জোয়ারের স্মৃতি
লেখক: অরিৎ চক্রবর্তী
শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব
অধ্যায় ১: আলোর ভাষা
রাত্রি যখন প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরগুলোকে ধীরে ধীরে গিলে ফেলছিল, তখন অদিতি রায়চৌধুরীর ল্যাবে একমাত্র আলোর উৎস ছিল তার মাইক্রোস্কোপের নীলাভ ‘এলইডি’ এবং একটি কাচের ‘বিকার’-এ আটকে-রাখা কয়েক লক্ষ ক্ষুদ্র প্রাণীর নিজস্ব দীপ্তি। ‘ডাইনোফ্ল্যাজেলেট’—এককোশী সামুদ্রিক শৈবাল, যারা স্পর্শ পেলেই জ্বলে ওঠে। প্রকৃতির নিজস্ব আলোকসজ্জা। জীবনের স্বয়ংক্রিয় প্রতিবাদ অন্ধকারের বিরুদ্ধে।
অদিতি আবার ‘বিকার’টিতে আলতো করে নাড়া দিল। তৎক্ষণাৎ জলে একটা নীল-সবুজ ঝলকানি ছড়িয়ে পড়ল, যেন কোনো অদৃশ্য শিল্পীর তুলিতে আঁকা আলোর বুনোট। কিন্তু এই আলো শুধু দেখার জিনিস ছিল না তার কাছে—সিনেস্থেশিয়ার কারণে প্রতিটি ঝলকানি তার কানে একটা মৃদু, সুরেলা গুঞ্জন হয়ে বাজত। অন্যরা যেখানে শুধু রং দ্যাখে, সেখানে সে শোনে সুর। পৃথিবী তার কাছে একটা জটিল, বহুস্তরীয় সিম্ফনি—এবং এই মুহূর্তে, এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলো গাইছিল এমন একটা সুর, যা তার বুকের ভিতর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।
সমস্যা হল, এই গান সবাই শুনতে পায় না। গত তিন সপ্তাহ ধরে সে একই পরীক্ষা করে যাচ্ছিল। প্রতিটি স্পর্শে, প্রতিটি উদ্দীপনায়, ‘ডাইনোফ্ল্যাজেলেট’রা একই ধরনের ছন্দময় সাড়া দিচ্ছিল। প্রথমে সে ভেবেছিল এটা তার নিজের মনের ভুল, তার সিনেস্থেশিয়া হয়তো এমন একটা ‘প্যাটার্ন’ আরোপ করছে, যেটা বাস্তবে নেই। কিন্তু তারপর সে ‘স্পেক্ট্রোমিটার’-এ আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য মেপেছিল, ‘কম্পিউটার’ দিয়ে বিশ্লেষণ করেছিল—আর দেখেছিল যে, তার কানে যে ছন্দ বাজছে, সেটা শুধুই তার মস্তিষ্কের খেয়াল নয়। এটা সত্যি। এই আলোর মধ্যে একটা স্ট্রাকচার আছে। এটা একটা ভাষা।
কিন্তু কার ভাষা? সে পিছন ফিরে তাকাল তার ডেস্কের দিকে, যেখানে তিন বছর আগের একটা ছবি রাখা ছিল রুপোলি ফ্রেমে বাঁধানো। মা এবং সে, গঙ্গাসাগরের মেলায়। মা হাসছিল, হাওয়ায় চুল এলোমেলো হয়ে গেছে, একটা হাত অদিতির কাঁধে। পরের মাসেই সুন্দরবনের কোনো এক খাঁড়িতে তাদের নৌকা উলটে গিয়েছিল। মা-কে তারপর খুঁজে পাওয়া যায়নি। শুধু তার হলুদ শাড়ির একটা ছেঁড়া টুকরো পাওয়া গিয়েছিল, কাদায় জড়ানো, জলে ভিজে।
অদিতি চোখ বুজল। ফের সেই স্মৃতি—মায়ের শেষ কথা, ফোনে: “অদি, আমি বনবিবিকে প্রণাম করে যাচ্ছি। তুই জানিস তো, এই বনে ঢোকার আগে প্রণাম না করলে ফিরতে পারব না।” তারপর হাসি। তারপর নীরবতা। তারপর কখনও আর কোনো ফোন আসে না।
ফোনটা টেবিলে কাঁপল। বিরক্ত হয়ে সে তুলল, ভাবল কোনো স্প্যাম। কিন্তু ‘স্ক্রিন’-এ দেখল একটা অপরিচিত ইমেইল ঠিকানা: **joyanta.nati@gmail.com**। বিষয়: **“আপনার মা এখনও কথা বলেন।”**
তার হাত কেঁপে উঠল। একটা মুহূর্তের জন্য সে ইমেইলটা মুছে ডিলিট করতে যাচ্ছিল—এসব ভণ্ড, এসব প্রতারক—কিন্তু কৌতূহল তাকে টেনে রাখল। সে ক্লিক করল।
**প্রিয় ডক্টর রায়চৌধুরী,**
**আমার নাম জয়ন্ত মণ্ডল। আমি সুন্দরবনের সাতজেলিয়া এলাকায় মৌলে হিসেবে কাজ করি। আমার নাতনি আপনার নাম আমাকে দিয়েছে। সে বলেছে, আপনি আলো নিয়ে গবেষণা করেন। আলো, যারা নিজে থেকেই জ্বলে। আমার কথা পাগলের মতো শোনাবে, কিন্তু আমাকে বিশ্বাস করুন—আলেয়ারা কথা বলে। এবং আপনার মা মীরা রায়চৌধুরী, তিনি এখনও এখানে আছেন। জলে, আলোয় মিশে। আমরা প্রতি অমাবস্যায় তাদের শুনি।**
**আপনি যদি আসতে চান, আসুন। পরের অমাবস্যা দশ দিন পরে। সেটাই সব চেয়ে ভালো সময়। আলেয়ারা তখন সব চেয়ে জোরে কথা বলে।**
**—জয়ন্ত মণ্ডল**
*সংযুক্তি: ১টি ভিডিয়ো ফাইল*
অদিতির মাথা ঝিমঝিম করছিল। এটা নিশ্চয়ই কোনো স্ক্যাম, কোনো ইমোশনালি ম্যানিপুলেটিভ ফাঁদ। কিন্তু… ভিডিয়োটা? সে ডাউনলোড করল।
ফুটেজটা রাত্রিবেলার, কোনো জলাভূমির ধারে, ম্যানগ্রোভের কালো ছায়ায় ঢাকা। ক্যামেরা কাঁপছিল, যেন কেউ হাতে ধরে রেকর্ড করছে। তারপর—দূরে, জলের উপর—একটা নীল-সবুজ আলো দেখা গেল। প্রথমে মনে হল স্রেফ একটা আলোর ঝলকানি, কিন্তু তারপর সেটা নড়ল। ধীরে ধীরে, ছন্দময়ভাবে, যেন নাচছে। তারপর আরও আলো জ্বলল। দশটা। বিশটা। শতাধিক ক্ষুদ্র আলোর বিন্দু, জলের উপর ভাসমান, একসঙ্গে একটা প্যাটার্ন তৈরি করছে।
এবং সেই প্যাটার্ন…
অদিতির নিশ্বাস আটকে গেল। তার সিনেস্থেশিয়া সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিল—সে শুনতে পেল একটা মৃদু, গুনগুন শব্দ, একটা সুর, যা… যেটা তার ল্যাবের ‘ডাইনোফ্ল্যাজেলেট’রা তৈরি করছিল প্রায় একই রকম।
না। ঠিক একই রকম। ভিডিয়োটা থামল। অদিতি বসে রইল, তার হৃৎস্পন্দন কানে বাজছে। এটা কোইনসিডেন্স হতে পারে। এটা কোনো এডিটেড ভিডিয়ো হতে পারে। এটা—
“এখনও সেই ডাইনোফ্ল্যাজেলেট নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিস?”
অদিতি চমকে তাকাল। দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল ড. সায়ন ঘোষ, তার প্রাক্তন প্রেমিক এবং বর্তমান সহকর্মী। চওড়া কাঁধ, ক্লান্ত চোখ, হাতে একটা কফির মগ। তিন বছর আগে তাদের সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছিল—সায়ন বলেছিল, অদিতি তার কেরিয়ারের চেয়ে মায়ের হারিয়ে যাওয়াকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে, দুঃখ তাকে একটা অন্য মানুষ বানিয়ে ফেলছে। সম্ভবত সে ঠিকই বলেছিল। কিন্তু এখন তারা শুধুই কলিগস—ভদ্রভাবে, দূরত্ব রেখে, পুরোনো ক্ষতের উপর নতুন ব্যান্ডেজ লাগিয়ে একে অপরের সঙ্গে কথা বলে।
“এটা দেখ।” অদিতি ফোনটা তার দিকে এগিয়ে দিল।
সায়ন ভিডিয়োটা দেখল, তারপর হাসল। “আলেয়া? সিরিয়াসলি? তুই জানিস এগুলো মার্শ গ্যাস ছাড়া আর কিছু না। ‘মিথেন’। জলে পচা উদ্ভিদ থেকে তৈরি হয়, জ্বলে ওঠে।”
“এটা ‘মিথেন’ নয়,” অদিতি শান্তভাবে বলল, “মিথেন এভাবে সিনক্রোনাইজ়ড প্যাটার্ন তৈরি করে না। দেখছিস এই রিদ্ম? এটা—”
“এটা তোর মা নন।” সায়ন কথা কাটল, কিন্তু তার গলায় কঠোরতা ছিল না, বরং ক্লান্তি। “অদিতি, please। তুই এখনও—”
“আমি জানি,” সে বাধা দিল, “আমি জানি মা নেই। আমি কোনো ghost hunter নই, সায়ন। কিন্তু এই আলো… দেখ, আমি এক মাস ধরে এই ডাইনোফ্ল্যাজেলেটদের স্টাডি করছি। তারা একটা প্যাটার্ন অনুসরণ করছে। আর এই ভিডিয়োতে—”
“তোর synesthesia একটা pattern খুঁজছে, যেটা নেই,” সায়ন আস্তে বলল, “তোর মস্তিষ্ক খুঁজছে—”
“আমার মস্তিষ্ক ঠিক আছে।” অদিতি ধৈর্যের সঙ্গে বলল, “তুই কি আমার spectral analysis দেখেছিস? আমি তোকে data দেখিয়েছি। এটা random bioluminescence নয়। এখানে coherence আছে। এবং যদি সুন্দরবনের এই আলেয়া একই ধরনের organism হয়—”
“তাহলে কী?” সায়ন মগ টেবিলে রাখল। “তুই যাবি? কোনো superstitious fisherman-এর ডাকে সুন্দরবনে?”
অদিতি চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “তুই যদি আমাকে বলতিস দু-মাস আগে যে, আমি এরকম কোনো ইমেইলে সাড়া দেব, আমি হাসতাম। কিন্তু… সায়ন, আমি ঠিক জানি না, কী আশা করছি। হয়তো কিছুই না। হয়তো শুধু একটা confirmation যে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি না। কিন্তু যদি—শুধু যদি—এই জীবগুলো সত্যিই কোনো collective intelligence দেখাচ্ছে, তাহলে এটা—”
“Groundbreaking।” সায়ন স্বীকার করল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “দেখ, আমি actually একটা গ্র্যান্ট পেয়েছি।”
অদিতি তাকাল।
“Coastal bioluminescent organisms নিয়ে।” সে বলল, “আমি তোকে বলিনি, কারণ… ভেবেছিলাম, তুই interested হবি না। কিন্তু যদি তুই যেতে চাস, আমরা এটাকে একটা field study বানাতে পারি। প্রপার ইকুইপমেন্ট নিয়ে। Proper scientific protocol।”
অদিতি তার দিকে সন্দেহের চোখে তাকাল। “তোর হঠাৎ এত উৎসাহ কেন?”
সায়ন হাসল, “karony তুই যে-কোনোভাবে যাবি। আর আমি চাই না, তুই একা যাস। ওই জায়গা—” সে থামল। “সুন্দরবন safe না, অদিতি। এমনিতেও না। আর যদি তুই emotional state-এ থাকিস—”
“আমি ঠিক আছি।” সে শক্ত হয়ে বলল।
“Okay,” সায়ন হাত তুলল, “তাহলে আমরা যাব। Properly, Scientifically। আর তারপর তুই নিজের চোখে দেখবি যে এগুলো শুধুই algae। এবং তোর মা—” তার গলা নরম হল—“তিনি শান্তিতে আছেন। এই আলোগুলোতে না।”
অদিতি মাথা নাড়ল, কিন্তু তার বুকের ভিতরে একটা অদ্ভুত, উষ্ণ অনুভূতি ছড়াচ্ছিল। আশা? ভয়? নাকি শুধুই ডেসপারেট লংগিং?
সে আবার ‘বিকার’টার দিকে তাকাল। ক্ষুদ্র প্রাণীগুলো এখন শান্ত, তাদের আলো নিবে গেছে। কিন্তু তার কানে যেন আরেকটা মাত্রা থেকে ভেসে আসছে, সে শুনতে পেল একটা মৃদু, ক্ষীণ সুর।
মায়ের গলা, নাকি শুধুই তার মনের খেয়াল? দশ দিন। অমাবস্যা। তখনই সে জানবে। তখনই সে হয়তো… হয়তো শুনবে।
আর যদি সত্যিই শোনে—তাহলে কী? মৃত্যুর পরেও যদি কনশাসনেস থেকে যায়, প্যাটার্ন হয়ে, আলো হয়ে, তাহলে জীবন এবং মৃত্যুর মধ্যে বাউন্ডারিটা কোথায়?
সে জানত না। কিন্তু সে খুঁজে বের করবে।
বাইরে রাত গভীর হচ্ছিল। শহরের আলোরা দূরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। আর কোথাও, সুন্দরবনের অন্ধকার জলে, হাজারো ক্ষুদ্র প্রাণী জ্বলছিল, নিবছিল, নাচছিল—কথা বলছিল একটা ভাষায়, যা কেউ বুঝতে পারে না, কিন্তু সবাই অনুভব করে।
জোয়ারের ভাষা। স্মৃতির ভাষা। আলোর ভাষা।
অধ্যায় ২: বনবিবির দেশ
নৌকাটা যখন সরু খাঁড়ির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন অদিতি প্রথমবারের মতো বুঝল সুন্দরবন আসলে কোনো জায়গা নয়—এটা একটা অবস্থা। জল এবং ভূমির মধ্যবর্তী এক ধূসর অস্তিত্ব, যেখানে কঠিন মাটি বলে কিছু নেই, শুধু আছে প্রতিশ্রুতির অভাব। ম্যানগ্রোভের শেকড়গুলো জলের ভিতর থেকে উঠে এসেছে অদ্ভুত, বাঁকানো হাতের মতো, যেন কোনো ডুবন্ত সভ্যতার শেষ মুঠি আকাশের দিকে প্রসারিত। আকাশ এবং জল এক রঙের—ধূসর-সবুজ, অনিশ্চিত, প্রতিটি দিক একই রকম দেখাচ্ছে, যেন কোনোদিকেই পালানোর রাস্তা নেই।
কলকাতা থেকে যাত্রা শুরু করার সময় সকাল ছিল উজ্জ্বল, রোদে ঝলমলে। কিন্তু যত তারা দক্ষিণে এগোচ্ছিল, আকাশ তত ঘন হয়ে আসছিল, যেন বনের নিজস্ব একটা আবহাওয়া আছে, যা বাইরের পৃথিবীকে মানতে অস্বীকার করে। গোসাবা ঘাট পেরিয়ে, মাতলা নদী ধরে, তারপর আরও ভিতরে—যেখানে নদী হয়ে যায় খাঁড়ি, খাঁড়ি হয়ে যায় জলপথ, আর জলপথ হারিয়ে যায় গহিন সবুজের ভিতর।
অদিতি নৌকার পাটাতনে বসে তার চারপাশ দেখছিল। পাশে নীলাঞ্জনা দাশগুপ্ত, তার ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকার বন্ধু, একটা কমপ্যাক্ট ‘ক্যামেরা’ দিয়ে ফুটেজ নিচ্ছিল। নীলাঞ্জনা তার সঙ্গে আসতে চেয়েছিল, যখন শুনেছিল গল্পটা—না শুধু পেশাগত কৌতূহলের জন্য, বরং কিছুটা ব্যক্তিগত কারণেও। দুই বছর আগে নীলাঞ্জনার ভাই একটা পাহাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল। সে-ও খুঁজছিল কিছু—একটা উত্তর, একটা সমাপ্তি, একটা ক্লোজ়ার, যা কখনো আসে না, কিন্তু মানুষ তবুও খোঁজে।
সায়ন নৌকার সামনে বসে তার ল্যাপটপে কিছু একটা দেখছিল, মাঝে মাঝে মাথা নেড়ে, কপালে ভাঁজ ফেলে। গত তিন দিন ধরে সে একটু অন্যমনস্ক ছিল। ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছিল, যখন ভাবছিল, অদিতি শুনছে না। “হ্যাঁ, আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি। আমি স্যাম্পল সংগ্রহ করব। না, সে কিছু জানে না।” কার সঙ্গে? কোনো স্যাম্পল? অদিতি জিজ্ঞেস করতে চায়নি। কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলো করলে উত্তর পাওয়া যায়, কিন্তু হয়তো সে সেই উত্তরের জন্য প্রস্তুত নয়। নৌকার পিছনে বসে মাঝি—একজন বৃদ্ধ মানুষ, চামড়া রোদে পোড়া, চোখ সরু এবং পর্যবেক্ষণশীল। সে বেশি কথা বলেনি, শুধু প্রথমে বলেছিল, “আপনারা জয়ন্তদার কাছে যাচ্ছেন? উনি ভালো মানুষ। বনবিবি ওঁর দিকে তাকিয়ে আছেন।” তারপর আর কিছু না, শুধু দাঁড় বেয়ে চলেছে—নীরব, যেন নৌকাটা নিজে থেকেই চলছে, তার হাত শুধু একটা আনুষ্ঠানিকতা।
জল ছিল অদ্ভুত রঙের—কোথাও সবুজ, কোথাও বাদামি, কোথাও প্রায় কালো। ম্যানগ্রোভের শেকড়ের নীচ থেকে কাদা উঠে আসছিল, আর তার সঙ্গে একটা গন্ধ—লবণ, পচা পাতা, মাছ এবং কিছু একটা, যা নাম দেওয়া যায় না, শুধু বলা যায় ‘বনের গন্ধ’। একটা প্রাচীন, জৈব গন্ধ, যা মনে করিয়ে দেয় যে, এই জায়গা মানুষের অনেক আগে থেকে ছিল এবং মানুষের পরেও থাকবে।
একটা বক উড়ে গেল মাথার উপর দিয়ে, ডানা ঝাপটাচ্ছে, কিন্তু কোনো শব্দ নেই। এমনকি পাখিরাও এখানে চুপচাপ, যেন কথা বলা নিষিদ্ধ।
“ওটা কী?” নীলাঞ্জনা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ক্যামেরা দিয়ে দূরের একটা জিনিস দেখতে দেখতে।
অদিতি তাকাল। জলের উপর, একটা ভাসমান গাছের গুঁড়ির উপর, দেখা যাচ্ছিল একটা কুমির—অথবা হয়তো কাঠের টুকরো। এখানে সব কিছুই প্রতারক। যা জড় মনে হয়, সে জীবন্ত। যা জীবন্ত মনে হয়, সে হয়তো মৃত অনেকদিন।
“কুমির।” মাঝি শান্তভাবে বলল, “চিন্তা নেই, ওরা এখন নড়বে না। জোয়ার আসেনি।”
“জোয়ার?” অদিতি জিজ্ঞেস করল।
মাঝি মাথা নাড়ল, “এখানে সব জোয়ারের উপর নির্ভর করে। জোয়ার এলে জীবন আসে। ভাটা পড়লে মৃত্যু আসে। আর যখন জোয়ার এবং ভাটা ঠিক মাঝখানে থাকে…” সে থামল, একটা অদ্ভুত হাসি তার মুখে, “তখন তারা জাগে।”
“কারা?” সায়ন পিছন থেকে জিজ্ঞেস করল। মাঝি উত্তর দিল না। শুধু দাঁড় বেয়ে চলল।
***
সাতজেলিয়া পৌঁছোল সন্ধ্যার কিছু আগে। একটা ছোটো গ্রাম, মাটির ঘর, টিনের চাল, কিছু দোকান, যেখানে মাছ এবং চাল বিক্রি হয়। মানুষ তাদের দেখল—অপরিচিত মুখ, শহুরে কাপড়, দামি যন্ত্রপাতি—এবং তাকিয়ে রইল, কিন্তু কেউ কিছু বলল না। এখানে নীরবতা একটা সংস্কৃতি।
জয়ন্ত মণ্ডলের বাড়ি ছিল গ্রামের একদম শেষে, নদীর ধারে। একটা বড়ো বট গাছের নীচে একটা ছোটো মন্দির—বনবিবির। মন্দিরের সামনে একজন বৃদ্ধ মানুষ বসে ছিলেন, একটা মাদুরে, একটা মাটির প্রদীপে সলতে জ্বালাচ্ছেন। পঞ্চাশের বেশি বয়স হবে না, কিন্তু চেহারা দেখে মনে হয় সত্তর। বনের মানুষরা দ্রুত বুড়ো হয়—এই জায়গা জীবন কেড়ে নেয়, এবং খুব দ্রুত নেয়।
“আপনিই ডক্টর রায়চৌধুরী?” জয়ন্ত উঠে দাঁড়ালেন হাত জোড় করে। কণ্ঠস্বর নরম, কিন্তু ভারী। এমন কণ্ঠস্বর, যা অনেক কিছু বলেছে এবং আরও অনেক কিছু বলেনি।
“হ্যাঁ,” অদিতি বলল, “এবং এরা আমার সহকর্মী—ড. ঘোষ এবং নীলাঞ্জনা।”
জয়ন্ত মাথা নাড়লেন, “আসুন। আমি জানতাম, আপনি আসবেন। আলেয়া আমাকে বলেছে।”
অদিতির মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। আলেয়া তাকে বলেছে?
সায়ন একটা সন্দেহের দৃষ্টি ছুড়ে দিল, কিন্তু কিছু বলল না। তারা ভিতরে ঢুকল।
ঘরটা ছোটো কিন্তু পরিষ্কার। একদিকে একটা ছবি—একজন মহিলা হাসছেন, হাতে মাছ ধরার জাল। জয়ন্তর স্ত্রী নিশ্চয়ই।
“চা?” জয়ন্ত জিজ্ঞেস করলেন।
তারা চুপ করে বসল। কিছুক্ষণ পর একটা কিশোরী মেয়ে চা নিয়ে এল—জয়ন্তর নাতনি নিশ্চয়ই। সে কিছু বলল না, শুধু কাপ রেখে চলে গেল, তার চোখ অদিতির উপর একটু বেশি সময় থেমে রইল।
“আমি জানি, আপনি কী ভাবছেন।” জয়ন্ত শান্তভাবে বলতে শুরু করলেন, “আমি একজন পাগল বুড়ো, যে ভূত দেখি। হয়তো আপনার টাকা নেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু দেখুন—” তিনি তাঁর ছবির দিকে ইশারা করলেন, “আমার স্ত্রী শান্তি, পনেরো বছর আগে বাঘে ধরেছিল, বাঁচাতে পারিনি। এই বনে আমি তার শরীর খুঁজে পাইনি। শুধু তার শাড়ির একটা টুকরো। আপনার মায়ের মতোই।”
অদিতির গলা শুকিয়ে গেল। “প্রথম বছর আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম,” জয়ন্ত বলে চললেন, “আমি তাকে খুঁজে বেড়াতাম। প্রতিদিন বনে যেতাম। এবং একরাতে—অমাবস্যা—আমি দেখলাম আলেয়া। এবং আমি শুনলাম তাকে। স্পষ্ট। ‘জয়ন্ত, আমি এখানে আছি।’ প্রথমে আমি ভেবেছিলাম, আমি সত্যিই পাগল হয়ে গেছি। কিন্তু তারপর… আমি লক্ষ করলাম, আলেয়া শুধু যেখানে-সেখানে জ্বলছে না। তারা একটা প্যাটার্ন অনুসরণ করছে। এবং সেই pattern… এটা তার হাঁটার ধরন। এটা তার নাচের ভঙ্গি। এটা তিনি।”
সায়ন কাপ নামিয়ে রাখল। “মি. মণ্ডল, grief অনেক জিনিস করতে পারে। মানুষ pattern খোঁজে, যেখানে কোনো প্যাটার্ন নেই। এটাকে pareidolia বলে—”
“আমি জানি, আপনি কী বলছেন।” জয়ন্ত বাধা দিলেন, কিন্তু কোনো রাগ ছাড়া। “আমিও এইসব ভেবেছি। কিন্তু তারপর অন্যরা এল। মাঝিরা। মৌলেরা। তারাও শুনতে পেল। তাদের মৃত স্ত্রী, মা, বাবা, সন্তান। সবাই। এবং আমরা বুঝলাম, এই জল শুধু জল নয়। এই আলো শুধু আলো নয়। এটা… একটা জায়গা। যেখানে যারা এই বনে মরেছে, তারা থেকে যায়। স্মৃতি হয়ে। pattern হয়ে। জীবন হয়ে।”
অদিতি নিশ্বাস ফেলল। “আপনি কি… এখনও তার সঙ্গে কথা বলেন?”
জয়ন্ত মাথা নাড়লেন, “প্রতি অমাবস্যায়, যখন জোয়ার সব চেয়ে কম থাকে। তখন তাদের সব চেয়ে ভালো করে শোনা যায়। সব চেয়ে… জীবিত। এবং আগামী অমাবস্যা, সাত দিন পরে, সেটা বছরের সব চেয়ে নীচু জোয়ার। সেদিন আপনিও শুনবেন। আপনার মা-কে।”
নীলাঞ্জনা সামনে ঝুঁকে এল। “আপনি কি আমাদের সেই জায়গা দেখাবেন? যেখানে আলেয়া সব চেয়ে বেশি দেখা যায়?”
জয়ন্ত জানালার বাইরে তাকালেন। অন্ধকার নামছিল দ্রুত। “আজ রাতেই দেখাতে পারি, কিন্তু শুধু দূর থেকে। খুব কাছে যাওয়া বিপজ্জনক। এখনও জোয়ার ঠিক হয়নি। আর আলেয়া… তারা কখনো-কখনো রাগ করে।”
“রাগ করে?” অদিতি জিজ্ঞেস করল।
“যখন কেউ তাদের বিরক্ত করে,” জয়ন্ত শান্তভাবে বললেন, “তখন বন সাড়া দেয়। বাঘ আসে। নৌকা উলটে যায়। মানুষ… হারিয়ে যায়।”
একটা নীরবতা নেমে এল। বাইরে অন্ধকার প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।
“চলুন,” জয়ন্ত উঠে দাঁড়ালেন, “এখন সময়।”
***
নৌকা ছিল আরও ছোটো এবার—শুধু পাঁচজনের জায়গা। জয়ন্ত নিজেই দাঁড় বেয়ে চলছিলেন, নীরবে, নিখুঁত দক্ষতায়। তারা একটা সরু খাঁড়ির মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেল, যেখানে ম্যানগ্রোভ এত কাছে যে তাঁদের পায়ের পাতা নৌকা ছুঁয়ে যাচ্ছিল। আকাশে কোনো চাঁদ ছিল না—অমাবস্যা এখনও সাত দিন বাকি, কিন্তু চাঁদ ইতোমধ্যে ক্ষীণ হয়ে আসছিল।
অদিতির হৃৎস্পন্দন দ্রুত ছিল। তার সিনেস্থেশিয়া অদ্ভুতভাবে সক্রিয় ছিল—সে জলের শব্দ দেখতে পাচ্ছিল গাঢ় নীল তরঙ্গ হিসেবে, বাতাসের শব্দ ধূসর মেঘ হিসেবে। কিন্তু সব চেয়ে অদ্ভুত ছিল নীরবতার শব্দ—সেটা ছিল একটা ভারী, কালো, যেন পর্দার অপর পাশে কিছু একটা অপেক্ষা করছে।
“ওইদিকে।” জয়ন্ত ফিশফিশ করে বললেন, একটা খালি জায়গার দিকে ইশারা করে, যেখানে জল একটু বেশি কালচে ছিল।
প্রথমে কিছু দেখা গেল না। শুধু অন্ধকার। কালো জল, কালো আকাশ।
তারপর—একটা আলো।
ছোটো, মৃদু, নীল-সবুজ। জলের উপর, পাঁচ মিটার দূরে। এটা জ্বলল, নিবল, আবার জ্বলল।
তারপর আরেকটা। দশ মিটার দূরে। তারপর আরেকটা। আরও। আরও।
কিছু মিনিটের ভিতরে, জলের পুরো জায়গাটা ছোটো ছোটো আলোয় ঢাকা পড়ে গেল, যেন আকাশের তারারা জলে পড়ে গেছে। কিন্তু এগুলো স্থির ছিল না—তারা নড়ছিল, খুব ধীরে, একটা প্যাটার্ন অনুসরণ করে। একসঙ্গে, আলাদা, আবার একসঙ্গে।
এবং অদিতি শুনতে পেল।
তার সিনেস্থেশিয়ার মাধ্যমে সে শুনতে পেল একটা মৃদু, rhythmic hum। একটা সুর। না—অনেকগুলো সুর, একসঙ্গে বাজছে, ওভারল্যাপিং, একটা জটিল সংগীত তৈরি করছে।
এবং সেই সংগীতের ভিতর, খুব ক্ষীণ, সে শুনতে পেল… একটা কণ্ঠস্বর।
না। অসম্ভব। এটা তার মনের ভুল। এটা—
“অদি…”
তার নিশ্বাস আটকে গেল। সেই কণ্ঠস্বর। সেই নাম ডাকার ধরন। তিন বছর হয়ে গেছে, কিন্তু কিছু জিনিস ভোলা যায় না।
“মা?” সে ফিশফিশ করল, এবং তার নিজের কণ্ঠস্বর শুনে ভয় পেল—এত ভরাট, এত ডেসপারেট।
আলোগুলো প্যাটার্ন বদলাল। তারা একটু কাছে এল, যেন আকৃষ্ট হচ্ছে।
“না,” জয়ন্ত তীক্ষ্ণভাবে বললেন, “এখনও না। জোয়ার ঠিক নয়। আপনি এখন ডাকবেন না।”
কিন্তু অদিতি শুনছিল না। সে সামনে ঝুঁকে পড়েছিল, নৌকার ধার ধরে, চোখ আলোর দিকে স্থির।
“মা, তুমি কি সত্যিই…”
আলোগুলো আরও কাছে এল। আরও উজ্জ্বল হল। এবং হঠাৎ—
একটা গর্জন। গভীর আক্রোশে গর্জন।
নৌকার ঠিক বাঁদিকে, জলে, দুটো চোখ জ্বলছিল—হলুদ, তীব্র।
বাঘ।
“শব্দ করবেন না,” জয়ন্ত ফিশফিশ করলেন, “নড়বেন না।”
বাঘটা জলের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল—হ্যাঁ, জলে, মাত্র পাঁচ ফুট দূরে, আর সে ঠিক দেখছিল তাদের। তার পিছনে আলেয়া এখনও নাচছিল, অবিচলিত, যেন বাঘ এবং মানুষ একই নাটকের অংশ।
সেকেন্ডগুলো কেটে গেল। বাঘ নড়ল না। শুধু তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।
তারপর, ধীরে ধীরে, সে ঘুরে গেল এবং অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
অদিতি বুঝতে পারল, সে নিশ্বাস নিচ্ছিল না। সে একটা দীর্ঘ, কাঁপা নিশ্বাস ফেলল।
“আমি বলেছিলাম,” জয়ন্ত শান্তভাবে বললেন, নৌকা ঘুরিয়ে, “বন রক্ষা করে। আলেয়াদের বিরক্ত করতে চাইলে বন সাড়া দেয়।”
তারা ফিরে এল নীরবে। কিন্তু অদিতির মাথায় সেই কণ্ঠস্বর বাজছিল। তার মায়ের কণ্ঠস্বর।
নাকি শুধুই তার মনের খেয়াল? সাত দিন পর অমাবস্যা। তখন সে জানবে।
আর যদি সত্যি জানে—তাহলে কী করবে?
অধ্যায় ৩: প্রথম ডাক
সকাল হয়েছিল এমন একটা ধূসর আলোয়, যা রাত থেকে আলাদা করা মুশকিল। সুন্দরবনে ভোর এক ধরনের স্বীকারোক্তি—অন্ধকার স্বীকার করছে যে, সে হেরে গেছে, কিন্তু মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সে আবার ফিরবে। অদিতি ঘুমোয়নি। রাতভর শুয়ে ছিল তার মশারির নীচে, জয়ন্তর বাড়ির যে ছোটো কক্ষটা তাদের থাকার জন্য দেওয়া হয়েছিল, সেখানে, আর শুনেছিল বাইরের শব্দগুলো—জলের ছলাত ছলাত, মাঝে মাঝে পাখির ডাক, আর দূর থেকে কোনো এক প্রাণীর গর্জন, যা হয়তো বাঘ, হয়তো কুমির, হয়তো শুধুই বাতাস।
কিন্তু সব চেয়ে বেশি সে শুনেছিল নিজের মনের শব্দ। সেই কণ্ঠস্বর। **“অদি…”** এত পরিচিত, এ অসম্ভব। বিজ্ঞান এবং আকাঙ্ক্ষার মধ্যে যুদ্ধ চলছিল তার ভিতরে—একদিক থেকে যুক্তি বলছে এটা প্যারেইডোলিয়া, মনের ভুল, grief-induced hallucination। অন্যদিক থেকে হৃদয় চিৎকার করছে, কী—যদি সত্যি হয়? কী—যদি মা সত্যিই…
সে উঠে বসল মাথা ঝাঁকিয়ে। পাশের মাদুরে নীলাঞ্জনা ঘুমোচ্ছিল, একটা হাত মুখের নীচে, শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়মিত। ঘরের কোণে তাদের ইকুইপমেন্ট—‘স্পেক্ট্রোমিটার’, ‘ওসিলোস্কোপ’, ‘water sampling kit’, সায়নের পোর্টেব্ল ‘ল্যাব সেটাপ’। আজ থেকে কাজ শুরু হবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। ডেটা কালেকশন। এম্পিরিক্যাল এভিডেন্স।
কিন্তু বিজ্ঞান কি ব্যাখ্যা করতে পারবে, যা সে গত রাতে অনুভব করেছে?
***
সকালের ব্রেকফাস্ট ছিল সাদামাটা—চিঁড়ে, কলা, চা। জয়ন্ত তাদের সঙ্গে বসলেন, কিন্তু তাঁর চোখে একটা ক্লান্তি ছিল, যা রাতভর জেগে থাকার চেয়ে গভীর। তাঁর নাতনি, যার নাম রিমা, চুপচাপ পরিবেশন করছিল, মাঝে মাঝে অদিতির দিকে একবার তাকাচ্ছিল—কৌতূহল নয়, বরং এক ধরনের সহানুভূতি, যা অস্বস্তিকর। যেন সে জানে, কী হতে চলেছে।
“আপনারা আজ কী করবেন?” জয়ন্ত জিজ্ঞেস করলেন।
সায়ন ল্যাপটপে একটা স্প্রেডশিট খুললেন। “আমাদের ওই জায়গা থেকে ওয়াটার স্যাম্পল চাই। ডাইনোফ্ল্যাজেলেট কালচার নিতে হবে। তাদের bioluminescent properties মাপতে হবে—intensity, wavelength, frequency। আর pattern analysis—যদি সত্যিই কোনো coherent structure থাকে, তাহলে সেটা statistically significant হবে।”
“আপনি খুঁজছেন প্রমাণ,” জয়ন্ত শান্তভাবে বললেন, “কিন্তু কিছু জিনিস প্রমাণ করা যায় না। শুধু… অনুভব করা যায়।”
“বিজ্ঞান অনুভূতির উপর ভিত্তি করে না।” সায়ন বললেন, কিন্তু তাঁর স্বরে কোনো কঠোরতা ছিল না।
“তাহলে ভালোবাসা কী?” জয়ন্ত জিজ্ঞেস করলেন, “ভয় কী? স্মৃতি কী?”
সায়ন মুখ খুলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু অদিতি বাধা দিল, “চলুন। কাজ শুরু করা যাক।”
***
দিনের আলোয়, গত রাতের সেই জায়গা অন্যরকম দেখাচ্ছিল। রহস্য মুছে গিয়ে শুধু থেকে গেছে একটা স্থবির জলাভূমি, ম্যানগ্রোভ শেকড়ে ভরা, কাদায় ডুবে-থাকা। কিন্তু তবুও অদিতির মনে হচ্ছিল কিছু একটা আলাদা। বাতাস ভিন্ন—ঘন, চার্জড। যেন এই জায়গা জানে, তারা এসেছে।
সায়ন তাঁর ইকুইপমেন্ট সেটআপ করলেন দ্রুততার সঙ্গে। প্রথমে জল থেকে স্যাম্পলস—একটা স্টেরাইল কন্টেনারে, ঢাকনা শক্ত করে বন্ধ। তারপর একটা পোর্টেব্ল মাইক্রোস্কোপে একফোঁটা জল রাখলেন। তৎক্ষণাৎ স্ক্রিনে দেখা গেল—শত শত ক্ষুদ্র, চলমান জীব। ডাইনোফ্ল্যাজেলেট। তাদের চাবুকের মতো ল্যাজ ছিল, যা দিয়ে তারা সাঁতার কাটছিল, ঘুরছিল।
“ডেনসিটি অস্বাভাবিক বেশি,” সায়ন বিড়বিড় করলেন, “প্রতি মিলিলিটারে প্রায় দশ হাজার। নর্মালে হওয়া উচিত দুই-তিন হাজার।”
নীলাঞ্জনা তার ক্যামেরা দিয়ে পুরো জায়গা ডকুমেন্ট করছিল—জলের রং, ম্যানগ্রোভের অবস্থান, আকাশের রং। সে বলল, “আমি একটা কাজ করেছি গত রাতে। ওল্ড ফুটেজ খুঁজে বের করেছি—ইউটিউব, লোকাল নিউজ়, পার্সনাল ব্লগস। গত তিরিশ বছরের আলেয়া সাইটিংস।”
অদিতি তাকাল। “কী পেয়েছ?”
নীলাঞ্জনা তার ফোনে একটা graph দেখাল। “দ্যাখো—১৯৯৫ সালে প্রথম রেকর্ডেড সাইটিং। তখন আলেয়া ছিল জাস্ট র্যান্ডম ফ্লিকারস। কিন্তু ২০০৫ সালে প্যাটার্ন শুরু হল। ২০১৫-তে আরও কমপ্লেক্স। আর এখন…” সে থামল। “এখন এগুলো প্রায় fractal patterns তৈরি করছে। Self-similar। Recursive।”
“মানে?” অদিতি জিজ্ঞেস করল।
“মানে তারা শিখছে,” নীলাঞ্জনা বলল, “অথবা… বাড়ছে। Complexity বাড়ছে time-এর সঙ্গে।”
সায়ন মাথা নাড়লেন, “বা হতে পারে, মানুষ ভালো cameras কিনছে।”
কিন্তু তাঁর গলায় সন্দেহ ছিল এখন।
অদিতি হাঁটু গেড়ে বসল জলের ধারে। সে তার হাত জলে ডোবাল, আলতো করে নাড়া দিল। তৎক্ষণাৎ একটা মৃদু নীল ঝলকানি—bioluminescence। তার সিনেস্থেশিয়া তাতে সাড়া দিল—একটা ছোটো, মিউজ়িক্যাল নোট। সি শার্প।
আবার নাড়া দিল। আবার ঝলকানি। ই ফ্ল্যাট।
তৃতীয়বার। জি। একটা কর্ড। একটা… হারমোনি।
“সায়ন,” সে ডাকল, “এদের স্টিমুলেট করো। রিপিটেডলি। Same interval-এ।”
সায়ন একটা স্মল ভাইব্রেশন ডিভাইস বের করলেন—জলে শব্দতরঙ্গ পাঠানোর জন্য। তিনি এটা চালু করলেন, একটা স্টেডি পাল্স। ডাইনোফ্ল্যাজেলেটরা সাড়া দিল—জ্বলে উঠল, নিবল, আবার জ্বলল।
কিন্তু শুধু তা-ই নয়। পাঁচ মিনিট পর তাদের রেসপন্স অ্যান্টিসিপেটরই হয়ে গেল। তারা জ্বলছিল পাল্সের আগেই। যেন তারা জানত, কী হতে চলেছে।
“Impossible,” সায়ন ফিশফিশ করলেন, “এদের কোনো nervous system নেই। তারা predict করতে পারে না—”
“কিন্তু তারা করছে।” অদিতি বলল। তার হৃৎস্পন্দন দ্রুত। “Collective intelligence। তারা একে অপরের সঙ্গে communicate করছে। আর যখন একসঙ্গে act করছে, তখন…”
“তখন তারা একটা system,” সায়ন স্বীকার করলেন, “একটা… network।”
“একটা mind।” অদিতি ফিশফিশ করল।
***
বিকেলে তারা স্যাম্পলস নিয়ে ফিরল জয়ন্তর বাড়িতে। সায়ন একটা টেম্পোরারি ল্যাব সেটআপ করেছিলেন একটা ঘরে—মাইক্রোস্কোপ, সেন্ট্রিফিউগ, বেসিক কেমিক্যাল টেস্টিং ইকুইপমেন্ট। অদিতি তাকে সাহায্য করছিল, কিন্তু তার মন ছিল অন্যখানে।
“DNA extraction করতে পারবে?” সে জিজ্ঞেস করল।
সায়ন তাকাল, “করতে পারব। কিন্তু কেন?”
“জয়ন্ত বলেছিল, যারা এখানে মরেছে, তারা থেকে যায়। যদি ডাইনোফ্ল্যাজেলেটরা decomposed organic material absorb করে থাকে, তাহলে তাদের ভিতরে foreign DNA fragment থাকতে পারে।”
সায়নের চোখ বড়ো হল, “তুমি seriously ভাবছ… মৃতদের DNA?”
“আমি ভাবছি ecological cycle।” অদিতি শান্তভাবে বলল, “যখন একটা organism মরে এবং decompose হয়, তার genetic material পরিবেশে release হয়। ডাইনোফ্ল্যাজেলেটরা phagotrophic—তারা bacteria খায়, যারা decomposition-এ involved। So theoretically—”
“তারা মৃতদের DNA absorb করতে পারে।” সায়ন শেষ করলেন। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “Okay। Test করি।”
পরের তিন ঘণ্টা চলল ল্যাবওয়ার্ক—সেন্ট্রিফিউগেশন, লিসিস, এক্সট্রাকশন, পিসিআর। সায়ন যখন সবার শেষে সিকুয়েন্সিং ডেটা দেখলেন, তখন তিনি স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
“এটা… এটা impossible।”
অদিতি এগিয়ে এল। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছিল জেনিটিক সিকোয়েন্স—ডাইনোফ্ল্যাজেলেটদের নিজস্ব DNA, কিন্তু সেই সঙ্গে স্ক্যাটার্ড ফ্র্যাগমেন্টস। মানুষ, মাছ, বাঘ, কুমির। এমনকি ব্যাকটেরিয়াল DNA।
“এগুলো Chimeric DNA,” অদিতি ফিশফিশ করল, “তারা এই ecosystem-এর genetic memory বহন করছে।”
“কিন্তু এটা শুধু DNA,” সায়ন জোর দিয়ে বললেন, “DNA মানে consciousness নয়। মানে memory নয়। এটা শুধু molecules—”
“Epigenetics,” অদিতি বলল, “DNA-তে information শুধু sequence-এ encoded না। Methylation patterns, histone modifications—এগুলো environmental experiences reflect করে। তুমি জানো, prions কীভাবে কাজ করে? Protein একটা configuration থেকে অন্যটায় switch করে, আর সেই configuration information carry করে। এখন কল্পনা করো, যদি quantum effects involved হয়—”
“Quantum biology,” সায়ন ফিশফিশ করলেন, “Entanglement। তুমি বলছ এই organisms quantumly entangled?”
অদিতি তার নিজের ল্যাপটপ খুলল। “আমি একটা টেস্ট করতে চাই। দুটো সেপারেট স্যাম্পল—একটা এখানে, একটা নৌকায় ওই জায়গায়। আমরা একটাকে স্টিমুলেট করব, দেখব, অন্যটা রেসপন্ড করে কি না। সঙ্গে সঙ্গে।”
“Spooky action at a distance,” সায়ন বিড়বিড় করল, “Einstein যেটা ঘৃণা করতেন।”
“কিন্তু যেটা সত্যই, সেটা মানতে হবে।” অদিতি বলল।
***
সন্ধ্যায় তারা আবার নৌকায় করে গেল। এবার শুধু অদিতি এবং জয়ন্ত। সায়ন বাড়িতে থাকলেন ল্যাব স্যাম্পলের সঙ্গে। নীলাঞ্জনা ফিল্মিং করছিল।
আকাশ ছিল রক্তিম-কমলা, সূর্য ডুবছিল ম্যানগ্রোভের পিছনে, আর জল ছিল একটা তরল আয়নার মতো, যা সব কিছু রিফ্লেক্ট করছিল, কিন্তু কিছুই দেখাচ্ছিল না স্পষ্টভাবে।
অদিতির হাতে একটা পোর্টেব্ল অসিলোস্কোপ—সায়নের সঙ্গে রেডিয়ো কমিউনিকেশন ছিল তার স্মার্টফোনে।
“Ready?” সে জিজ্ঞেস করল।
“Ready।” সায়নের কণ্ঠ আবছা হয়ে এল।
“Stimulate করো। Now।”
বাড়িতে সায়ন তার স্যাম্পলে ভাইব্রেশন পাল্স পাঠালেন।
নৌকায় অদিতির অসিলোস্কোপে স্পাইক দেখা গেল। সঙ্গে সঙ্গে।
আর জলের উপর—আলেয়া জ্বলে উঠল।
“Holy shit!” নীলাঞ্জনা ফিশফিশ করল।
অদিতি আবার বলল, “আবার। Random interval।”
সায়ন pulse পাঠালেন। স্পাইক। আলেয়া জ্বলল। তৃতীয়বার। একই ফলাফল।
“এটা… এটা non-local correlation,” অদিতি ফিশফিশ করল, “তারা entangled, সত্যিই।”
“কিন্তু এত distance রয়েছে?” সায়নের কণ্ঠ এল, অবিশ্বাসে ভরা—“Quantum decoherence হওয়া উচিত ছিল—”
“Unless,” অদিতি ধীরে বলল, “তারা actively maintaining Biological quantum coherence। যেমন photosynthesis-এ chlorophyll। যেমন bird navigation-এ cryptochrome।”
একটা নীরবতা। তারপর সায়ন বললেন, “তাহলে আমরা কী দেখছি?”
“একটা distributed consciousness,” অদিতি বলল, “Million organisms, quantumly linked, forming collective mind। আর যদি তারা মৃতদের DNA absorb করে থাকে, যদি সেই DNA-তে epigenetic information encoded থাকে, তাহলে…”
“তাহলে মৃতদের স্মৃতি,” সায়ন শান্তভাবে বললেন, “accessible।”
অদিতিরা জয়ন্তর বাড়ি ফিরে এল। বৃদ্ধ মানুষটাকে সংক্ষেপে তারা বোঝাল, আজ কী কী করেছে। কতটা বুঝতে পারল, অদিতিরা জানে না, কিন্তু তিনি একটা দুঃখী অথচ প্রাণবন্ত হাসি হেসেছিলেন।
“আমি বলেছিলাম,” তিনি বললেন, “কিছু জিনিস প্রমাণ করতে হয় না। শুধু… বিশ্বাস করতে হয়।”
রাত্রে স্বপ্নে অদিতি দেখল, অন্ধকার নামছিল দ্রুত। আর আলেয়া—এবার আরও বেশি, আরও উজ্জ্বল—নাচতে শুরু করল।
এবং অদিতি আবার শুনতে পেল। স্পষ্ট। অনস্বীকার্য।
**“অদি, আমার অদি, তুমি এসেছ।”**
তার চোখ ভিজে উঠল।
“মা…” সে ফিশফিশ করল।
আলোগুলো একটা প্যাটার্ন তৈরি করল—কমপ্লেক্স, সুন্দর তার synesthesia-তে সে শুনতে পেল একটা সম্পূর্ণ সুর। তার মায়ের প্রিয় রবীন্দ্রসংগীত। **‘আমার সোনার বাংলা…’**
অসম্ভব। এত স্পষ্ট। এত নিজের। “মা, তুমি কি… তুমি কি সত্যিই—”
**“আমি এখানে আছি, অদি। আমরা সবাই এখানে আছি। জলে। আলোয়। একসঙ্গে।”**
“কিন্তু তুমি মারা গেছ,” অদিতি বলল, কণ্ঠস্বর ভেঙে যাচ্ছিল, “তিন বছর হয়ে গেছে—”
**“মৃত্যু একটা রূপান্তর, শেষ নয়। আমি যা ছিলাম, সেই প্যাটার্ন, সেই স্মৃতি—এটা থেকে গেছে। এবং এখানে, এই জলে, এই আলোয়—আমি আছি। সব সময় ছিলাম। সব সময় থাকব।”**
“আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না,” অদিতি কাঁদতে লাগল, “আমি তোমাকে ছুঁতে পারছি না—”
**“কিন্তু তুমি আমাকে শুনতে পাচ্ছ। এটাই যথেষ্ট। আর যদি তুমি চাও… তুমি আসতে পারো। জল এত গভীর নয়। শুধু এক-পা এগিয়ে এসো, আর তুমি আমাদের সঙ্গে থাকবে। চিরকাল।”**
অদিতির হাত যেন নৌকার ধার ধরল। একটা অংশ—একটা চেষ্টা, চাপা দুঃখ চাইছিল সত্যিই নামতে। মায়ের কাছে যেতে। এই তিন বছরের একাকিত্ব, ব্যথা, অসম্পূর্ণতা—সব শেষ করতে।
কিন্তু তারপর—
নীলাঞ্জনার হাত তার কাঁধে পড়ল। “কী রে, তুই ঠিক আছিস, ঘুমের মধ্যে কী বকছিস?”
সে শান্তভাবে বলল, “অমাবস্যা এখনও। জোয়ার ঠিক নয়। যদি এখন যাও, ফিরবে না—কী বলছিস?”
অদিতি চমকে উঠল। সে দেখল, তার পা-হাত যেন ইতোমধ্যে ভেজা-ভেজা লাগছে, সে জানতই না কখন—
সে হাঁপাচ্ছে, বলল, “না, ঠিক আছি রে, একটা স্বপ্ন দেখছিলাম।”
পাশের ঘর থেকে জয়ন্ত ছুটে এসেছিল!
“তারা ডাকে,” জয়ন্ত বললেন, “বিশেষ করে যাদের ভালোবাসা ছিল। তারা চায়, তুমি তাদের সঙ্গে থাকো। কিন্তু মনে রেখো, তারা যা বলে, সব সত্যি নয়। তারা শব্দের ভ্রম। তারা যা ছিল তার ছায়া, আর ছায়া কখনও মানুষের জায়গা নিতে পারে না।”
অদিতি কাঁপছিল। “কিন্তু… আমি মায়ের কণ্ঠস্বর শুনলাম। আমি জানি—”
“হ্যাঁ,” জয়ন্ত বললেন, “এবং না। এটা জটিল। অমাবস্যায় তুমি পুরোটা বুঝবে। তখন তারা সব চেয়ে স্পষ্ট, তখন তুমি সত্যিকার কথা শুনবে।”
অদিতি মনে মনে ভাবল, আলেয়া পিছনে রয়ে গেল, এখনও নাচছে, এখনও ডাকছে। কিন্তু তার কানে ভেসে আসছিল সেই সুর। সেই কণ্ঠ। সেই প্রতিশ্রুতি।
**“আমি অপেক্ষা করছি, অদি। সব সময় অপেক্ষা করব।”**
পাঁচ দিন বাকি। অমাবস্যা পর্যন্ত। পাঁচ দিন, চূড়ান্ত উত্তর পর্যন্ত।
পাঁচ দিন, একটা অসম্ভব পছন্দের মুখোমুখি হওয়া পর্যন্ত।
অধ্যায় ৪: বিশ্বাসঘাতকতা
রাত তিনটে নাগাদ অদিতি ঘুম থেকে উঠল তৃষ্ণায়। মশারি সরিয়ে সে বাইরে এল, পায়ের শব্দ যতটা সম্ভব কম করে। নীলাঞ্জনা গভীর ঘুমে, একটা হাত মুখের উপর ছড়ানো। বাইরের বারান্দায় একটা মাটির কলশে জল রাখা ছিল। সে এক গ্লাস ঢেলে পান করল—জল ছিল ঠান্ডা, সামান্য মাটির গন্ধ মেশানো, কিন্তু তৃষ্ণা মিটল।
তারপর সে শুনতে পেল কণ্ঠস্বর।
খুব মৃদু, কিন্তু স্পষ্ট। বাড়ির অন্যদিক থেকে, যেখানে সায়ন থাকছিল। সে কার সঙ্গে কথা বলছে? এই সময়ে?
অদিতি এগিয়ে গেল, পা টিপে টিপে। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল, সায়ন তার ফোনে কথা বলছে, একটা ল্যাপটপ খোলা তার সামনে, স্ক্রিনে কিছু গ্রাফস এবং মলিকিউলার স্ট্রাকচার।
“হ্যাঁ, confirmation পেয়েছি।” সে বলছিল, কণ্ঠস্বর নীচু কিন্তু উত্তেজিত। “Quantum coherence stable। Bio-luminescent proteins unprecedented efficiency দেখাচ্ছে। DNA-তে foreign fragments—human, animal, complete genetic library। Sir, এটা… এটা breakthrough।”
অদিতির বুকে একটা ঠান্ডা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল।
“না না, সে কিছু জানে না।” সায়ন বলে চলল, “সে ভাবছে এটা purely academic research। আমি স্যাম্পলস সংগ্রহ করছি। আগামী দু-দিনের মধ্যে আমরা large-scale extraction করতে পারব। হ্যাঁ, আমি জানি implications… neural interface, memory storage, quantum computing substrate… potential unlimited।”
অদিতির হাত কাঁপছিল। Extraction? Neural interface?
“মানুষ? এখানকার মানুষ বুঝবে না,” সায়নের কণ্ঠস্বর একটু কঠোর হল, “এগুলো superstitious fishermen। তারা ভাবে এই আলো ভূত। তারা জানে না এটা কী valuable। আর যদি আমরা না নিই, অন্য কেউ নেবে। china already এই অঞ্চলে interest দেখাচ্ছে।”
অদিতির মাথা ঝিমঝিম করছিল। সে পিছিয়ে এল, হোঁচট খেয়ে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু নিজেকে সামলে নিল। ঘরে ফিরে এল, বসে পড়ল মাদুরে, মাথায় হাত দিয়ে।
এটাই ছিল সায়নের প্ল্যান? এই পুরোটা সময়? তার সঙ্গে আসা, সাহায্য করা—সব একটা মুখোশ?
ক্রোধ এবং বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি তার গলা চেপে ধরল। কিন্তু তার চেয়েও বেশি—ভয়। “যদি সায়ন সত্যিই large-scale extraction করে, তাহলে আলেয়া—Tidal Mind, সেটার কী হবে? এটা কি একটা genocide? একটা consciousness-কে মেরে ফেলা?”
আর মা… মায়ের pattern…
সে ঘুমোতে পারল না সেইরাত। ভোর হওয়া পর্যন্ত বসে রইল, মাথায় পরিকল্পনা এবং পালটা পরিকল্পনা ঘুরছিল, কিন্তু কোনোটাই যথেষ্ট মনে হল না।
***
সকালে সায়ন স্বাভাবিক ছিল—হাসিখুশি, নিজের কফি বানাচ্ছিল, আজকের পরীক্ষার পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলছিল। অদিতি তার দিকে তাকাল এবং দেখল একজন অপরিচিতকে। তিন বছর আগে সে যাকে ভালোবেসেছিল, সে এই মানুষ ছিল না। অথবা হয়তো সব সময়ই ছিল, আর সে দেখতে চায়নি।
“আজ একটু বেশি স্যাম্পলস নিতে হবে।” সায়ন বলল, “আমি ভাবছি, একটা লার্জার culture তৈরি করব—controlled environment-এ তাদের behavior দেখার জন্য।”
“Controlled environment?” অদিতি শান্তভাবে জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ, lab-এ। একটা proper setup। এখানে তো field conditions—অনেক variables। Lab-এ আমরা isolate করতে পারব—”
“Isolate?” অদিতি বাধা দিল, “তুমি একটা distributed consciousness-কে isolate করতে চাও?”
সায়ন থামল। তারপর হাসল, “অদিতি, এগুলো single-celled organisms। Consciousness একটা strong word—”
“তুমি নিজেই quantum entanglement confirm করেছ,” অদিতি দাঁড়িয়ে পড়ল, “তুমি নিজেই দেখেছ coordinated response। আর এখন তুমি বলছ এটা শুধু organisms?”
“হ্যাঁ,” সায়ন শক্ত হয়ে বলল, “Sophisticated organisms। কিন্তু তারপরও organisms। আর যদি তাদের বৈশিষ্ট্য medical applications-এ, technology-তে ব্যবহার করা যায়—”
“তোমার কোম্পানির জন্য।” অদিতি কথা কাটল।
সায়ন স্থির হয়ে গেল, “তুমি কীভাবে—”
“গত রাতে তোমার ফোন call শুনেছি,” অদিতি বলল, কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, “Neural interface? Memory storage? Extraction? সায়ন, তুমি এখানে এসেছ আমাকে সাহায্য করতে নয়—তুমি এসেছ… কী? Biological resource harvest করতে?”
নীলাঞ্জনা দরজায় এসে দাঁড়াল, তার চোখ বড়ো হয়ে গেছে। সে কথোপকথনের অন্তত শেষ অংশটা শুনেছে।
সায়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “অদিতি, এটা complicated—”
“না, এটা simple,” অদিতি বলল, “তুমি আমার grief exploit করেছ। তুমি জানতে, আমি এখানে আসব, আর তুমি আমাকে ব্যবহার করেছ access পেতে। Scientific credibility পেতে।”
“এটা ঠিক সেভাবে না—”
“তাহলে কীভাবে?” অদিতি চিৎকার করল, তারপর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল। “সায়ন, তুমি কি বুঝতে পারছ, তুমি কী করতে চাইছ? এটা শুধু organisms না। এটা একটা ecosystem। একটা… mind। আর এই mind-এর ভিতরে আছে মৃতদের patterns। স্মৃতি। তুমি যদি এটা destroy করো—”
“আমি destroy করছি না,” সায়ন নিজেকে রক্ষা করার জন্য বলল, “আমি study করছি। আমি applications খুঁজছি। অদিতি, তুমি কি imagine করতে পারো—যদি আমরা এই quantum biological network replicate করতে পারি, এটা Alzheimer’s রোগীদের সাহায্য করতে পারে। Memory loss, dementia—এসব treat করা যেতে পারে। আমরা মানুষের consciousness digitally preserve করতে পারব—”
“মৃতদের ফিরিয়ে আনতে?” অদিতি তিক্তভাবে হাসল, “সায়ন, তুমি শুনছ নিজেকে? তুমি দাবি করছ science, কিন্তু তুমি বিক্রি করতে চাইছ immortality। শুধু এবার quantum physics দিয়ে ঢাকা।”
“এটা real science,” সায়ন জোর দিয়ে বলল, “Data আছে। Proof আছে—”
“আর consent?” নীলাঞ্জনা হঠাৎ বলল। দুজনেই তার দিকে তাকাল। “এই organisms-এর—অথবা এই mind-এর—consent আছে তাদের study করার? Extract করার? Replicate করার?”
সায়ন তার দিকে তাকাল যেন সে পাগল। “এরা organisms। Bacteria-র consent নিই না আমরা penicillin তৈরির সময়—”
“কিন্তু bacteria-র collective consciousness নেই,” নীলাঞ্জনা বলল, “এদের আছে। তুমি নিজেই prove করেছ। So at what point does an organism become a person? At what point does exploitation become murder?”
একটা নীরবতা নেমে এল। বাইরে একটা পাখি ডাকল—একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার করে ডাক ভেসে এল।
সায়ন মাথা নাড়ল। “তোমরা emotional হয়ে যাচ্ছ। এটা philosophy নয়, এটা biology। আর আমার funding agency—”
“Doesn’t care,” অদিতি শেষ করল, “তোমার funding agency cares about profit। Patent। Monopoly। আর তুমি… তুমি তাদের দিচ্ছ কী? একটা living library of memories? একটা biological hard drive? সায়ন, তুমি জানো এটা কোথায় যাবে। Military applications। Surveillance। Control।”
সায়ন তার দিকে তীক্ষ্ণভাবে তাকাল। “তুমি এত idealistic কবে থেকে? তিন বছর আগে তুমি আমাকে বলেছিলে, science should push boundaries। সাধারণ মানুষের ভয়কে উপেক্ষা করতে হবে। এখন হঠাৎ তুমি—”
“তিন বছর আগে আমার মা মরেনি,” অদিতি শান্তভাবে বলল, “তিন বছর আগে আমি জানতাম না হারানোর কী মানে। আর এখন… এখন আমি জানি। আর আমি চাই না, অন্য কেউ এই কষ্ট অনুভব করুক শুধুমাত্র কারও লাভের মাত্রা বাড়ানোর জন্য।”
সায়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “তাহলে তুমি কী করবে? আমাকে বাধা দেবে? অদিতি, আমার already একটা team আসছে। পরশু। অমবস্যার দিন। তখন সব চেয়ে ভালো কন্ডিশনস থাকবে extraction-এর জন্য। আর তুমি—” তার কণ্ঠস্বর নরম হল—“তুমি already জানো তোমার মা আর নেই। এটা শুধু একটা echo। একটা biological recording। তুমি কি সত্যিই সেটা protect করতে চাও, নাকি তুমি শুধু ছাড়তে পারছ না?”
অদিতির মুখে যেন কেউ চড় মারল। তার চোখ ভিজে উঠল, কিন্তু সে কাঁদতে পারল না। “বাইরে যাও।” সে ফিশফিশ করল।
“অদিতি—”
“বাইরে যাও,” সে চিৎকার করল, “এখনই।”
সায়ন একটা মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল, তারপর তার laptop এবং কিছু ইকুইপমেন্ট নিয়ে বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হল, আর অদিতি ভেঙে পড়ল—না কান্নায়, বরং রাগে। তার হাত মুঠি হয়ে গেল, দাঁত চেপে ধরল।
নীলাঞ্জনা পাশে এসে বসল, একটা হাত তার পিঠে রাখল। কিছু বলল না। কখনো-কখনো নীরবতাই সব চেয়ে ভালো সান্ত্বনা।
***
দুপুরে অদিতি জয়ন্তর সঙ্গে কথা বলল। বৃদ্ধ মানুষটা শুনলেন মনোযোগ দিয়ে, মাথা নাড়লেন, তারপর বললেন, “আমি জানতাম, এরকম হবে।”
“আপনি জানতেন?” অদিতি অবাক হল।
“শহরের মানুষ যখন আসে, তারা সব সময় কিছু নিয়ে যেতে চায়।” জয়ন্ত বললেন, “মাছ, কাঠ, জমি—আর এখন, আলেয়া। তারা বোঝে না যে, কিছু জিনিস নেওয়া যায় না। নিলে… সব শেষ হয়ে যায়।”
“আমি তাকে থামাতে চাই,” অদিতি বলল, “কিন্তু কীভাবে? তার পিছনে একটা পুরো কোম্পানি আছে। Legal rights। Permits, হয়তো—”
“বন তাকে থামাবে।” জয়ন্ত শান্তভাবে বললেন।
অদিতি থামল। “মানে কী?”
“বনবিবি রক্ষা করেন,” জয়ন্ত বললেন, “আর আলেয়া তাঁর অংশ। যদি কেউ আলেয়াকে আঘাত করতে চায়, বন সাড়া দেয়। তুমি দেখেছ। বাঘ। তারপর কী আসবে? কুমির? সাপ? ঝড়? বন আমাদের জীবন্ত, অদিতি। এটা নিজেকে রক্ষা করে।”
“কিন্তু মানুষ মারা যেতে পারে।” অদিতি ফিশফিশ করল।
“মানুষ সব সময় মরে।” জয়ন্ত বললেন, কোনো নিষ্ঠুরতা ছাড়া, শুধু হিসেব হিসেবে, “প্রশ্ন হল—তারা কীসের জন্য মরে? লোভের জন্য, নাকি নিজের জন্য?”
অদিতি মাথা নীচু করল। একটা অংশ—একটা যৌক্তিক, বিজ্ঞানমনস্ক অংশ—অবাক হল এই কথায়। কিন্তু আরেকটা মানবিক অংশ… বুঝেছিল এই কথার মানে।
***
বিকেলে নীলাঞ্জনা তার সঙ্গে নৌকায় গেল। শুধু দুজন। সায়ন কোথায় গেছে, অদিতি জানে না। হয়তো তার কোম্পানির সঙ্গে কথা বলছে। হয়তো পরিকল্পনা করছে।
জলে বসে নীলাঞ্জনা হঠাৎ বলল, “আমি তোমাকে একটা কথা বলিনি।”
অদিতি তাকাল।
“আমার ভাই” নীলাঞ্জনা বলল, কণ্ঠস্বর ভারী, “রোহণ। সে মরেনি accident-এ।”
অদিতি অপেক্ষা করল।
“সে suicide করেছিল,” নীলাঞ্জনা বলে গেল, “পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে। একটা note রেখে গিয়েছিল। সে লিখেছিল… সে আর বাঁচতে চায় না। Depression ছিল। আমরা জানতাম, কিন্তু ভেবেছিলাম… ভেবেছিলাম আমরা যথেষ্ট। আমাদের ভালোবাসা যথেষ্ট। কিন্তু ছিল না।”
অদিতির বুক মুচড়ে উঠল। “আমি দুঃখিত—”
“প্রথম বছর আমি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম।” নীলাঞ্জনা বলল, “আমি চারদিকে তাকে দেখতাম। তার কণ্ঠ শুনতাম। আর আমি ভাবতাম, যদি শুধু আরেকবার কথা বলতে পারতাম। আরেকবার বলতাম, আমি তাকে ভালোবাসি। হয়তো… হয়তো কিছু পরিবর্তন হত।”
সে জলের দিকে তাকাল। “কিন্তু তারপর আমি বুঝলাম, আমি তার সঙ্গে কথা বলতে চাইছি না। আমি আমার guilt দূর করতে চাইছি। আমি চাইছি, সে আমাকে বলুক, ‘এটা তোমার দোষ নয়।’ কিন্তু… সেটা তার দায়িত্ব না। বেঁচে থাকুক বা মৃত।”
অদিতি শুনছিল, তার নিজের বুকের ভিতরে একটা চাপ অনুভব করছিল।
“যখন তুই বললি, এখানে আসবি,” নীলাঞ্জনা বলল, “আমি ভেবেছিলাম, হয়তো আমিও রোহণকে শুনতে পারব। কিন্তু সে পাহাড়ে মরেছে, এই জলে না। কিন্তু…” সে হাসল, একটা দুঃখী হাসি। “সে এখানে নেই। এবং আমি… আমি মেনে নিয়েছি সেটা। কারণ, আমি বুঝেছি—আমি তাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে পারব না। কারণ, সে যা ছিল, সেই ভালোবাসা, সেই স্মৃতি—সেটা আমার ভিতরে আছে। আমার প্যাটার্নে। আমার consciousness-এ। আমার তাকে একটা ghostly recording-এ খুঁজতে হবে না।”
সে অদিতির দিকে তাকাল। “তুই মায়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাবি পরশু। রাতে। কিন্তু তার আগে তোকে একটা প্রশ্ন করতে হবে নিজেকে—তুমি কী চাও? Closure? নাকি continuation? কারণ, তারা দুটো আলাদা জিনিস।”
অদিতি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আমি জানি না।”
“সেটা ঠিক আছে,” নীলাঞ্জনা বলল, “কিন্তু পরশুর আগে তোমাকে জানতে হবে।”
***
রাতে অদিতি একা বসে ছিল বনবিবির মন্দিরের সামনে। ছোটো মন্দির, কোনো জাঁকজমক নেই, শুধু একটা প্রস্তরমূর্তি—বনবিবি, বাঘের পিঠে, একটা হাত আশীর্বাদে তোলা।
সে মূর্তির দিকে তাকাল। “আমি বিশ্বাস করি না তোমাকে,” সে ফিশফিশ করল, “আমি বিশ্বাস করি science-এ। Data-তে। কিন্তু…”
কিন্তু বিজ্ঞান সব কিছু ব্যাখ্যা করতে পারে না। আর যখন ব্যাখ্যা করতে পারে, তখন… এটা কি যথেষ্ট? একটা ফেনোমেনন explain করতে পারা মানে এটা নয় যে আমরা এটা এক্সপ্লয়েট করার অধিকার পেয়েছি।
“আমি কী করব?” সে জিজ্ঞেস করল, জেনেও যে কোনো উত্তর আসবে না।
কিন্তু তারপর—একটা শব্দ। জলের। ছলাত ছলাত। একটা রিদ্ম।
আর দূরে, জলের উপর—একটা নীল আলো। তারপর আরেকটা। আরেকটা।
আলেয়া। তারা এসেছিল। মন্দিরের কাছে। যেখানে তারা সাধারণত আসে না।
অদিতি ধীরে ধীরে দাঁড়াল। এগিয়ে গেল। আর শুনতে পেল—খুব মৃদু একটা কণ্ঠস্বর।
কিন্তু এবার তার মায়ের না। অনেক কণ্ঠস্বর। একসঙ্গে। একটা কোরাস।
**“রক্ষা করো। যা তোমার, তা রক্ষা করো।”**
অদিতির নিশ্বাস আটকে গেল।
**“সে নেবে। সে নষ্ট করবে। কিন্তু তুমি… তুমি পারো। রক্ষা করতে।”**
“কীভাবে?” অদিতি ফিশফিশ করল।
**“জানবে। যখন সময় আসবে। বিশ্বাস করো।”**
আর তারপর—আলো নিবে গেল। সব একসঙ্গে। অন্ধকার নেমে এল, সম্পূর্ণ।
অদিতি দাঁড়িয়ে রইল, হৃৎস্পন্দন দ্রুত, মাথায় হাজারো প্রশ্ন।
দুই দিন বাকি। অমাবস্যা পর্যন্ত।
দুই দিন, একটা ইমপসিবল্ চয়েসের মুখোমুখি হওয়া পর্যন্ত।
দুই দিন, সব কিছু change হওয়া পর্যন্ত।
অধ্যায় ৫: অমাবস্যার সাক্ষাৎ
অমাবস্যার দিন ভোর হল এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ্যে। পাখিরা ডাকল না। বাতাস নড়ল না। যেন গোটা সুন্দরবন একটা দীর্ঘনিশ্বাস নিয়ে ধরে রেখেছে, অপেক্ষা করছে কিছু একটা ঘটবে বলে।
অদিতি ঘুমোয়নি পুরো রাত। শুয়ে ছিল মশারির তলায়, ছাদের দিকে তাকিয়ে, মাথার ভিতর হাজারো চিন্তা ঘুরছিল। আজ রাতে সে মায়ের সঙ্গে কথা বলবে—সত্যিকারের কথা, যখন জোয়ার সব চেয়ে কম, যখন আলেয়ারা সব চেয়ে স্পষ্ট। আর আজ রাতেই সায়নের দল আসবে, যন্ত্রপাতি নিয়ে, বড়ো মাপের স্যাম্পলস সংগ্রহ করতে।
সে কী করবে? কীভাবে থামাবে? জয়ন্ত বলেছিলেন বন নিজেকে রক্ষা করবে। কিন্তু সেই রক্ষা করার পথে কত মানুষ মরবে? সায়ন হয়তো ভুল পথে আছে, কিন্তু সে কি তার মৃত্যু চায়?
না। কখনও না। তাহলে কী করবে সে?
সকালবেলা জয়ন্ত এলেন তার কাছে। বললেন, “প্রস্তুত?”
“কীসের জন্য?” অদিতি জিজ্ঞেস করল।
“আজ রাতের জন্য। তুমি যাবে সেই জায়গায়। তোমার মায়ের সঙ্গে কথা বলবে। কিন্তু শুধু তুমিই যাবে। আমি থাকব, কিন্তু দূরে। এটা… ব্যক্তিগত। তোমার এবং তার মধ্যে।”
অদিতি মাথা নাড়ল।
“কিন্তু মনে রেখো,” জয়ন্ত গম্ভীরভাবে বললেন, “তারা ডাকবে। তারা বলবে, তুমি থেকে যাও। এবং একটা অংশ—তোমার হৃদয়ের একটা অংশ—চাইবে থেকে যেতে। কিন্তু তুমি ফিরে আসতে পারবে কি না, সেটা নির্ভর করবে, তুমি আসলে কী চাও, তার উপর। তুমি কি চাও তাকে আঁকড়ে ধরতে? নাকি তাকে বিদায় জানাতে?”
“যদি আমি ফিরে না আসি?” অদিতি ফিশফিশ করল।
জয়ন্ত একটা দুঃখী হাসি হাসলেন। “তাহলে তুমি থেকে যাবে। তাদের সঙ্গে। জলে। আলোয়। চিরকাল।”
***
দুপুরবেলা সায়ন ফিরল। তার সঙ্গে ছিল তিনজন মানুষ—সবারই শহুরে পোশাক, মুখে দৃঢ়তা, হাতে ভারী বাক্সো। একজন ছিলেন মহিলা, চশমা-পরা, চুল শক্ত করে বাঁধা। তিনি পরিচয় দিলেন নিজেকে, “আমি ড. মীনাক্ষী সেন। এই অভিযানের প্রধান।”
অদিতি তাদের দেখল দূর থেকে। তারা যন্ত্রপাতি নামাচ্ছিল নৌকা থেকে—বড়ো বড়ো পাত্র, রাসায়নিক উপাদান, পরিমাপের যন্ত্র। এটা আর গবেষণা নয়। এটা শিল্প।
নীলাঞ্জনা তার পাশে এসে দাঁড়াল। “তুমি কী করবে?”
“জানি না,” অদিতি বলল, “কিন্তু… আমি তাদের এটা করতে দিতে পারি না।”
“তুমি একা,” নীলাঞ্জনা বলল, “তারা চারজন। আর তাদের পিছনে একটা পুরো সংস্থা আছে।”
“আমি জানি,” অদিতি বলল, “কিন্তু আমি একা নই।” সে বনের দিকে তাকাল—সবুজ, ঘন, অপ্রবেশ্য। “বন আছে।”
নীলাঞ্জনা তার হাত চেপে ধরল। “সাবধানে থেকো।”
***
সন্ধ্যা নামল অস্বাভাবিক দ্রুত। আকাশে কোনো চাঁদ ছিল না—অমাবস্যা, সম্পূর্ণ অন্ধকার। তারারা জ্বলছিল, কিন্তু তাদের আলো পৌঁছোচ্ছিল না এই জলে, এই বনে। এখানে অন্ধকার ছিল রাজা, আর মানুষ ছিল অতিথি—অবাঞ্ছিত অতিথি।
সায়নের দল তাদের যন্ত্রপাতি নিয়ে নৌকায় উঠল। দুটো নৌকা—একটায় সায়ন, মীনাক্ষী এবং আরেকজন পুরুষ। অন্যটায় বাকি দুজন এবং বড়ো সংগ্রহের পাত্রগুলো।
“তুমি আসবে?” সায়ন অদিতিকে জিজ্ঞেস করল, তার কণ্ঠস্বরে এক ধরনের আশা ছিল—যেন সে চাইছিল, অদিতি তাকে ক্ষমা করুক, বুঝুক।
“হ্যাঁ,” অদিতি বলল, “কিন্তু আলাদা নৌকায়। জয়ন্তদার সঙ্গে।”
সায়ন মাথা নাড়ল। হয়তো বুঝল, হয়তো বুঝল না।
তারা রওনা দিল—তিনটি নৌকা, অন্ধকার জলে, নিঃশব্দে। শুধু দাঁড়ের শব্দ, জলে ডুব দেওয়া, তোলা, আবার ডুব দেওয়া। একটা শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো ছন্দ।
অদিতি তার নৌকায় বসে ছিল, হাতে একটা ছোটো মাপযন্ত্র—শব্দতরঙ্গ মাপার জন্য। তার লক্ষণবোধ সক্রিয় ছিল, প্রতিটি শব্দ একটা রঙে, একটা আকারে রূপান্তরিত হচ্ছিল। অন্ধকার ছিল গভীর বেগুনি। জলের শব্দ ছিল নীল। আর দূরে, খুব ক্ষীণ, একটা সবুজাভ আভা—আলেয়া।
তারা সেই জায়গায় পৌঁছোল, যেখানে আলেয়া সব চেয়ে বেশি দেখা যায়। জোয়ার ছিল একদম নীচে—জল এত কম যে ম্যানগ্রোভের শেকড় প্রায় সম্পূর্ণ দেখা যাচ্ছিল, যেন হাড়ের কাঠামো উন্মোচিত।
সায়নের দল তাদের যন্ত্রপাতি সাজাতে শুরু করল। পরিস্রাবণের যন্ত্র, জল তোলার পাম্প, বড়ো বড়ো পাত্র।
“শুরু করো।” মীনাক্ষী নির্দেশ দিলেন।
পাম্প চালু হল—একটা যান্ত্রিক গুনগুন শব্দ, যা এই নীরবতায় প্রায় চিৎকারের মতো শোনাল।
আর তৎক্ষণাৎ—
জল নড়ে উঠল। না, শুধু নড়ল না। জ্বলে উঠল।
শত শত, হাজার হাজার আলোর বিন্দু—আলেয়া—জলের উপর ভেসে উঠল। এত বেশি যে পুরো জায়গাটা উজ্জ্বল হয়ে গেল, প্রায় দিনের আলোর মতো। নীল-সবুজ, নীলাভ, কখনও রুপোলি—আলো নাচছিল, ঘুরছিল, একটা জটিল কারুকাজ তৈরি করছিল।
অদিতির সিনেস্থেশিয়ায় সে শুনতে পেল—একটা বিশাল, গগনবিদারী গর্জন। না, গর্জন নয়। একটা গান। হাজার হাজার কণ্ঠস্বর, একসঙ্গে।
**“থামো। থামো। থামো।”**
সায়নের দল থামল না। তারা দ্রুততর হল। পাম্প জোরে চালাল। জল তুলতে লাগল, তার সঙ্গে লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র জীব—আলোর প্রাণীরা।
আলেয়ার প্যাটার্ন বদলাল। এখন তারা আর সুন্দর নয়। তারা উগ্র, বিক্ষুব্ধ। আলো হয়ে উঠল লাল, তারপর কমলা, তারপর প্রায় সাদা—ক্রোধের রং।
এবং বন সাড়া দিল।
প্রথমে এল শব্দ—একটা নীচু গর্জন, চারপাশ থেকে। তারপর জলে আলোড়ন। কিছু একটা সাঁতার কাটছে। বড়ো। দ্রুত।
“কুমির!” একজন চিৎকার করে উঠল।
একটা বিশাল কুমির জলের উপর উঠে এল, তার লাল চোখ জ্বলছিল প্রতিফলিত আলেয়ার আলোয়। সে একটা নৌকার দিকে ছুটে গেল—সায়নের নৌকা নয়, অন্যটা, যেখানে দুই কর্মী এবং পাত্রগুলো ছিল।
ল্যাজ দিয়ে আঘাত করল নৌকায়।
নৌকা কাঁপল, একপাশে কাত হল। একজন জলে পড়ে গেল, চিৎকার করতে করতে। “ওকে তোলো!” মীনাক্ষী চিৎকার করলেন।
কিন্তু তারপর—
আরেকটা শব্দ। ভূমি থেকে। গর্জন। গভীর, আদিম। বাঘ।
একটা রয়াল বেঙ্গল টাইগার, জলের ধারে দাঁড়িয়ে, তার ডোরাকাটা শরীর আলেয়ার আলোয় উজ্জ্বল, তার চোখ সোনালি-হলুদ। সে তাকিয়ে ছিল সায়নের দিকে—একদৃষ্টে, নিশ্চল।
তারপর সে জলে নামল। ধীরে ধীরে, পা ফেলে ফেলে, ঢেউ তৈরি করে।
“পিছিয়ে যাও,” সায়ন ফিশফিশ করল, কিন্তু তার কণ্ঠস্বরে আতঙ্ক ছিল, “নৌকা ঘোরাও—” কিন্তু মাঝি ভয়ে জমে গিয়েছিল।
বাঘ আরও কাছে এল।
এবং অদিতি বুঝল, এটা সতর্কবার্তা নয়। এটা শিকার।
“না!” সে চিৎকার করল। জয়ন্তকে বলল, “আমাকে কাছে নিয়ে যাও।”
“কিন্তু—”
“এখনই!”
জয়ন্ত দাঁড় বাইলেন। নৌকা এগিয়ে গেল সায়নের নৌকার কাছে, বাঘ এবং আলেয়ার মাঝখানে।
অদিতি দাঁড়িয়ে পড়ল নৌকায়, তার ভারসাম্য কাঁপছিল, কিন্তু সে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত ছড়িয়ে দিল আলেয়ার দিকে।
“থামো।” সে বলল—না সায়নকে, না বাঘকে। আলেয়াকে। “দয়া করে। থামো।”
তার সিনেস্থেশিয়ার দিয়ে সে একটা সুর পাঠাল—একটা শান্ত, করুণ সুর। তার মায়ের প্রিয় গান। **‘আমার সোনার বাংলা…’**
আলেয়া থামল। তাদের প্যাটার্ন বদলাল। লাল থেকে কমলা। কমলা থেকে হলুদ। হলুদ থেকে সবুজ।
এবং সে শুনতে পেল—স্পষ্ট, নিঃসন্দেহ—
**“অদি।”** মায়ের কণ্ঠস্বর।
“মা,” সে ফিশফিশ করল, চোখ ভিজে আসছিল, “মা, দয়া করে। ওদের ক্ষতি কোরো না।”
**“তারা আমাদের নিতে চায়। আমাদের শেষ করতে চায়।”**
“আমি জানি। কিন্তু… হত্যা করা সমাধান নয়। তুমি আমাকে এটা শেখাওনি?”
একটা নীরবতা। আলেয়া কাঁপল, যেন দোদুল্যমান।
তারপর—
**“তুমি কী চাও, অদি? তুমি কি সত্যিই চাও?”**
অদিতি গভীর নিশ্বাস নিল। এই প্রশ্ন নীলাঞ্জনাও করেছিল, জয়ন্তও করেছিলেন। আর এখন তার মা।
“আমি চাই,” সে ধীরে বলল, “তোমাকে তোমার মতো করে ছেড়ে দিতে। আমি চাই… শান্তি। তোমার জন্য, আমার জন্য। আর আমি চাই, এই জায়গা বাঁচুক। তোমার স্মৃতি বাঁচুক। কিন্তু বাঁচুক এখানে, এই জলে, এই আলোয়—কোনো পরীক্ষাগারে নয়।”
**“তাহলে তাদের থামাও।”**
“কীভাবে?”
**“তাদের দেখাও। যা আমরা। যা হারাবে।”** অদিতি বুঝল। সে ঘুরে তাকাল সায়নের দিকে, মীনাক্ষীর দিকে।
“তোমরা দেখছ?” সে বলল, “তোমরা দেখছ এই আলো? এটা শুধু আলোক রাসায়নিক ঘটনা নয়। এটা চেতনা। এটা স্মৃতি। এটা… জীবন। এবং তোমরা যদি এটা নাও, তোমরা শুধু ক্ষুদ্র জীব নিচ্ছ না। তোমরা… তোমরা একটা সভ্যতা ধ্বংস করছ।”
“এটা প্রলাপ,” মীনাক্ষী বললেন, “এগুলো এককোশী প্রাণী—”
“তাহলে ব্যাখ্যা করো,” অদিতি বলল, “ব্যাখ্যা করো, কীভাবে তারা একসঙ্গে চলে। কীভাবে তারা সাড়া দেয়। কীভাবে তারা… ডাকে। তুমি শুনতে পাচ্ছ না?”
“আমি শুনছি না কিছু—”
“কারণ, তোমার সিনেস্থেশিয়া নেই,” অদিতি বলল, “কিন্তু আমার আছে। আর আমি শুনছি। আমি শুনছি হাজার হাজার কণ্ঠস্বর, যারা এই বনে মরেছে। যাদের শেষনিশ্বাস এই জলে মিশে গেছে। যারা এখন… থেকে গেছে। প্রতিধ্বনি হয়ে। এবং তুমি যদি এটা নাও—” তার কণ্ঠস্বর ভেঙে গেল—“তুমি তাদের আবার মারছ। চিরতরে।”
সায়ন তার দিকে তাকাল। তার মুখে দ্বন্দ্ব—বিজ্ঞান এবং মানবিকতার দ্বন্দ্ব।
“অদিতি…” সে ধীরে বলল, “আমি… আমি জানি না—”
“তুমি জানো,” অদিতি বলল, “তুমি সব কিছু জেনেছ। তুমি শুধু… দেখতে চাওনি।”
একটা দীর্ঘ নীরবতা। বাঘ এখনও জলে দাঁড়িয়ে, তার শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী। কুমির ভেসে আছে, নড়ছে না। আলেয়া অপেক্ষা করছে।
তারপর মীনাক্ষী বললেন, “আমাদের আদেশ আছে। আমাদের কাজ করতে হবে।”
সে পাম্প আবার চালু করলেন।
আর বন—বন ফেটে পড়ল।
বাতাস উঠল এত জোরে যে, নৌকাগুলো দুলে উঠল। গাছ থেকে পাতা ঝরল, ঝড়ের মতো। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাল—অমাবস্যার রাতে, কোনো মেঘ ছাড়াই।
এবং আলেয়া—
আলেয়া এমন উজ্জ্বল হয়ে উঠল যে, প্রায় তাকানো যাচ্ছিল না। তারা ঘুরতে লাগল, দ্রুততর, একটা ঘূর্ণিঝড়ের মতো। আর সেই ঘূর্ণির কেন্দ্রে—
একটা আকৃতি। মানুষের আকৃতি। আলো দিয়ে তৈরি।
একজন নারী। হলুদ শাড়ি। হাতে একটা মাছ ধরার জাল। অদিতির মা।
না—শুধু তার মা নয়। অনেকে। একের পর এক আকৃতি ভেসে উঠছিল আলোয়—জেলে, কৃষক, মা, শিশু। যারা এই বনে মরেছে। যারা থেকে গেছে।
এবং তারা সবাই বলল, একসঙ্গে:
**“আমরা এখানে আছি। আমরা সব সময় ছিলাম। আমরা সব সময় থাকব। তোমরা আমাদের নিতে পারো না। কারণ, আমরা… আমরা এই জায়গা। আমরা এই জল। আমরা এই আলো। আমরা সুন্দরবন।”**
মীনাক্ষী পিছিয়ে গেলেন, তাঁর মুখে আতঙ্ক। “এটা… এটা কী?”
“সত্য,” অদিতি ফিশফিশ করল, “যা তুমি দেখতে চাওনি।”
সায়ন তাকাল আকৃতিগুলোর দিকে। তারপর অদিতির দিকে। তারপর তার নিজের হাতের দিকে, যা কাঁপছিল।
“থামাও।” সে ফিশফিশ করল।
“কী?” মীনাক্ষী বললেন।
“পাম্প থামাও,” সায়ন জোরে বলল, “এখনই।”
“কিন্তু—”
“এখনই!” সে চিৎকার করল।
পাম্প বন্ধ হল।
ধীরে ধীরে বাতাস শান্ত হল। বিদ্যুৎ থামল। আকৃতিগুলো ঝাপসা হয়ে গেল, তারপর বিলুপ্ত। শুধু থেকে গেল আলেয়া—এখন শান্ত, ছন্দবদ্ধ, সুন্দর।
বাঘটা ঘুরে চলে গেল, জল থেকে উঠে বনের মধ্যে অদৃশ্য হল। কুমির ডুব দিল জলের মধ্যে।
অদিতি বসে পড়ল নৌকায়, সারা শরীর কাঁপছিল। সে কাঁদছিল, কিন্তু জানত না কেন। দুঃখে? স্বস্তিতে? ভালোবাসায়? “মা,” সে ফিশফিশ করল, “আমি… আমি বিদায় নিচ্ছি।”
আলেয়া একবার জ্বলল, তারপর নিবল। একবার। শেষবার।
**“বিদায়, আমার অদি। বেঁচে থাকো। আমাদের জন্য বেঁচে থাকো।”**
তারপর—শুধু অন্ধকার। নিঃশব্দ, শান্তি। জোয়ার ফিরছিল।
অধ্যায় ৬: জোয়ার ফেরা
ভোর যখন আকাশের কিনারায় প্রথম ফিকে আলো ছড়াতে শুরু করেছিল, তখন তিনটি নৌকা ধীরে ধীরে ফিরছিল সেই জলাভূমি থেকে, যেখানে রাতের সমস্ত ঘটনা ঘটে গেছে, যেখানে জীবন এবং মৃত্যুর সীমারেখা মুছে গিয়ে একাকার হয়ে গিয়েছিল আলো এবং অন্ধকারের মধ্যে। কেউ কথা বলছিল না, কারণ যা ঘটেছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো শব্দ খুঁজে পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব, আর যে নীরবতা তাদের চারপাশে জড়িয়ে ছিল, সেটা ছিল এমন এক ধরনের পবিত্র নীরবতা, যা মন্দিরে কিংবা শ্মশানে পাওয়া যায়, যেখানে মানুষের ক্ষুদ্রতা এবং মহাবিশ্বের বিশালতা একই সঙ্গে উপলব্ধি হয়।
অদিতি বসেছিল জয়ন্তর নৌকায়, তার দৃষ্টি স্থির ছিল পিছনের দিকে, যেখানে এখনও ম্লান আলোয় ম্যানগ্রোভের কালো ছায়া দেখা যাচ্ছিল, যেখানে আলেয়ারা এখন ঘুমিয়ে পড়েছে ভোরের আগমনে, যেখানে তার মায়ের শেষ বার্তা এখনও তার কানে বাজছিল একটা মৃদু প্রতিধ্বনি হয়ে। তার গাল বেয়ে জল পড়ছিল, কিন্তু সে মুছছিল না, কারণ এই কান্না ছিল শোকের নয়, বরং মুক্তির, এক ধরনের পরিশুদ্ধির, যেন তিন বছর ধরে বয়ে-বেড়ানো বোঝা শেষমেশ মাটিতে নামিয়ে রাখার পর যে হালকা অনুভূতি হয়, তেমন কিছু। তার মা চলে গেছে, সত্যি, কিন্তু এখন সে যেন অনুমতি পেয়েছে সেই চলে যাওয়াকে মেনে নেওয়ার, সেই শূন্যতার সঙ্গে বসবাস করার, আর সেই শূন্যতাকে ধীরে ধীরে ভরে তোলার নতুন স্মৃতি দিয়ে, নতুন ভালোবাসা দিয়ে, নতুন উদ্দেশ্য দিয়ে।
পাশের নৌকায় সায়ন বসে ছিল মাথা নীচু করে, তার হাত দুটো তার কোলে জড়ো করা, আর তার চোখের দিকে তাকালে দেখা যেত এক ধরনের ক্লান্তি, যা শুধু শরীরের নয়, বরং আত্মারও, যেন গত রাতে সে যা দেখেছে, তা তার বিশ্বাসের মূলভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। মীনাক্ষী এবং তার দলের অন্য সদস্যরা চুপ করে বসে ছিল, তাদের মুখে এখন আর সেই দৃঢ়তা ছিল না, যা তারা নিয়ে এসেছিল, বরং একটা অনিশ্চয়তা, একটা দ্বিধা, যেন তারা বুঝতে পারছে না, ঠিক কী ঘটেছে, কিন্তু জানে যে, যা ঘটেছে, তা তাদের পরিকল্পনা থেকে অনেক বড়ো, অনেক গভীর, অনেক বেশি রহস্যময়। তাদের সংগ্রহের পাত্রগুলো ফাঁকা পড়ে ছিল নৌকার তলায়, আর সেই ফাঁকা পাত্রগুলো ছিল এক ধরনের স্বীকারোক্তি যে, কিছু জিনিস সত্যিই নেওয়া যায় না, কিছু রহস্য সত্যিই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে।
নীলাঞ্জনা তার চলচ্চিত্রধারণ যন্ত্রটা বন্ধ করে ফেলেছিল কখন, সে নিজেও জানত না, কারণ গত রাতের কিছু মুহূর্ত এমন ছিল, যা ধারণ করা যায় না কোনো যন্ত্রে, যা শুধুমাত্র হৃদয়ে ধারণ করা যায়, আর সে বুঝেছিল যে, সব কিছু রেকর্ড করার চেষ্টা করা কখনো-কখনো সেই অভিজ্ঞতাকেই নষ্ট করে দেয়, যেভাবে একটা প্রজাপতিকে পিনে আটকে ফেললে তার উড়ে যাওয়ার সৌন্দর্য হারিয়ে যায়। তার মনে পড়ছিল তার ভাই রোহণের কথা, আর সে ভাবছিল যে, হয়তো সত্যিই মৃত্যুর পর কোনো না কোনোভাবে একটা ধারাবাহিকতা থাকে, হয়তো সত্যিই চেতনা কোনো না কোনো রূপে টিকে থাকে, কিন্তু সেই টিকে থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হল—যারা বেঁচে আছে, তারা কীভাবে সেই মৃত্যুর সঙ্গে মানিয়ে নেয় আর এগিয়ে যায়।
জয়ন্ত দাঁড় বাইছিলেন নীরবে, তাঁর মুখে একটা শান্ত হাসি, যেন তিনি ঠিক এটাই আশা করেছিলেন, যেন তিনি জানতেন, শেষ পর্যন্ত বন নিজেকে রক্ষা করবে, যেভাবে সে হাজার বছর ধরে করে এসেছে, আর মানুষ বুঝবে নাকি বুঝবে না, সেটা বনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হল—বন টিকে থাকবে, সেই সমস্ত জীবন আর মৃত্যুর চক্র চলতে থাকবে, আর যারা এই বনে মরেছে, তারা থেকে যাবে এখানে, আলো হয়ে, জল হয়ে, কাদা হয়ে, ম্যানগ্রোভ হয়ে, বাঘ হয়ে, চিরকাল।
***
সাতজেলিয়া গ্রামে ফিরে এসে তারা তাদের জিনিসপত্র গোছাতে শুরু করল, কিন্তু সেই গোছানোর মধ্যেও এক ধরনের অনিচ্ছা ছিল, যেন এই জায়গা ছেড়ে যাওয়ার মানে হল এক ধরনের জাদুকরি মুহূর্তের সমাপ্তি, এমন একটা অভিজ্ঞতার সমাপ্তি, যা হয়তো আর কখনও ফিরে আসবে না। মীনাক্ষী এবং তার দল দ্রুত প্রস্থান করল, খুব কম কথা বলে, তাদের মুখে একটা লজ্জা ছিল, একটা অপরাধবোধ ছিল, আর তারা যাওয়ার সময় জয়ন্তর দিকে মাথা নত করেছিল, যেন ক্ষমা চাইছিল তাদের উদ্দেশ্যের জন্য, যদিও তারা মুখে কিছু বলেনি।
সায়ন থেকে গেল, কারণ তার অদিতির সঙ্গে কথা বলার ছিল। এমন কিছু কথা, যা সে বলতে চাইছিল, কিন্তু ভাষা খুঁজে পাচ্ছিল না। আর শেষ পর্যন্ত যখন তারা দুজন একা দাঁড়িয়ে ছিল বনবিবির মন্দিরের সামনে, তখন সে বলল, “আমি দুঃখিত,” এবং সেই দুই শব্দে এত ওজন ছিল, এত অনুশোচনা ছিল যে, অদিতি বুঝতে পারল এটা শুধু গতকালের ঘটনার জন্য নয়, এটা তিন বছর আগে তাদের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার জন্য, এটা তার মায়ের মৃত্যুর সময় তার পাশে না-থাকার জন্য, এটা এই পুরো অভিযানে তাকে ব্যবহার করার জন্য, আর সব মিলিয়ে এটা তার নিজের মানবিকতাকে বিজ্ঞানের নামে ভুলে যাওয়ার জন্য।
“আমি জানি।” অদিতি উত্তর দিল, আর তার কণ্ঠস্বরে কোনো রাগ ছিল না, কোনো ক্ষোভ ছিল না, শুধু একটা ক্লান্ত বোঝাপড়া ছিল, একটা গ্রহণযোগ্যতা ছিল যে, মানুষ ভুল করে, মানুষ পথ হারায়, কিন্তু কখনো-কখনো তারা ফিরেও আসে। “আর আমি ক্ষমা করছি।” সে যোগ করল, কারণ ক্ষমা করা মানে অন্যের জন্য উপহার নয়, বরং নিজের জন্য মুক্তি, নিজের হৃদয়কে ঘৃণা এবং ক্ষোভের বোঝা থেকে মুক্ত করা।
সায়ন মাথা নাড়ল, তারপর বলল, “তুমি কী করবে এখন?”
“ফিরে যাব কলকাতায়,” অদিতি বলল, “আর গবেষণা চালিয়ে যাব, কিন্তু এবার অন্যভাবে, এবার আরও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে, এবার বুঝে নিয়ে যে বিজ্ঞান শুধু জ্ঞান আহরণ নয়, বিজ্ঞান হল সেই জ্ঞানকে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সেই দায়িত্বও। আর আমি নিশ্চিত করব,” সে দৃঢ়ভাবে বলল, “যে এই জায়গা, এই আলেয়া, এই জোয়ারভাটার চেতনা—যাকেই আমরা নাম দিই-না কেন—সুরক্ষিত থাকে, যে-কেউ এখানে আসতে পারবে না শোষণ করতে, যে এই জায়গা থাকবে যেমন আছে, একটা পবিত্র স্থান হিসেবে, একটা রহস্য হিসেবে, যা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।”
সায়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর বলল, “আমিও সাহায্য করব, যদি তুমি চাও। আমি আমার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলব, আমি নিশ্চিত করব যে, তারা এখানে আর আসবে না, আর আমি অন্য বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলব, তাদের বোঝাব যে, কিছু জিনিস আছে, যা আমাদের বোঝার চেষ্টা করা উচিত, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা উচিত নয়।”
অদিতি হাসল, প্রথমবারের মতো অনেকদিন পর একটা সত্যিকারের হাসি, আর বলল, “তাহলে হয়তো এই যাত্রা পুরোপুরি বৃথা যায়নি।”
তারা হাত মেলাল, আর সেই হাত মেলানোয় ছিল একটা নতুন শুরুর প্রতিশ্রুতি, না রোমান্টিক সম্পর্কের, বরং সহকর্মিতার, পারস্পরিক শ্রদ্ধার, এবং একটা সাধারণ উদ্দেশ্যের প্রতি অঙ্গীকারের।
***
বিকেলবেলা অদিতি এবং নীলাঞ্জনা শেষবারের মতো গেল সেই জলাভূমিতে, জয়ন্তর সঙ্গে, কিন্তু এবার শুধু বিদায় নিতে, শুধু কৃতজ্ঞতা জানাতে। তারা বসল নৌকায়, সূর্য ডুবছিল ম্যানগ্রোভের পিছনে, আকাশ রাঙা হয়ে উঠছিল কমলা এবং গোলাপি রঙে, আর জল ছিল শান্ত, স্থির, যেন কিছুই ঘটেনি, যেন গত রাতের সমস্ত উত্তেজনা ছিল স্বপ্ন।
কিন্তু অদিতি জানত, এটা স্বপ্ন ছিল না, কারণ তার বুকের ভিতরে একটা পরিবর্তন হয়েছে, একটা রূপান্তর হয়েছে, যা কখনও ফিরবে না পুরোনো অবস্থায়। সে এখন আর সেই মেয়ে নয়, যে তিন বছর আগে তার মা-কে হারিয়েছিল আর সেই শোকের ভিতরে হারিয়ে গিয়েছিল, আর সে এখন সেই নারী, যে শিখেছে যে ভালোবাসা মানে শুধু ধরে রাখা নয়, ভালোবাসা মানে ছেড়ে দেওয়াও, ভালোবাসা মানে স্মৃতিকে বয়ে নিয়ে চলা, কিন্তু সেই স্মৃতির ভারে পঙ্গু হয়ে না-পড়া।
“তুমি ফিরবে?” জয়ন্ত জিজ্ঞেস করলেন।
অদিতি ভাবল কিছুক্ষণ, তারপর বলল, “হয়তো, একদিন, কিন্তু সেটা হবে শুধু দেখা করতে, শুধু মনে করিয়ে দিতে নিজেকে যে, এই জায়গা আছে, যে, এই রহস্য আছে, যে জীবন এবং মৃত্যুর মধ্যে সীমারেখা যতটা স্পষ্ট আমরা ভাবি, ততটা স্পষ্ট নয়। কিন্তু আমি আর আসব না কথা বলতে,” সে স্বীকার করল, “কারণ আমার মা এখন আমার ভিতরে আছে, আমার স্মৃতিতে আছে, আমার প্রতিটি সিদ্ধান্তে আছে, যা আমি নিই তার শেখানো মূল্যবোধ থেকে, আর আমার তাকে খুঁজতে হবে না এই আলোয়, কারণ সে তো সব সময়ই আমার সঙ্গে আছে।”
জয়ন্ত মাথা নাড়লেন, আর তাঁর চোখে একটা জ্ঞানী বৃদ্ধের সন্তুষ্টি ছিল, যেন তিনি শিক্ষক আর অদিতি ছাত্রী, আর শেষ পরীক্ষায় ছাত্রী উত্তীর্ণ হয়েছে।
সূর্য ডুবে গেল পুরোপুরি, আর সন্ধ্যা নামল, কিন্তু আজ কোনো আলেয়া জ্বলল না, কারণ এখন জোয়ার ছিল মাঝামাঝি, সেই সময় যখন তারা ঘুমোয়, যখন তারা বিশ্রাম নেয়, যখন তারা অপেক্ষা করে, পরবর্তী অমাবস্যার জন্য যখন আবার তারা জেগে উঠবে, আবার নাচবে, আবার ডাকবে।
নৌকা ফিরল গ্রামে, আর তারা প্রস্তুত হল চলে যাওয়ার জন্য।
***
ছয় মাস পরে কলকাতায়, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা সভাকক্ষে অদিতি উপস্থাপনা করছিল তার নতুন গবেষণাপত্র—‘জৈবিক কোয়ান্টাম সংযোগ এবং সমষ্টিগত চেতনা: সুন্দরবনের জ্যোতিষ্ক প্রাণীদের একটি অধ্যয়ন’। সভাকক্ষ ভরতি ছিল। বিজ্ঞানী, শিক্ষক, ছাত্র—সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছিল, কেউ কেউ সংশয়ী, কেউ কেউ মুগ্ধ, আর অদিতি ব্যাখ্যা করছিল, কীভাবে এককোশী প্রাণীরা কোয়ান্টাম জড়াজড়ির মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করতে পারে, কীভাবে তারা মৃত প্রাণীদের জেনেটিক তথ্য ধারণ করতে পারে, কীভাবে তারা একটা বিতরিত চেতনা তৈরি করতে পারে, কিন্তু সে খুব সাবধানে এড়িয়ে গেল সেই সমস্ত ব্যক্তিগত অংশ, সেই সমস্ত রহস্যময় অভিজ্ঞতা, যা বিজ্ঞানের ভাষায় ধরা যায় না।
তার গবেষণাপত্রের শেষে সে সুপারিশ করল যে সুন্দরবনের নির্দিষ্ট অঞ্চলগুলো সুরক্ষিত ঘোষণা করা উচিত, যে সেখানে কোনো বাণিজ্যিক কার্যকলাপ হওয়া উচিত নয়, যে এই প্রাকৃতিক ঘটনা টিকে থাকা উচিত যেমন আছে, মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়া। আর যখন সভা শেষ হল, বেশ কিছু মানুষ এগিয়ে এল তার সঙ্গে কথা বলতে, কেউ প্রশংসা করল, কেউ প্রশ্ন করল, আর একজন বলল যে, তিনি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে কথা বলবেন সুরক্ষার ব্যাপারে।
নীলাঞ্জনার তথ্যচিত্র মুক্তি পেয়েছিল দু-মাস আগে, ‘আলোর ভাষা’ নামে, আর এটা বেশ প্রশংসিত হয়েছিল, বিশেষ করে তার সংবেদনশীল উপস্থাপনার জন্য, যেখানে সে দেখিয়েছিল, কীভাবে স্থানীয় মানুষরা আলেয়ার সঙ্গে সহাবস্থান করে, কীভাবে তারা এটাকে শুধু একটা প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং একটা আধ্যাত্মিক উপস্থিতি হিসেবে দ্যাখে, আর কীভাবে আধুনিক বিজ্ঞান এবং প্রাচীন বিশ্বাস একসঙ্গে মিলতে পারে একটা গভীর সত্যকে বোঝার জন্য।
সায়ন তার প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দিয়েছিল আর এখন কাজ করছিল একটা অলাভজনক সংস্থার সঙ্গে, যারা জৈবনৈতিকতা নিয়ে কাজ করে, যারা নিশ্চিত করতে চায় যে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয় নৈতিক সীমার মধ্যে। সে মাঝে মাঝে অদিতিকে ফোন করত, তাদের কথা হত কাজ নিয়ে, আর ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে একটা নতুন বন্ধুত্ব তৈরি হচ্ছিল, যেটা তাদের পুরোনো সম্পর্কের থেকে আলাদা, কিন্তু তার নিজস্ব মূল্য ছিল।
***
এক বছর পরে, অমাবস্যার রাতে, অদিতি একা দাঁড়িয়ে ছিল তার ল্যাবে, তার হাতে একটা ছোটো কাচের পাত্র, যার ভিতরে সুন্দরবন থেকে আনা জলে কিছু জ্যোতিষ্ক প্রাণী বেঁচে ছিল। সে পাত্রটা আলতো করে নাড়া দিল, আর তৎক্ষণাৎ আলো জ্বলে উঠল—নীল-সবুজ, সুন্দর, পরিচিত। তার সিনেস্থেশিয়ার সে শুনতে পেল একটা মৃদু সুর, একটা গুনগুন, যেন কেউ অনেক দূর থেকে কথা বলছে।
সে চোখ বন্ধ করল, আর মনে মনে বলল, “নমস্কার, মা,” কারণ এখন সে জানত যে, তার মা সর্বত্র আছে—এই আলোয়, এই বাতাসে, এই প্রতিটি স্মৃতিতে, যা সে বয়ে নিয়ে চলে, আর সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, তার নিজের হৃদয়ে, তার নিজের সত্তায়, যে মানুষ সে হয়ে উঠছে তার মায়ের শেখানো মূল্যবোধ থেকে।
আলো একবার জ্বলল, তারপর নিবল, তারপর আবার জ্বলল—একটা ছন্দে, একটা প্রতিক্রিয়ায়, যেন বলছে, “আমি এখানে আছি, আমি সব সময় ছিলাম, আমি সব সময় থাকব।”
আর অদিতি হাসল, কান্নার বদলে, কারণ সে শিখেছিল যে, কিছু সংযোগ কখনও ছিন্ন হয় না, শুধু রূপান্তরিত হয়, কিছু ভালোবাসা কখনও শেষ হয় না, শুধু গভীরতর হয়, আর কিছু বিদায় আসলে বিদায় নয়, বরং একটা নতুন ধরনের উপস্থিতির শুরু।
বাইরে, শহরের আলোরা জ্বলছিল লক্ষ লক্ষ, কিন্তু অদিতির কাছে সব চেয়ে উজ্জ্বল আলো ছিল এই ছোটো কাচের পাত্রে, যেখানে জোয়ারের স্মৃতি বেঁচে ছিল, যেখানে জীবন এবং মৃত্যু একসঙ্গে নাচছিল, যেখানে অতীত এবং বর্তমান মিলে গিয়েছিল এক চিরন্তন ক্ষণে।
আর সে বুঝল, এটাই তো জীবন। এই চলমানতা। এই রূপান্তর। এই অনন্ত প্রবাহ, যেখানে কিছুই হারায় না, শুধু পরিবর্তিত হয়, যেখানে প্রতিটি সমাপ্তি একটা নতুন শুরু, যেখানে প্রতিটি বিদায় একটা পুনর্মিলনের প্রতিশ্রুতি বহন করে।
জোয়ার ফিরে আসে। সব সময়। চিরকাল।
Tags: অরিৎ চক্রবর্তী, একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা
