পিছাবনি
লেখক: পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়
শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব
ক্যু সতেরো নম্বর হাঁচিটা দিয়ে ডেস্কের উপর একটা থাবড়া মারল। চোখ জ্বালা করছে, নাক দিয়ে জল পড়ছে। ল্যাবের মধ্যে ভাইরাল আউটব্রেক হয়েছে নির্ঘাত। আবুদ তো স্ট্যাটাস দিয়ে রেখেইছে ওয়ার্কিং ফ্রম কমোড। কী ঘেন্নার কথা! মোটের উপর সিস্টেম ল্যাবের হেল্থ ইন্টিগ্রিটি প্রোটোকলের অ্যাইসি কি ত্যাইসি হয়ে গিয়েছে।
খুবই স্ট্রেঞ্জ ব্যাপার! রেগুলার ফ্লু শট দেয় সিস্টেম। ল্যাবের মধ্যেই থাকা-খাওয়া, বিনোদন। বাইরে নোংরা পলিউশনের মধ্যে যাওয়ার কোনো ব্যাপার নেই। উপায়ও নেই। বড়ো বড়ো কোম্পানির মাথা, ভারী ভারী দেশের মুণ্ডু ল্যাবে টাকা ঢেলে যাচ্ছে। আনকোরা মেমোরি ইনটেলিজেন্স একটু চেপে না রাখলে হয়? এত কিছুর পরেও ভাইরাস ঢুকল কোথা দিয়ে?
পার্সনাল কনসোলে পুটুং করে রোজার মেসেজ এল। সকাল থেকেই জ্বর-মাথাব্যথা নিয়ে ডাউন, লাঞ্চে স্পাইসি খেতে মন চাইছে, ক্যু কি জয়েন্ট অর্ডার দিতে ইচ্ছুক?
ক্যু কনসোলটা খুলে রোজার মেসেজের জবাব দিতে গেল—“কী খাবি?” লিখতে গিয়ে থেমে গেল আঙুল।
ঠিক কী খেতে ইচ্ছে করছে, সেটাই তো মনে পড়ছে না। ওই সিন্থেটিক প্রোটিন শেক ছাড়া কী খায় ক্যু?
বিরক্ত হয়ে ফেভারিটস ট্যাবটা খুলল ক্যু। সাধারণত এখানে সারি সারি আইকন থাকে—খাবার, গান, শো, ‘কমফোর্ট মেমোরি’ অনুযায়ী সাজানো লিস্ট। থাকে, মানে থাকার কথা। এখন নেই।
শুধু একটা ফাঁকা ধূসর গ্রিড বেকুবের মতন ক্যু-র দিকে চেয়ে আছে। কেন?
কনসোল হ্যাং হল? হতে পারে, তবে কখনও হয়নি আগে। আগের কথা কতটা ক্যু-র মনে আছে? হঠাৎ ক্যু-র মনে হল, এই হাঁচি অ্যালার্জির ভাইরাস কি তার মেমোরিতে ঢুকে পড়ল?
“বোগাস!”
মাথা ঝাঁকিয়ে পুরো কনসোল রিফ্রেশ করতে দিল। স্ক্রিন ঝলসে উঠল, তারপর একই ফাঁকা ঘরগুলো আবার ফিরে এল।
এ কেমন তামাশা? কালেকটিভ মেমোরি ফিল্ডে দাপিয়ে বেড়ানো ক্যু-র কমফোর্ট মেমোরি সাজানোই আছে ওর জো হুজুরি করার জন্য। সেসব ফুড়ুত হয়ে গেল?
মেমোরি গিয়ারটা খুলে রেখেছিল ক্যু, নাক-চোখের নায়াগ্রার তোড়ে, পাশ থেকে উঠিয়ে মাথায় পরে নিল। ওর মাথার সঙ্গে সিস্টেমের সরাসরি যোগাযোগ। কই ওর কমফোর্ট মেমোরি?
ক্যু-র বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল।
সিস্টেমে মান্ধাতার আমলের টেকনোলজির মতন এখন গ্লিচ হয় না। মানুষের যা মনে থাকে না, সিস্টেম তা-ই মনে রাখে।
কিন্তু দুটো জায়গা থেকেই যদি একসঙ্গে উধাও হয়ে যায়?
“মেমোরি ফিল্ড ডায়াগনস্টিক চালাব নাকি?”
গিয়ার আদুরে গলায় বলল। ক্যু-র বিরক্তি-রাগ ভালোমতোই সিস্টেমে পৌঁছোচ্ছে তার মানে। তাহলে সমস্যা কোথায়?
ক্যু-র বলার দরকার হল না। গিয়ার নিজেই ডায়াগনস্টিক চালিয়ে দিল।
“অ্যালার্ট এসেছে, ক্যু। আমি পড়ে দিই?” চিকন গলায় গিয়ার বলে উঠল।
“এসেছে, দেখতেই পাচ্ছি, ন্যাকামি বন্ধ কর…” বিরক্তিটা পুরোপুরি উগরে দেওয়া ক্যু-র আর হয়ে উঠল না।
গোটা গোটা লাল রঙে সারা স্ক্রিন জুড়ে অ্যালার্ট ঝলসাচ্ছে। সঙ্গে মেমোরি লিংক পার্সেন্টেজ গ্রাফ সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে নেমে আসছে।
“তোমার মেমোরি লিংক করাই আছে, ক্যু, কিন্তু পারসেন্টেজ কমছে।” গিয়ারের গলা এবার একটু সিরিয়াস।
ক্যু হঠাৎই বুঝতে পারল এ কোনো সাধারণ ম্যালফাংশন নয়। ওর এই নিয়ে চব্বিশতম হাঁচিও সাধারণ জ্বর বা ভাইরাস নয়। কেউ বা কিছু ওর ব্যক্তিগত মেমোরি ফিল্ড, ওর নিজস্ব স্মৃতির মধ্যে ঢুকে পড়েছে।
“আপডেট আছে একটা, জরুরি। ইস্ট সেক্টরে অ্যানোমালি। যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, CMI শূন্য।” গিয়ার নিস্পৃহ গলায় বলল।
“ইমপসিব্ল!” উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠল ক্যু।
CMI—কালেকটিভ মেমোরি ইনডেক্স। বহুরাত জেগে মাথার চুল ছিঁড়ে বানানো ওর ব্রেনচাইল্ড। পৃথিবীর প্রতিটি কোনা-ঘুপচি থেকে মানুষের স্মৃতির প্রয়োজনীয়তা মেপে তৈরি স্কোর—যার উপর নির্ভর করে উন্নয়ন, বিনিয়োগ, এমনকি নাগরিকত্ব। ট্রিলিয়ন ডলার মাল্টিন্যাশনাল প্রোজেক্ট।
ক্যু-র চোখের সামনে ম্যাপের থামনেইলটা নেচে উঠল। অ্যালার্ট নোটিফিকেশনের দিকে তাকাতেই গিয়ার সরব হল, “অ্যানোমালিটা এসেছে এই দেশ থেকে। তোমাকে দেখাচ্ছি…”
গিয়ারের বাকি কথাগুলো আর ক্যু-র কানে ঢুকল না।
যে ছবিটা চোখের সামনে ভাসছে, সেটা বড়ো চেনা। তিনদিকে সমুদ্র, ত্রিভুজের মতো স্থলভাগ। জ্বলজ্বল করছে বড়ো বড়ো CMI, তিন অঙ্ক, দুই অঙ্ক। চেনা-চেনা।
পুবদিকে জ়ুম করে এগোতেই কলকাতা ভেসে উঠল। CMI মন্দ নয়, একশো পঁচাত্তর। আরও জ়ুম, এই তো দিঘা। টুরিস্ট স্পট, আটাত্তর CMI। বড্ড চেনা। কোন জন্মে থাকত এখানে ক্যু?
গিয়ার এসে স্থির হল দিঘার পাশে একটা অঞ্চলে। জায়গাটা ফাঁকা—সবুজ নীল রংচঙে ম্যাপের মধ্যে অদ্ভুত এক ধূসর শূন্যতা। ক্যু এক্ষুনি এমন ধূসর ফাঁকা স্পেস দেখে এসেছে, এখনও ওর পার্সনাল ফেভারিট ট্যাব খুললে একই ধূসর ফাঁকা গ্রিড দেখা যাবে।
গিয়ার চুপ করে গেছে। রোজ়ি কিছু একটা বলছে মেসেজে, সেসব দিকে নজর দেওয়ার অবকাশ নেই। ক্যু ফুল রোজি জ়ুম করল।
ধূসর দাগটার চারপাশে ভূগোলটা যেন স্থির থাকতে পারছে না—নদীর রেখা কাঁপছে, রাস্তার নেটওয়ার্ক ভেঙে গিয়ে আবার জোড়া লাগছে। যেন ম্যাপের মধ্যে ভূমিকম্প হচ্ছে। জায়গাটার নাম কী?
স্ক্রিনে নামটা ভেসে উঠল—এই তো, এই নামটা, এই নামটা তো—
তারপর দুম করে নামটা ঝাপসা হয়ে গেল। ক্যু চোখ কুঁচকে তাকাল। পড়ার আগেই শব্দগুলো যেন পিছলে যাচ্ছে। মস্তিষ্কে ঢোকার আগেই মুছে যাচ্ছে।
ক্যু-র শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নামতে শুরু করল। এ কোনো সিস্টেম ম্যালফাংশন নয়, ডেটা-ডিলিশন নয়। ক্যু বিলক্ষণ জানে, এ হল স্মৃতিক্ষয়ের লক্ষণ।
কয়েক সেকেন্ড পরে নামটা আবার এক মুহূর্তের জন্য পরিষ্কার হল।
পিছাবনি।
জন্মভূমি! জন্মভূমি!
এবার ক্যু-র মনে পড়ে গেল, ওর আসল নাম মাধবীলতা হাঁসদা। ওর কমফোর্ট ফুড হল অনেকটা লংকা দিয়ে লাল করে ভাজা মুড়ি, আর সেই মা বেঁচে থাকতে মায়ের বানানো পাঁঠার মাংস দিয়ে চিনিগুড়া চালের ভাত। এই যে জায়গাটা ম্যাপে ধূসর হয়ে আছে, এ হল সেই গ্রাম, যেখানে ক্যু জন্মেছে। ক্যু-র ঠাকুমার ঠাকুমা জন্মেছে। সেই গ্রাম, যেখান থেকে সে একদিন ভিন দেশে চলে এসেছিল।
যে জায়গাটার নাম এতক্ষণ ঠিক করে মনে পড়ছিল না।
পিছাবনি।
পিছাবনি।
পিছাবনি।
ক্যু হঠাৎ বুঝতে পারল, সে যতই নামটা মনে করার চেষ্টা করছে, শব্দটা তত দ্রুত তার মাথার ভেতর থেকে পিছলে যাচ্ছে।
যেন কেউ ডাস্টার হাতে ওর মাথার মধ্যে দাঁড়িয়ে। ভালো করে কথাটা ফুটে ওঠার আগেই মুছে দিচ্ছে। স্মৃতি মুছে দিচ্ছে। জন্মভূমির স্মৃতি, মুছে দিচ্ছে।
ক্যু কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে স্থির তাকিয়ে রইল। ল্যাবের মধ্যে বন্দি একটা নিরাপদ স্বছন্দ জীবন তার, সেখানে জন্মভূমির স্মৃতি না থাকলেই-বা কী?
ক্যু দ্রুত গ্লোবাল CMI ড্যাশবোর্ড খুলল।
ম্যাপে ধূসর দাগটা স্পষ্ট।
তার চারপাশে সবুজ অঞ্চলগুলো স্থির, কিন্তু মাঝখানে একটা ন্যাড়া জায়গা যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে, ভাসছে—একটা নেহাত ফাঁকা জায়গা।
এবার পরপর স্ট্যাটাস লাইন আসতে শুরু করল—
“CMI-এর নিরিখে এই অঞ্চলটি সিস্টেমের কাছে অপ্রয়োজনীয়।
আইডেন্টিটি রেকর্ড: শূন্য
মানব সম্পদ: শূন্য
স্টেট রেশন: টারমিনেটেড”
ক্যু-র গলা শুকিয়ে গেল। CMI শূন্য শুধু নয়, ওখানকার মানুষ এখন রাষ্ট্রের কাছে অস্তিত্বহীন।
র্যাশন নেই।
ব্যাংক নেই।
জমির অধিকার নেই।
ইতিহাস নেই।
এত নেইয়ের দায় কার? ক্যু-র? এই জায়গার লোকগুলো টেকনিক্যালি জীবিত, কিন্তু সিস্টেমের দৃষ্টিতে তারা ডিলিটেড। মানব, কিন্তু সম্পদ নয়। এমন কেন হচ্ছে? CMI কম হলে এসব হবে, কেউ তো ক্যু-কে ঘুণাক্ষরেও বলেনি?
ক্যু-র হাত অন্যমনস্কভাবে ধূসর জায়গাটার উপর থেমে রইল। সে জানে, এই পর্যায়ে প্রোটোকল কী বলে। কালেকটিভ মেমোরি ফিল্ড আনস্টেব্ল হলে সেখানে ঢোকা নিষিদ্ধ। এর কারণ অনেকগুলো। যে ঢুকবে, সে কোনো ম্যাপ গাইড পাবে না, প্রাইম কনসোলের সঙ্গে যোগাযোগ থাকতেও পারে, আবার না-ও থাকতে পারে। সব চেয়ে বড়ো কথা, যেটা সিস্টেম পইপই করে মনে করিয়ে দেয়, বেসামাল মেমোরি ফিল্ডে ঢুকলে কিছু না কিছু বদলে যাবেই। সেখান থেকে আর আগের মতন ফেরা সম্ভব নয়।
অর্থাৎ—
ক্যু চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। মৃত্যুর আগে নাকি মানুষ তার সারাজীবন একঝলক দেখতে পায়। জেদি মাধবীলতা ভাইয়ের সঙ্গে আইসক্রিম নিয়ে চুলোচুলি করছে, সামনে দুর্গা ঠাকুরের মূর্তি। ঘাড়ের উপর রদ্দা এসে পড়ছে, সঙ্গে মুখুজ্জেকাকার চিৎকার, “নীচু জাত শালা, মায়ের মন্দিরে ঢুকিস?” মুখুজ্জেকাকার হিংস্র মুখের পেছনে গর্জন তেল-মাখা ঠাকুরের মুখ জ্বলজ্বল করছে। ওইটাই মায়ের মুখ। স্থির, মর্গের সামনে শোয়ানো, সারা শরীরে দাগ আর সেলাই। মাধবীলতা খালি পায়ে স্পনসরের ইনটারভিউ দিতে যাচ্ছে। ঠাকুমা—
ক্যু-র বুকের ভেতর আচমকা তোলপাড় করে উঠল। এ শুধু সিস্টেম অ্যানোমালি নয়। নাড়ির টান ওকে ডাকছে। এ ডাকে সাড়া না দিয়ে মাধবীলতা যায় কোথায়?
ক্যু ধীরে ধীরে ‘ফিল্ড ওভাররাইড’ ট্যাব খুলল। ব্যাকআপ লগইন প্রম্ট ভেসে উঠল।
গিয়ার বলছে, শুনতে পেল ক্যু, “ফিল্ড স্টেব্ল নয়। কোয়ান্টাম সিংক নেই। এখানে ঢুকলে তোমার বরাবরের মতন স্মৃতিভ্রংশ হওয়ার সম্ভাবনা নাইনটি নাইন পার্সেন্ট।”
কেটে কেটে বলে লিখেও দিল সিস্টেম। সতর্কবার্তাটার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল ক্যু। তারপর খুব ধীরে, কেটে কেটে বলল, “এত লোকের শূন্যের দায় ক্যু নেবে না। মাধবীলতাও না।”
‘CONFIRM’ বোতামের উপর ক্যু-র আঙুল থেমে রইল এক মুহূর্ত। তারপর চাপ দিল। স্ক্রিনে ম্যাপটা থরথর করে কেঁপে উঠল।
ধূসর দাগটার ভেতরে প্রথমবারের মতো একটি ক্ষীণ নির্দেশচিহ্ন জ্বলে উঠল—
একটা ভাঙাচোরা পথ।
এ রাস্তা পৃথিবীর কোনো মানচিত্রে নেই।
ক্যু-র চোখের সামনে গিয়ারের ডিসপ্লেতে ধূসর অঞ্চলের সীমানা ঝাপসা হয়ে উঠল।
তারপর এক মুহূর্তের জন্য সব আলো নিবে গেল।
ক্যু নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে বলল, “কেউ নেই, কিছু নেই—সূর্য নিবে গেছে।”
পরের মুহূর্তেই চারদিক আলো হয়ে উঠল। ক্যু দাঁড়িয়ে আছে খোলা আকাশের নীচে। গরম নোনা হাওয়া মুখে এসে লাগছে। দূরে সমুদ্রের গর্জন।
ক্যু হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে পড়ল। শরীরটা হঠাৎ ভারী লাগছে।
এই অনুভূতিটা সে আগে শুধু সিমুলেশনে পেয়েছে, মেমোরি ফিল্ডের মধ্যে ঢুকলে স্পেস-টাইম ক্যালিব্রেশন ঠিকমতো মেলে না। যদিও সেসব সময়ে প্রাইম কনসোল সঙ্গে সঙ্গে রিক্যালিব্রেট করে দেয়। এখন সে সম্ভাবনা খুবই কম।
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল ক্যু। চারপাশে তাকিয়ে বুঝল—সে একটা মেঠোরাস্তার উপর দাঁড়িয়ে আছে। মেঠোরাস্তাই কি? তাহলে মাঝখানে খাদ কেন?
যেন রাস্তাটা কিছুতেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না কোনদিকে যাওয়া উচিত, থাকা উচিত, না মুছে যাওয়া উচিত।
ক্যু প্রমাদ গুনল। সে জানে এর মানে কী। এখানে স্মৃতি এত কম, স্পেস-টাইম ফ্যাব্রিক অপুষ্ট হয়ে পড়েছে।
গা ঝেড়ে উঠে একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ করল ক্যু। রাস্তার পাশে একটা দোকান। দরজাটা অর্ধেক খোলা। ভেতরে টাল-দেওয়া মুদির জিনিস, কিন্তু জিনিসগুলো যেন সম্পূর্ণ নয়। চিপসের প্যাকেট নেই, চিপসগুলো এমনই ঝুলে আছে। দরজাটা আধস্বচ্ছ। আধখানা আছে, বাকিটা নেই।
ক্যু জানে এগুলো স্মৃতিনির্ভর বস্তু। যতটা যেমনটা মানুষ মনে রেখেছে, ততটাই বাস্তব। বাকিটা—অস্তিত্বহীন।
ঠিক তখনই বাসটা হলুদ চোখ নিয়ে হুড়মুড় করে ক্যু-র গায়ের উপরে উঠে এল। শেষ মুহূর্তে একজোড়া সবল হাত এসে চুলের মুঠি ধরে ক্যু-কে রামধাক্কা না দিলে কী হত, বলা শক্ত। ধাক্কার চোটে ক্যু মুখ থুবড়ে পড়ল।
এইদিকটা কাঁকরে ভরতি। উলটে পড়ে হাঁটু আর থুতনি জ্বালা করছে। স্কুলের বাইরে এমন মাঠ ছিল, মনে পড়ল ক্যু-র। নীচু জাত বলে ওখানে বসে মিল খাওয়ার হুকুম ছিল। যেদিন মিল থাকত, সেদিন। স্মৃতি কেন এত যন্ত্রণার?
“মর ছুঁড়ি! আসার আর সময় পেলিনে?”
ঘটনার আকস্মিকতায় যতটা বিহ্বলতা ছিল, কথাটার ধাক্কায় কোথায় উবে গেল। ক্যু তাকিয়ে দেখল সামনে এক সাদা চুলের বৃদ্ধা। পরনে থান, চুল কদমছাঁট। অথচ চোখ দুটো ঝাপসা, বলিরেখাগুলো তিরতির করে কাঁপছে।
“কে? ঠাকুমা?”
কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল ক্যু।
“তুই কে?”
তীক্ষ্ণকণ্ঠে প্রশ্ন করলেন মহিলা।
“মাধবী–লতা।”
খুব কষ্ট করে নামটা বলতে পারল ক্যু। এখানে আর কিছুক্ষণ থাকলে নিজের নামটাও ধরে রাখা কঠিন হবে। হাঁটু, হাতের চেটো জ্বালা করছে, এটা একদিকে সাপে বর হয়েছে। সারভাইভাল ইনস্টিংট স্মৃতির উপর দখল রাখতে কিঞ্চিৎ সাহায্য করছে।
“কী চাই এখানে? হাতে সময় নেই, শিগগিরই বল।” ভদ্রমহিলা জাঁদরেল হুংকার দিলেন।
মাথার রগ চেপে ক্যু অস্ফুটে বলল, “সময়—আর-একটু।”
সামনে রাস্তাটা কাঁপছে। কোথায় যাবে এখন ক্যু?
“সময় নেই। আয়, আমার সঙ্গে আয়। একা মেয়েছেলে পেলে তুলে নে যাবে। ফুলমণি থাকতে অত সহজ হবেনে।”
বলে ভদ্রমহিলা তরতর করে এগিয়ে গেলেন। কথাগুলো ভেঙেচুরে যাচ্ছিল, শেষের কথাটা প্রতিধ্বনি হতে লাগল। সামনে পিচরাস্তাটা আর নেই। সেখানে মেলা লোক। খণ্ডযুদ্ধ বেধেছে। এক মুহূর্তে ক্যু-র কাছে স্থানকালপাত্র পরিষ্কার হয়ে গেল।
সে এখন একটা সেকেন্ড হ্যান্ড স্মৃতির মধ্যে আছে। এ গল্প প্রায় সন্ধ্যায় ঠাকুমা বলত, পাকা চুল বাছতে বাছতে শুনত ক্যু। পিছাবনির স্বাধীনতার লড়াইয়ের গল্প। লবণ সত্যাগ্রহের সময় এই গ্রামে নুনচাষিরা এসে জমা হয়েছিলেন। ব্রিটিশ পুলিশের সামনে রুখে দাঁড়িয়েছিল সেই জমায়েত। তার মধ্যে ঠাকুমার ঠাকুমা ছিলেন। ফুলমণি, নামটা ঠাকুমা বলেছিল বটে।
ক্যু জমায়েতটার দিকে এগোল। জমায়েতটা যেন আরও পিছিয়ে গেল। ক্যু দৌড়োতে লাগল। রাস্তাটা কেমন উঠে উঠে যাচ্ছে। ক্যু এবার হাঁপিয়ে উঠল। সে যত এগোয়, ভিড়টা ততই পিছিয়ে যায়। পেছনে সমুদ্রটাও তা-ই। একটা ফোর্ড গাড়ি এসে ভিড়টার সামনে থামল। গাড়ি থেকে কোট-টুপি-পরা একটা লোক নেমে এল। ওগুলো কি ব্রিটিশ পুলিশ?
“ওদিকে যাস না। ওটা অন্য সময়।”
দূরে একটা ছায়ামূর্তি বলে উঠল। লোকটা কয়েক পা এগিয়ে এল। চোখ দেখা যাচ্ছে। এক মুহূর্তে স্পষ্ট, পরের মুহূর্তে ফিকে হয়ে যাচ্ছে। চিনতে পারল ক্যু।
“বাবা!”
লোকটা থেমে দাঁড়াল তার সামনে। চোখ দুটো গভীর, ক্লান্ত।
ক্যু-র বুকের ভেতর ধড়াস করে উঠল, বলল, “তোমরা… র্যাশন বন্ধ, লোন বন্ধ—বাবা? তোমরা এখানে আছ কীভাবে?”
লোকটা প্রশ্নটা যেন বহুবার শুনেছে। শান্ত গলায় বলল, “মনে রেখে।”
ক্যু বুঝতে পারল না।
লোকটা এবার হাত তুলে দূরের জনতার দিকে দেখাল। মানুষ পুলিশের উদ্যত লাঠির সামনে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শব্দগুলো বাতাসে ভেসে আসছে—
“…পিছাবনি… পিছাবনি… পিছাবনি…”
লোকটা বলল, “আমরা প্রতিদিন নিজেদের নাম বলি। আমাদের গ্রামের নাম বলি। সে নামের ইতিহাস বলি। আমাদের ঠাকুমা-ঠাকুরদাদার রক্তে ভেজা ইতিহাস। আমরা মৃতদের নাম বলি। যতক্ষণ কেউ উচ্চারণ করে, যতক্ষণ কেউ শোনে, ততক্ষণ সব কিছু পুরোপুরি মুছে যায় না।”
লোকটা খানিক থেমে বলল, “র্যাশন, কাগজ ছিল, ব্যাংক, চাষের বীজ, জমি। ওই, থাকার থাকা। গোলমাল লেগেই থাকত। কখনও সিস্টেমের স্ক্যানার খারাপ হয়, কখনও ট্রানস্লেটর।
“একদিন সিস্টেম বলল, কাজের কাজ বিশেষ কিছু হবে না আমাদের দিয়ে। আমরা বুড়োবুড়িরা পড়ে আছি। ছেলেমেয়েরা বাইরে। এতগুলো পেট চালাতে সরকারের অনেক খরচ। তারপর থেকেই সব পালটে যেতে থাকল।”
ক্যু দেখল বাবার চোখে কোনো রাগ নেই। শুধু গভীর ক্লান্তি।
“তারপর আমাদের নাম কাগজ থেকে মুছে গেল।”
ক্যু-র চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। এথিক্স প্রোটোকল সব ক-টা ভাঙা হয়েছে এখানে। প্রত্যেকটা স্পনসর সই করে লিখেছিল, কালেকটিভ মেমোরি ইনডেক্স ব্যবহার করে একটাও মানুষকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
“কিন্তু আমরা নিজেদের ভুলিনি,” বাবা বলল, “যতদিন কেউ কাউকে মনে রাখে, ততদিন সে পুরোপুরি মরে না।”
ঠিক তখনই হাওয়ার ঝাপটা এল। বাবার শরীরের ডান পাশটা হঠাৎ অন্যরকম হয়ে গেল, যেন আরেকটা লোকের আধখানা।
ক্যু ভয়ে ফিশফিশ করে বলল, “বাবা, তুমি… মুছে যাচ্ছ?”
লোকটা মাথা নাড়ল।
“আমাদের মনে রাখার লোক কমে যাচ্ছে।”
বলতে বলতেই বাবার চোখ দুটো হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“তুই কে জানিস? তুই তাদের একজন… যারা এখনও আমাদের মনে রেখেছে। ওইজন্যই আমরা এখনও আছি রে, মাধু।”
ক্যু-র শ্বাস আটকে গেল।
বাবা খুব ধীরে বলল, “তাই তুইও এখনও পুরোপুরি মুছে যাসনি।”
দূরে মানুষের আর্তনাদ, ব্রিটিশ পুলিশ বেদম পেটাচ্ছে। আবার একসঙ্গে ধ্বনি উঠল—“পিছাবনি… পিছাবনি…”
ক্যু এই প্রথমবার অনুভব করল, এ লড়াই নেহাত সিস্টেমের রিক্যালিব্রেশনের জন্য ম্যাপিং ফিক্স করার নয়। এ লড়াই—ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে। স্মৃতি বেদখল হওয়ার বিরুদ্ধে।
তখনই দূর থেকে রাগি গুঞ্জন ভেসে এল। যেন অনেকগুলো ভিমরুল একসঙ্গে উড়ছে।
ক্যু মাথা তুলে তাকাল। দিগন্তে একটা কালো বিন্দু। তারপর সেটা বড়ো হতে লাগল, একটা হোভারক্রাফ্ট। ধাতব, ডিমের মতো গঠন। নীচ থেকে সরু সরু অ্যান্টেনা ঝুলছে।
লোকটা হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার মুখের ক্লান্ত ভাবটা মুহূর্তে বদলে গেল।
“ওরা এসেছে।”
ক্যু-র বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“কে?”
লোকটা উত্তর দিল না। দূরে রাস্তাটা দুটো ভাগে ভাগ হয়ে গেল। স্কুলের মাঠটা মাঝখানে ঢুকে পড়েছে, দেখল ক্যু। সেখানে কয়েকজন আবছা মানুষ একসঙ্গে উঠে দাঁড়িয়েছে।
ভাসমান যন্ত্রটা ধীরে ধীরে নীচে নামল। অ্যান্টেনাগুলো মাটির দিকে তাক করে নেমে আসছে, যেন কিছু স্ক্যান করছে।
ক্যু-র মাথার ভেতর হঠাৎ একটা তীব্র চাপ অনুভূত হল। যেন কেউ জোর করে তার স্মৃতির ভেতর ঢুকতে চাইছে। পায়ের তলার মাটি কেমন জেলির মতন হয়ে গেল। বাবা খপ করে ধরে না ফেললে ক্যু আবার পড়ে যেত।
ক্যু কষ্ট করে বলল, “সরকার রেসকিউ টিম পাঠিয়েছে?”
“সরকার নয়। ওরা তার চেয়েও বড়ো।”
যন্ত্রটা মাটির কয়েক ফুট উপরে ভাসছে এখন। গায়ে ঝলমলে লোগোটা এবার দেখতে পেল ক্যু।
“Synaptica Memory Solutions.”
ক্যু-র বুকের ভেতর একটা ধাক্কা লাগল। SMS ওদের ল্যাবের পেট্রন, দুনিয়ার সব চেয়ে বড়ো মেমোরি-ইকোনোমি কর্পোরেশন। এদের স্পন্সরশিপেই মাধবীলতা ক্যু হতে পেরেছে। এদের দেওয়া মেমোরির উপরেই ক্যু সিমুলেশন চালাত। ওরা বলত সিন্থেটিক মেমোরি। তা-ই কি?
বাবা ফিশফিশ করে বলল, “গুজব আছে, মাধু, ওরা এবার আসবে, যা বাকি আছে, সব নিয়ে যেতে।”
“কোন স্মৃতি নিয়ে যায় ওরা?”
বাবার চোখে হঠাৎ ভয় ঝলসে উঠল, “আমাদের গল্প। গান। আমাদের নাম। মায়ের নাম।”
“তাও তোমরা এত কিছু মনে রেখেছ? কী করে পারলে গো?”
ম্লান হাসল বাবা।
“প্রতিবার ওরা আসার পরে আমরা সকলে মিলে বসে আবার মনে করি। কষ্ট হয়, তাও। গোটাটা পারি না, কিছু কিছু মনে থেকে যায়। ওইটুকু দিয়ে এখনও টিকে আছি।”
ক্যু হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
“মানে… তোমরা নিজেরাই তোমাদের CMI বাড়াচ্ছ?”
বাবা অবাক চোখে তাকাল।
“সেটা কী রে?”
কথার উত্তর দেওয়ার আগেই একটা আশ্চর্য কাণ্ড হল। ক্যু-র পা দুটো যেন জেলির মতন নরম মাটির মধ্যে সড়াত করে ঢুকে গেল। প্রথমে পা, তারপর কোমর। শেষে পুরো শরীরটাই। দুম করে একটা অন্ধকার ঘরে এসে পড়ল ক্যু। কিছু বোঝার আগেই গিয়ারের স্ক্রিনে ঝলসে উঠল: “ক্রস কানেকশন—ফিল্ড আনস্টেব্ল”
“ড্যাম ইট।” দাঁত কিড়মিড় করে বলল ক্যু। গ্রামে কী হচ্ছে, আর শোনা যাচ্ছে না। এটা কোথায়? কার স্মৃতি?
ঘরটাতে আশ্চর্য টক গন্ধ। মাছি ভনভন করছে। তক্তার উপরে সারি সারি পাতা, তার মধ্যে থেকে ওটা কী? নড়ছে কেন?
পাতাগুলো বেঁকেচুরে উঠে দাঁড়াল। যেন একটা মানুষ।
“ক্যু? ডেঞ্জার!”
“আবিদ?” ক্যু ধরা-গলায় বলল।
“ওরা আমার পুরো দেশ ডিলিট করে দিচ্ছে, ক্যু! ম্যাপে বুর্কিনা ফাসোর কোনো চিহ্ন নেই। SMS হোভারক্রাফ্ট পাঠিয়েছে আমার গ্রামে।”
“SMS-এর স্পন্সরশিপেই আমাদের এতদূর আসা। আমরা কি ভুল করেছিলাম, আবিদ?”
পাতার শরীরটা কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়ল মেঝের উপরে। ক্যু ধরতে গেল, পারল না। চারটে পাতা খুলে এল শুধু।
“আমার পিসি বলল, ওরা তাও লড়ছে। নিজেদের নাম নিয়ে ছড়া বানিয়েছে। ডেটাবেস ছাড়া, সিস্টেম ছাড়া, শুধু মনে রেখে।” আবিদ বলল।
“হ্যাঁ। আমার বাবাও তা-ই বলল। যদি একসঙ্গে অনেক মানুষ একই সময় একই জিনিস মনে করে… তাহলে সেই স্মৃতি মেমোরি ফিল্ডে হঠাৎ বিস্ফোরণের মতো বুস্ট দেয়। CMI বাড়ে। কিন্তু এভাবে কতদিন?”
“আমরাই কতদিন টিকব? মৃত পিসির সঙ্গে কথা বলেছি বলে দ্যাখো, আমার কী দশা হচ্ছে? অ্যানোমালি!”
“আমরাও অ্যানোমালি ছিলাম, আবিদ। নয়তো অজ পাড়াগাঁ থেকে ল্যাবে নিয়ে এল কেন SMS? কেবল দয়া?”
বাইরে ফটাস করে একটা জোরে কিছু ফাটল। জোর বচসার আওয়াজ আসছে। ক্যু দ্রুত হিসেব কষছিল। CMI ধরে নেয়, যা মানুষ বেশি মনে রাখে, সেটা প্রয়োজনীয়, এবং—”
“মেমোরি কীভাবে ছড়ায়, আবিদ?”
আবিদের দেহটা দুমড়ে-মুচড়ে একটা ঝুড়ির মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। ক্যু নিজের মনেই বলল, “সিস্টেম ধরে নেয়, স্মৃতি ছড়ায় স্বাভাবিকভাবে। অর্গানিক। রাইট? আচ্ছা আবিদ, যদি অ্যানোমালি ইনজেক্ট করি?”
একটা প্রচণ্ড আলোর ঝলক ক্যু-র চোখ ধাঁধিয়ে দিল। লাল-হলুদ ফল, ঝুড়ি, কলাপাতা চারদিকে ছিটকে উঠে তালগোল পাকিয়ে ক্যু-র উপরে পড়ার সময় একটা বিকট আওয়াজ করে ঘরটার ছাদ উড়ে গেল।
ধাঁধা কাটতে ক্যু দেখল, পিছাবনির সেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। দূরে রাগি ভিমরুলের গর্জন তুলে হোভারক্রাফ্ট আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে।
মাঠের দিকে তাকিয়ে ক্যু-র বুক হুহু করে উঠল। যেখানে মানুষগুলো একটু আগে দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের শরীর এখন আধস্বচ্ছ হয়ে গেছে। কারা যেন গুঙিয়ে গুঙিয়ে কাঁদছে।
“বাবা! বাবা?”
ক্যু সামনে পড়ে-থাকা লোকটার দিকে ছুটে গেল। বীরবাহু হাঁসদা খালি হাতে নারকেল ফাটাত। কাদায় পড়া ট্র্যাক্টর একা টেনে তুলত। সেই বীরবাহু হাঁসদা, ক্যু-র বাবা, মাটিতে ধনুকের মতন বেঁকে শুয়ে আছে।
“বাবা? ও বাবা? প্লিজ় কথা বলো! ও বাবা!”
ধনুকের মতন বাঁকানো শরীরটা সামান্য নড়ে উঠল।
“আমরা শুধু ভুলে যাচ্ছি না,…” শ্বাস টেনে টেনে বলল বীরবাহু, “আমাদের ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”
আকাশে বিলীয়মান হোভারক্রাফ্টের দিকে তাকিয়ে ক্যু বলল, “এবার ওদের থামাতে হবে। এত সহজে পিছাবনি।”
দূরে একটা কুকুর ডেকে উঠল। এখনও ওরা আছে? স্মৃতি না সত্যি?
ক্যু-র গিয়ারের ডিসপ্লেতে ধূসর অঞ্চলটার চারপাশে নানান আকারের লাল সতর্কবাণী দপদপ করে উঠল।
তারপর একে একে স্ট্যাটাস লাইনগুলো বদলাতে লাগল—
—CMI বিপজ্জনক সীমানার নীচে
—এমার্জেন্সি প্রোটোকল শুরু হচ্ছে
দূরের সমুদ্রটা হঠাৎ স্থির হয়ে গেল। তারপর ধীরে ধীরে আকাশের রং ফিকে হতে শুরু করল। নীল থেকে ধূসর, ধূসর থেকে প্রায় স্বচ্ছ। যেন কেউ পৃথিবীর রং, আলো সব ধুয়ে ফেলছে। মাঠের ঘাসগুলো একে একে মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। গাছের ডালগুলো মাঝখান থেকে ভেঙে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
কনসোলে একটা কাউন্টডাউন উইন্ডো খুলে গেল। 60… 59… 58
হাতে আর এক মিনিটও নেই। ম্যাপ, মেমোরি ফিল্ড, স্মৃতির দেশের এই যোগাযোগ যেমন মুছে যাবে, তেমনই ওই জায়গায় যে মানুষগুলো শারীরিকভাবে উপস্থিত, তাদের সমস্ত স্মৃতি মুছে যাবে। SMS ওই ডাকাতি-করা স্মৃতিগুলো ইচ্ছামতো বদলে সিমুলেশনের জন্য বিক্রি করবে।
বীরবাহু ফিশফিশ করে বলছে, “ফুলমণি!”
“মাধবীলতা!”
“পিছাবনি!”
কুকুরটা একটানা কাঁদছে। ঠিক তখনই ক্যু-র কনসোলের ভেতরে একটা নতুন উইন্ডো খুলে গেল।
BACK UP PROTOCOL INITIATED
কোণে আবিদের নাম দেখতেই ক্যু ঝাঁপিয়ে পড়ল।
“ANCHOR NODE REQUIRED.”
30… 29… 28—কাউন্টডাউন চলছে।
পুটুং করে একটা মেসেজ এল। গিয়ার কথা বলল এতক্ষণে, গলাটা আবিদের।
“সিস্টেমকে সিস্টেম দিয়েই ধোঁকা দিতে হবে। আমরাই অ্যানোমালি, আমাদের স্মৃতি সিস্টেমের ঘাড়ে নোঙর ফেলে টুপি পরিয়ে যাবে। প্রম্ট এলে নিজের আসল নাম বলিস। সাইনিং আউট—তোর আবিদ নামুন।”
ক্যু-র মাথার মধ্যে সব পরিষ্কার হয়ে গেল। এই ব্যাকআপ প্রোটোকলটা ভাগ্যিস কী ভেবে বানিয়েছিল ওরা!
20… 19… 18
দূরের সমুদ্র প্রায় অদৃশ্য। কুকুরটা ককিয়ে উঠল। বীরবাহু মাটিতে পড়ে। নিস্পন্দ।
ক্যু-র চোখ জলে ভরে উঠল। ওর শরীরটা পড়ে থাকবে সিস্টেম ল্যাবের দশ ফুট বাই দশ ফুট বাব্লের মধ্যে। স্মৃতি, ভালোবাসা, ভয়, আনন্দ সব মিশে যাবে কালেকটিভ মেমোরি ফিল্ডের মধ্যে। সেখানে তার কাজ হবে এক ও একমাত্র—
10… 9… 8
তার মাথার ভেতর হঠাৎ একের পর এক স্মৃতি জেগে উঠল—
ঠাকুমার চুল তুলতে বসে গল্প শোনা। খেতের মধ্যে ক্ষতবিক্ষত পড়ে-থাকা মা। ভাইয়ের সঙ্গে খুনশুটি। উঁচু জাতের বাবুদের মারধর। স্পনসরের সামনে দাঁড়িয়ে-থাকা সেই কিশোরী মাধবীলতা। স্মৃতি বড়ো যন্ত্রণার।
স্ক্রিনে প্রম্ট উইন্ডোটা কাঁপছে—
“ANCHOR NODE REQUIRED.”
ক্যু নিজের নামটা মনে করার চেষ্টা করল—মা… ধা…
শব্দগুলো অস্পষ্ট হয়ে আসছে।
5… 4… 3
ঠিক তখনই দূরে মানুষগুলোর কণ্ঠ আবার উঠল—“পিছাবনি… পিছাবনি…”
ক্যু চোখ বন্ধ করল।
3… 2… 1
তার ঠোঁট নড়ল—“মাধবীলতা… হাঁসদা…”
চারপাশের পৃথিবীটা যেন ভেতর থেকে উলটে গেল।
ক্যু অনুভব করল সে আর মাটিতে দাঁড়িয়ে নেই। সে ভাসছে। আলোর মধ্যে, জলের মধ্যে, কোনো কিছু না-থাকার মধ্যে সে ভাসছে। তার চারপাশে অগণিত আলোর ফোঁটা মিটমিট করছে। কেউ উজ্জ্বল, কেউ ক্ষীণ, কেউ প্রায় নিবুনিবু।
এই আলোর ছিটে এইগুলোই স্মৃতি? মানুষের স্মৃতি। জীবজন্তুর স্মৃতি। বুর্কিনা ফাসোর স্মৃতি।
পিছাবনির স্মৃতি।
হঠাৎ একটা আলোর দিকে সে টান অনুভব করল। কাছে এগোতেই আলোটা ঝরনার ফেনার মতন ক্যু-র উপরে এসে পড়ল।
বাবার গলা—“পিছাবনি মানে কী জানিস? পিছিয়ে যাব না।”
আরেকটা আলো জ্বলে উঠল। তার মধ্যে কিশোরী রোজ়ি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসে একটা হাস্কির গলা জড়িয়ে কাঁদছে।
আরেকটা আলো, ভাই খিলখিল করে হাসছে। বিয়েবাড়ির রোশনাই।
আরেকটায় বুর্কিনা ফাসো। লাল মাটিতে খালি পায়ে এক কিশোর কোকো ফল টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আবিদ নামুন।
চারদিকে একটার পর একটা আলো ক্যু-কে ঘিরে ধরছে, বলয়ের মতন। প্রতিটা আলো একটা জীবন্ত গল্প। ক্যু-র ইচ্ছে হল, পরিদের মতন হাত ছড়িয়ে নাচে। আহা, তার তো হাত-পা কিছুই নেই। শরীরটাই নেই।
ক্যু ফিশফিশ করে উঠল, “পিছাবনি, পিছাব-নি, পিছাবনি…”
ঠিক তখনই একটা গভীর কম্পন ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। দূরে ছড়িয়ে-থাকা ক্ষীণ নিবুনিবু আলোরা একে একে উজ্জ্বল হতে লাগল। যেন কেউ তাদের পলতে উসকে দিয়েছে।
ক্যু এখন সিস্টেমের ঘাড়ে নোঙর ফেলেছে। আবিদ নামুন ফেলেছে। রোজ়িও হয়তো। স্মৃতিগুলোর পলতে উসকে দেওয়ার কাজ ওদের। একমাত্র ওদের।
শেষবারের মতো ক্যু নিজের ভেতরে একটা শব্দ শুনতে পেল—মৃদু, দূর থেকে ভেসে-আসা—“মাধবী…”
শব্দটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
তারপর শুধু একটাই ধ্বনি রয়ে গেল—অসংখ্য কণ্ঠে উচ্চারিত—“পিছাবনি… পিছাবনি…”
বহু বছর পরে—
নতুন পৃথিবীর মানচিত্রে কিছু অঞ্চল সব সময় একটু আলাদা রঙে জ্বলে। কোনো প্রশাসনিক নাম নেই, দেশ নেই, সরকার নেই, কিছুই নেই। ওগুলো সিস্টেম অ্যানোমালি। সিস্টেম নিজেই জায়গাগুলো দেখভাল করে।
CMI এখানে একটু অদ্ভুত ধরনের ছটফটে। কখনও একটু উঁচুতে ওঠে, কখনও বেশ কমে যায়। কিন্তু কখনও শূন্যে নামে না। এইসব তুচ্ছ ব্যাপারে কেউ মাথাও ঘামায় না।
তবে কিনা ইদানীং একটা কানাঘুষো শুরু হয়েছে। এই জায়গাগুলো সিস্টেম নিজের জন্য ইনভেস্ট করছে। নয়তো Synaptica Memory Solutions, বিশ্বের এক নম্বর মেমোরি ব্যাংক, এই জঞ্জাল স্পেসগুলো কিনতে যতবার বিড দেয়, সিস্টেম নাকচ করে দেবেই-বা কেন? আর দিন দিন এমন জায়গা বেড়ে উঠবেই-বা কেন? এই জায়গাগুলো এমনিতে ম্যাপে কিছুই দেখায় না, কিন্তু বারবার দেখলে একটা চোখের, কানের ভুল হয়।
ভুলটা অবশ্য খুব মজার। মনে হয় যেন অনেকগুলো মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে বলছে:
“পিছাবনি
পিছাবনি
পিছাবনি”
কেন যে এ যুগেও এসব হয়!
Tags: একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা, পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়
