ড্রাগনের চোখ
লেখক: স্বর্ণদীপ রায়
শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব
১
চাঁদনি রাতে এই বরফ-ঢাকা উপত্যকাটা পৃথিবীর অংশ বলে মনে হচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে, এ যেন কোনো এক রহস্যময় স্বপ্নপুরী।
অনির্বাণ হাঁটা থামাল। তারপর ধীরে ধীরে চোখের নাইট-ভিশন গগল্স খুলে নিল। জ্যোৎস্নার আলো বরফে প্রতিফলিত হয়ে যে উজ্জ্বলতা সৃষ্টি করেছে, তাতে খালি চোখেই সব কিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
টিবেটান হাইল্যান্ডসের এই অঞ্চলে বাতাস খুব পাতলা। তাই চাঁদের আলো এখানে অন্য যে-কোনো জায়গার চেয়ে অনেক বেশি তীব্র বলে মনে হয়। যখন পূর্ণিমার চাঁদ দিগন্তের উপরে ওঠে, তখন পুরো উপত্যকা একনিমেষে বিশাল এক রুপালি আয়নায় পরিণত হয়। চারপাশের সুউচ্চ তুষারাবৃত শৃঙ্গগুলো সাদা রেশমি চাদর মুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, নীরব প্রহরীর মতো।
জায়গাটা নির্জন হলেও একেবারে নিস্তব্ধ নয়।
মাঝেমধ্যেই দূর থেকে বরফের চাঙড় ভেঙে পড়ার ক্ষীণ ‘কড়াত’ শব্দ কানে আসছে। তারপর আবার নিস্তব্ধতা। কখনও-বা উত্তরের দিক থেকে হিমেল বাতাস বয়ে যাচ্ছে শোঁ শোঁ শব্দে।
অনির্বাণ কান খাড়া করল।
পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা-খাওয়া বাতাসের প্রতিধ্বনি এক অদ্ভুত গুঞ্জন সৃষ্টি করছে। হঠাৎ শুনলে মনে হয়, যেন বহু দূরের কোনো এক গুম্ফা থেকে ভেসে আসছে সমবেত কণ্ঠের প্রার্থনার ধ্বনি।
অনির্বাণের মনে হল পরিবেশটা অদ্ভুত সুন্দর।
একজন সিক্রেট এজেন্ট ও বৈজ্ঞানিক হওয়ার পাশাপাশি সে একজন প্রকৃতিপ্রেমিকও বটে। আন্তর্জাতিক গুপ্তচর সংস্থা সায়েন্টিফিক রিসার্চ ইনটেলিজেন্স, সংক্ষেপে এসআরআই-এর দক্ষতম ফিল্ড অপারেটিভ, এজেন্ট Vaan-এর চরিত্রের এইদিকটা অনেকেরই অজানা। তার ইস্পাতকঠিন ব্যক্তিত্বের আড়ালে যে একটি রোমান্টিক ও সংবেদনশীল মন রয়েছে, এটা সে সচেতনভাবেই কাউকে জানতে দিতে চায় না।
তিব্বতের এই তুষারাবৃত উপত্যকার সৌন্দর্য, অনির্বাণকে যেন সম্মোহিত করে ফেলেছিল। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন সে ভুলেই গিয়েছিল যে সে একজন সিক্রেট এজেন্ট, এখানে এসেছে একটা গোপন মিশন নিয়ে।
কিন্তু কবজির ঘড়ির ডায়ালের কোণে সক্রিয় স্টপওয়াচটা, তাকে আবার বাস্তব জগতে ফিরিয়ে আনল।
সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
অনির্বাণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নাঃ, চুপচাপ দাঁড়িয়ে প্রকৃতির শোভা উপভোগ করার মতো সময় ওর হাতে নেই। রাত শেষ হওয়ার আগেই ওকে খাসি-খারপ মনাস্ট্রিতে পৌঁছোতে হবে। জিপিএস বলছে জায়গাটা এখনও মাইলখানেক দূরে।
বরফ-ঢাকা উপত্যকার মধ্যে দিয়ে, এই ভয়ানক ঠান্ডায়, এতটা পথ এই সময়ের মধ্যে পাড়ি দেওয়া অনির্বাণের মতো দক্ষ অপারেটিভের পক্ষেও সহজ কাজ নয়।
অনির্বাণ আবার গগল্স পরে নিল।
পূর্ণিমার উজ্জ্বল আলোয় সাধারণত নাইট-ভিশন গগল্সের সেন্সর কাজ করে না। কিন্তু অনির্বাণ যে গগল্সটা ব্যবহার করছে, তাতে রয়েছে ‘সেল্ফ অ্যাডজাস্টমেন্ট মোড’। এটা পরিবেশের আলোর তীব্রতা অনুযায়ী সেন্সরকে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে। অন্ধকার না থাকলেও অনির্বাণ যে এখনও এই চশমাটা ব্যবহার করছে, তার অবশ্য একটা কারণ আছে। জিনিসটার মধ্যে রয়েছে একটি শক্তিশালী স্ক্যানার, যা প্রতিনিয়ত বরফের মধ্যে লুকিয়ে-থাকা ফাটলের উপস্থিতি স্ক্যান করে চলেছে।
চশমাটা পরতেই একটা মৃদু ইলেকট্রনিক গুঞ্জনের শব্দ অনির্বাণকে বুঝিয়ে দিল যে, স্ক্যানিং সিস্টেম সক্রিয় হয়েছে।
অনির্বাণ আবার চলতে শুরু করল।
চারপাশে বরফের রুপালি পাহাড়গুলির মাঝখানে তাকে দেখাচ্ছিল একটি চলমান কালো বিন্দুর মতো।
অনির্বাণের পরনে রয়েছে বিশেষ থার্মাল ‘স্টিল্থ সুট’, যা তাকে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা থেকে বাঁচানোর পাশাপাশি চারপাশের সাদা তুষারের সঙ্গে মিশে থাকতেও সাহায্য করছে। তার চোখের গগল্সে চাঁদের রুপালি আলো নিয়ন-সবুজ রঙের ডেটা স্ট্রিমে পরিণত হচ্ছে। বরফের খাঁজে কোনো গোপন সেন্সর বা ফাঁদ আছে কি না, তা প্রতিমুহূর্তে স্ক্যান করা হচ্ছে।
অনির্বাণ চারদিকে সতর্ক দৃষ্টিনিক্ষেপ করতে করতে এগিয়ে চলল।
হঠাৎ…
‘ক্রঞ্চ!’
পায়ের নীচে একটা পাতলা বরফের চাঙড়, ভারী বুটের আঘাতে ভেঙে ছত্রখান।
অনির্বাণ সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল।
শব্দটা কি খুব জোরে হল?
তিব্বতের উপত্যকার এই পাতলা বাতাসে সামান্য শব্দও মাইলের পর মাইল প্রতিধ্বনিত হতে পারে।
শব্দটা চিনা প্রহরীদের কানে পৌঁছোল কি?
অনির্বাণ প্রায় মিনিট দুয়েক শ্বাস বন্ধ করে সাদা বরফের সঙ্গে মিশে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। না মানুষের, না ড্রোনের।
অনির্বাণ জানে যে, খাসি-খারপ মনাস্ট্রির উপর এই মুহূর্তে চাইনিজ় ইনটেলিজেন্সের বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে। কাজেই সেখানে যাওয়ার একমাত্র পথটিতে তাদের গোপন নজরদারি থাকা অস্বাভাবিক নয়।
আর তাই প্রতিটি কদম ওকে ফেলতে হচ্ছে মেপে মেপে।
আরও মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করে, কোনো বিপদের ইঙ্গিত না পেয়ে, অনির্বাণ আবার পা বাড়াল।
উপত্যকার নিস্তব্ধতা যেন আরও ঘন হয়ে উঠল।
২
ইউরোপের প্রাগ শহরে এসআরআই হেডকোয়ার্টারস। সেখানেই অনির্বাণ প্রথম জেনেছিল যে, তার এবারের মিশন একটা তিব্বতি গুম্ফায়।
সে বিস্মিত হয়েছিল।
কারণ এসআরআই-এর কাজ পৃথিবীর সমস্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণাগারের উপর নজর রাখা।
একটা ধর্মস্থানে তাদের কী প্রয়োজন?
এই প্রশ্নের উত্তর অনির্বাণ পেয়েছিল তখন, যখন ডিরেক্টর জেনারেল স্বয়ং ওকে ব্রিফ করছিলেন।
উনি অনির্বাণকে ঠিক কী বলেছিলেন, তা জানার আগে বরং এসআরআই সম্পর্কে কয়েকটি তথ্য জেনে নেওয়া যাক…
এসআরআই রাষ্ট্রসংঘের সিকিউরিটি কাউন্সিলের অধীন একটি আলট্রা-ক্লাসিফায়েড ইনটেলিজেন্স অর্গানাইজ়েশন। এই সংস্থার অস্তিত্বের বিষয়ে জানেন খুব অল্প কয়েকজন—বিশ্বের প্রধান প্রধান দেশের টপ লেভেল ডিপ্লোম্যাট, পলিটিশিয়ান আর ইনটেলিজেন্স পার্সনেল।
কিন্তু তিব্বতের দুর্গম স্থানে অবস্থিত একটি অখ্যাত গুম্ফার ততোধিক অখ্যাত এক লামা, এই টপ সিক্রেট সংস্থার বিষয়ে কীভাবে জানলেন, সেটাই রহস্য!
গত মাসে সংস্থার ডিরেক্টর জেনারেলের অফিশিয়াল ইমেইলে একটি এনক্রিপ্টেড ই-বার্তা এসে পৌঁছোয়।
প্রেরক: তিব্বতের খাসি-খারপ মনাস্ট্রির জনৈক লামা—পেমবা দোরজি।
বার্তায় লেখা ছিল—
“…আমাদের এই পবিত্র গুম্ফা গত কয়েক শতাব্দী ধরে আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্র। কিন্তু একই সঙ্গে এটি এমন এক সম্পদ ধারণ করে রয়েছে, যা মানবসভ্যতার গতিপথ বদলে দিতে পারে। আমরা এই সম্পদের কথা এতকাল গোপন রেখে এসেছি। কিন্তু মানবতার শত্রুরা এই সম্পদের সন্ধান পেয়ে গিয়েছে। আমরা বেশি দিন ওদের ঠেকিয়ে রাখতে পারব না। একমাত্র এসআরআই-ই পারে এই সম্পদকে রক্ষা করতে…”
বার্তাটি এসআরআই-এর অন্দরে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে।
রাষ্ট্রসংঘের অনুমোদিত স্বশাসিত সংস্থা হিসেবে এসআরআই-এর বিশেষ অধিকার রয়েছে—প্রয়োজনে কোনো দেশের গভর্নমেন্টের অনুমতি ছাড়াই ওই দেশে অপারেশন চালানোর। তবে পরে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট সিকিউরিটি কাউন্সিলের কাছে জমা দিতে হয়।
যদি প্রমাণিত হয় যে, সেখানে সত্যিই মানবজাতির পক্ষে বিপজ্জনক গবেষণা চলছিল—তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশের গভর্নমেন্টকে রাষ্ট্রসংঘের কাছে জবাবদিহি করতে হয়।
কিন্তু যদি অভিযোগ ভিত্তিহীন হয়—তাহলে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের দায়ে এসআরআই-ই অভিযুক্ত হয়।
অতীতে এমন ঘটনা মাত্র দুবার ঘটেছে।
আর দুবারই তৎকালীন ডিরেক্টর জেনারেলকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল।
কাজেই এবার খাসি-খারপ গুম্ফার বিষয়ে সংস্থা অত্যন্ত সতর্ক। আর তাই ইমেইল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এসআরআই কর্তৃপক্ষ তিব্বতের খাসি-খারপ গুম্ফা আর লামা পেমবা দোরজি সম্পর্কে খোঁজখবর করতে শুরু করে…
৩
“খাসি-খারপ কথাটার ইংরেজি তরজমা—দ্য সিলভার ফোর্ট্রেস।” বলছিলেন প্রফেসার লিন মে—বেজিং-এর শিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজ়িক্সের অধ্যাপিকা এবং এসআরআই-এর চাইনিজ় শাখার প্রধান।
হেডকোয়ার্টারে ব্রিফিং চলছিল।
টেবিলে অনির্বাণের মুখোমুখি বসে ছিলেন ডিরেক্টর জেনারেল ওসমান হায়দর। ওদের সামনে একটা হলোগ্রাফিক ডিসপ্লে।
প্রফেসার মে স্লাইড চেঞ্জ করতে করতে বলছিলেন, “মুন ভ্যালি—তিব্বতি ভাষায় ‘দাওয়া-লুং’। তিব্বতের এক দুর্গম উপত্যকা। তার ঠিক মাঝখানে, একটি ২০০০ ফিট উঁচু খাড়া পাহাড়ের মাথায় রয়েছে গুম্ফাটি। ওখানে যেতে হয় একটা সংকীর্ণ গিরিপথ বেয়ে। তবে সেটা এতটাই দুর্গম যে সাধারণ পর্যটকেরা চট করে ওই মনাস্ট্রিতে যেতে চায় না।”
প্রফেসার মে ডিসপ্লেতে পাহাড়চূড়ায় গুম্ফার ইমেজের উপর জ়ুম ইন করলেন।
ছবিটা দেখে অনির্বাণের মনে হল, আকাশ আর পৃথিবীর সংযোগস্থলে গুম্ফাটা দাঁড়িয়ে রয়েছে এক নিঃসঙ্গ ড্রাগনের মতো।
“ইনটারেস্টিং। আর গুম্ফার ইতিহাস?”
প্রফেসার মে মৃদু হাসলেন। “ইতিহাস আর লোককথার সীমারেখা এখানে অস্পষ্ট।”
স্লাইড বদলে গেল।
“৮০০ বছর আগে এক তিব্বতি সাধক ওই পাহাড়ের গুহায় তপস্যা করতেন। কিংবদন্তি বলে, একরাত্রে যখন উনি ধ্যানমগ্ন ছিলেন, তখন হঠাৎই একজন দেবী আকাশ থেকে ওঁর সামনে অবতীর্ণ হন। সাধকের হাতে একটি আশ্চর্য বস্তু তুলে দিয়ে উনি বলেন, ‘এটা সযত্নে রক্ষা করবি। এ হল মানবজাতির উপর দেবতাদের আশীর্বাদ।’”
ব্রিফিং রুমে কয়েক সেকেন্ডের জন্য নেমে এল নীরবতা।
“তারপর?”
ডিরেক্টর জেনারেল শান্তস্বরে বললেন, “তারপর সেই সাধক আর তাঁর শিষ্যরা, পাহাড়ের চূড়ায় গড়ে তোলেন এই মনাস্ট্রি…খাসি-খারপ গুম্ফা। ‘খাসি-খারপ’, অর্থাৎ ‘রুপোর দুর্গ’! সাদা পাথরের স্থাপত্য। পূর্ণিমায় রুপোর মতো ঝলমল করে ওঠে, তাই ওই নাম। মনে করা হয় যে, দেবী প্রদত্ত সেই আশ্চর্য বস্তুটি গত আট শতাব্দী ধরে ওর ভিতরেই সুরক্ষিত রয়েছে।”
ওসমান হায়দর আঙুল জোড়া করলেন।
“জিনিসটা আসলে কী?”
একটু থেমে আবার বললেন, “বর্ণনা শুনে তো কোনো এলিয়েন আর্টিফ্যাক্ট-এর মতো লাগছে!”
অনির্বাণ কথাটা শুনে ওঁর দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকাল। আগের ডিরেক্টর জেনারেল প্রফেসার পামারের সঙ্গে অনির্বাণের খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানের ওই অধ্যাপক গত বছর এসআরআই-এর কর্ণধারের পদ থেকে অবসর নেন। আর তাঁর জায়গাতেই ওই পদে বসানো হয় করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক প্রফেসার ওসমান হায়দরকে।
একজন পাকিস্তানি নাগরিকের অধীনে কাজ করতে হবে ভেবে অনির্বাণ প্রথমে খুবই অস্বস্তি বোধ করেছিল। কিন্তু গত কয়েক মাসে ভদ্রলোকের সঙ্গে কাজ করে অনির্বাণ বুঝেছে যে, একটি আদ্যন্ত কট্টর ও ধর্মান্ধ দেশেও যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব নয়।
প্রফেসার হায়দর নিজেই তার প্রমাণ।
“আমারও ঠিক সেটাই অনুমান, স্যার।” প্রফেসার হায়দরের দিকে তাকিয়ে অনির্বাণ বলল।
“আর আমারও।” প্রফেসার মে বললেন, “তবে এর কোনো প্রমাণ নেই। ব্যাপারটা নিছক কিংবদন্তিও হতে পারে।”
“হুঁ।”
বর্ষীয়ান পাকিস্তানি জীববিজ্ঞানী চিন্তিত স্বরে বললেন, “অ্যান্ড হোয়াট অ্যাবাউট দ্যাট লামা? ওঁর সঙ্গে কনট্যাক্ট করা গিয়েছে কি?”
“আমরা চেষ্টা করেছিলাম স্যার, কিন্তু ওই মনাস্ট্রিতে ঢোকা সম্ভব হয়নি।”
“কেন?” হায়দরের ভ্রূ কুঁচকে গেল।
“এমএসএস।”
প্রফেসার মে কেটে কেটে বললেন, “দে আর কিপিং আ ক্লোজ় সারভেইলেন্স অন দ্য মনাস্ট্রি।”
৪
পাহাড়টা দৃষ্টিগোচর হতেই অনির্বাণ তার গগল্সের বাইনোকুলার মোড অন করল।
আর অমনি HUD-তে ফুটে উঠল পাহাড়চূড়ার স্থাপত্যটি।
খাসি-খারপ গুম্ফা!
সত্যি! চাঁদের আলোয় ওটাকে ঠিক একটা রুপোর কেল্লার মতোই মনে হচ্ছে।
অনির্বাণ কিছুক্ষণ গুম্ফাটার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে রইল। তারপর সতর্ক পদক্ষেপে পাহাড়ের দিকে এগিয়ে গেল।
“কেয়ারফুল, এজেন্ট Vaan।”—ইয়ারপডের মধ্যে দিয়ে ভেসে এল প্রফেসার মে-র স্বর, “এমএসএস-এর সারভেইলেন্স ড্রোন নিশ্চয়ই পাহাড়ের আশপাশেই আছে। কোনো অবস্থাতেই ওদের নজরে পড়া চলবে না।”
অনির্বাণের হেডগিয়ারে লাগানো ক্যামেরার মাধ্যমে, বেজিং-এ এসআরআই-এর সিক্রেট অপস সেন্টারে বসেই প্রফেসার মে ওর যাত্রাপথের উপর নজর রাখছেন। আর প্রয়োজনমতো উপদেশ ও নির্দেশ দিচ্ছেন।
অনির্বাণ আকাশের দিকে তাকাল, কিন্তু উড়ন্ত কোনো কিছুই ওর গগল্সের স্ক্যানারে ধরা পড়ল না।
তবে এমএসএস-কে বিশ্বাস নেই। ওদের হাতে এমন কোনো উন্নত প্রযুক্তি থাকতেই পারে, যার সাহায্যে ওরা নিজেদের নজরদারি ড্রোনগুলোকে শত্রুর চোখের আড়ালে লুকিয়ে রাখে।
যদিও অনির্বাণের সাদা স্টেল্থ সুটের কারণে, বরফে ঢাকা এই উপত্যকায় তাকে সহজে ট্রেস করা যাবে না। কিন্তু পাহাড়ে ওঠার সময়, পাহাড়ের ধূসর-বাদামি প্রেক্ষাপটে অনির্বাণের সাদা সুটই তাকে ধরিয়ে দিতে পারে।
অনির্বাণ অকারণ ঝুঁকি নিতে চাইল না।
সে নিজের কবজিতে বাঁধা রিস্টওয়াচের মতো যন্ত্রটায় কিছু একটা অন করল। আর অমনি তার সম্পূর্ণ অবয়বটাই আবছা হতে হতে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
এটা হল অনির্বাণের গায়ে চড়ানো স্টেল্থ সুটের কামাল। ‘ওমনি সুট’ নামে এই বিশেষ পোশাকটি এসআরআই-এর আর অ্যান্ড ডি বিভাগের নিজস্ব ডিজ়াইনে তৈরি।
ওমনি সুটের সঙ্গেই থাকে একটা রিস্টওয়াচের মতো কনট্রোল ইউনিট। এতে নির্দিষ্ট মোড অ্যাকটিভেট করলেই ওমনি সুটের ফাইবারগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।
অনির্বাণ আপাতত যন্ত্রে ‘ইনভিজ়িবিলিটি মোড’ অ্যাকটিভেট করেছে। এর ফলে সুটের মাইক্রো-অপটিক্যাল স্কেলগুলো চারপাশের আলোর প্যাটার্ন স্ক্যান করে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিফলন বদলাতে শুরু করে। পরিণামে ঝাপসা হতে হতে একসময়ে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যাওয়া যায়।
“ইনভিজ়িবিলিটি মোড অ্যাকটিভেটেড।” অনির্বাণ ফিশফিশিয়ে বলল।
“নট এনাফ।”—ইয়ারপডে আবার শোনা গেল প্রফেসার মে-র স্বর।
“থার্মাল সিগনেচার মিনিমাইজ় করুন। এমএসএস ওটাও ট্র্যাক করতে পারে।”
অনির্বাণ জানে, প্রফেসার মে ঠিকই বলছেন।
এমএসএস, অর্থাৎ মিনিস্ট্রি অব স্টেট সিকিউরিটি হল চিনের প্রধান ইনটেলিজেন্স সংস্থা। তাদের প্রযুক্তিকে হালকা করে দেখার কোনো প্রশ্নই নেই।
এমএসএস-এর অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন সারভেইলেন্স সিস্টেমকে ওমনি সুটের সাহায্যে ফাঁকি দেওয়া কি আদৌ সম্ভব?
অনির্বাণ জানে যে, এই প্রশ্নের উত্তরের উপরেই হয়তো আজ ওর জীবনমরণ নির্ভর করছে।
৫
পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছে অনির্বাণ উপরে ওঠার পথটা খুঁজছিল। কাছাকাছি কোনো নজরদারির ব্যবস্থা নেই ভেবে ও বোধহয় সামান্য অসতর্ক হয়ে থাকবে। নয়তো হাঁটুসমান উঁচু তিব্বতি জুনিপারের ঝোপটা পেরোনোর সময় ও এত শব্দ করবে কেন?
কিন্তু ওর এই সামান্য অসতর্কতাটুকুই ওর পক্ষে আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়াল।
ঝোপটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে হঠাৎ একজন চিনা সৈনিককে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল। লোকটা যে ঝোপের আড়ালে বসে নজরদারি করছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শব্দ শুনেই বেরিয়ে এসেছে তদন্ত করতে।
অনির্বাণ নিশ্বাস বন্ধ করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ও খুব বাঁচা বেঁচে গিয়েছে। গায়ে ওমনি সুট থাকার কারণে লোকটা ওকে এখন দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু শব্দ শুনে লোকটা বেমক্কা বেরিয়ে না এলে, অনির্বাণ হয়তো লোকটার উপরেই হুমড়ি খেয়ে পড়ত।
কারণ, ও ওইদিকেই যাচ্ছিল।
“কী ব্যাপার, ওয়াং?”
একটু দূরে একটা পাথরের আড়াল থেকে আরেকজন মানুষের সাড়া পাওয়া গেল।
সেদিকে তাকিয়ে লোকটা চিনা ভাষায় বলল, “কিছু না, ক্যাপটেন। একটা শব্দ পেলাম বলে মনে হল। তাই দেখতে এসেছিলাম।”
“সব ঠিক আছে তো?”
“ওঃ ইয়েস, ক্যাপটেন। এখানে অল ক্লিয়ার। মনে হয়, হাওয়াতে শব্দ হচ্ছিল।”
“হুঁ, ঠিক আছে, ওয়াং। এবার নিজের জায়গায় ফিরে যাও। তোমার জায়গাটাই সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ওখান থেকেই গুম্ফায় যাওয়ার পথ আরম্ভ হয়েছে। সো বি ভেরি কেয়ারফুল।”
ওয়াং নামের লোকটা নিজের উপরওয়ালার হুকুম তামিল করে আবার ঘাসঝোপের আড়ালে অন্তর্হিত হল।
অনির্বাণ কিছুটা দমে গেল।
বোঝাই যাচ্ছে যে, চিনা সৈনিকেরা এই পুরো জায়গাটা জুড়ে, ঝোপঝাড় আর পাথরের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে। ওদের এড়িয়ে গুম্ফায় যাওয়ার পথটা ধরতে পারা বেশ কঠিন। যদিও ওমনি সুটের দৌলতে ওরা হয়তো অনির্বাণকে চোখে দেখতে পাবে না। কিন্তু এইসব ঠান্ডা জায়গায় নজরদারির জন্য থার্মাল সেন্সর ব্যবহার করা হয়। ওমনি সুট থার্মাল সিগনেচার মিনিমাইজ় করলেও একেবারে শূন্য করতে পারে না। দেহের স্বাভাবিক উষ্ণতার কারণেই সেটা করতে পারা মুশকিল।
অনির্বাণ ঝুঁকি নিল না।
ও পা টিপে টিপে তিব্বতি জুনিপারের ঝোপটা থেকে বেরিয়ে এল। তারপর পাহাড়ের গা ঘেঁষে চলতে চলতে পাহাড়ের পিছনদিকটাতে পৌঁছে গেল।
এদিকে মাটি একেবারে ন্যাড়া। ঝোপঝাড় কিংবা আলগা বড়ো পাথর, কিছুই নেই এখানে। ফলে এখানে সৈন্যদের পক্ষে লুকিয়ে নজরদারি করা সম্ভব নয়।
অবশ্য এদিকে নজরদারি করার তেমন প্রয়োজনও নেই। কারণ, এদিকে পাহাড় একেবারে খাড়া।
এই খাড়া পাহাড় বেয়ে ২০০০ ফিট উপরে উঠে গুম্ফায় পৌঁছোনো ইহজগতের কোনো প্রাণীর পক্ষেই অসম্ভব।
কিন্তু নিয়ম থাকলে তার ব্যতিক্রমও থাকবে।
আর এক্ষেত্রে সেই ব্যতিক্রমেরই অপর নাম এজেন্ট Vaan!
অনির্বাণ ওর কবজিতে বাঁধা স্মার্টফোনের মতো যন্ত্রটায় কিছু একটা করল। তারপর এগিয়ে এসে পাহাড়ের গা স্পর্শ করে দাঁড়াল। পরমুহূর্তেই ও প্রায় একটা টিকটিকির মতো খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে তরতর করে উপরদিকে উঠতে লাগল।
আসলে অনির্বাণের হাতে আর পায়ে রয়েছে বিশেষ ধরনের দস্তানা আর জুতো। ‘ওমনিপড’ আর ‘ওমনিগ্লাভস’ নামে ওই জিনিস দুটোও এসআরআই-এর আর অ্যান্ড ডি ডিপার্টমেন্টের আবিষ্কার। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি এই জিনিস দুটি আসলে এক রকমের হাই-টেক গ্যাজেট। কবজিতে বাঁধা কনট্রোল ইউনিটের সাহায্যে এই গ্যাজেট দুটিকেও বিভিন্ন মোডে সেট করা যায়। এই মুহূর্তে অনির্বাণ ওগুলোকে সেট করেছে ‘লিজ়ার্ড’ মোডে। আর তাই ওই দুটি গ্যাজেটের সাহায্যে, ও ঠিক টিকটিকির মতোই খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে তরতর করে উপরে উঠে যেতে পারছে।
কিন্তু প্রযুক্তির সাহায্য পেলেও, কাজটা নিঃসন্দেহে যথেষ্ট পরিশ্রমসাপেক্ষ। ২০০০ ফিটের উচ্চতা এভাবে অতিক্রম করা সহজ নয় মোটেই।
প্রায় এক ঘণ্টা ধরে এভাবে পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠার পরে অনির্বাণ বিশ্রাম নেওয়ার জন্য একটু থামল। কবজিতে বাঁধা যন্ত্রটার ডিসপ্লেতে দেখা যাচ্ছে যে, ও ইতিমধ্যেই ১৫০০ ফিটেরও বেশি উচ্চতা অতিক্রম করে ফেলেছে।
পাহাড়ের গায়ে টিকটিকির মতো ঝুলে থেকে বিশ্রাম নেওয়াটা অনির্বাণের কাছে খুব একটা স্বস্তিদায়ক বোধ হল না। ওভাবে মিনিট দশেক কাটিয়েই ও আবার উপরে উঠতে শুরু করল।
আধ ঘণ্টা পরে ও যখন পাহাড়ের মাথায় পৌঁছোল, তখন চাঁদ পশ্চিমের আকাশে ঢলতে শুরু করেছে।
৬
পেমবা দোরজি ঘরের মেঝেতে পদ্মাসনে বসে ছিল। চোখ দুটি বোজা, চেহারায় হালকা উদ্বেগের ছাপ।
এসআরআই-এর লোকটির তো এতক্ষণে পৌঁছে যাওয়া উচিত ছিল। রাত যে শেষ হতে চলল।
লোকটা আবার চিনা সৈনিকদের হাতে ধরা পড়ে গেল না তো?
পেমবা এইসব সাত-পাঁচ ভাবছিল। হঠাৎ ঘরের কোনা থেকে ‘খুট’ করে একটা শব্দ পেতেই সচকিত হয়ে উঠল।
ঘরের মধ্যে একটিমাত্র ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলছিল। তার মৃদু আলোয় পেমবা দেখল, মেঝের একটা পাথরের স্ল্যাব সরে যাচ্ছে। আর তার ফলে যে গহ্বরের সৃষ্টি হয়েছে, সেখান থেকে উঁকি মারছে একটা মাথা।
মানুষের মাথা।
পেমবা আসন থেকে উঠে লোকটার দিকে এগিয়ে গেল।
লোকটার সম্পূর্ণ শরীরটাই ইতিমধ্যে নীচের গর্ত থেকে বেরিয়ে, ঘরের মধ্যে উঠে এসেছে।
পেমবা অবাক হয়ে লোকটাকে দেখছিল। তার আপাদমস্তক ডুবুরিদের মতো আঁটোসাঁটো পোশাকে ঢাকা। তবে এর রং ডুবুরিদের পোশাকের মতো কালো নয়।
বরং তার উলটো।
অর্থাৎ সাদা, বরফের মতো সাদা।
লোকটার হাতে আর পায়ে রয়েছে অদ্ভুতদর্শন একজোড়া দস্তানা আর ততোধিক অদ্ভুতদর্শন একজোড়া জুতো।
মাথাটা হেলমেট-জাতীয় একটা জিনিস দিয়ে ঢাকা।
লোকটা এবার হেলমেটের কাচ সরাতেই পেমবা ওর মুখ দেখতে পেল।
একঝলক দেখে পেমবার লোকটিকে ভারতীয় বলে মনে হল।
“লামা পেমবা দোরজি?” লোকটা পেমবার দিকে চেয়ে বলল।
পেমবা মাথা নেড়ে লোকটিকে বুঝিয়ে দিল যে তার অনুমান নির্ভুল।
“এসআরআই।”
লোকটা নিজের বুকে তর্জনী ঠেকিয়ে বলল, “দে কল মি এজেন্ট Vaan…”
“আমার ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।”
পেমবা তিব্বতি কায়দায় হাত দুটো নমস্কারের ভঙ্গিতে জড়ো করে বলল।
লোকটা একটা হালকা ‘নড’ করে সৌজন্য রক্ষা করল।
“নষ্ট করার মতো বেশি সময় নেই। জিনিসটা কোথায়?”
“আসুন আমার সঙ্গে।”
ওরা দুজনে ঘর থেকে বেরিয়ে একটা সংকীর্ণ করিডরে এসে পড়ল। করিডরের মেঝের পাথরের স্ল্যাবগুলো থেকে দেয়ালে লাগানো মশালের আলো প্রতিফলিত হয়ে অদ্ভুত আলো-আঁধারির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
অনির্বাণ করিডরটা চিনতে পারল। পেমবা এসআরআই-কে মনাস্ট্রির একটা ম্যাপ পাঠিয়েছিল। সেটার ভিত্তিতে সংস্থার ডেটা অ্যানালাইসিস ডিপার্টমেন্ট বানিয়ে ফেলেছিল, মনাস্ট্রির একটা থ্রি-ডি ভিশুয়াল কনস্ট্রাক্ট। অনির্বাণ সেটা খুঁটিয়ে স্টাডি করেছিল। তাই ও চিনতে পারল যে, এই গলিটা হল ‘ড্যাং-পো ড্রুল’, অর্থাৎ ‘প্রথম সর্প’। কনস্ট্রাক্ট অনুযায়ী মনাস্ট্রির মধ্যে দিয়ে ডায়াগনালি এরকম দুটো করিডর পাস করেছে। দ্বিতীয় করিডরটা হল ‘ন্যিপা ড্রুল’, অর্থাৎ ‘দ্বিতীয় সর্প’। এই দুটো গলি পরস্পরকে যেখানে ক্রস করেছে, সেখানে রয়েছে একটা বন্ধ দরজা। দরজাটা খুললেই দেখা যাবে, ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গিয়েছে পাতালের অন্ধকারে। ওটাই হল খাসি-খারপ গুম্ফার ভূগর্ভস্থ অংশ। এই গুম্ফার সব চেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলি এখানেই সুরক্ষিত থাকে।
অনির্বাণ দেখল যে, ওর অনুমান নির্ভুল প্রমাণ করে পেমবা ওই দরজাটার কাছে এসে থামল।
তারপর অনির্বাণের দিকে ঘুরে বলল, “এবার নীচে নামতে হবে। আপনার চোখের চশমাটা দিয়ে বোধ করি, অন্ধকারেও দেখা যায়।”
অনির্বাণ অবাক হল।
তিব্বতের এক অখ্যাত গুম্ফার সাধারণ একজন লামা নাইট-ভিশন গগল্সের মতো অত্যাধুনিক একটা গ্যাজেটর বিষয়ে জানে! এমনকি দেখে চিনতেও পারে!
অনির্বাণের মনের ভাবটা বুঝে নিয়ে পেমবা বলল, “এখানে রাতের দিকে চিনা সেনারা মাঝে মাঝে টহল দিতে আসে। তাদের এরকম চশমা ব্যবহার করতে দেখেছি।”
অনির্বাণ উত্তরে কিছু বলল না, কেবল সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে পেমবার দিকে তাকিয়ে রইল।
পেমবা এবার নিজের পোশাকের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে একটা চাবি বের করে আনল। তারপর দরজায় লাগানো তালাতে চাবিটা ঢুকিয়ে ঘোরাতেই সেটা ‘ঘটাং’ শব্দে খুলে গেল।
পেমবা দরজার ভারী পাল্লা দুটো খুব সাবধানে, প্রায় কোনো শব্দ না করেই খুলে ফেলল।
অনির্বাণ দেখল, দরজার পিছনে একটা পাথরের সিঁড়ি নীচের অন্ধকারে নেমে গিয়েছে।
“আসুন।”
পেমবা সিঁড়ির ধাপে পা রেখে বলল।
“এক মিনিট।”
অনির্বাণ বলল, “আপনি বোধহয় মশাল নিতে ভুলে যাচ্ছেন। অন্ধকারে দেখবেন কীভাবে?”
পেমবা অনির্বাণের দিকে একটা রহস্যময় হাসি ছুড়ে দিয়ে বলল, “মশালের দরকার নেই। আমি এমনিতেই অন্ধকারে দেখতে পাই। অনেকটা বাদুড়ের মতো…”
৭
প্রফেসার ওসমান হায়দর ঘরের দেয়ালে জায়ান্ট স্ক্রিনটার দিকে নিবিষ্টচিত্তে চেয়ে ছিলেন।
স্ক্রিনটা অনেকগুলো ছোটো ছোটো অংশে বিভক্ত।
পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এসআরআই-এর ফিল্ড অপারেটিভরা এই মুহূর্তে যে মিশনগুলি চালাচ্ছে, স্ক্রিনের আলাদা আলাদা অংশে তারই লাইভ টেলিকাস্ট দেখা যাচ্ছে। অপারেটিভদের হেডগিয়ারে বসানো ক্যামেরার ফিড, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সরাসরি চলে আসছে হেডকোয়ার্টারে, ডিরেক্টর জেনারেলের ঘরের দেয়ালের এই জায়ান্ট স্ক্রিনে।
এই মুহূর্তে পৃথিবীর আটটি দেশে এসআরআই-এর আটজন অপারেটিভ অপারেশনে ব্যস্ত রয়েছে। তবে এদের মধ্যে অনির্বাণ, অর্থাৎ এজেন্ট Vaan-এর উপরেই প্রফেসার হায়দরের দৃষ্টি রয়েছে সব চেয়ে বেশি। সে তিব্বত থেকে যে জিনিসটা উদ্ধার করে আনতে গিয়েছে, সেটা সম্ভবত কোনো ভিনগ্রহী টেকনোলজির নিদর্শন।
হয়তো ওটা এমন কিছু, যা সারা পৃথিবীর বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাকেই ওলট-পালট করে দিতে পারে।
তবে এখানে অর্থাৎ প্রাগ শহরে, এসআরআই হেডকোয়ার্টারের সেন্ট্রাল ল্যাবরেটরিতে, একবার জিনিসটা এনে ফেলতে পারলেই কেল্লা ফতে।
প্রফেসার হায়দরের স্থির বিশ্বাস যে, এখানে সংস্থার রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের বিজ্ঞানীরা নিশ্চয়ই জিনিসটার প্রযুক্তিগত রহস্য ভেদ করতে সক্ষম হবেন।
অবশ্য তার জন্য হয়তো কয়েক বছর সময় লাগবে।
তা লাগুক, কুছ পরোয়া নেহি।
কিন্তু যদি জিনিসটা তিব্বত থেকে উদ্ধার করে না আনা হয়, তাহলে আজ নয় কাল সেটা চিন সরকারের হস্তগত হবেই। পেমবা দোরজি নামে ওই লামার ইমেইলে তো সেরকম ইঙ্গিতই ছিল।
আর যদি তা হয়, তাহলে সেটা মানবজাতির পক্ষে যে খুব একটা শুভ হবে না, সেটা বলাই বাহুল্য।
আর সেই কারণেই জিনিসটা অবিলম্বে উদ্ধার করে আনা দরকার। আর তাই প্রফেসার হায়দর মাঠে নামিয়েছেন এসআরআই-এর সেরা ফিল্ড অপারেটিভ এজেন্ট Vaan-কে।
স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে যে সে ইতিমধ্যেই মনাস্ট্রিতে, ওই লামার কাছে পৌঁছে গিয়েছে। লামা তাকে নিয়ে চলেছে মনাস্ট্রির সিকিয়োরড অংশে। এখানেই সম্ভবত সেই এলিয়েন আর্টিফ্যাক্টটা সুরক্ষিত অবস্থায় রাখা আছে।
প্রফেসার হায়দর জানেন যে, বেজিং-এ এসআরআই-এর সিক্রেট অপস সেন্টারে বসে প্রফেসার মে-ও এজেন্ট Vaan-এর উপর দৃষ্টি রাখছেন। আর তাকে গাইডও করছেন।
ওসমান হায়দর বুঝলেন যে জিনিসটা এজেন্ট Vaan-এর হাতে আসা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।
হঠাৎ ঘরের দরজায় নক করার শব্দ শোনা গেল।
“কাম ইন।” প্রফেসার হায়দর ভারিক্কি স্বরে বললেন।
দরজা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করল একজন ব্লন্ড, শ্বেতাঙ্গ সুন্দরী। ইনি তাতিয়ানা রোমানোভা, এসআরআই-এর সিনিয়ার ক্রিপ্টোগ্রাফার।
“কী ব্যাপার, মিস রোমানোভা?” ওসমান অবাকস্বরে বললেন।
“স্যার, আমি জাস্ট নাউ কিছু এনক্রিপ্টেড ডেটা ডিকোড করতে পেরেছি। ইট মে বি লিংকড উইথ আওয়ার অনগোয়িং অপারেশন ইন টিবেট।”
ওসমান হায়দরের ভ্রূযুগল ঈষৎ কুঞ্চিত হল।
“শো মি।” উনি বললেন।
তাতিয়ানা হাতে ধরা ল্যাপটপটা ওসমানের টেবিলের উপর রাখল।
৮
ঘোরানো সিঁড়িটা দিয়ে নীচে নেমে ওরা পৌঁছোল একটা প্রায়ান্ধকার প্যাসেজে। বাঁদিকে, গলিটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে একটা মশাল জ্বলছে। আর তার আলোতেই দেখা যাচ্ছে একটা প্রকাণ্ড লোহার দরজা। আর তাতে ঝুলছে পেল্লায় এক তালা।
পেমবা দরজাটার দিকে এগিয়ে গেল, আর ওর পিছু পিছু অনির্বাণ।
পেমবা আগের মতোই নিজের পোশাকের ভিতর থেকে চাবির গোছাটা বের করে আনল। তারপর একটা বিশেষ চাবি দিয়ে খুলে ফেলল দরজার তালাটা।
“আসুন।” পেমবা দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল।
অনির্বাণ ওকে অনুসরণ করল।
জায়গাটা আসলে প্রকাণ্ড এক হলঘর। আর তার চতুর্দিকে, কাচের আলমারির মধ্যে সাজানো রয়েছে রাশি রাশি জিনিসপত্র। বুদ্ধদেব এবং বৌদ্ধ দেবদেবীর ধাতব মূর্তি, বিভিন্ন ধরনের জপযন্ত্র, পাথর-বসানো গয়নাগাটি, লাল শালুতে মোড়া প্রাচীন পুথিপত্র, থাংকা এবং আরও অনেক কিছু।
ঘরে কোনো আলো না থাকলেও, ওর নাইট-ভিশন গগল্সের দৌলতে অনির্বাণ সব কিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল।
“এটা আমাদের মনাস্ট্রির আর্কাইভ কাম মিউজ়িয়াম।”
পেমবা বলল, “আর যে জিনিসটার জন্য আপনি এখানে এসেছেন, সেটা রয়েছে ওদিকে।”
অনির্বাণ দেখল, পেমবা নির্দেশ করছে ঘরের একপ্রান্তে রাখা কতকগুলি ধাতব সিলিন্ডারের মতো জিনিসের দিকে।
ওরা জিনিসগুলোর দিকে এগিয়ে গেল।
অনির্বাণ লক্ষ করল যে সিলিন্ডারগুলোর মধ্যে কয়েকটা সোনার তৈরি, কয়েকটার রুপোর আর অন্যগুলো লোহার।
অনির্বাণ জানে যে এগুলোকে বলা হয় ‘টেরমা’। এগুলোর মধ্যে অনেক সময় পাতলা সোনার পাতে হাজার হাজার বছরের পুরোনো লিপি খোদাই করা থাকে।
পেমবা এবার ওগুলোর মধ্যে থেকে একটা সিলিন্ডার হাতে তুলে নিয়ে বলল, “আমাদের গুম্ফার ইতিহাসটা জানেন কি?”
“তা কিছুটা জানি বই-কি।”
অনির্বাণ, প্রফেসার মে-র মুখে শোনা কিংবদন্তির কথা সংক্ষেপে জানাল।
“ঠিকই শুনেছেন।” পেমবা বলল।
তারপর লোহার সিলিন্ডারটা অনির্বাণের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “আর এটাই হল সেই বস্তু। এই জিনিসটাই আমাদের গুম্ফার প্রতিষ্ঠাতা লোপোন রিনপোচে পেমা লিংপা, দেবীর কাছ থেকে পেয়েছিলেন।”
কথাটা শুনে অনির্বাণ কিছুটা হতাশ হল।
এটা তো একটা তিব্বতি ‘টেরমা’। আর এর চেহারাটাও তো অত্যন্ত সাদামাটা। এই জিনিস কোনো ভিনগ্রহী জীবের দান বলে বিশ্বাস করা শক্ত।
“অন্য সিলিন্ডারগুলো কীসের?” পেমবার কাছ থেকে জিনিসটা নিয়ে অনির্বাণ প্রশ্ন করল।
“এই দিব্য বস্তুটি লুকিয়ে রাখার জন্যই ওগুলো বানানো হয়েছে। শত্রুরা দৈবাৎ এই গোপন স্থানে পৌঁছে গেলেও, এতগুলো সিলিন্ডারের মধ্যে থেকে আসল সিলিন্ডারটা সহজে খুঁজে বের করতে পারবে না।”
“হুঁ।”
অনির্বাণ আর কথা না বাড়িয়ে জিনিসটা পরীক্ষা করে দেখতে শুরু করল। প্রফেসার মে আর প্রফেসার হায়দরও নিশ্চয়ই ওর হেডগিয়ারের ক্যামেরার ফিডের মাধ্যমে জিনিসটার ছবি দেখতে পাচ্ছেন।
“এটাকে খোলার কোনো উপায় আছে কি?” প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে জিনিসটা খুঁটিয়ে দেখার পরে অনির্বাণ প্রশ্ন করল।
“না এবং হ্যাঁ।” পেমবা বলল, “বস্তু হিসেবে এটা খোলার উপায় না থাকলেও ধ্যানের মাধ্যমে এর অন্তর্নিহিত শক্তিকে স্পর্শ করা অবশ্যই সম্ভব। আমাদের গুম্ফার কয়েকজন লামা সেটা পেরেওছেন।”
“তাদের মধ্যে আপনিও রয়েছেন কি?”
“হ্যাঁ।”
পেমবা কিছুটা ইতস্তত করে উত্তর দিল।
“আর তাই আপনার মধ্যে অতীন্দ্রিয় শক্তির সঞ্চার ঘটেছে। সেই শক্তির বলেই আপনি জানতে পেরেছেন যে, এসআরআই নামের একটি গুপ্তসংস্থা রয়েছে। আর এরাই পারে আপনাদের এই সম্পদকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে। কী? তা-ই তো?” অনির্বাণের কণ্ঠস্বরে হালকা বিদ্রুপের সুর।
পেমবা মাথা নেড়ে দৃঢ়স্বরে বলল, “অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এটাই সত্যি।”
অনির্বাণের ভ্রূযুগল ঈষৎ কুঞ্চিত হল।
পেমবা যা বলছে, সেটা পুরোপুরি ভুল না-ও হতে পারে।
‘সাইকিক পাল্স’ বলে একটা জিনিসের কথা অনির্বাণ আগেও শুনেছে। প্যারাসাইকোলজিস্টদের মধ্যে অনেকের বিশ্বাস যে, এর সাহায্যেই একজন অতীন্দ্রিয় শক্তিসম্পন্ন মানুষ নিজের শক্তি যে-কোনো সাধারণ মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত করতে পারেন।
অনির্বাণ পেমবাকে আবার কোনো প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ওর ইয়ারপডের মধ্যে দিয়ে ভেসে এল প্রফেসার মে-র স্বর, “হোল্ড অন এজেন্ট Vaan। ডিরেক্টর জেনারেলের অফিস থেকে এইমাত্র খুব ইম্পরট্যান্ট একটা ইনফর্মেশন এসেছে। ইউ মাস্ট লিস্ন টু দিস বিফোর টেকিং এনি ফারদার স্টেপস…”
৯
পেমবা একটু অস্বস্তি বোধ করছে।
লোকটা একটু আগে তার ইয়ারপডে কারও সঙ্গে নীচুস্বরে কথা বলছিল। এখন অবশ্য ও আর কথা বলছে না, কিন্তু কিছু শুনছে।
কী এত শুনছে লোকটা?
পেমবা জানে না।
রাত কত হল?
মাটির নীচের এই কক্ষে সময় জানার উপায় নেই। তবে মনে হয় ভোর হতে বেশি দেরি নেই। আকাশে আলো ফুটে গেলে লোকটা আর এই মনাস্ট্রি থেকে বেরোতে পারবে না। ও কি সেটা বুঝতে পারছে না?
নিজে তো বিপদে পড়বেই, পেমবাকেও বিপদে ফেলবে।
পেমবা অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছিল। কিন্তু লোকটাকে কিছু বলতে যেতেই সে হাতের ইশারায় পেমবাকে নীরব থাকতে বলল।
এভাবে প্রায় দশ মিনিট কেটে যাওয়ার পরে লোকটা অবশেষে মুখ খুলল, “চলুন লামাজি, এবার উপরে যাওয়া যাক।”
“সব ঠিক আছে তো?” পেমবা কৌতূহলী স্বরে প্রশ্ন করল।
“হ্যাঁ হ্যাঁ। আমার উপরওয়ালাকে মিশনের আপডেট দিচ্ছিলাম।”
“কিন্তু আমি তো দেখলাম যে, আপনি বললেন কম, শুনলেন বেশি।”
“ওটা আমাদের পেশার দস্তুর। বসের সব কথা কান খুলে শুনতে হয়। বসের কথার মাঝখানে কথা বলা নিষেধ।”
কথা বলতে বলতে পেমবা আর অনির্বাণ ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল। ধাতব সিলিন্ডারটা অনির্বাণের হাতেই ধরা ছিল।
পেমবা আগের মতোই পোশাকের ভিতর থেকে চাবির গোছা বের করে দরজায় তালা দিল। তারপর ঘোরানো সিঁড়িটা ধরে উপরে উঠতে লাগল। অনির্বাণ ওর পিছু পিছু আসতে আসতে বলল, “আচ্ছা, আপনাদের এই মনাস্ট্রিতে বস কে? আপনি?”
“নাঃ, আমি এই গুপ্তভাণ্ডারের প্রহরীমাত্র। আমাদের প্রধান লামাই হলেন এই গুম্ফার আসল কর্তা।”
“ওঁকে কি ‘ড্রাগন’ নামে ডাকা হয়?”
কথাটা শুনে পেমবা যেন একটু চমকে উঠল।
পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “কই? না তো! ওঁর নাম লোবসাং নামগিয়াল। গুম্ফার সকলে অবশ্য ওঁকে ‘খেনপো’ বলে ডাকে। কিন্তু হঠাৎ ওঁর কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?”
ইতিমধ্যে ওরা কথা বলতে বলতে ‘প্রথম সর্প’ গলিতে উঠে এসেছিল। গলির দেওয়ালের গায়ে বসানো মশালের প্রায় সব ক-টিই নিবে গিয়েছে। তবে অনেক উপরে স্কাইলাইটের মতো কতকগুলি ফোকর দিয়ে ভোরের নরম প্রবেশ করছে। তাই গলিটা তত অন্ধকার মনে হচ্ছে না।
“এই যাঃ!” পেমবা হতাশভাবে বলল, “ভোরের আলো ফুটে গিয়েছে। এখন আপনি আর মনাস্ট্রির বাইরে বেরোতে পারবেন না। আবার রাতের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।”
অনির্বাণ কান খাড়া করে কিছু একটা শোনার চেষ্টা করছিল।
পেমবার কথা শেষ হতেই ও বলল, “তার মনে হয়, দরকার হবে না… ওই শুনুন।”
পেমবাও এবার শব্দটা শুনতে পেল।
গুম্ফার পাথরের মেঝের উপর ভারী মিলিটারি বুটের শব্দ।
“সর্বনাশ, চাইনিজ় সোলজাররা গুম্ফায় ঢুকে পড়েছে।” পেমবা আতঙ্কিত স্বরে বলল,
“নিশ্চয়ই ওরা কোনোভাবে আপনার কথা জেনে গিয়েছে। আপনাকে এখনই লুকিয়ে পড়তে হবে। আসুন আমার সঙ্গে।”
“আপনার অনুমান ভুল, পেমবা দোরজি, ওরফে লোবসাং নামগিয়াল।”
“কী বলছেন আপনি!” পেমবা বিস্মিত স্বরে বলল, “আমি লোবসাং নামগিয়াল হতে যাব কেন? আমি তো…”
“সিলভার ড্রাগন!” অনির্বাণ বলল, “কী, তা-ই না?”
কথাটা শোনামাত্রই পেমবার মুখের ভাব সম্পূর্ণ বদলে গেল।
তার দু-চোখের দৃষ্টিতে শান্তি ও স্নিগ্ধতার বদলে জেগে উঠল হিংসার আগুন!
মুহূর্তের মধ্যে তার হাতে চলে এল একটি অত্যাধুনিক সাইলেন্সার-লাগানো রিভলভার।
“আপনি বড্ড বেশিই জেনে ফেলেছেন, মনে হচ্ছে। কাজেই…”
পেমবা কথাটা শেষ করল না। তার পরিবর্তে রিভলভারটা অনির্বাণের দিকে তাগ করে দুবার ফায়ার করল।
“থাড্-থাড্” সাইলেন্সারের মধ্যে দিয়ে চাপা শব্দ তুলে, দুটো বুলেট পরপর ছুটে গেল অনির্বাণের দিকে।
পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে ছোড়া গুলি সাধারণত লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না।
এক্ষেত্রেও হল না।
বুলেটের অভিঘাতে অনির্বাণের শরীরটা ছিটকে গিয়ে বেশ কয়েক হাত দূরে, গলির মেঝের উপর পড়ল। ওর হাতের ধাতব সিলিন্ডারটা ‘ঠং’ শব্দে মেঝেয় পড়ে গড়িয়ে পেমবার পায়ের কাছে চলে এল।
জিনিসটা কুড়িয়ে নিয়ে পেমবা অনির্বাণের নিথর শরীরটার দিকে একঝলক তাকাল।
লোকটা খুবই স্মার্ট ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। তবে ওর অতিরিক্ত স্মার্টনেসই শেষ পর্যন্ত ওর মৃত্যুর কারণ হল।
১০
ভোরবেলা কোনো ধর্মস্থানে প্রবেশ করলে সাধারণত মানুষের মন শান্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু কর্নেল ঝাও জিং-এর ওরকম কোনো অনুভূতি হচ্ছিল না। এমএসএস-এর এলিট ‘গোস্ট ফ্যালকনস’ ইউনিটের কমান্ডার হিসেবে ওঁর আপাতত একটাই ধ্যানজ্ঞান।
ড্রাগনকে ফাঁদে ফেলা।
গুম্ফার অধিবাসীরা ইতিমধ্যেই ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। তারা নিজেদের নিত্যনৈমিত্তিক কাজে ব্যাস্ত ছিল। হঠাৎ সৈনিকদের দলটাকে গুম্ফায় ঢুকে পড়তে দেখে সবাই যেন হতভম্ব হয়ে পড়েছিল। অবশ্য চিনা সেনারা মাঝেমধ্যেই গুম্ফায় হানা দেয়, রুটিন তল্লাশির জন্য। তবে তারা এত ভোরের দিকে তো আসে না। আর তা ছাড়া এই সৈনিকদের পোশাক আর চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে যে এরা ঠিক সাধারণ সৈনিক নয়।
কর্নেল জিং আর তাঁর দলবল গুম্ফাবাসীদের কৌতূহলী দৃষ্টি উপেক্ষা করে দ্রুত এগিয়ে যেতে লাগলেন। কর্নেলের দৃষ্টি ওঁর হাতের ইলেকট্রনিক ডিভাইসটার স্ক্রিনের উপর নিবদ্ধ। সেখানে একটি দ্রুত সঞ্চরমাণ আলোকবিন্দু দেখা যাচ্ছে। প্রায় ছুটতে ছুটতে দলটা এসে পৌঁছোল গুম্ফার একপ্রান্তে, একটা ধাতব দরজার সামনে।
“লোকটা সম্ভবত এই দরজার পিছনের গলিতেই আছে।” কর্নেল জিং বললেন। তারপর পাশে থাকা সহকারীর দিকে চোখের ইশারা করতেই, সে তালাটা লক্ষ করে গুলি চালাল।
ভাঙা তালা সরিয়ে, বুটের ধাক্কায় দরজা খুলে ফেলে, দলটা গলিতে প্রবেশ করল।
কর্নেল নিজের হাতের ইলেকট্রনিক ডিভাইসটার দিকে একঝলক চেয়ে বললেন, “লোকটা এই করিডর ধরে মনাস্ট্রির বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। রান বয়েজ়, উই হ্যাভ টু গেট হিম।”
সেনাপতির নির্দেশ পেতেই সৈনিকদের পুরো দলটা হাতের অস্ত্রগুলো বাগিয়ে ধরে দৌড়োতে আরম্ভ করল।
করিডরের শেষ প্রান্তে পৌঁছোতে ওদের খুব বেশি সময় লাগল না।
ওরা দেখল, একজন লামা ওখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, যেন ওদেরই প্রতীক্ষায়।
কর্নেল জিং আবার নিজের ডিভাইসে চোখ রাখলেন। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে খাসি-খারপ মনাস্ট্রির একটা ম্যাপ। আর তার ঠিক যে জায়গাটায় আলোর বিন্দুটা ব্লিংক করছে, এই লামা ঠিক ওইখানেই দাঁড়িয়ে আছেন।
“দ্যাট’স আওয়ার ম্যান।”
কর্নেল উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলেন, “গো, গেট হিম।”
দুজন কমান্ডো তাদের দলপতির আদেশপালনের জন্য লামার দিকে এগিয়ে গেল।
লামাকে কিন্তু একেবারেই বিচলিত মনে হল না। বরং ওঁর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একচিলতে হাসির আভাস।
কমান্ডো দুজন যখন লামার থেকে হাত পাঁচেক দূরত্বে পৌঁছোল, তখনই হঠাৎ যেন অদৃশ্য কিছুতে ধাক্কা খেয়ে মেঝেতে ছিটকে পড়ল।
দৃশ্যটা দেখে কর্নেল জিং চমকে উঠলেন।
এটা কীরকম হল!
লামা এবার একটা অট্টহাসি হেসে তিব্বতি ভাষায় বললেন, “দেবতারা স্বয়ং আমায় রক্ষা করছেন। আমায় তোমরা কিছুতেই ধরতে পারবে না। এখনও সময় আছে, ফিরে যাও। নয়তো তোমাদের একজনও এই গুম্ফা থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবে না।”
কর্নেল জিং-এর চেহারাটা রাগে লাল হয়ে উঠল।
“ওইসব বুজরুকি রাখো।” উনি সরোষে বলে উঠলেন, “তোমার আসল পরিচয় আমরা জেনে গিয়েছি, সিলভার ড্রাগন। ভালোয় ভালোয় আত্মসমর্পণ করে দাও। নয়তো…”
“নয়তো কী?”
লামা বিদ্রুপের সুরে বললেন, “এসো-না, ক্ষমতা থাকলে এসে ধরো আমায়।”
কর্নেল জিং-এর চেহারায় একটা অসহায় ভাব ফুটে উঠল।
উনি মেঝেতে পড়ে-থাকা কমান্ডো দুজনের অচেতন শরীরের দিকে দেখলেন। দলের অন্য কয়েকজন সৈনিক ইতিমধ্যেই ওই দুজনের জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু কর্নেলের অভিজ্ঞ দুটো চোখ ওঁকে বলছিল যে, ওই দুজনের জ্ঞান এত সহজে ফিরবে না।
ওদের শক লেগেছে, বৈদ্যুতিক শক।
এই লামা কোনো এক বিশেষ কায়দায়, নিজেকে ঘিরে একটা বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ওর কাছে যেতে গেলেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হতে হবে।
“কী হল? ভয় পেয়ে গেলেন নাকি?”
লামা আবার বিদ্রুপের সুরে বললেন।
“ভয় তো এবার তোমায় পেতে হবে, সিলভার ড্রাগন।”
কে বলল কথাটা!
কর্নেল জিং চমকে উঠে পেছন ফিরে দেখলেন, আপাদমস্তক সাদা পোশাক-পরা একজন দীর্ঘদেহী পুরুষ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছেন।
লোকটাকে দেখে লামা যেন প্রচণ্ড চমকে উঠলেন।
“এ কী!…. আপনি!… না না… এ হতে পারে না। আপনাকে তো আমি নিজের হাতে…”
“গুলি করেছিলেন। তা-ই না?”
লোকটা খলখল করে হেসে বলল, “কিন্তু এই গুম্ফায় বোধহয় সত্যিই জাদু আছে। তাই আমার মতো মরা মানুষও বেঁচে উঠেছে।”
কর্নেল জিং লক্ষ করলেন, লামার মুখ আতঙ্কে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে।
“স্টে… স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম মি!” খাঁটি মার্কিন অ্যাকসেন্টে লামা বলে উঠলেন।
কিন্তু লোকটি থামল না।
“এসো পেমবা দোরজি, আমার কাছে এসো। আমি যে তোমায় নিতে এসেছি।”
দু-হাত বাড়িয়ে পেমবার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে লোকটা অদ্ভুতস্বরে বলল।
পেমবা আর সহ্য করতে পারল না।
“পেমবা নই, আমি সিলভার ড্রাগন। আমাকে তুমি ধরতে পারবে না, কিছুতেই না!”
চিৎকার করে কথাটা বলেই সে নিজের পোশাকের ভিতর থেকে একটা রিভলভার বের করে আনল। এটা দিয়েই ও কিছুক্ষণ আগে অনির্বাণকে গুলি করেছিল।
কাজটা আরও একবার করার জন্য পেমবা প্রস্তুত হল।
অনির্বাণের সাদা পোশাক-পরা অবয়বটা আরেকটু কাছাকাছি আসতেই পেমবা রিভলভারটা তুলে ফায়ার করল।
পরমুহূর্তেই একটা কানফাটানো শব্দ আর তীব্র সাদা আলোর ঝলকানিতে পুরো জায়গাটা কেঁপে উঠল। আর সেই সঙ্গে সাদা ধোঁয়ায় সব কিছু ঢেকে গেল।
মিনিটখানেক পরে ধোঁয়ার প্রকোপ কিছুটা কমলে দেখা গেল যে, পেমবার অচেতন দেহটা মেঝেতে পড়ে রয়েছে।
আর অনির্বাণ হাঁটু গেড়ে ওর পাশে বসে নাড়ি পরীক্ষা করছে।
“বেঁচে আছে।”
অনির্বাণ কর্নেল জিং-এর দিকে তাকিয়ে বলল, “বাট হি নিডস মেডিক্যাল অ্যাটেনশন।”
কর্নেল মাথা নাড়লেন।
তারপর নিজের সহকারীর দিকে ফিরে বললেন, “ব্রিং ইন দ্য মেডিক্যাল টিম… ফাস্ট!”
১১
এক সপ্তাহ পরে, প্রাগ শহরে, এসআরআই-এর সদর দফতরে…
“ইউ রিয়েলি ডিড আ ওয়ান্ডারফুল জব, এজেন্ট Vaan।” প্রফেসার মে উচ্ছ্বসিত স্বরে বলছিলেন।
“আমি এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত।” প্রফেসার মে-র পাশের চেয়ারে বসা দীর্ঘাঙ্গী চিনা মহিলাটি বললেন।
ইনি চিনা ইনটেলিজেন্স সংস্থা এমএসএস-এর উপপ্রধান ম্যাডাম লিং ঝাও।
“কিন্তু Vaan, মাই বয়।”
ওসমান হায়দর সস্নেহে বললেন, “আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, আমেরিকা আর সিআইএ তোমাকে নিজেদের শত্রু বলে না ধরে নেয়।”
“কিন্তু তিব্বতের এই ব্যাপারটাতে যে আমেরিকা কিংবা সিআইএ ইনভল্ভড আছে, সেটা তো আমরা কেউই জানতাম না। কাজেই এজেন্ট Vaan যে জেনেশুনে আমেরিকার সঙ্গে সংঘাতে গিয়েছেন, এরকম তো নয়।” ম্যাডাম ঝাও বললেন।
ওসমান কিছু বললেন না।
ম্যাডাম লিন বাইরের লোক। ওঁর কাছে তো আর সব কথা প্রকাশ করা যায় না। কিন্তু ওসমান তো দীর্ঘদিন এসআরআই-তে আছেন। এজেন্ট Vaan-এর কার্যকলাপ সম্পর্কে উনি সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল।
গত বছর অতলান্তিক মহাসাগরের নিউম্যান’স আইল্যান্ডে, আমেরিকার সিক্রেট রিসার্চ ফেসিলিটিতে অনির্বাণ যে সফল অপারেশন চালিয়েছিল, তার কথা ওসমানের অজানা নয়। গুজব আছে যে, ওই অপারেশনের কারণে উদ্ভূত রাজনৈতিক ডামাডোলের জেরেই নাকি তৎকালীন ডিরেক্টর জেনারেল প্রফেসার পামারকে তড়িঘড়ি অবসর গ্রহণ করতে হয়েছিল।
তবে এবারের ব্যাপারটা অবশ্য সম্পূর্ণ আলাদা।
তিব্বতের তুষারাবৃত উপত্যকায় চালানো, এজেন্ট Vaan-এর এবারের অপারেশনের ফলে ফাঁস হয়ে গিয়েছে সিআইএ-র এক সাংঘাতিক ষড়যন্ত্রের কথা।
এই ষড়যন্ত্রের মাস্টারমাইন্ড হলেন ইভলিন ক্রাউজ, যিনি নিউম্যান’স আইল্যান্ডে মার্কিন ডিফেন্স রিসার্চ ফেসিলিটির অধিকর্তা ছিলেন। এজেন্ট Vaan-এর সঙ্গে টক্করে হেরে যাওয়ার পর থেকেই উনি প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছিলেন। নিজের সেই প্রতিশোধস্পৃহা পূর্ণ করার সুযোগ ওঁর কাছে হঠাৎ চলে আসে অভাবনীয়ভাবে। ইভলিন হলেন মার্কিন সেনার সমরাস্ত্র সংক্রান্ত গবেষণা সংস্থা DARPA-র কর্ণধার। এই সংস্থার বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি একটি অত্যাধুনিক স্পায়িং ডিভাইস তৈরি করতে সক্ষম হয়। তাদের মতে এরকম উন্নত যন্ত্র এই মুহূর্তে পৃথিবীর কোনো দেশের কাছে নেই।
যন্ত্রটির আকৃতি একটি মসৃণ ধাতব সিলিন্ডারের মতো। এর গায়ে কোনো দৃশ্যমান সুইচ অথবা পোর্ট নেই। ম্যাট ব্ল্যাক রঙের টাইটানিয়াম অ্যালয়ের খোলের ঠিক মাঝবরাবর রয়েছে একটি স্বচ্ছ, সরু রিং। এখান দিয়ে যন্ত্রের ভিতরের নীলাভ কোয়ান্টাম কোরকে স্পন্দিত হতে দেখা যায়। হঠাৎ দেখলে মনে হয়, যন্ত্রটি যেন শ্বাস নিচ্ছে। যন্ত্রের ভিতরে, কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট মেশ-এর পাশাপাশি রয়েছে ‘প্রমিথিউস’ নামক শক্তিশালী আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স সিস্টেম। এই উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে যন্ত্রটি তার ১০০ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে উপস্থিত সমস্ত ডিজিটাল সিস্টেমের ডেটা কপি করে নিতে পারে। এ ছাড়া প্রয়োজন হলে, যন্ত্রের ভিতরের বিশেষ অ্যালগোরিদ্ম সক্রিয় করে এর চারপাশে একটি শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করাও সম্ভব। ওই ক্ষেত্রটি, এই যন্ত্র এবং তার ধারককে শত্রুদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। পাশাপাশি ওই বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র একটি ইলেকট্রনিক জ্যামিং শিল্ড হিসেবেও কাজ করে, ফলে যন্ত্রটির অবস্থান নির্ণয় করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।
DARPA-র যে টিম এই যন্ত্রটা বানিয়েছিল, তারা এর নাম রেখেছিল Dragon eye, অর্থাৎ ড্রাগনের চোখ।
এই নাম থেকেই ইভলিনের মাথায় একটা পরিকল্পনা জন্ম নেয়। এই পরিকল্পনা ছিল যন্ত্রটি ব্যবহার করে এসআরআই-কে জব্দ করার, আর নিজের অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার।
ইভলিনের উদ্দেশ্য ছিল কোনোভাবে যন্ত্রটা এসআরআই-এর সদর দফতরে স্থাপন করার। তাহলে সেখানকার ডিজিটাল আর্কাইভের সমস্ত কনফিডেনশিয়াল ডেটা এই যন্ত্রের মাধ্যমে ওঁর হস্তগত হত। আজকের পৃথিবীতে ডেটা বা ইনফর্মেশনই হল আসল শক্তি। এসআরআই-এর কাছ থেকে চুরি করে পাওয়া এই শক্তি, ইভলিন ব্যবহার করতেন তাদেরই বিরুদ্ধে।
কিন্তু ইভলিন জানতেন যে, মার্কিন গভর্নমেন্ট কিছুতেই এই কাজের জন্য অনুমতি দেবে না। কারণ, এসআরআই-এর মতো রাষ্ট্রসংঘ নিয়ন্ত্রিত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার উপর এভাবে নজরদারি করাটা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
ইভলিন বুঝেছিলেন যে, ওঁকে ফাঁদ পাততে হবে। অর্থাৎ, এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে হবে, যাতে এসআরআই নিজে থেকেই যন্ত্রটা নিজেদের হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যায়।
ড্রাগনের চোখ পাচার করার ব্যাপারে ইভলিনের সেরা বাজি ছিল স্বয়ং ড্রাগন।
ইভলিন জানতেন যে, তিব্বতের এক মনাস্ট্রিতে সিআইএ-র একজন অ্যাসেট রয়েছে। লোকটা তিব্বতি লামার ভেক ধরে থাকলেও আসলে সে সিআইএ-র একজন আন্ডারকভার এজেন্ট। লোকটার সাংকেতিক নাম হল ‘সিলভার ড্রাগন’।
‘ড্রাগনের চোখ তো ড্রাগনের কাছে থাকাটাই মানানসই।’ ইভলিন মনে মনে বলেছিলেন।
ইভলিনের পরিকল্পনাটা সিআইএ-র কর্তাদেরও বেশ মনে ধরেছিল। আর তাদের তৎপরতায় ‘ড্রাগনের চোখ’ পৌঁছে গিয়েছিল তিব্বতের খাসি-খারপ মনাস্ট্রিতে, সিলভার ড্রাগনের জিন্মায়। ওই এলাকায় চিনাদের যে ক-টা সামরিক ও ইনটেলিজেন্স ঘাঁটি ছিল, পরবর্তী এক মাসে তাদের সব ক-টির কম্পিউটার সার্ভারে সঞ্চিত ক্লাসিফায়েড তথ্য, ড্রাগনের চোখের দৌলতে সিআইএ-র হস্তগত হয়।
তবে চিনারাও এইসব ব্যাপারে কম যায় না।
ওদের কাছেও নানারকম উন্নত যন্ত্রপাতি রয়েছে। সেগুলোর সাহায্যে ওরা ড্রাগনের চোখ-এর অস্তিত্ব টের পেয়ে যায়। জিনিসটার প্রিসাইজ় লোকেশন ট্রেস করতে না পারলেও, সেটা যে দাওয়া লুং উপত্যকার কোনো মনাস্ট্রিতে লুকোনো আছে, তা বুঝতে ওদের দেরি হয় না। ফলে ওই অঞ্চলের সব ক-টি গুম্ফাতেই চিনা সৈনিকেরা নিয়মিত হানা দিতে থাকে।
এটা যে হবে, সেটা অবশ্য ইভলিন আগেই অনুমান করেছিলেন। সিআইএ কর্তারা যন্ত্রটা সরাবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠতেই ইভলিন ওঁদেরকে নিজের পরিকল্পনার কথা জানান। উপায়ান্তর না দেখে ওঁরা ইভলিনের পরিকল্পনায় শামিল হন। এসআরআই ডিরেক্টর জেনারেলের কাছে লামা পেমবা দোরজি ওরফে সিলভার ড্রাগন-এর পাঠানো ইমেইল ছিল এই পরিকল্পনারই অংশ। ইভলিন জানতেন যে, এসআরআই এই বিষয়ে খোঁজখবর করলেই খাসি-খারপ গুম্ফার সঙ্গে জড়িত প্রাচীন কিংবদন্তির কথা জানতে পারবে। পেমবার ইমেইলের পরিপ্রেক্ষিতে, এসআরআই ওই গুম্ফায় একটি এলিয়েন ডিভাইসের অস্তিত্ব অনুমান করে সচকিত হয়ে উঠবে। আর জিনিসটা উদ্ধার করে নিয়ে আসার জন্য ঠিক কাউকে পাঠাবে।
অন্য কেউ হলে, হয়তো সে পেমবার দেওয়া ওই ধাতব সিলিন্ডারটাকে সত্যিকারের কোনো এলিয়েন আর্টিফ্যাক্ট মনে করে, প্রাগ শহরে, এসআরআই হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যেত।
কিন্তু ইভলিনের দুর্ভাগ্য, এই কাজের জন্য এসআরআই যাকে নিযুক্ত করেছিল, সে হল ওই সংস্থার দক্ষতম ফিল্ড অপারেটিভ, এজেন্ট Vaan, অর্থাৎ অনির্বাণ!
তিব্বতের মিশনে যাওয়ার আগে অনির্বাণ ডিরেক্টর জেনারেল ওসমান হায়দরকে বলেছিল, তিব্বতের বিষয়ে গ্লোবাল ইনটেলিজেন্স কমিউনিটিতে কোনো রিসেন্ট আপডেট আছে কি না খোঁজ নিতে।
ওসমান অনির্বাণের অনুরোধে সাড়া দিয়ে সংস্থার ডিজিটাল সারভেইলেন্স টিমকে নির্দেশ দেন ওই বিষয়ে খোঁজখবর করার জন্য। আর সেটা করতে গিয়েই ওই টিমের সিনিয়র মেম্বার তাতিয়ানা রোমানোভার হাতে আসে কিছু ক্লাসিফায়েড এনক্রিপ্টেড ডেটা। বহু পরিশ্রমে ওই ডেটা ডিকোড করে তাতিয়ানা চমকে ওঠেন।
তিব্বতের খাসি-খারপ গুম্ফার প্রধান লামা লোবসাং নামগিয়াল ওরফে পেমবা দোরজিই হল সিআইএ আন্ডারকভার এজেন্ট সিলভার ড্রাগন।
আর এই মুহূর্তে তার জিম্মায় রয়েছে একটি শক্তিশালী স্পায়িং ডিভাইস। চাইনিজ় ইনটেলিজেন্স ওই জিনিসটা পাগলের মতো খুঁজে চলেছে।
তথ্যটির যথার্থতা নিয়ে তাতিয়ানার কোনো সন্দেহ ছিল না।
কারণ, যেখান থেকে সে এই তথ্য পেয়েছিল, সেটা ছিল একটা এনক্রিপ্টেড ইমেইল। ভার্জিনিয়াতে সিআইএ ডিরেক্টরকে ওই ইমেইল পাঠিয়েছিল সংস্থার চাইনিজ় নেটওয়ার্কের মাথা।
ব্যাপারটা জানামাত্রই তাতিয়ানা সেটা জানায় ওসমানকে।
তারপর ডিরেক্টর জেনারেলের অফিস থেকে প্রফেসার মে-র মাধ্যমে খবরটা বিদ্যুদ্বেগে পৌঁছে যায় অনির্বাণের কানে।
এরপর দুইয়ে দুইয়ে চার করতে ওর আর অসুবিধা হয়নি।
১২
“বাট টেল মি এজেন্ট Vaan।”
এমএসএস-এর ডেপুটি চিফ ম্যাডাম ঝাও বললেন, “লোকটা তো আপনার উপর পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে ফায়ার করেছিল। হাউ ডিড ইউ সারভাইভ?”
“এর কৃতিত্ব সম্পূর্ণভাবেই আমাদের আর অ্যান্ড ডি ডিপার্টমেন্টের সায়েন্টিস্টদের।” অনির্বাণ বলল, “ওঁদের তৈরি স্টেল্থ সুটের বুলেটপ্রুফ মোডই সংকটের চরম মুহূর্তে আমাকে রক্ষা করেছিল। তবে বুলেট আমার শরীর ভেদ করতে না পারলেও তার অভিঘাতে আমি ধরাশায়ী হয়েছিলাম। আর তাই লোকটা ভেবেছিল যে, আমি মরে গিয়েছি।”
“তারপর?” ম্যাডাম ঝাও কৌতূহলী স্বরে প্রশ্ন করলেন।
“বাকিটা তো আপনি জানেনই। হেডকোয়ার্টার থেকে আপনাদের, অর্থাৎ এমএসএস-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে এসআরআই এবং এমএসএস এই ক্ষেত্রে একযোগে কাজ করতে সহমত হয়।
“তারই ফলশ্রুতিতে গ্রাউন্ড লেভেলে কর্নেল জিং-এর টিমের সঙ্গে আমার কনট্যাক্ট এসটাবলিশড হয়। পেমবা দোরজির পোশাকে আমি গোপনে একটা মাইক্রোট্র্যাকার লাগিয়ে দিতে পেরেছিলাম। সেটার ফিড কর্নেল জিং-এর সঙ্গে শেয়ার করতেই উনি তার সাহায্যে পেমবাকে লোকেট করে ফেলেন। অ্যান্ড দেন হি ওয়াজ় হান্টেড ডাউন কোয়াইট ইজ়িলি।”
“কিন্তু কর্নেল জিং তো বলেছেন যে, লোকটা নিজের চারপাশে একটা বৈদ্যুতিক সুরক্ষাবলয় তৈরি করেছিল। আপনার বুদ্ধিতেই নাকি ওই ইলেকট্রিক শিল্ড ক্র্যাক করা সম্ভব হয়।” ম্যাডাম ঝাও বললেন।
অনির্বাণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আসলে একজন মানুষ যত আধুনিকই হোক-না কেন, তার ভিতরে অন্ধবিশ্বাস কিছুটা হলেও থেকেই যায়। পেমবা বা সিলভার ড্রাগনও এর ব্যতিক্রম ছিল না। আমি সেটাকেই কাজে লাগিয়েছি মাত্র। আর আমায় সাহায্য করেছে তিব্বতি গুম্ফার আলো-আঁধারি পরিবেশ। আসলে আমায় গুলি করার পরে পেমবা ধরেই নিয়েছিল যে, আমি মরে গিয়েছি। তাই আমায় হঠাৎ আবির্ভূত হতে দেখে ও ভেবেছিল যে, আমি বোধহয় প্রেতাত্মা হয়ে ওর উপর প্রতিশোধ নিতে এসেছি। আমিও ইচ্ছে করেই এমনভাবে কথাবার্তা বলেছিলাম ও আচরণ করেছিলাম, যাতে ওর সেই বিশ্বাসটা পোক্ত হয়।
“ফলে উত্তেজনার বশে, আগুপিছু না ভেবেই ও আমায় লক্ষ করে গুলি চালায়। এর ফল হয় মারাত্মক। অবশ্য ঠিক এটাই আমি চেয়েছিলাম।
“শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের মধ্যে দিয়ে বুলেটটি পাস করার সময় তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে। তার অভিঘাতেই পেমবা জ্ঞান হারায় আর ওর যন্ত্রটাও সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়ে।
“যন্ত্রটা আমরা আবার চালু করতে পেরেছি।”
ম্যাডাম ঝাও বললেন, “কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ড্রাগনকে নিয়ে। বিস্ফোরণের ফলে লোকটার স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে।”
“সে কী!” অনির্বাণ চমকে উঠল, “আপনি এই ব্যাপারে নিশ্চিত? লোকটা অভিনয় করছে না তো?”
“ওঃ নো এজেন্ট Vaan।” ম্যাডাম ঝাও বললেন, “আমরা চায়নার সেরা নিউরোলজিস্টদের দিয়ে ওকে পরীক্ষা করিয়েছি। আর ওঁরা সকলেই একমত যে এটা সত্যিই মেমোরি লসের কেস।”
“আর ড্রাগনের চোখ?” ওসমান হায়দর কৌতূহলী স্বরে বললেন, “ওটার কী হল?”
“আপাতত ওটা আমাদের বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখছেন।”
কথাটা শুনে অনির্বাণ অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল।
চিনা বিজ্ঞানীরা নির্ঘাত ওই যন্ত্রটার টেকনোলজির রহস্য ভেদ করতে চাইছে। ওরা সফল হলে, চিন ভবিষ্যতে নিজেই ওরকম একটা যন্ত্র বানাবে।
অনির্বাণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
এবারের মতো চিনের সাহায্য নিয়ে আমেরিকার ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়া গেল ঠিকই, কিন্তু সমস্যাটা রয়েই গেল।
চিন যে ভবিষ্যতে ওই যন্ত্র এসআরআই-এর বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়?
আর তা ছাড়া…
এসআরআই-এর মতো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার এজেন্ট হলেও, দিনের শেষে অনির্বাণ তো একজন ভারতীয় নাগরিকই।
তাই চিনের হাতে ওরকম একটি অ্যাডভান্সড স্পায়িং ডিভাইসের উপস্থিতি, ভারতীয় হিসেবে যে তাকে চিন্তায় ফেলবে, সেটা বলাই বাহুল্য।
অনির্বাণ নিজের কর্তব্য স্থির করে ফেলল।
চিনা বিজ্ঞানীরা ড্রাগনের চোখের রহস্য ভেদ করার আগেই ওটার ব্যবস্থা করতে হবে।
অনির্বাণ বুঝল, ওকে আবার ছুটির দরখাস্ত করতে হবে।
কারণ, পরবর্তী অপারেশনটা ওকে চালাতে হবে এসআরআই এজেন্ট হিসেবে নয়, বরং একজন ভারতীয় ফ্রি এজেন্ট হিসেবে।
তবে এক্ষেত্রে ভারতীয় ইনটেলিজেন্সের সাহায্য ও পাবে বলেই ওর বিশ্বাস।
* * *
“উই হ্যাভ আ সিরিয়াস অ্যাসাইনমেন্ট ফর ইউ, সোনাম।”
দিল্লির সাউথ ব্লকের সুরক্ষিত কনফারেন্স রুমে বসে মেজর অর্জুন বর্মা কথা বলছিলেন।
ওঁর সামনে টেবিলের উপর রাখা একটা নীল ফোল্ডার। তার উপর লাল কালি দিয়ে লেখা—CLASSIFIED.
“স্যার?”
টেবিলের উলটোদিকে বসা তরুণীটি তার বসের কথায় যেন একটু চমকে উঠল।
মেয়েটির নাম সোনাম লেপচা। সে ডিফেন্স ইনটেলিজেন্স উইং-এর একজন জুনিয়র কমব্যাট এজেন্ট।
মেজর বর্মা ফোল্ডারটা ওর দিকে এগিয়ে দিলেন।
“একজন শিকারি আমাদের জন্য শিকার করতে যাবে। তোমার কাজ হবে ওকে সাহায্য করা। ডিটেইলস এই ফোল্ডারে পেয়ে যাবে।”
সোনাম ধীরে ধীরে ফোল্ডার খুলল।
ভিতরে প্রথম ডকুমেন্টটির শীর্ষে মোটা কালো অক্ষরে লেখা—
OPERATION DRAGON EYE
তার নীচে আরেকটি লাইন—
Field Asset: Codename—Vaan
সোনামের চোখ দ্বিতীয় লাইনটার উপর আটকে গেল…
Tags: একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা, স্বর্ণদীপ রায়
