গহ্বরের ঘড়ি
লেখক: অরিজিৎ দেবনাথ
শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব
১
(দ্য সিগন্যাল)
১৯৬৮ সালের ২২ মে।
উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের অন্ধকারের বুক চিরে ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছে আমেরিকান নৌবাহিনীর গর্ব ‘ইউএসএস স্করপিয়ন’। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কয়েকশো ফুট নীচে, যেখানে সূর্যের শেষ আলোকবিন্দুটিও পৌঁছোনোর সাহস করে না, সেখানে ইস্পাতের তৈরি এই দানবটি যেন সাক্ষাৎ এক শিকারি।
সাবমেরিনের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে গুমোট আর যান্ত্রিক গন্ধে ঠাসা। ডিজ়েল, লুব্রিকেন্ট আর নিরানব্বইজন মানুষের ক্রমাগত ঘামের গন্ধে বাতাসটা যেন ভারী হয়ে আছে। করিডরগুলোও এতটাই সরু যে দুজন মানুষ পাশ কাটিয়ে যেতে গেলেই একে অপরের শরীরের তাপ অনুভব করতে পারে। সনিক অ্যানালিস্ট জন মিলার তাঁর ছোটো কেবিনে বসে আছেন। কানে বিশাল হেডফোন, যা বাইরের জগতের সমস্ত কোলাহল থেকে তাঁকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। মিলার হলেন এই সাবমেরিনের ‘কান’। সাগরের নীচে কোথায় তিমির ডাক শোনা গেল, কোথায় মেরিন কোন পাথরে ধাক্কা খেল, কিংবা এখান থেকে ঠিক কত মাইল দূরে কোন সোভিয়েত সাবমেরিন তার প্রপেলার ঘোরাল—সবই মিলারের এই হেডফোনে ধরা পড়ে।
মিলার ফ্রিকোয়েন্সি অ্যানালাইজ়ারের নবটা সূক্ষ্মভাবে ঘোরালেন। সামনে রাখা অ্যানালগ টেপরেকর্ডারের চাকা দুটো ধীর গতিতে ঘুরে উঠল। ১৯৫০-এর দশকে তৈরি এই ‘SOSUS’ (Sound Surveillance System) প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা মিলার জানতেন, কিন্তু একটু আগেই তিনি যা শুনছেন, তা তাঁর সমস্ত অভিজ্ঞতার বাইরে।
মিলার হেডফোনটা একবার খুলে কপাল মুছলেন। রুমালটা তাঁর ঘামে ভিজে গেল। তিনি আবার মন দিয়ে শুনলেন। এক গভীর, কম্পমান শব্দ। যেন সমুদ্রের অতল গহ্বরে বসে কোনো এক আদিম দানব দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। শব্দটা লিনিয়ার নয়। এর ফ্রিকোয়েন্সি প্রতি দশ সেকেন্ড অন্তর বদলে যাচ্ছে। ফিজ়িক্সের ভাষায় একে ‘নন-পিরিয়ডিক অ্যানালগ পাল্স’ বলে। কিন্তু কেন জানি না, মিলারের কেবল মনে হচ্ছে, কেউ তাকে ডাকছে।
“সব ঠিক আছে তো, জন?”
পিছন থেকে একটি হাতের চাপড় মিলারের কাঁধের উপর এসে পড়ল। মিলার ঘুরে দেখলেন, ক্যাপটেন ফ্রান্সিস স্ল্যাটারি দাঁড়িয়ে আছেন। স্নায়ুযুদ্ধের অভিজ্ঞতায় পোড়া মানুষটির কপালে চিন্তার ভাঁজগুলো যেন চিরস্থায়ী হয়ে আছে। স্করপিয়ন এখন ভূমধ্যসাগরের উপর দিয়ে ফেরার পথে তাদের মিশন ছিল সোভিয়েতদের গতিবিধির উপর নীরবে নজর রাখা। কিন্তু আজ ক্যাপটেনের কী হল? তার চোখে যেন এক ভিন্ন রকমের উত্তেজনার ছাপ।
“স্যার, আমি যা পেয়েছি, তা আপনারও শোনা দরকার।” মিলার তাঁর রেকর্ড-করা টেপটা প্লে করলেন।
ক্যাপটেন স্ল্যাটারি হেডফোনটা কানে দিলেন। ঘরের অন্যান্য যান্ত্রিক শব্দ সেই মুহূর্তের জন্য ম্লান হয়ে এল। সেই রহস্যময় শব্দটা ক্যাপটেনের কানে ভেসে উঠল—ভুউউম… ভুউউম… টিক… ভুউউম…।
“তিমি?” ক্যাপটেন ভ্রূ কুঁচকে প্রশ্ন করলেন।
“না, স্যার,” মিলার মাথা নাড়লেন, “তিমির গলার স্বরে একটা জৈবিক ছন্দ থাকে। এটার ছন্দ অনেকটা যান্ত্রিক লাগছে। যদিও এর মেকানিক্স আমাদের জানা কোনো ইঞ্জিনের সঙ্গে মেলে না। আর সব থেকে বড়ো কথা, এই শব্দটা আসছে আজোরস দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত সেই ‘ভয়েড’ থেকে। নেভাল চার্ট অনুযায়ী ওই জায়গাটার গভীরতা এখনও পরিমাপ করা সম্ভব হয়নি।”
ক্যাপটেন স্ল্যাটারি ম্যাপটার দিকে তাকালেন। স্নায়ুযুদ্ধের এই দিনগুলোতে তথ্যের মূল্য জীবনের চেয়েও বেশি। সোভিয়েতরা কি তবে নতুন কোনো আন্ডারওয়াটার সেন্সর স্টেশন বসাচ্ছে? নাকি কোনো গোপন অস্ত্র পরীক্ষা চলছে ওখানে? আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ অনেকদিন ধরেই ‘প্রোজেক্ট জেনিফার’ নিয়ে কাজ করে চলেছে, যা সমুদ্রতলের সকল রহস্য উদ্ধার করতে চায়। ক্যাপটেন নিজেকে বোঝালেন, এটা হয়তো সেরকমই কিছু।
“মিলার, তুমি নিশ্চিত যে এই সিগন্যালটা আগে কোনোদিন রেকর্ড হয়নি?” ক্যাপটেনের কণ্ঠে সন্দেহ।
“একদম নিশ্চিত, স্যার। আমি ১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল ক্রাইসিসের সময় থেকেও ডেটাবেস চেক করেছি। এই ফ্রিকোয়েন্সি রেঞ্জ—সতেরো হার্টজ় থেকে তেইশ হার্টজ়—একদম নতুন। একে বলা যেতে পারে ‘দি আপসুইপ’।”
সাবমেরিনের কনট্রোল রুমে তখন এক অস্থির আবহ। মাঝবয়সি মেকানিক্যাল অফিসার রিচার্ডসন বারবার সতর্ক করে চলেছেন, “ক্যাপটেন, আমাদের সাবমেরিনের হালের কন্ডিশন খুব একটা ভালো না। গত মাসে নরফোক পোর্টে যাওয়ার কথা ছিল মেরামতের জন্য। আমাদের সেফটি লিমিট খুব বেশি হলেও দুই হাজার ফুট। এর থেকে নীচে যেতে চাইলে সমুদ্রের চাপ এই স্টিলকে একেবারে কাগজের মতো দুমড়ে ফেলবে।”
কিন্তু স্ল্যাটারি তখন অন্য এক নেশায় মত্ত। তার কাছে সামরিক মর্যাদার চেয়েও বড়ো হয়ে উঠেছে এক আদিম কৌতূহল। তিনি ঘোষণা করলেন, “মাই ফ্রেন্ডস, আমরা ওই সিগন্যালের উৎস পর্যন্ত যাব। রুট ডাইভার্ট করো। স্করপিয়ন এখন আজোরস ট্রেঞ্চের দিকে এগোবে।”
সাবমেরিনটি তার নাক আরও নীচু করল। মিলার তাঁর সোনার স্ক্রিনে দেখলেন, জলের গভীরতা বাড়ছে—৭০০ ফুট… ৯০০ ফুট… ১২০০ ফুট। বাইরের নীল জল এখন আস্তে আস্তে গাঢ় কালচে রং ধারণ করছে। সাবমেরিনের জানলার কাচের উপর মাঝে মাঝেই ভেসে উঠছে অদ্ভুত সব প্রাণীর ছায়া। তারা অনেকেই পৃথিবীর আলো চেনে না, এই চিরস্থায়ী অন্ধকারের বাসিন্দা।
মিলার লক্ষ করলেন, তাঁর টেবিলের উপর রাখা পেনসিলটা কাঁপছে। সাবমেরিনের ভেতরের বাতাস যেন ক্রমেই ঠান্ডা হয়ে আসছে। অথচ থার্মোমিটার দেখাচ্ছে তাপমাত্রা স্বাভাবিক, আশ্চর্য!
হঠাৎ করেই মিলারের কানে শব্দটা আরও তীব্র হয়ে উঠল। এবার আর শুধু ‘ভুউউম’ নয়, তার সঙ্গে মিশে আছে ধাতব হাসির মতো এক তীক্ষ্ণ আওয়াজ। মিলার আঁতকে উঠে হেডফোনটা ফেলে দিলেন। তার কান দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল।
“স্যার! কী হয়েছে?” স্টিভেন নামে এক তরুণ তাকে ধরতে এগিয়ে এল।
মিলার টাল সামলে উঠে দাঁড়ালেন। “শব্দটা বদলে গেছে, স্টিভেন। ওটা আর সিগন্যাল নেই। ওটা এখন…”
কনট্রোল প্যানেলের আলোগুলো দপ করে নিবে গিয়ে আবার জ্বলে উঠল। সোনার স্ক্রিনে যেখানে একটু আগেও গভীরতা দেখাচ্ছিল, সেখানে এখন হঠাৎ করেই শূন্য হয়ে গেছে। তারা যেন আর সমুদ্রের নীচে নেই।
ক্যাপটেন স্ল্যাটারি চিৎকার করে ভেসে এল, “ইঞ্জিন রুম! রিপোর্ট!”
ইনটারকমের ওপাশ থেকে এক আতঙ্কিত স্বর ভেসে এল, “স্যার! আমাদের সমস্ত ঘড়ি উলটোদিকে ঘুরছে! থার্মোমিটারের পারদ নীচে নামার বদলে উপরে চড়ছে! আমরা কোথায় আছি, স্যার, তাও লোকেট করা যাচ্ছে না… হেল্প আস, স্যার… প্লিজ় হেল্প…”
মিলার তার ভাঙা হেডফোনটা আবার কানে দিলেন। নাহ্, এবার আর কোনো শব্দ হচ্ছে না। বরং এক অসীম নিস্তব্ধতা বিরাজ করে চলেছে। অথচ সেই নিস্তব্ধতার মাঝেও তিনি স্পষ্ট অনুভব করতে পারলেন, সাবমেরিনের দেয়ালগুলো যেন কথা বলছে। যেন হাজার হাজার বছর আগে হারিয়ে-যাওয়া কোনো সভ্যতার প্রতিধ্বনি এই ইস্পাতের গায়ে সমানে আছড়ে পড়ছে।
“ক্যাপটেন!” স্টিভেন হঠাৎ রেডিয়োতে চিৎকার করে উঠল। সকলেই স্তম্ভিত। সাবমেরিনের কৃত্রিম আলোয় দেখা যাচ্ছে এক অদ্ভুত প্রাণী। মাথাটা অনেকটা মানুষের মতো হলেও তাতে কোনো চোখ নেই। প্রাণীটি যেন তাদের দিকে তাকিয়ে দৈত্যের মতো হাসছে। মিলার বুঝতে পারলেন, তাঁরা যে সিগন্যাল অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছিলেন, তার সোর্স আসলে এই বীভৎস প্রাণীটিই। এটি ছিল এরই পাতা এক মরণফাঁদ।
ঠিক তখনই প্রাণীটি তীব্র কর্কশকণ্ঠে চিৎকার করে উঠল। স্করপিয়নের ভেতরেও শোনা গেল সেই কানফাটানো শব্দটা। সকলে কান চাপার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হল। একে একে সকলে জ্ঞান হারালেন। ওদিকে মিলারও অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো নিজের ঘড়িটার দিকে তাকালেন। রাত তখন একটা বেজে পনেরো মিনিট। কিন্তু ও কী, ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটাটা এত দ্রুত ঘুরছে কেন? মিলার আর কিছু ভাবতে পারলেন না, মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন।
সকলের চোখেই অন্ধকার নেমে এসেছে। স্করপিয়ন ডুবে যেতে থাকল একা একা, এমন এক অতল গহ্বরে, যা হয়তো সকলের ধারণার ঊর্ধ্বে।
২
(সময়ের থাবা)
জন মিলারের যখন জ্ঞান ফিরল, তখন তার মনে হল, মাথার ভেতর হাজার হাজার ভোমরা একসঙ্গে গুনগুন করছে। কতক্ষণ এভাবে অচেতন হয়ে পড়েছিলেন তিনি? এক সেকেন্ড? নাকি এক শতাব্দী?
মেঝে থেকে ওঠার চেষ্টা করতেই টের পেলেন শরীর তখন মারাত্মকভাবে দুর্বল। হাত দুটোও যেন আগের মতো আর সাড়া দিচ্ছে না। সাবমেরিনের ভেতরের আলোগুলো যেন আগের থেকে একটু পালটে গেছে। এক অদ্ভুত ফিকে নীলচে আভা ঘরের প্রতিটি কোণকে গ্রাস করে ফেলেছে। ইঞ্জিনের একটানা ঘড়ঘড় শব্দটাও কেমন যেন পালটে গিয়ে এখন অনেক বেশি দ্রুত, অনেক বেশি কর্কশ।
মিলার অতি কষ্টে তার রেডিয়ো প্যানেলের সামনে এসে বসলেন, তাঁর চোখ গেল নিজের হাতের দিকে। স্তব্ধ হয়ে গেলেন তিনি। তাঁর হাতের নখগুলো অন্তত ইঞ্চিখানেক লম্বা হয়ে গেছে, যেন কয়েক সপ্তাহ ধরে কাটা হয়নি।
“স্যার… আপনি ঠিক আছেন তো?”
মিলার ঘুরে তাকালেন। স্টিভেন। সে এখন মেঝেতে বসে হাঁপাচ্ছে। স্টিভেনের ঝাঁকড়া চুলগুলোও যেন আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি বড়ো লাগছে! নিজের মুখে হাত রাখতেই আবার চমকে উঠলেন মিলার। এ কী! মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তার মুখে এত বড়ো দাড়ি গজাল কীভাবে?
“স্যার, অস্থির হবেন না। আমার কথা শুনুন।” নিজের গলার স্বর শুনে স্টিভেনও চমকে উঠল। গলার আওয়াজটা অনেক ভারী, সামান্য কর্কশ—ঠিক যেমনটা তার বাবার ছিল।
দ্রুত পকেট থেকে নিজের সেই এইচএমটি অ্যানালগ ঘড়িটা বের করল সে। ঘড়ির কাচটা ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। ঘণ্টা-মিনিট-সেকেন্ড, কোনো কাঁটাই সেখানে আর নেই, যেন প্রচণ্ড ঘূর্ণনের চোটে ছিটকে গেছে। মিলারের ঘড়িরও একই অবস্থা। তবে সেখানে মিনিট আর ঘণ্টার কাঁটা দুটো অক্ষত। চোখের সামনে সেই দুটোও লাটিমের মতো ঘুরে চলেছে।
স্টিভেন জানত, পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘গ্র্যাভিটেশনাল টাইম ডাইলেশন’। তার এক বন্ধু পদার্থবিজ্ঞানের প্রফেসার। তার কাছেই একবার শুনেছিল, আইনস্টাইনের তত্ত্বে নাকি বলা হয়েছে, প্রবল মাধ্যাকর্ষণ বা চাপ সময়কে ধীর করে দেয়। অথচ এখানে যা ঘটছে, তা ঠিক তার উলটো। সমুদ্রের এই অজানা গহ্বরে জলের অকল্পনীয় চাপ আর ওই রহস্যময় সিগন্যাল মিলে এমন এক ‘টেম্পোরাল অ্যানোমালি’ তৈরি করেছে, যেখানে সময় হয়তো বাইরের জগতের চেয়ে একেবারে আলাদা। সাবমেরিনের ভেতরে অতিক্রান্ত প্রতি এক মিনিট হয়তো বাইরের জগতের কয়েক সপ্তাহ কিংবা তারও বেশি। আর তাতেই শরীরের প্রতিটি কোশ এখন দ্রুত অ্যাকটিভ। প্রতিটি ডিএনএ শরীরকে এগিয়ে দিচ্ছে বার্ধক্যের দিকে।
মিলার ও স্টিভেন কাঁপা-কাঁপা পায়ে করিডর দিয়ে এগিয়ে চলল কনট্রোল রুমের দিকে। পথে তাঁরা যা অভিজ্ঞতা পেলেন, তা কোনো দুঃস্বপ্নের চেয়ে কম নয়। এতক্ষণ তাঁরা ভাবছিলেন, সময় কেবল কয়েক সপ্তাহ কিংবা মাসের হিসেবে এগিয়ে। কিন্তু বাস্তবে চিত্র অন্যরকম। সময় যেন একেকজনের উপর একেকরকম গতিতে প্রভাব ফেলে চলেছে।
মেকানিক্যাল অফিসার রিচার্ডসন তাঁর চেয়ারেই বসে আছেন। তাঁর পরনের সেই খাকি পোশাকটা এখন অনেক বেশি ঢিলেঢালা। তাঁর গাল কুঁচকে চিমসে হয়ে গেছে, চোখ দুটো কোটর থেকে প্রায় বেরিয়ে আসার জোগাড়। তিনি একদৃষ্টে সামনের প্রেশার গেজের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। গেজটি দেখাচ্ছে—৫^০_¤ ফুট… X২*Z… ফুট… ৫ ▓ ০ ⊗ ফুট। সাবমেরিনটি কি এখনও নীচের দিকেই নেমে চলেছে?
“রিচার্ডসন! কনট্রোল নিন! এভাবে চলতে থাকলে আমরা যে ক্রাশ ডেপ্থ পার হয়ে যাব।” মিলার চিৎকার করে উঠলেন।
রিচার্ডসন ধীরে ধীরে মুখ ফেরালেন। তাঁর দাঁতগুলো পড়ে গেছে, মাড়ি বেরিয়ে আসছে। তিনি অস্ফুটস্বরে কিছু বলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু তার আগেই এক তীব্র কাশির দমক তাঁকে কাবু করে ফেলল। কাশির সঙ্গে বেরিয়ে এল জমাট-বাঁধা রক্ত। শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো এত দ্রুত বার্ধক্য সহ্য করতে পারছে না। তাঁর হৎপিণ্ড, প্রতিটা শিরা-উপশিরা-ধমনি এখন সত্তর বছরের বৃদ্ধের মতোই ভঙ্গুর।
মিলার এবার এগিয়ে চললেন। সামনে ক্যাপটেন স্ল্যাটারি দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর সেই উদ্ধত শরীর এখন ন্যুব্জ। ক্যাপটেনের সোনালি চুল এখন সম্পূর্ণ পড়ে গেছে। কাঁপা-কাঁপা হাতে তিনি তখনও নেভিগেশন চার্টটা ধরে আছেন।
“মিলার।” ক্যাপটেন ফিশফিশ করে বললেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে এখন আর কর্তৃত্ব নেই, আছে এক গভীর হাহাকার। “আমরা কোথায়? আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না।” বৃদ্ধ কান্নায় ভেঙে পড়লেন, “সাবমেরিনের অনেক পার্টস আগেই ভেঙে গেছে। এটা আমাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ওহ্ জিসাস… আমাদের তো এতক্ষণে মারা যাওয়ার কথা। আমরা যে অনেক আগেই ক্রাশ ডেপ্থ পার করে ফেলেছি… জলের চাপ কেন আমাদের সাবমেরিনকে পিষে দিচ্ছে না?”
মিলার এর কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। তিনি সামনের বড়ো জানলাটার দিকে তাকালেন। সাবমেরিনের চারপাশের সেই নীলচে আভা এখন আরও তীব্র। জানলার কাচের বাইরে দিয়ে বিশালাকার সব অণুজীব ভেসে যাচ্ছে—যেগুলো কত পুরোনো, তা কেউ জানে না।
“স্যার,” স্টিভেন বলল, “জলের চাপ আমাদের মারছে না, তার একটাই কারণ হতে পারে। এই গহ্বরের ভেতরে ‘স্পেস-টাইম’ হয়তো কুঁচকে গেছে। তাই বাইরের জগতের পদার্থবিদ্যার নিয়মগুলি এখানে খাটছে না। হয়তো আমাদের শরীরও এই নিয়মের বাইরে নয়। আর তাই, এটা একেকজনের উপর একেকরকম প্রভাব ফেলছে। কিন্তু কেন, এর ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। তবে স্যার, একটা কথা পরিষ্কার… আমাদের মধ্যে অনেকের সময় দ্রুত ফুরিয়ে চলেছে। অনেকে তো ইতিমধ্যে শেষনিশ্বাসও…”
হঠাৎ সাবমেরিনের পেছনের দিক থেকে একটা বীভৎস আর্তনাদ ভেসে এল। ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশনে আবার কারও আপনজন মারা গেলেন। শুধু মারাই গেলেন না—বার্ধক্যের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে তাঁর শরীরটা যেন স্রেফ ধুলোয় মিশে গেল।
ক্যাপটেন স্ল্যাটারি জানলার কাচের উপর কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি দেখতে পাচ্ছেন, দূরে সমুদ্রের তলদেশের সেই অন্ধকার গহ্বরটা থেকে নীল আলোর ফোয়ারা ছুটে আসছে। হয়তো কোনো এক প্রাগৈতিহাসিক স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ, যার গায়ে খোদাই করা আছে এমন কিছু লিপি, যা কোনো মানুষের দ্বারা সৃষ্ট নয়।
“মিলার, এই বৃদ্ধ লোকটার একটা শেষ আবদার রাখবে?” ক্যাপটেনের চোখ দিয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। “আমি ভেবেছিলাম, এটা আমাদের নৌবাহিনীর শ্রেষ্ঠ অর্জন হবে। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি, এটাই আসল মৃত্যুপুরীর দরজা। আমি একবারের জন্য ওই স্থাপত্যটা ছুঁতে চাই।”
হঠাৎ সাবমেরিনের হাই-ফ্রিকোয়েন্সি রেডিয়োটা নিজে থেকেই সচল হয়ে উঠল। স্ট্যাটিক শব্দের আড়ালে একটা পরিষ্কার ডিজিটাল ভয়েস ভেসে আসছে। ভাষাটা ইংরেজি হলেও উচ্চারণটা একটু অন্য ধরনের শোনায়।
“…this is US Naval Command. Repeat, the year is 1998. We have detected a sonic ping from coordinate 32-N. Anyone respond…”
“১৯৯৮?” মিলারের মাথার ভেতরটা ভোঁ-ভোঁ করে উঠল। ১৯৬৮ থেকে সোজা ১৯৯৮—তিরিশ বছর! তাঁরা মাত্র কয়েক মিনিট আগে এই গহ্বরে প্রবেশ করেছিলেন, আর এরই মধ্যে বাইরের পৃথিবীতে তিরিশ বছর পার হয়ে গেল? সময় এখানে ঠিক কত দ্রুত কাজ করে চলেছে? এতক্ষণ তাঁরা যা ভাবছিলেন, এ যে তার চেয়েও…
“ক্যাপটেন, শুনুন!” মিলার ক্যাপটেনকে ডাকলেন, “ওই দল নিশ্চয়ই আমাদের আশপাশে আছে! আমাদের এখান থেকে বেরোনোর পথ হারিয়ে যায়নি, ক্যাপটেন। আপনারা ভেঙে পড়বেন না।”
ক্যাপটেন স্ল্যাটারি কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি ধীরে ধীরে তাঁর সিটের উপর বসে পড়লেন। তাঁর শরীরটা এখন এতটাই হালকা, মনে হচ্ছে যেন তাঁর পরনের কাপড়ের ভারই তাঁকে সমানে পিষে ফেলতে চাইছে।
বাইরে সেই রহস্যময় ‘আপসুইপ’ শব্দটা আবার ফিরে এল। এবার আর সেটা আগের বারের মতো আর্তনাদ নয়। এ যেন এক বিজয়ীর উল্লাস। সাবমেরিনটি এখনও গভীরে তলিয়ে চলেছে। মিলার হঠাৎ অনুভব করলেন, তাঁর নিজের চোখের জ্যোতিও একটু একটু করে কমে আসছে। চারপাশটা যেন বড্ড ঝাপসা দেখাল।
তিনি কাঁপা-কাঁপা হাতে পকেট থেকে ডায়েরিটা বের করে আনলেন। পেনসিল ধরার ক্ষমতাও লোপ পেয়েছে। অতি কষ্টে একটা বড়ো করে প্রশ্নচিহ্ন আঁকতে আঁকতেই তিনি আবার জ্ঞান হারালেন।
৩
(অতলান্তের শূন্যতা)
ইউএসএস স্করপিয়নের ভেতরে এখন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজমান। এই নিস্তব্ধতা শান্তির নাকি আতঙ্কের, তা কারও জানা নেই। সাবমেরিনের ইঞ্জিনের সেই কর্কশ গুঞ্জন এখন আর শোনা যায় না, তার বদলে শোনা যাচ্ছে এক ধরনের ‘হোয়াইট নয়েজ়’—যা কোনো যান্ত্রিক গোলযোগ নয়, বরং সময়ের নিরন্তর বয়ে চলার শব্দ।
জ্ঞান ফিরে আসার পর থেকেই জন তাঁর রেডিয়ো প্যানেলের উপর ঝুঁকে পড়ে আছেন। তাঁর প্রতিটি নিশ্বাস এখন এক-একটা সংগ্রামের মতো। তাঁর ফুসফুস বার্ধক্যের ভারে কুঁচকে আসছে। তিনি অনুভব করতে পারছেন তাঁর এই পরিণতিকে। ১৯৬৮ সালের সেই চনমনে যুবক আজ যেন স্রেফ এক ইতিহাস। তাঁর আঙুলগুলো এখনও কাঁপছে।
“১৯৯৮… ওরা বলছে ১৯৯৮…” স্টিভেন বিড়বিড় করে আওড়ে চলেছে।
তাঁর কানে ভেসে-আসা সেই ডিজিটাল কণ্ঠস্বরটি এখন আরও অস্পষ্ট। তবে কি রেডিয়ো তরঙ্গগুলো সময়ের এই পর্দার ওপার থেকে আসার সময় বিকৃত হয়ে গেছে? যদিও ফিজ়িক্সের ‘ডপলার ইফেক্ট’ অনুযায়ী, শব্দের উৎস এবং শ্রোতার মধ্যে আপেক্ষিক গতি থাকলে কম্পাঙ্ক বদলে যেতে পারে। তবে কি এখানে গতির বদলে কাজ করছে ‘টাইম-ল্যাপ্স’! বাইরের জগৎ থেকে আসা সংকেতগুলোই কি আসলে সাবমেরিনের ভেতরে ঢোকার সময় ‘ব্লু-শিফটেড’ হয়ে যাচ্ছে? নাকি ওগুলো এমনই এক অতি-উচ্চ কম্পাঙ্কে পৌঁছোচ্ছে, যা মানুষের কানের শ্রবণসীমার বাইরে।
“স্যার… স্যার আমাদের… আমাদের যে করে হোক, উপরে উঠতেই হবে…” স্টিভেন এগিয়ে এল।
ক্যাপটেন স্ল্যাটারি তখন কনট্রোল রুমের এককোণে বসে আছেন। তার সেই উদ্ধত ইউনিফর্ম এখন যেন এক কঙ্কালকে ঢেকে রেখেছে। তিনি একদৃষ্টিতে সাবমেরিনের সামনের বড়ো পোর্টহোলের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। জানলার বাইরে সমুদ্রের সেই নীলচে আলো এখন আরও প্রখর।
হঠাৎ করেই সাবমেরিনের সার্চলাইটটা নিজে থেকে জ্বলে উঠল। তীব্র সেই আলোর মাঝে যা দেখা গেল, তা দেখার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না।
সমুদ্রের সেই প্রান্ত, যেখানে আজ পর্যন্ত কোনো আলো পৌঁছোতে পারেনি, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল ভাসমান ‘পিরামিড’। তবে সেটি পাথরের তৈরি নয়, বরং এক ধরনের স্বচ্ছ স্ফটিক বা ক্রিস্টাল দিয়ে তৈরি, যার ভেতর দিয়েই ওই নীলচে আলো ক্রমাগত বিচ্ছুরিত হয়ে চলেছে। পিরামিডটার গায়ে লেগে আছে অদ্ভুত বিশালাকার সব সামুদ্রিক জীব, যাদের আকার কম করেও শত ফুট লম্বা তিমির চেয়েও বড়ো হবে। তাদের শরীরে কোনো পাখনা নেই, আছে সরু সরু তন্তুর মতো অঙ্গ, যা দিয়ে তারা ওই ক্রিস্টালের গা থেকে ক্রমাগত শক্তি শোষণ করে চলেছে।
“মিলার… ওগুলো কী?” ক্যাপটেনের কণ্ঠস্বর এখন বাতাসের ফিশফিশানির মতোই শোনাচ্ছে।
“হলফ করে বলতে পারি না, স্যার, তবে মনে হচ্ছে, ‘প্রাইমর্ডিয়াল এনার্জি ফিডারস’।” স্টিভেন নিজের অজান্তেই বলে ফেলল। তার অবচেতন মন যেন কোনো এক আদিম জ্ঞান খুঁজে পেয়েছে। “এই গহ্বরটি কোনো প্রাকৃতিক ফাটল বলে মনে হচ্ছে না, এ যেন সাক্ষাৎ ‘টেম্পোরাল ওয়েল’। আমার ধারণা, ওই ক্রিস্টাল পিরামিডটি আসলে পৃথিবীর ঘূর্ণনশক্তি আর মাধ্যাকর্ষণকে ব্যবহার করে সময়কে এক জায়গায় ঘনীভূত করে রেখেছে। আমরা ওই ঘনীভূত সময়ের ‘ইভেন্ট হরাইজ়ন’-এ ঢুকে পড়েছি।”
হঠাৎ সাবমেরিনের পুরো কাঠামোটা আবার কেঁপে উঠল। সাবমেরিনের পেছনদিক থেকে এক বিশ্রী ধাতব শব্দ ভেসে আসছে। রিচার্ডসন, যিনি এতক্ষণ নিথর হয়ে পড়েছিলেন, হঠাৎ আর্তনাদ করে উঠলেন।
“জল ঢুকছে! সেক্টর ৪-এ লিক হয়েছে!”
বার্ধক্যের ভারে জীর্ণ রিচার্ডসনের চিৎকারটা আধো-অস্ফুট রয়ে গেল। মিলারও দেখতে পেলেন, মেঝের উপর দিয়ে জল চুইয়ে আসছে। তবে সেই জলের রং স্বচ্ছ নয়, ঘন কালচে রঙের এক তরল। আরও একটা বিষয় তিনি লক্ষ করলেন, সেই জল মেঝেতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাষ্পীভূত হয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রের এত হাজার ফুট নীচে প্রচণ্ড চাপেও জল বাষ্পীভূত হওয়া যে প্রায় অসম্ভব, যদি না সেই জলের তাপমাত্রা কয়েক হাজার ডিগ্রি হয়। কিন্তু এই জল তো শীতল।
“স্টিভেন, ওটা জল নয়!” মিলারের গলার স্বর আতঙ্কে চিরে গেল, তিনি হন্তদন্ত হয়ে পিছিয়ে এলেন। “ওটা… ওটা ‘ক্রোনো-ফ্লুয়িড’! ঈশ্বর! আমাদের সাবমেরিন যেখানে ফেঁসে গেছে, সেখানে সময় আর কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়—ওটা এখন একটা জ্যান্ত ভৌত পদার্থ! ওই চাপের সামনে স্টিলের পরমাণুগুলো স্রেফ গুঁড়িয়ে যাচ্ছে! আমাদের জগৎ আর এই গহ্বরের জগৎ একে অপরকে রিজেক্ট করছে, স্টিভেন… আমরা শেষ হয়ে যাব!”
স্টিভেনও বুঝতে পারল, সাবমেরিনের প্রতিটি বোল্ট, প্রতিটি জয়েন্ট ইতিমধ্যে কয়েক বছরের পুরোনো হয়ে গেছে। যে স্টিল ১৯৬৮ সালে একদম চকচকে ছিল, এই টেম্পোরাল অ্যানোমালির প্রভাবে তা এখন পঞ্চাশ বছরের পুরোনো মরিচা-ধরা লোহায় পরিণত হচ্ছে। সমুদ্রের চাপ নয়, আসলে বার্ধক্যই সাবমেরিনটিকে ক্রমাগত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
“ক্যাপটেন! ব্যালাস্ট ট্যাংক খালি করুন! আমাদের ভেসে উঠতে হবে!” মিলার আর্তনাদ করলেন।
ক্যাপটেন স্ল্যাটারি যেন হঠাৎ ঘোর কাটিয়ে জেগে উঠলেন। কাঁপা-কাঁপা হাতে কোনোমতে এমার্জেন্সি লিভারটা টানলেন। সাবমেরিনের ভেতরে সংকুচিত বায়ুর শব্দ হল, কিন্তু জাহাজটি নড়ল না। সে-ও যেন ওই ভাসমান ক্রিস্টাল পিরামিডের আকর্ষণে আটকে গেছে।
জানলার ওপাশে সেই অদ্ভুত জীবগুলো এখন সাবমেরিনের একদম কাছে চলে এসেছে। তাদের বিশাল বড়ো বড়ো মাথা সাবমেরিনে এসে ধাক্কা মারছে। মিলার দেখলেন, ওই জীবগুলোর চোখের মণিও ঘড়ির কাঁটার মতো ঘুরছে। এ যেন প্রকৃতির এক বীভৎস রসিকতা! এই প্রাণীগুলো সময়ের এই দ্রুত গতিতে অভ্যস্ত, তাদের বিবর্তন ঘটেছে কয়েক সেকেন্ডে কয়েকশো বছর পার করার জন্য।
“মিলার… রেডিয়োটা…” স্টিভেনের গলার স্বর এবার একদম অস্পষ্ট হয়ে এল।
মিলার রেডিয়োর দিকে কান পাতলেন। এবার আর ১৯৯৮ নয়। এবার ভেসে আসছে আরও পরের কোনো সংকেত।
“…This is the Global Research Station, year 2045. We have detected a metallic mass surfacing at 32°N. Visual confirmation indicates it might be the USS Scorpion, but Jesus, it can’t be true…”
“২০৪৫!” মিলার বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠলেন। বাইরে প্রায় সাতাত্তর বছর পার হয়ে গেছে! তাঁর বাবা-মা, তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী এলিনা—সবাই যে মাটির নীচে। সে যদি এখান থেকে বেঁচেও ফিরতে পারে, কার কাছে যাবে? কোন পৃথিবীতে তার আসল স্থান?
সাবমেরিনের ভেতরে তাপমাত্রা এখন অস্বাভাবিকভাবে কমে যাচ্ছে। অক্সিজেনও কমে আসছে ধীরে ধীরে। মিলার লক্ষ করলেন, তাঁর নিশ্বাসের সঙ্গে বরফের কুচি বেরোচ্ছে। কিন্তু সেই বরফ সাদা নয়, বরং কালচে রঙের।
“স্যার, আমরা যদি এখান থেকে এখনই বেরোতে না পারি, তবে আমরা ২০৪৫ নয়, সভ্যতার একেবারে শেষ দিনে গিয়ে পৌঁছোব।” স্টিভেন ক্যাপটেনের দিকে তাকিয়ে বলল।
ক্যাপটেন স্ল্যাটারি কোনোমতে তাঁর সিট থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর শরীরটা এখন এতটাই ভঙ্গুর যে মনে হচ্ছে, যে-কোনো মুহূর্তে হাড়গুলো ভেঙে যাবে। তিনি জানলার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমরাই তো আবিষ্কার করতে চেয়েছিলাম, স্টিভেন। আমরা তো মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সময়… সময় তো কারও দাস নয়। আমরা শুধু সময়ের সমুদ্রের বালুকণামাত্র।”
হঠাৎ করেই পিরামিড থেকে এক তীব্র নীল আলো বিচ্ছুরিত হল। সাবমেরিনটি এক ভয়াবহ বেগে উপরের দিকে উঠতে শুরু করল। মিলার মনে মনে উপলব্ধি করলেন, এই ওঠাটাও যেন মুক্তির নয়, বরং এ-ও এক মরণঝাঁপ।
সাবমেরিনের ওই প্রচণ্ড বেগ সহ্য করতে না পেরে সকলে মেঝেতে শুয়ে পড়ল। মিলারের চোখের জ্যোতি এখন প্রায় নেই বললেই চলে। তাঁর শরীরটা ধীরে ধীরে হালকা হয়ে যাচ্ছে। আর হাড়গুলো? যেন তরল হয়ে আসছে।
“স্টিভেন? ক্যাপটেন?” মিলার অনেক কষ্টে ডাকলেন।
কোনো উত্তর নেই। কনট্রোল রুমের অন্ধকার কোণে পড়ে আছে কয়েকটা খাকি পোশাক। তার ভেতরে কোনো মানুষ নেই, আছে শুধু একমুঠো ছাই। সময়ের তীব্র স্রোতে তাদের অবশিষ্ট শরীরও পুড়ে ছাই হয়ে গেল। মিলারও জানেন, তাঁর হাতে আর সময় স্বল্প। তাঁর চোখ বুজে আসছে। রেডিয়ো থেকে ভেসে-আসা শেষ শব্দটা তাঁর কানে গিয়ে পৌঁছোল। সমুদ্রের সেই ‘আপসুইপ’ শব্দটা। ওটা এখনও হাসছে।
৪
(মহাকালের মোহানা)
ইউএসএস স্করপিয়ন এখন আর কোনো রণতরি নয়, এটি এখন মহাকালের এক জরাজীর্ণ কফিন। সাবমেরিনটি যখন উপরের দিকে আরোহণ শুরু করল, তখন ভেতরের প্রতিটি জয়েন্ট থেকে এক বীভৎস আর্তনাদ বেরিয়ে এল। এই শব্দ কেবল ধাতব নয়, এ যেন ছিঁড়ে-যাওয়া বার্ধক্যের গোঙানি।
জন মিলার মেঝের উপর পড়ে আছেন। তাঁর নড়াচড়া করার ক্ষমতা লুপ্ত হয়েছে। তাঁর শ্রবণেন্দ্রিয় এখন অদ্ভুতভাবে সংবেদনশীল। তিনি শুনতে পাচ্ছেন, সাবমেরিনের ভেতরে প্রতিটি ঘড়ির কাঁটা এখন একেকটা কামানের গোলার মতো শব্দ করছে। ‘টিক-টক-টিক’—প্রতিটি শব্দ যেন তার আয়ু থেকে এক-একটা দিন কেড়ে নিচ্ছে।
“স্যার… শুনতে পাচ্ছেন?”
কণ্ঠস্বরটি পাশ থেকেই এল। মিলার খুব কষ্টে মাথা ঘুরিয়ে দেখলেন, স্টিভেন হামাগুড়ি দিয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। ক্যাপটেনের শরীর এখন উধাও। এমনকি নিজের শরীরের থেকেও কেমন যেন মাংস উধাও গেছে বলে মনে হচ্ছে তাঁর। চামড়াগুলো কেবল হাড়ের সঙ্গে লেপটে আছে এক প্রাচীন মমির মতোই। চোখ দুটো এখন ঘোলাটে।
“স্যার… আমরা… আমরা ফিরছি?” স্টিভেন খুব কষ্টে শব্দগুলো উচ্চারণ করলেন। তাঁর জিব এখন কাঠের মতোই শক্ত।
“ফিরছি কি না জানি না, স্টিভেন। কিন্তু আমরা ওই নরক ‘জ়োন’ থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাচ্ছি। প্রেশার গেজ… দ্যাখো…” মিলার কাঁপা-কাঁপা আঙুলে দেয়ালের দিকে নির্দেশ করলেন।
স্টিভেন দেখলেন, অ্যানালগ গেজটি এখন অবিশ্বাস্য গতিতে কমছে। ৩০০০ ফুট… ২৮০০ ফুট… ২৬০০ ফুট। সাবমেরিনটি যেন কোনো এক অদৃশ্য রাবার ব্যান্ডের টানে উপরের দিকে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। আর সেই আরোহণের সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রেডিয়োর সেই স্ট্যাটিক আওয়াজ।
রেডিয়োর স্পিকার থেকে এখন আর শুধু কথা নয়, ভেসে আসছে গান, খবরের টুকরো শব্দ আর অজস্র ডিজিটাল ডেটার সম্মিলিত চিৎকার। স্টিভেন শুনতে পেল এক পপ গানের সুর, যা ১৯৬৮ সালে কল্পনার বাইরে ছিল, শুনল এক যান্ত্রিক নারীর কণ্ঠস্বর, যিনি আবহাওয়া বার্তা দিচ্ছে কোনো এক স্মার্ট ডিভাইসের নাম বলে।
“…The temperature in Norfolk today is 75 degrees. The date is July 14, 2100…”
২১০০! মিলার অন্ধের মতো হাসার চেষ্টা করলেন। বাড়ি ছাড়ার সময়ে তাঁর বাবার বয়স যেন কত ছিল! চল্লিশ? আজও তিনি বেঁচে থাকলে নির্ঘাত শতায়ুর বেশিই হতেন। আর এলিনা? এলিনা কি বেঁচে থাকলে আজও জানলার ধারে বসে সমুদ্রের দিকে চেয়ে থাকত? নাকি সেদিন অন্য কারও সংসারে গিয়ে সে আগেই তাদের স্মৃতিগুলোকে কবর দিয়েছে?
“মিলার, দেখুন!” স্টিভেন আর্তনাদ করে উঠল।
মিলার দেখলেন, ক্যাপটেনের ছাই-হয়ে-যাওয়া শরীরটার অংশ মেঝের উপর থেকে হাওয়ায় ভাসতে শুরু করেছে। শুধু ক্যাপটেন নয়, সাবমেরিনের ভেতরের প্রতিটি আলগা বস্তু—পেনসিল, ডায়েরি, চেয়ার—সবই এখন ওজনহীন।
“গ্র্যাভিটি… গ্র্যাভিটি কাজ করছে না কেন?” স্টিভেন চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু শুধু এক অস্ফুট গোঙানি বেরিয়ে এল।
“আমরা… আমরা ‘ইভেন্ট হরাইজ়ন’ পার করছি, স্টিভেন,” মিলার ফিশফিশ করে বললেন, “আমরা যখন ওই পিরামিড থেকে দূরে সরেছি, সময় আমাদের উপর আছড়ে পড়ছে। আমরা এতক্ষণ যেখানে ছিলাম, সেখানে সময় ছিল অন্যরকম। কিন্তু এখানে সময় বয়ে চলেছে এক প্রলয়ংকরী ঝরনার মতো। আমাদের মৃত্যু আসন্ন।”
স্টিভেন বুঝতে পারছে, ওই গভীর গহ্বরে তারা এক ধরনের ‘টাইম-বাব্ল’-এ আটকে ছিল। সেখানে তাদের বার্ধক্য ছিল দ্রুত, কিন্তু এখানে? এই মুহূর্তে তাঁরা যখন বাস্তবের সময়ের স্রোতে ফিরে আসতে চাইছেন, সেই স্রোতে তাঁদের অস্তিত্ব থাকার কথা নয়। আর তাই হয়তো পৃথিবী আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে তাঁদের মুছে দেওয়ার।
“স্যার, আমাদের…” স্টিভেন খুব কষ্টে মিলারের হাতটা ধরল। মিলারের হাতটা বরফের মতোই ঠান্ডা। “সত্যিই কি আমরা মারা যাব?”
মিলার জানলার দিকে তাকালেন। সমুদ্রের জলস্তরে এখন হালকা-হালকা রোদের আভা দেখা যাচ্ছে। কত বছর পর তিনি সূর্যের আলো দেখলেন? বছর নাকি কয়েক শতাব্দী পর? তাঁর চোখে এক অদ্ভুত তৃপ্তি দেখা দিল।
“স্টিভেন, আমি শুধু একবার… আকাশটা ছুঁয়ে দেখতে চাই।” মিলার বললেন। তাঁর কণ্ঠস্বর এখন এক শিশুর মতো সরল। “আমার ডায়েরিতে লিখেছিলাম… মানুষ আকাশ জয়ের নেশায় সমুদ্রকে ভুলে যায়। কিন্তু সমুদ্রই আমাদের আদিম গর্ভ। আমরা সেখান থেকেই এসেছিলাম, সেখানেই ফিরে যাচ্ছি।”
দেখতে দেখতে সাবমেরিনের সেই নীল আভাটা ফিকে হয়ে এল।
“স্টিভেন… শোনো…” মিলারের কণ্ঠস্বর তখন ভাঙা কাচের ঘর্ষণের মতো। “ক্যাপটেন স্ল্যাটারি যে স্থাপত্যটা ছুঁতে চেয়েছিলেন… তিনি হয়তো জানতেন না… ওই পিরামিড কোনো আবিষ্কার নয়… ওটা একটা ‘টাইম-ফিলটার’। ওটা আমাদের মতোই বর্বরদের থেকে সময় চুষে নিয়ে নিজেকে শুদ্ধ করে টিকিয়ে রাখে। আসলে আমরাই ওই গহ্বরে জোর করে ঢুকে সময়কে কলুষিত করতে চাইছিলাম… তাই হয়তো আমাদের শাস্তি এটাই। আমরা কোনোদিনই জীবিতরূপে স্থলে পৌঁছোতে পারব না, স্টিভেন… কোনোদিন না।”
স্টিভেন চোখ মেলার চেষ্টা করল, মিলার হাসছেন। এক করুণ হাসি। হঠাৎ ইউএসএস স্করপিয়ন সমুদ্রের জলস্তর ভেদ করে আকাশের দিকে ছিটকে গেল। নীচের ‘হাই প্রেশার’ থেকে এক লহমায় এক বায়ুমণ্ডলীয় চাপে আসতেই সাবমেরিনের ভেতরের বাতাস এক প্রচণ্ড শক্তিতে বাইরের দিকে প্রসারিত হতে চাইল। বাইরের সেই কয়েকশো বছরের পুরোনো মরিচা-ধরা লোহা আর সেই অভ্যন্তরীণ চাপের ভারসাম্য সামলাতে পারল না। এক বিশাল নীলচে বিস্ফোরণ আকাশ ছুঁল। ইউএসএস স্করপিয়ন এক লহমায় কয়েক কোটি টুকরোয় পরিণত হয়ে উল্কাবৃষ্টির মতোই সমুদ্রে আছড়ে পড়তে থাকল। সেই বিস্ফোরণের তীব্রতা ছিল এতটাই, যা ২১০০ সালের ওই প্যাট্রোল ড্রোনের ক্যামেরাগুলোকেও কিছুক্ষণের জন্য সাদা করে দিল।
৫
(মহাকালের শিলালিপি)
ইউএসএস স্করপিয়নের বিস্ফোরণটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; তা যেন মহাকালের এক ‘টক্সিক ডিসচার্জ’। যখন নীল আগুনের গোলাটি মহাসাগরের জলরাশি ভেদ করে মহাকাশের দিকে হাত বাড়াল, তখন আশপাশের কয়েক কিলোমিটার জুড়ে সময়ের গতিপথ যেন সেকেন্ডের জন্য বেড়ে গিয়েছিল।
২১০০ সালের ‘গ্লোবাল ক্রোনোস সিকিউরিটি’ (GCS)-এর কমান্ড সেন্টারে তখন রেড অ্যালার্ট। তাদের স্ক্রিনে ফুটে-ওঠা ডেটাগুলো পদার্থবিজ্ঞানের কোনো সংজ্ঞায় যেন ধরা দিতে চাইছিল না। ল্যাব চিফ ডক্টর আর্য তাঁর হলোগ্রাফিক গ্লাসের ওপার থেকে দেখলেন, বিস্ফোরণস্থলের আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো নীলচে স্ফটিকের কণা পড়ছে—যা সমুদ্রে পড়ার আগেই উধাও হয়ে গেল।
“স্যার! আমাদের ন্যানো-প্রোবগুলো একটা সলিড অবজেক্ট লক করেছে,” টেকনিশিয়ানের গলা ভয়ে কাঁপছে, “কিন্তু… কিন্তু স্ক্যানার বলছে ওটার ওজন ‘নেগেটিভ’!”
ডক্টর আর্যর ভ্রূ কুঁচকে গেল। “নেগেটিভ মাস? মানে ওটা মহাকর্ষকে বিকর্ষণ করছে?”
মিনিট দশেকের মধ্যেই একটি রিমোট অপারেটেড ভেসেল (ROV) সমুদ্রের সেই উত্তাল জলরাশি থেকে একটি ধাতব খণ্ড উদ্ধার করে আনল।
আপাতদৃষ্টিতে জিনিসটা নিছকই সাধারণ প্যানেলের ভেঙে-পড়া এক অংশ বলে মনে হয়। যন্ত্রের হিসেব নির্ভুল, ১৯৬৮ সালের মডেল; বিশুদ্ধ আমেরিকান স্টিল। তবু গোলমালটা বাধছে ঠিক সেখানেই—ধাতুর শনাক্তকরণে, যেন ওই ধাতুর অস্তিত্ব স্বয়ং পৃথিবীর ইতিহাসেও নেই।
“অ্যানালাইসিস রিপোর্ট দাও, কুইক!” আর্য গর্জে উঠলেন।
কম্পিউটারের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে ভেসে এল উত্তর, “সাবজেক্ট পার্শিয়ালি আইডেন্টিফায়েড। মেটিরিয়াল: আলট্রা-ডেন্স টেম্পোরাল ম্যাটার। প্রপার্টি: রিভার্স এন্ট্রপি… এরর… এরর… ডেঞ্জার।”
হঠাৎ ল্যাবের ভেতরের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে নামতে শুরু করল। ধাতব খণ্ডটার ভেতর থেকে একটা তীক্ষ্ণ ডিজিটাল ফ্রিকোয়েন্সি নির্গত হচ্ছে। নাহ্, কোনো রেডিয়ো সিগন্যাল নয়, যেন ওটা সেখানে উপস্থিত সকল বিজ্ঞানীর মস্তিষ্কের ‘নিউরন’-এ আঘাত করছে।
ডক্টর আর্য তাঁর চোখের সামনে দেখতে পেলেন এক বীভৎস দৃশ্য। কোনো এক সাবমেরিন… ৯৯ জন ক্রু… পিরামিডের থেকে ভেসে-আসা নীলচে আলো… শত শত অমর প্রহরী। তারপর কিছুক্ষণের জন্য সব কিছু অন্ধকার।
ঠিক সেই মুহূর্তে ল্যাবের সমস্ত স্ক্রিনে ভেসে উঠল এক হাড়-হিম-করা দৃশ্য। ভিডিয়োতে দেখা গেল—বিস্ফোরণের ঠিক কয়েক সেকেন্ড আগের ফুটেজ, ভেতরে উপস্থিত দুই অদ্ভুতদর্শী প্রাণী। তাদের শরীর থেকেও ঠিকরে বেরোচ্ছে নীলচে আলো। একটা প্রাণী হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল। তার বীভৎস মুখ যেন নড়ে উঠল, হাসছে? তারপর এক তীব্র আলোর সঙ্গে সঙ্গে ভিডিয়োটা কেটে গেল। এআই ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টের জবাব ভেসে এল: “ডেটা রিকভারি ফেইলড। স্ট্যাটাস এরর…”
ল্যাবের সকলে স্তম্ভিত। জানলার ওপাশে আকাশটা যেন আজ বড্ড বেশি শান্ত। হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা চিরে ভেসে এল এক অট্টহাসি: ‘ভুউউম… টিক…’।
Tags: অরিজিৎ দেবনাথ, একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা
