মৃতপ্রায় পৃথিবীর মিথ্যুক কথক
লেখক: তৃণময় দাস
শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব
বই: The Book of the New Sun Vol 1: Shadow & Claw
লেখক: Gene Wolfe
প্রকাশনা: Orion Publishing Group (SF Masterworks)
মূল্য: £14.99
সুদূর ভবিষ্যৎ। সূর্যের পাণ্ডুর কিন্তু রক্তিম আলো। জরাগ্রস্ত পৃথিবী। ম্যাজিক আর বিজ্ঞানের সহাবস্থান। জ্যাক ভেন্সের ‘ডায়িং আর্থ’ (‘মৃতপ্রায় পৃথিবী’) জনরায় এই চারটে জিনিস থাকবেই থাকবে।
এখানে সত্যিটা বলি: জ্যাক ভেন্সের ‘ডায়িং আর্থ’ উপন্যাসগুলোর একটাও আমার পড়া হয়নি। সত্যি বলতে এই ঘরানার সঙ্গে আমার এতদিন পর্যন্ত যোগাযোগ ছিল জর্জ আর আর মার্টিন (এবং গার্ডনার ডোজোয়া) সম্পাদিত ‘Songs of the Dying Earth’ বইটির মাধ্যমে, যেটা মূলত জ্যাক ভেন্সের সৃষ্ট জগতের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে, বাঘা বাঘা কিছু লেখক-লেখিকার ফ্যান-ফিকশন। বহু বছর আগে, পড়ার সময়, এই বইয়ের অনেক কিছুই আমার মাথায় ঢোকেনি, এবং বইটি পুনর্মূল্যায়ন করার সময় যে এসে গেছে, বুঝতে পারছি। মোদ্দা কথা, এই জনরার প্রতি আমার জ্ঞান কতটা সীমিত, সেটা আগে থেকে জানিয়ে রাখা উচিত।
কারণ, সম্প্রতি আমি ‘The Book of the New Sun’ সিরিজ়টি ধরেছি, আর প্রথম দুটো উপন্যাসের সংকলন ‘Shadow & Claw’ শেষ করেছি। জিন উল্ফের লেখা এই সিরিজ় তো খ্যাতই হয়েছে প্লটের জটিলতা আর অস্পষ্টতার জন্য। অতএব জ্যাক ভেন্সের লেখা না পড়ে এই বইগুলো পড়া শুরু করাটা একপ্রকার ধৃষ্টতাই বটে, এবং তার জন্য আমাকে মাশুল দিতে হয়েছে বারংবার।
জিন উল্ফ প্রণীত ‘New Sun’-এর পাঁচটা উপন্যাস মৃতপ্রায় পৃথিবীর গল্প, তাতে সন্দেহ নেই। উপন্যাসে স্পষ্ট করে বলা নেই, তবে সিরিজ়টার জন্য লেখা অভিধানে (হ্যাঁ মশাই, এই সিরিজ়ের জন্য আলাদা একটা ডিকশনারি রয়েছে) বিবৃত রয়েছে যে উপন্যাসগুলো, বর্তমান সময় থেকে ১০ লক্ষ বছর পরের ঘটনা হলেও হতে পারে।
এই জায়গায় জ্যাক ভেন্সের ‘ডায়িং আর্থ’-এর সঙ্গে একটা বড়ো পার্থক্য রয়েছে। ভেন্সের দুনিয়া বর্তমান সময় থেকে কোটি কোটি বছর ভবিষ্যতের। ততদিনে রাতের আকাশে চাঁদ নেই, আর সূর্য প্রায় নিবুনিবু। ততদিনে বর্তমান সভ্যতার কোনো চিহ্নই পৃথিবীতে আর দেখতে পাওয়া যায় না। ততদিনে মানুষ মধ্যযুগীয় জীবনযাত্রায় ফিরে গেছে। কিন্তু জিন উল্ফের উপন্যাসে রাতের আকাশে চাঁদ (Lune) দেখা যায়। বর্তমান সভ্যতার চিহ্নও স্বপ্নের মতো ইতিউতি ভেসে ভেসে আসে। কারণ, ‘New Sun’-এ সূর্য মারা যাচ্ছে অসুস্থতার জন্য, সিরিজ়ের নায়ক সেভেরিয়ানের কথায়, “with a worm in its heart.”
সেভেরিয়ান আমাদের নায়ক। সেই লোন সোর্ডসম্যান ট্রোপের পরাকাষ্ঠা। একখান ইয়া বড়ো তরোয়াল পিঠে বয়ে বেড়ায়। জুতোতে মহামূল্য দৈব রত্ন গুঁজে রাখে। এবং অবশ্যই নানারকম রোমাঞ্চকর ঘটনার সম্মুখীন হয়। এইসব শুনে চোখ উলটিয়ে কোনান, গাটস ইত্যাদিদের কথা বলতেই পারেন। কিন্তু একটা ছোটো সমস্যা রয়েছে। সেভেরিয়ান একটা সাইকোপ্যাথ। এবং, যেহেতু গল্পগুলো সেভেরিয়ানের জবানিতে আমরা শুনছি, ক্রমে ক্রমে এটাও বোঝা যায়, সেভেরিয়ান আমাদের মিথ্যে বলছে, ক্রমাগত বলেই যাচ্ছে।
গল্পের ফ্রেমিং-এর জটিলতা এখান থেকেই শুরু। প্রথম ফ্রেমিং হল সেভেরিয়ানের জবানি। সামান্য একজন টর্চারার থেকে (ইয়ে, এই পয়েন্টে পরে ফিরছি) কীভাবে সে অটার্ক (সম্রাট) হয়ে উঠল, সেই ঘটনাবলি বিবৃত করতেই সেভেরিয়ান কলম তুলে নিয়েছে। অতএব লেখাটাকে একদিক থেকে প্রপাগান্ডা গল্পও বলা যেতে পারে।
দ্বিতীয় ফ্রেমিংটা আরও জটিল। চতুর্থ দেওয়াল ভেঙে প্রতিটা উপন্যাসের শেষে জিন উল্ফ নিজে উত্তরকথনে আমাদের জানাচ্ছেন, সেভেরিয়ানের লেখাটা নাকি সময়ের উলটো স্রোতে বেয়ে তাঁর হাতে এসেছে। এই লেখার অচেনা ভাষাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে তাঁর নাকি অনেক অসুবিধা হয়েছে, এবং অনেক শব্দের সঠিক অনুবাদ তিনি খুঁজেই পাননি। একটা উদাহরণ দিই। হয়তো গল্পে লেখা আছে: সেভেরিয়ান একটা destrier দেখতে পেল, অর্থাৎ আমাদের ধরা উচিত সেটা যুদ্ধের ঘোড়া। কিন্তু আসলে এটাও হতে পারে যে সেটা কোনো ঘোড়াই নয়, বরং জেনেটিক মিউটেশনের ফলে জন্মানো কোনো জীব।
এইরকম অস্পষ্টতা সবার পছন্দ হবে না, কিন্তু আমার কাছে এইরকম ফ্রেমিং-এর ব্যবহার এক অভূতপূর্ব পড়ার অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছে। আজ থেকে কয়েক লক্ষ পরের দুনিয়াটা যে আমাদের কাছে ধোঁয়াশাপূর্ণ হবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ভাবুন, একজন মধ্যযুগীয় মানুষকে আপনি কলকাতা শহরের মাঝে ফেললেন। তাঁর কাছে আমাদের প্রযুক্তি, আমাদের স্থাপত্য, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের বিবিধ ভাষা অবিশ্বাস্য শুধু নয়, স্বপ্নালু মনে হবে।
সেই স্বপ্নালু ভাবটি ‘Shadow & Claw’-তে রয়েছে। তার উপর জিন উল্ফ ইচ্ছে করে কিছু স্বল্পপরিচিত এবং উদ্ভট শব্দ ব্যবহার করেছেন, যেগুলো মূলত জার্মান, গ্রিক আর লাতিন ভাষা থেকে নেওয়া লোন-ওয়ার্ড। (একটা-দুটো সংস্কৃত শব্দও পাবেন, কিন্তু সেগুলো নিয়ে আলোচনা করব না, নইলে চমকটা পাবেন না।)
এত বাধাবিপত্তি পার করে কাউকে একটা বই পড়তে বলাটা এক ধরনের অসভ্যতা বটে (মানে লোকজন ‘Dune’ নিয়েই কত ধরনের অভিযোগ আনে), কিন্তু বইগুলোর ঘোর একবার লেগে গেলে সেই নেশা ছাড়ানো কঠিন।
আর এই ঘোর লাগার মূল কারণ আমাদের ফেভারিট সাইকোপ্যাথ লোন সোর্ডসম্যান, সেভেরিয়ান।
সেভেরিয়ান মিথ্যুক। এটা বইটা পড়ার সময় মনে রাখবেন কিন্তু। প্রথম লাইনটা পড়ে একটু জোরে নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে মনে করাবেন… সেভেরিয়ান মিথ্যুক।
ও বড়ো হয়েছে মাটাকিন টাওয়ারে, পুরোনো সিটাডেলের ধ্বংসাবশেষে। যে সংঘে বড়ো হয়েছে, সেটার গালভরা নাম হল ‘দি অর্ডার অব দ্য সিকারস ফর ট্রুথ অ্যান্ড পেনিটেন্স’, গোদা বাংলায় যাকে বলে ‘টর্চারার’-দের গিল্ড। অটার্কের হয়ে রাজনৈতিক বন্দিদের উপর নির্যাতন করতে এরা সিদ্ধহস্ত।
এইরকম একটা পরিবেশে ছোটোবেলাটা কাটালে কেউ যে সুস্থ মস্তিষ্কের হবে না, সেটা বলাই বাহুল্য। কিন্তু সেভেরিয়ান শুধু নির্যাতন, নিপীড়ন আর স্কন্ধ থেকে ধড় আলাদা করাতেই পারদর্শী নয়, সে একজন দার্শনিকও বটে। প্রথম উপন্যাসে (‘The Shadow of the Torturer’) শুরুতেই, বিপ্লবী ভডালুসের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর সেভেরিয়ানের বলা এই লাইনটা আমার চিরকাল মনে থাকবে: “We believe that we invent symbols. The truth is that they invent us; we are their creatures, shaped by their hard, defining edges.”
বেশি কার্ল ইউং আর সার্ত্রে না কপচিয়ে বললে ব্যাপারটা দাঁড়ায়, আমাদের জীবনে যে সমস্ত চিহ্ন বা প্রতীক রয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক একতরফা নয়, বরং ব্যাপারটা মিথস্ক্রিয়। হয়তো শুরুতে প্রতীকের জন্ম আমাদের হাতে হয়, কিন্তু পরে সেই প্রতীক আমাদের চিন্তাধারা, বোধশক্তি, এমনকি আমাদের আচরণকেও প্রভাবিত করতে থাকে। তাই এই ইঁদুর দৌড়ের যুগে টাকার নোট আর ব্যাংক স্টেটমেন্টের মতো প্রতীক আমাদের জীবনমৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এইরকম প্রতীকের ব্যবহার বই জুড়ে রয়েছে। জিন উল্ফ আসলে হাই ফ্যান্টাসি জঁরের সঙ্গে জড়িত প্রতীকের ঘনঘন ব্যবহার করেছেন এই কারণেই… আমরা পাঠকদের পড়ার ধরনটাকে সর্বোপরিভাবে ম্যানিপুলেট করার জন্য। এই চিহ্ন আর প্রতীকের ধাঁধা ভেদ করাটাই পাঠকদের দিকে ছুড়ে দেওয়া একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। একটা ধাঁধার কথা বলি। মাটাকিন টাওয়ার, যেটাকে আমরা ফ্যান্টাসি সেটিং-এর একটা টাওয়ার বা মিনার হিসাবেই ধরে নিয়েছি, সেটার বর্ণনা বেশ কয়েকবার পড়লে (ধাতব দেওয়াল, ছোটো ছোটো খোপের মতো ঘর, সব থেকে উপরের কক্ষে থাকা অদ্ভুত ‘কলকবজা’) বোঝা যায়, হায় রে, সেটা কোনো টাওয়ার নয়, আমাদের যুগের কোনো মহাকাশযান। আর তারপরে বোঝা যায়, যে বড়ো দুর্গে ওরা থাকে, সেটা এক ধরনের স্পেস পোর্ট ছাড়া আর কিছুই নয়। ভাষা এখানে সিম্বল হয়ে যায়, আমাদের সচেতন মনকে প্রভাবিত করার একটা মারাত্মক অস্ত্র।
কিন্তু পরবর্তী বইয়ে (‘The Claw of the Conciliator’) এই দার্শনিকতার বদলে আমরা দেখতে পারি কদর্যতা। কারণ, আমাদের ভাবুক সেভেরিয়ান একসম তাদের গিল্ডে হয়ে-থাকা যৌননির্যাতন সম্বন্ধে খুবই শুকনো বর্ণনা দিতে থাকে। তখন সে আর জটিল তত্ত্ব নিয়ে কথা বলে না, বরং তার হাতে ধরে-থাকা তরোয়াল হয়ে যায় ‘iron phallus’। সেভেরিয়ানের এই দ্ব্যর্থব্যঞ্জক রূপই ওকে অন্য লোন সোর্ডম্যানদের থেকে আলাদা করে ফ্যালে।
সবশেষে প্লট নিয়ে কিছু কথা বলি, যদিও এই গল্পের সিনপসিস দেওয়াটা দুঃসাধ্য ব্যাপার। মাটাকিন টাওয়ারে বড়ো-হয়ে-ওঠা সেভেরিয়ান এক বন্দির প্রেমে পড়ে একটি মারাত্মক ভুল করার জন্য তাকে গিল্ড থেকে বহিষ্কৃত করা হয়। মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে তাকে দেওয়া হয় জল্লাদের কাজ এবং বলা হয়, নেসাস শহরের সুদূর উত্তরে থ্রাক্স বলে একটা শহরে জল্লাদের কাজের জন্য তাকে আহ্বান করা হয়েছে। এই অভিযানে বেরিয়ে, সেভেরিয়ান নানান অদ্ভুত ঘটনার মধ্যে জড়িয়ে যেতে থাকে। এক দৈত্য আর এক ডাক্তারের যাত্রাদল, আজিয়া নামে একজন সুন্দরী প্রতারক রমণী, এক অর্ধোন্মাদ চ্যালা, একজন সাইবর্গ… এইভাবে একের পর এক অদ্ভুত চরিত্রেরা প্লটের স্রোতে কিছুক্ষণের জন্য ভেসে আসে, তারপর কোনো এক ঘূর্ণাবর্তে আবার হারিয়ে যায়। এর মধ্যে ঘটনাচক্রে সেভেরিয়ানের হাতে এক দৈব রত্ন আসে, কনসিলিয়েটরের ক্ল, যা দিয়ে সে রীতিমতো আব্রাহামিক মিথের সমতুল্য মিরাক্ল ঘটাতে থাকে।
কিন্তু আস্তে আস্তে বোঝা যায়, সেভেরিয়ান একই ঘটনাকে মাঝে মাঝে দু-ভাবে বর্ণনা করছে, অর্থাৎ এইখানে কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে, সেটা বোঝা সামান্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটা উদাহরণ দিই। ‘The Shadow of the Torturer’-এ একজন বারবনিতার সঙ্গে রাত কাটানোর পর সেভেরিয়ান, আমাদের, মানে পাঠকদের আশ্বাস দিয়ে বলে যে সে নারীদোষে তেমন দুষ্ট নয়, বরং একটা রাত কাটানোর পর সে ওই পতিতালয়ের দিকে পা বাড়ায়নি। কিন্তু কয়েকটা অধ্যায় পরেই, অনেকটা মুখ ফসকে সেভেরিয়ান বলে ফ্যালে যে, সে শহরে বহু বারবনিতার আলিঙ্গনের সঙ্গে পরিচিত ছিল, এমনকি ওদের গিল্ডের এক বন্দির সঙ্গে ওর অবৈধ সম্পর্কও ছিল।
এইরকম কন্ট্রাডিকশনে ভরা কথনের জন্য প্লটটাকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করার একটা বড়ো সুযোগ রয়েছে। আমার কাছে এই বইটার প্লট যেভাবে এগিয়েছে, আমি যেভাবে ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করেছি, সেটা আরেকজন পাঠকের থেকে একদম সম্পূর্ণ আলাদা হবে। এখানে প্রতিটা বাক্যের পেছনে লুকিয়ে আছে রহস্যের আহ্বান। প্রতিটা চরিত্রের মুখে রয়েছে অসংখ্য মুখোশ। প্রতিটা বলা ম্যিথের পেছনে রয়েছে আমাদের ইতিহাসের হাতছানি (একটা রূপকথা আসলে মার্কিন গৃহযুদ্ধের পুরাণীকৃত রূপ)।
জিন উল্ফের লেখার মন্দ দিক হল অ্যাক্সেসিবিলিটির অভাব। আধপাগল নার্ড ছাড়া এই বইগুলোতে দাঁত বসাতে কেউ তেমন সাহস পাবে না। তাই তো এখন বলছি, একবার চেষ্টা করে দেখতে পারেন। হয়তো মৃতপ্রায় পৃথিবীর মিথ্যুক কথক সত্যিই আপনাকে ঘোরের মধ্যে ফেলে দিতে পারে।
ব্যক্তিগত রেটিং: ৪/৫
Tags: একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা, তৃণময় দাস
