উচ্চতা
লেখক: সাগ্নিক কোলে
শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব
১
ব্লু রেন কাফেতে আমি প্রায়ই আসি, ঠিক এই সময়। সাড়ে চারটে-পাঁচটার মধ্যে রেলিং-ঘেঁষা এই টেবিলটা দখল করে বসে পড়ি, লিয়ানাকে ডেকে বলি ‘দি ইউজ়ুয়াল’। তবে আজকের ব্যাপারটা আলাদা। অন্যদিন ক্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকি, লালচে ধূসর আকাশের দিকে, লম্বা লম্বা বাড়ির দিকে, উদ্দেশ্যহীন এয়ার ট্রাফিকের দিকে। আজ রীতিমতো ভাবতে হচ্ছে। আমি ভাবুক নই, ইমোশন-টিমোশন আমার স্রেফ ন্যাকামো মনে হয়। আমার কাজ শরীর নিয়ে, আই মিন, দিয়ে। আমি সাপ্লাই করি। কিন্তু মালটা কী, তা-ই তো? শুনতে অদ্ভুত, কিন্তু এই অডিয়ো জার্নালে আমি কিস্সু লুকোই না। আমি ডেলিভারী বয়, তবে ব্যাপারটা একটু অন্যরকম, কনফিডেনশিয়াল আর… খদ্দেরদের খুবই ব্যক্তিগত। বিয়ে বা যাকে অনেকের যথেচ্ছ যৌনতার সামাজিক কনট্র্যাক্ট মনে হত, তাও একসময় হয়ে গেল বাসি। বহুগামিতা আর কেচ্ছা থাকল না, স্বাদবদল কে না চায়! আমরা মূলত সেক্সটিং অ্যাপ (আগে যা ছিল ডেটিং অ্যাপ) থেকে ডিপ সার্চ করে তুলে আনি আমাদের সম্ভাব্য খদ্দেরদের পুল; একাকিত্বের থেকে ভালো মার্কেট আর কী হতে পারে! তারপর ছিপ ফেলে দিনকয়েকের অপেক্ষা। শালা, বহুত ভাটাচ্ছি। এবার স্ট্রেট টু দ্য পয়েন্ট। আমার কোম্পানির নাম ফ্লেশ-কাপ্ল। আমরা সিন্থেটিক শরীর তৈরি করি, একদম কাস্টমাইজ়ড, তারপর একেবারে, বলা যায় বেডসাইড ডেলিভারি। আমার মতো আরও খান দশেক ‘বডিবয়’ আছে আমাদের আঞ্চলিক অফিসে, আর অব কোর্স, আমরা দশজন আলাদা আলাদা এরিয়া কেটার করি। কত লোকের কতরকম ফ্যান্টাসি, বাপ রে বাপ! ছেলে, মেয়ে, মাঝামাঝি… সমাজের টপ টু বটম, কেউ বাদ নেই। আমাদের প্রোডাক্ট তো জাস্ট পুতুল নয়, সূক্ষ্মভাবে তাতে প্রাণ… ঠিক প্রাণ নয়, মানে ওরা রেসিপ্রোকেট করতে পারে, বুঝে নিন। আজ বস বলল, “তোর হয়তো মনে নেই, নেক্সট মান্থ তোর সার্ভিসের পনেরো বছর পূর্ণ হচ্ছে।”
আমি তো শালা অবাক! খেয়ালই নেই আমার। উত্তর খুঁজে পেলাম না। শরীর বেচতে বেচতে বুড়ো হয়ে গেলাম?
“তোকে আমরা একটা গিফট দেব, তোর চয়েস। তুই যা বেচিস, তেমনই একটা মাল, যদ্দিন বাঁচবি, নিখরচায় মেনটেনেন্স। তোর লয়ালটির জন্য এটুকু রয়ালটি তুই ডিজ়ার্ভ করিস।”
মনে মনে ভাবলাম, গাঁ* মেরেছে! সবাইকে জিজ্ঞেস করি, “এগজ়্যাক্টলি বলুন তো, আপনার কী চাই, ডাইমেনশন ধরে ধরে বলুন। রং বলুন, গন্ধ বলুন, টেক্সচার বলুন…।” নিজের কী ভালো লাগে, তা তো কোনোদিন ভেবে দেখিনি!
“ভাবছি।” বলে কাজ সারলাম।
“ঠিক এক সপ্তাহ সময় দিলাম। তার মধ্যে জানাবি। তা না হলে আমাদের নতুন প্রোটোটাইপ, যা এখনও মার্কেটে আসেনি, তার একটা তোকে দেব। রথ দেখবি, কলা বেচবি। ফিল্ড ট্রায়াল আর কী!”
নতুন প্রোটোটাইপের একটা ফ্যান্সি নাম আছে, নিউ ফ্লুয়িডিটি মডেল বা এনএফএম। আমাদের প্রোডাক্ট মেনলি দু-রকম, পুরো সলিড আর অর্ধেক সলিড। বুঝলেন না? সেক্সের জন্য পেলভিক আর থোরাসিক এই দুটো রিজিয়ন রিক্রিয়েট করে বাকিটা হলোগ্রাম দিয়ে ফিল করা হয়। অর্থাৎ আপনি সংগমসুখ তো পাবেনই, আপনার দু-হাতের মুঠোও পাবে নরম শিহরন, আর তার সঙ্গে শুনতে পাবেন আপনার হাফ সলিড পার্টনারের ত্বরান্বিত লাব-ডুব। আর ফুল সলিড মানে তো বুঝতেই পারলেন। এনএফএম মালটা এই দুইয়ের মাঝামাঝি। ধরুন, আপনি চুমু খাবেন, আপনার সেই তুমুল আবেগ ফিরিয়ে দেবে আমাদের ডেভেলপ-করা নতুন হলোগ্রাম, সিউডো-সলিডিফায়েড হয়ে। শুনতে দিব্যি লাগে, কিন্তু ওই, ব্যাপারটা কেমন যেন অস্বাভাবিক।
আমি তা-ই ভাবছি। আমি ঠিক কী চাই, আমি জানি না। মনে পড়ে যাচ্ছে আমার ফ্যামিলির কথা। মায়ের কথা। এমনিতে পড়ে না। রোজ অনেকগুলো পাত পড়ত বাড়িতে। মায়ের মুখস্থ ছিল কার কোন পদটা প্রিয়। একদিন বললাম, “বলো মা, অর্ডার করব। বা চলো, ডাইন আউট করি। তোমায় কী কী প্রিয়, বলো।”
মায়ের তখনকার নির্বাক হাসির মানে কোনোদিন ধরতে পারিনি। তাই হয়তো অনেকখানি জীবন আমার অধরা থেকে গেছে। যাক গে, হু দ্য ফাক কেয়ারস!
ব্লু রেন কাফের এই বারান্দায় আমি কিছুক্ষণ থেমে থাকি। ভালো লাগে। এটুকুই।… না, আরও কিছু আছে। বলা ভালো, আরেকজন আছে। লিয়ানা।
২
খুব ঘনঘন আসে লোকটা। ওর দিকে অদ্ভুতভাবে তাকায়। লিয়ানা লক্ষ করে, তবে মনে রাখে না। ও ঝুঁকে পড়ে অর্ডার নেয়, যেমনভাবে ওকে ট্রেন করা হয়েছে। ডিপ নেক স্লিভলেস টপের ভেতর দিয়ে শরীরের নিষ্ফল হাতছানি হাওয়ায় ছড়িয়ে যায়। লোকটা তাকায় ওর ক্লিভেজের দিকে, নাভির দিকে, মাঝে মাঝে ওর গলা, চিবুক আর পুরু ঠোঁটের দিকে। কিন্তু আজ তা হল না। লোকটা ওর চোখের দিকে তাকাল। প্রথমবার। তাকিয়েই থাকল। অনেকক্ষণ। ‘দি ইউজ়ুয়াল’ না বলে জানতে চাইল, “একটা বড়ো মাটির ভাঁড়ে অনেকটা আদা-দেওয়া দুধ-চা আনতে পারো? সঙ্গে খান দুই প্রজাপতি বিস্কুট?”
লিয়ানা অবাক হয়, কিন্তু ও লোকটাকে কিছু বুঝতে দেয় না। “শিয়োর” বলে একটা মেকি হাসি ছুড়ে দেয় সে।
পঞ্চান্নতলায় অবস্থিত এই কাফেটা গড়পড়তা কাফের থেকে একটু আলাদা। যাবতীয় তামসিক কেনাবেচা এখানে বিশেষ হয় না, কারণ এখানকার আকর্ষণ অন্যত্র। ফুট দশেকের একটা কাচের বারান্দা বেরিয়ে এসে ধরে রেখেছে এর রুফটপ অংশকে। কয়েকটা হলদেটে অথচ স্বচ্ছ ছাতা-ঢাকা টেবিলে এখানে বসার ব্যবস্থা করা আছে। সন্ধের দিকে অর্থাৎ হ্যাপি আওয়ারে হালকা নীল রঙের বৃষ্টি পড়ে এই একফালি বারান্দায়। কীভাবে? লিয়ানাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিল বডিবয়।
“এটা কী হচ্ছে, লিয়ানা? আই মিন, কীভাবে হচ্ছে?”
“ধরে নিন এটা আমাদের ট্রেড সিক্রেট।”
“বৃষ্টি বিক্রি করছ?”
মুচকি হেসে লিয়ানা তাকিয়ে ছিল দু-তিন সেকেন্ড। ও কি তাহলে জানে যে বডিবয়ও সেল্সম্যান, অন্য আর-এক বৃষ্টির?
নীল বৃষ্টির ধারা লিয়ানার শরীরের নানান উপত্যকা বেয়ে নেমে আসে আর জলাশয় না পেয়ে অতলে তলিয়ে যায়। বডিবয় না-তাকানোর ভান করে। তীব্র কামের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে কবিতা, উল্লম্ব পৌরুষ ঢেকে দেয় চুম্বনের পুরোনো ক্ষত। কিন্তু আজ এসব কিছুই হল না। কপট অন্ধকার গিলে নিল বিকেলের আলো। বৃষ্টি নামল যথাসময়ে। বডিবয় তার দ্বিতীয় প্রজাপতি বিস্কুটটা হাতে নিয়ে বসে ছিল। তার সামনে দিয়ে লিয়ানা হেঁটে গেল বারকয়েক, তবু নিস্তেজ হয়ে রইল প্রজাপতির ডানা।
হঠাৎ “বিল প্লিজ়” শুনে খানিক চমকে উঠল সে। তারপর? আরেকবার “শিয়োর”। আরেকটা মেকি হাসি।
৩
X (তারিখ)
আমার প্রিয় বন্ধু বলেছিল, “ডায়েরি লেখ। যা পারবি, লেখ! কিন্তু লেখ।” অনেকদিন ধরে ভাবলাম, লিখব, লিখব না, লিখতে পারি না, কোনোদিন লিখিনি, তারপর একদিন ধুত্তোর বলে শুরু করে দিলাম লিখতে।
যখন শুরু করলাম, কাগজ তখন আর কিনতে পাওয়া যায় না। সময়ের কোটর থেকে বের করে আনলাম কয়েকটা হলুদ পোকায় কাটা পাতা। কিছু যায়-আসে? আরও ভাবলাম দিনকয়েক; নাহ্, দেরি হয়ে যাচ্ছে! আসলে আমার ভীষণ আঁকড়ে বাঁচতে ভালো লাগে, সময়কে, নিজেকে, যাবতীয় ক্ষয়িষ্ণু ভালো লাগাকে। তাই কাগজগুলো রেখে দিলাম, ওরা ওদের মতো থাকুক। ট্যাবলেটে সাদা ভোঁতা পেনের আঁচড় কেটে আমার নিরুদ্দেশ যাত্রা শুরু হল।
X+২৫
এই ক-দিন মনটা ভালো ছিল না। কেন ছিল না, সেটা হয়তো কাল আমার মনে থাকবে না। তাই এইবেলা লিখে রাখি। আমি ঘণ্টায় দু-তিনবার উঠে যাই বারান্দায়, ঝাঁপ না দিয়ে ফিরে আসি। কেন যাই? কেন ফিরে আসি? আমার ফ্ল্যাটটা কত তলায় বেশ? চল্লিশ বোধহয়, সত্তর হওয়াও আশ্চর্য নয়। তবে একটা জিনিস হলফ করে বলতে পারি, আমার কোনো পাশের ফ্ল্যাট নেই। তার কারণ, একেকটা বাসা থাকে থাকে বসিয়ে একটা রোগা ইটের পাঁজার মতো গোটা বাড়িটা কেউ দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। শর্টপিচ খেলার সময় সেই কোন ছোটোবেলায় যেমন ইটের উইকেট বানাতাম, ঠিক সেরকম। একটা ততোধিক রোগা লিফট মাটি থেকে আকাশের দিকে উঠে এসেছে, মাটির সঙ্গে যোগাযোগ এটুকুই। তাই প্রায় চারদিকে তাকালেই ধু-ধু আকাশ। বরাবর কিন্তু এমনটা ছিল না। আমার প্রিয় আকাশের রং এমন ফিকে জীবাশ্মের মতো ছিল না, আমার বিকেলগুলো এমন স্বমেহন আর তৎপরবর্তী ফাঁপা অনুভবে ভেসে যেত না।
আমার ভীষণ ইচ্ছে করে তোমায় ছুঁয়ে থাকতে, অপালা। মনে পড়ে, মা-কে বলতাম, আমি ত্রুটিহীন, দাগহীন সৌন্দর্য দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে গেছি। চারদিকে এত অসার বিজ্ঞাপন, চোখ-জ্বালিয়ে-দেওয়া হলোগ্রাম, যারা হোর্ডিং থেকে বেরিয়ে এসে ছোঁ মেরে কেড়ে নিতে চায় একাকী পথিককে। সব্বাই উঠে যাচ্ছে মাটি থেকে, হুস করে, দ্রুতগতির লিফটে। মা, তুমি সুন্দর নও, যারা মাটি থেকে অনেক উপরে থাকে, তাদের মতো নও। পতঙ্গভুক আগুনের মতো তেজ তোমার নেই। মনে আছে, তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে, “তুই কি কাউকে ভালোবাসিস?”
“হ্যাঁ, তোমায়।”
“না, ওরকম ভালোবাসা নয়।”
“না মা, এখনও পারিনি।”
“কেন?”
“আমি ছেলে, মেয়ে, জেন্ডার ফ্লুয়িড সবরকম মানুষের সঙ্গেই মিশেছি, কখনো-কখনো তারাও আগ্রহী হলে, শারীরিকভাবেও…”
“ঠিকাছে, বল-না!”
“কিন্তু একবারও, বিশ্বাস করো, একবারও মনে হয়নি যে, একে ধরে রাখা যায়, একে ছুঁয়েই বেঁচে থাকা যায়! আমার ভেতরটা কেমন যেন ঝাঁজরা হয়ে গেছে।”
ঠিক তারপরই কী লোডশেডিং হয়েছিল, নাকি…? কী জানি!
X+৬০
ডায়েরি লেখা শুরু করেছি… কয়েক মাস হয়ে গেল বোধহয়। আজকাল কিছু মনে থাকে না। আমি কি এবার সত্যিই পাগল হয়ে যাব? নাকি ইতিমধ্যেই…? আজ হঠাৎ মনে পড়ল, অপালাকে কতদিন দেখিনি। নাকি, কোনোদিন দেখিনি? যে চিঠি তোমায় কোনোদিন পাঠাইনি অপালা, তুমি কি পড়বে সেটা? যদি লিখি, যদি সাহস করে…।
চিরকালীন অপালা,
হাওয়ার মধ্যে হাত চালিয়ে নরম খরগোশের মতো তোমায় পেয়েছিলাম, ব্যাপারটা কিন্তু এত সরল নয়। অপালা, তুমি আমায় ক্লীব ভাবতে পারো, পাথরের বুকে নির্বিষ আঁচড় ভাবতে পারো; কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি আরেকটা ভঙ্গুর সকাল, কয়েকশো বসন্ত আমায় মাড়িয়ে চলে গেছে। অবশ্য তুমি বলতেই পারো, আমায় চেনো না, পৃথিবীর ভিড়ে মানুষ মানুষকে হারায় খুব সহজেই। প্রেম আমার শরীরে তীব্র বিষের মতো ছড়িয়ে পড়েছে, এটা জানার পর আর তোমায় দোষ দিই না; চাইলে তুমি যেতে পারো, তোমার নিজের হাতে খোঁড়া দরজা দিয়ে, দূরে। আমি বুঝতে পারি, একাধিক মহাজাগতিক স্নাইপার বহু দূর থেকে তাদের অস্ত্র নির্নিমেষ তাক করে আছে আমার দিকে, তবু আমি চিন্তিত নই এতটুকু। মৃত্যু মানে শরীর বদল হতে পারে, জন্ম মানে হতে পারে মৃত্যুরই মিরর ইমেজ, তবু আমি ভাবিত নই এতটুকু। এমনও হতে পারে, তুমি নেই, কোনোদিন ছিলেও না, তুমি আমার সমগ্র অস্তিত্বের ঘনীভূত তৃপ্তি, কাঁপা হাতে লেখা প্রথম কবিতা। তুমি প্রথাগত সুন্দরী নও, তোমার দু-গালের ব্রণ, বাঁদিকে হেলে-পড়া নাক আজও ঝরে-যাওয়া সময়ের সাক্ষ্য দেয়। অপালা, তোমায় ভালোবেসেছি বলেই আমি এই মুহূর্তে সব কিছু ভেঙে দিয়ে চলে যেতে পারি, নিজেকে পুড়িয়ে সেই ছাই মেখে নিতে পারি আমার পরবর্তী শরীরে। তুমি অস্বীকার করতে পারো না, ভালোবাসা তোমার ত্বকের নীচে কোকেনের পোকার মতো ছুটে বেড়ায়। শরীর একটা নৌকা, অপালা, জিনের পসরা সাজিয়ে আমরা তাতে পারাপার করি; কিংবা একটা ঝলমলে বাড়ি, যেখানে উৎসবের জৌলুস কমতেই থাকে ক্রমশ। তুলসী মঞ্চ, ঠাকুরদালান পেরোলেই এখানে পাওয়া যায় না অন্দরমহল। তুমি আসবে আমার বাড়িতে, একবার? হ্যাজাক বাতি নিবে গেলে না হয় অন্তত একটা কুপি জ্বালিয়ে দিয়ে চলে যেয়ো। অবশ্য এখন বাঁশপাতার মতো তিরতির করে তুমি কাঁপছ, আমি দেখতে পাচ্ছি এতদূর থেকেও। একটা বেয়াড়া ধূসর মেঘ বারবার ঘুরেফিরে এসে ঢেকে দিতে চাইছে তোমার অস্থির অবয়ব। আমি দেখতে পাচ্ছি, তোমার বন্যতা তুমি দু-হাতে উড়িয়ে দিচ্ছ শূন্যে, কনফেটির মতো। অপালা, ভালোবাসা আমায় বিহ্বল করেছে যত, নিরস্ত্র করেছে তারও বেশি। আমার দিনযাপন এখন রোশনাই আর অবলুপ্তির মাঝে একটা ছোট্ট সাঁকো, আর কিছু নয়। এই চিঠি তোমায় লিখতাম না, প্রিয়, যদি না আমার দীর্ঘতম ঘুম ভেঙে আমি দেখতাম আমার ছাদহীন ঘরের দেওয়ালে অসংখ্য সমান্তরাল রেখা, কোথাও তারা বেশ গভীর, মেঝেয় জন্মে যারা আকাশের দিকে ছুটে গেছে। আমার বাড়ির সমস্ত আলো, পোকায় খাওয়া কার্পেট, কাঠের ফ্রেমে ঝুলতে-থাকা দীর্ঘশ্বাস, প্রতিটা দেওয়ালজোড়া কাচের জানালা একেকটা পোর্টাল, অপালা। বিশ্বাস করো, স্থান, কাল, পথ আমার গুলিয়ে যায় প্রতিনিয়ত। ব্যাঙের সঙ্গে শরীর বদলে আমি লাফ দিতে চাই আমার নিজস্ব কুয়োর বাইরে, প্রজাপতি হতে চেয়ে তুমুল নিংড়ে নিই আমার হলুদ রঙের পৃথিবীকে। কখনও ভেবে দেখেছ, মানুষ যখন নগ্ন, নিজের শরীরে বন্দি, একা; সে তখন নিজের ছবি কীভাবে আঁকে? আমি ভেবেছি, এঁকেওছি। আমি বুঝেছি, ঘরে আটকে থাকলে আকাশ তো চৌকো খোপে ভাগ হবেই। আমার দুই সারি দাঁত দিয়ে আমি কংক্রিটের নিষ্ঠুর ইজেলে তাই একটা মুখর বিকেল আঁকতে চেয়েছি। আমি শুধু আমাকে খুবলে নিতে পারি প্যালিয়োলিথিক দেওয়াল থেকে, অপালা, মানুষের ক্ষমতা তো সামান্যই, তুমি জানো। নক্ষত্রপথিক তুমি, আরও এক কল্প পরে এসো, দেখতে পাবে, আমার কঙ্কাল আইসক্রিমের কাঠির মতো তোমার ঘরের এককোণে পড়ে আছে। তার দেওয়ালেও একই রকম সারি সারি দাগ।
ইতি,
তোমার অচেনা এক পথিক
X+৭৫
(ওর সঙ্গে একদিন কথাও হল। না, ঠিক একদিন নয়, মাঝে মাঝে হয়। মানে হত, বেশ অনেকদিন হয়নি আর। কিছুটা এরকম, যদ্দূর মনে পড়ে…)
“তোমায় লেখা চিঠিটা পড়েছ, অপালা?”
“পড়েছি।”
“সত্যিই?”
“হ্যাঁ, তিন সত্যি।”
“কোনো উত্তর দেবে না?” (আমার দু-চোখ ভারী হয়ে আসে, নাকের পাশে সোঁদা গন্ধ।)
“এই যে তুমি আমায় সৃষ্টি করেছ, ঠিক যেভাবে চেয়েছ, আমি এসেছি, শুধু তোমার হয়েই আছি; এটাই কি যথেষ্ট উত্তর নয়?”
“একটি বার আমার পাশে এসে বসবে, অপালা?”
“এই তো, এসেছি।”
“আমার হাতটা ধরো, প্লিজ়।”
“দাও।”
“কিন্তু তোমার হাতের মধ্যে দিয়ে আমার হাতটা গলে যাচ্ছে কেন? তোমায় ছুঁতে পারছি না কেন? তুমি অন্তত এইভাবে ঠকিয়ো না আমায়।”
“এই তো, দ্যাখো, তোমার কাঁধে মাথা রেখেছি…”
“কিন্তু আমি সেটা বুঝতে পারছি না কেন? কেন? আমি কি আদৌ জেগে আছি? আদৌ কি বেঁচে আছি? কোথায় তুমি, অপালা? বলো! কোথায় তুমি? কোথায়?”
(আমার স্বর নিবে আসে, কান্নায় না ক্লান্তিতে, জানি না।)
৪
এন্ডলেস হাইটস অ্যাপার্টমেন্টের আটচল্লিশতলা থেকে যখন সিটি পুলিশের কাছে ফোনটা এল, তখন সবে সন্ধে নামছে। উনপঞ্চাশতলার বাসিন্দার নাকি সাত-আট মাস কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি। প্রায় ছ-মাস পর বারান্দায় বেরিয়ে নীচের তলার বাসিন্দার নাকে উচ্চ AQI-এর ধোঁয়াশা ছাপিয়েও এসে ঢোকে এক বিস্মৃত গন্ধ। তারপরই এই ফোন। পুলিশ একটা ছোটো টিম নিয়ে এয়ার-অ্যাম্বুলেন্সে সেখানে পৌঁছোয় আধ ঘণ্টার মধ্যে, তারপর কাচ ভেঙে ঢোকে ফ্ল্যাটের ভেতরে। আমি পুলিশের একজন ছোটো কর্তা, আমিও ছিলাম সেই দলে। দরজার বাইরে ফ্লেশ-কাপ্ল-এর ছাপ-মারা একটা আকর্ষণীয় প্যাকেজ পড়ে ছিল। ওটার উপরের দিকটা একটু খুলেই চমকে উঠলাম। আরে! এটাই তো আমি গিফট করেছিলাম এই এরিয়ার বডিবয়কে; মালটা বেপাত্তা হওয়ার আগে তাহলে এটাকে বেচে দিয়ে গেছে! আজ হঠাৎ এই বডির মুখটা খুব চেনা-চেনা ঠেকল। এই বিল্ডিং-এরই একটা কাফেতে মেয়েটা আমায় দু-একবার কফি সার্ভ করেছিল না? এই এভিডেন্সটাকে গাপ করতে হবে। ওটা কোনো ব্যাপার নয়; আগে তো ব্যাবসাটাকে বাঁচাতে হবে!
ফ্ল্যাটের মৃত ব্যক্তিকে পাওয়া গেল তার বিছানায়, একটা ট্যাবলেট আঁকড়ে ধরে উপুড় হয়ে পড়ে ছিল। ভূমিকম্পের সময় মানুষ যেভাবে গুঁড়ি মেরে মাটিতে শুয়ে থাকে, অনেকটা সেরকম। সেই ট্যাবলেট ডিক্রিপ্ট করে যে ডায়েরি পাওয়া গেছে, তা-ই আমি পড়ে শোনাচ্ছিলাম আমার তৃতীয় স্ত্রী হেলেনকে। কেসটা যতটা ধর-তক্তা-মার-পেরেক গোছের মনে হচ্ছিল, ততটা বোধহয় নয়। সেকেন্ড অফিসার বলছিল, “স্যার, ডায়েরিতে একটা চিঠি আছে। একটু পরের দিকে। আমি পুরোটা পড়িনি। তবে এটা আমার মনে হয়, স্যার, খুব ভাইটাল এই কেসে।”
“কেন? কাকে লেখা চিঠি?”
“খুব সম্ভবত ইম্যাজিনারি কেউ। নাম অপালা।”
“তা-ই?” একটু থমকালাম। বাইরের ওই বডিটা তাহলে…?”
“এনিথিং রং, স্যার?”
“নাহ্। আমি… আমি একবার পড়ে দেখব পুরোটা।”
ওই চিঠিটা কি তবে অপালার সৃষ্টির চাবিকাঠি অর্থাৎ হলোগ্রামের প্রম্ট ছিল? এমনও সম্ভব? আমি নিজেই একবার পুরোটা খুঁটিয়ে পড়ে দেখব, মৃত ব্যক্তি বেশ ইনটারেস্টিং, সন্দেহ নেই। আরও একটা ব্যাপার; বেডরুমের চার দেওয়ালেই দেখলাম কয়েক সারি এবড়োখেবড়ো দাগ। আঁচড়ানোর? কিন্তু বডির হাত-পায়ের নখ তো অক্ষতই আছে। তাহলে?
বেশ দমবন্ধ-করা এই লেখাটা, শাওয়ারের নীচে এবার কিছুক্ষণ একা বসে থাকতে চাই। প্রথম দু-তিনটে এন্ট্রি পড়েই মাথাটা দপদপ করছে। হেলেনের হাতে আমার ট্যাবলেটটা ধরিয়ে দিয়ে এগোতে গেলাম। ঘোরের মধ্যে ছিলাম, তবু আমার চোখ এড়াল না; হেলেনের হাত গলে প্রায় দু-ফুট উচ্চতা থেকে ট্যাবলেটটা বিছানায় ধপ করে পড়ে গেল।
Tags: একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা, সাগ্নিক কোলে
