পাঠ প্রতিক্রিয়া: বিজ্ঞাননির্ভর অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ১ (সেজান মাহমুদ)
লেখক: অনির্বাণ ঘোষ (দীপ)
শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব
🖌️ প্রচ্ছদ: উজ্জ্বল ঘোষ
🖨️ প্রকাশক: কল্পবিশ্ব পাবলিকেশনস
📄 পৃষ্ঠা: ১৯২
💰 মুদ্রিত মূল্য: ₹৩৫০/- (হার্ডবাউন্ড)
🍂 বিষয়বস্তু:
মার্কিন প্রবাসী সেজান মাহমুদ বর্তমান যুগের বাংলা সাহিত্যে এক জনপ্রিয় নাম, যিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে ছোটোবড়ো সব বয়সি পাঠকের মনে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখার পাশাপাশি বিজ্ঞাননির্ভর অ্যাডভেঞ্চার সিরিজ় শুরু করেছিলেন সেই ১৯৯২ সাল থেকে।
এই সিরিজ়ের প্রথম গ্রন্থ ‘দ্বীপ পাহাড়ের আতঙ্ক’। প্রাকৃতিক উৎস সামুদ্রিক গ্যাস থেকে শক্তি উৎপাদনের যে কথা এখন পত্রপত্রিকায় দেখা যাচ্ছে, সেই গ্যাস হাইড্রেড নিয়ে ১৯৯২ সালেই লিখেছিলেন ‘দ্বীপ পাহাড়ের আতঙ্ক’; এক ক্ষমতালোভী বিজ্ঞানীর কুপরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন ছোটকা আর নিশু, বাংলাদেশের মাটিতে, মহেশখালির দ্বীপে।
ছোটকা-নিশুর অ্যাডভেঞ্চার দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘তুষারমানব’ প্রথম প্রকাশিত হয় বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘ধান শালিকের দেশ’ পত্রিকা এবং গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে। অস্ট্রিয়ার হিমবাহের নীচে খুঁজে-পাওয়া প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো মানুষের মৃতদেহ নিয়ে এক রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাসের মধ্যে তুলে আনা হয়েছে মানুষের জেনেটিক বা বংশগতিবিদ্যার সুকঠিন বিষয় একেবারে কিশোর মনের উপযোগী করে। এরকম আধুনিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, বাস্তববাদিতা আর কল্পনার বিশালতা নিয়ে সচেতনভাবে লেখার কাজ বাংলা শিশু-কিশোরসাহিত্যে খুব কম লেখকই করেছেন। আর স্বতন্ত্র স্বাদু গদ্যের অধিকারী এবং নিজে চিকিৎসাবিজ্ঞানী হওয়ায় এক অনায়াস সহজিয়ায় এই গুরুগম্ভীর বিষয়গুলো আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করেন তিনি।
নিজস্ব উচ্চশিক্ষা আর পেশার কারণে দীর্ঘ বিরতি হলেও আবার ছোটকা-নিশুর অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে তিনি হাজির হয়েছেন পাঠকের সামনে; এবারে একেবারে আনকোরা নতুন উপন্যাস ‘ফেসবুকের বন্ধু’ নিয়ে। এই উপন্যাসেও উঠে এসেছে আধুনিকতম বিষয়—বায়োটেররিজ়্ম।
এই তিনটি উপন্যাস নিয়ে ‘বিজ্ঞাননির্ভর অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ১’। বাংলা শিশু-কিশোরসাহিত্যে এই গ্রন্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
এতে রয়েছে:
গল্প
📌 দ্বীপ পাহাড়ের আতঙ্ক
📌 তুষারমানব
📌 ফেসবুকের বন্ধু
🍁 প্রতিক্রিয়া:
📌 দ্বীপ পাহাড়ের আতঙ্ক
ছোটকা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার, আর নিশু ঠিক তোমাদেরই বয়সি। বয়সের বিস্তর দূরত্ব সত্ত্বেও তুমুল সখ্য দুজনের। কক্সবাজার-মহেশখালি এলাকার রাখাইনদের উপর এক গবেষণার জন্য গেলেন সেখানে। বাড়তি পাওনা রাতের সমুদ্র, দ্বীপের মোহনীয় হাতছানিতে ভ্রমণ। কিন্তু যাওয়ার আগে ছোটকার বন্ধুর সাধারণ দুর্ঘটনা, যা টেলিফোনে কক্সবাজার থেকে জানানো হয়েছিল, তা যেন ক্রমশ রহস্যময় হয়ে উঠছে। নির্জন সি-বিচে নিশু চিৎকার করে ওঠে, লাশ ফুলে ঢোল হয়ে আছে। মহেশখালি দ্বীপের আশপাশে ঘটছে ব্যাখ্যাহীন সব ঘটনা। প্রচণ্ড জলের তোড়ে উলটে যাচ্ছে ট্রলার, নৌকা, স্পিডবোট। আদিনাথের মন্দিরে রাতে দেখা যায় আগুনে ভূত। এই সুন্দর দ্বীপে কোন অশুভশক্তি? কোন অশান্ত আত্মা? সমুদ্রের কোন নাম-না-জানা আজব প্রাণী? দ্বীপবাসীর তা-ই বিশ্বাস। বিজ্ঞানমনস্ক ছোটকার সিদ্ধান্ত, ভাঙতে হবে এই অন্ধবিশ্বাসকে। কিন্তু কাজটা সহজ নয়—জীবনের উপর হুমকি, আঘাত। রহস্যের জট খুলতে গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন ছোটকা। কী ঘটছে এখানে? ছোটকার মতো বিজ্ঞানীও বিস্ময়ে হতবাক।
কল্পবিজ্ঞানের কৌতূহল-রোমাঞ্চের স্বাদের সঙ্গে গা-ছমছম রহস্যের দুর্দান্ত মিশেলে এক চমকপ্রদ কাহিনি শুনিয়েছেন কুশলী লেখক সেজান মাহমুদ।
ছোটকা আর নিশুর অ্যাডভেঞ্চারের প্রথম কাহিনি তোমাদেরই জন্যে।
📌 তুষারমানব
অস্ট্রিয়ার ইন্সব্রুক শহরের কাছে আল্পস পর্বতের বরফের নীচে পাওয়া গিয়েছিল পৃথিবীর সব চেয়ে প্রাচীন মানুষের মৃতদেহ। সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো ‘তুষারমানব’। এ তুষারমানবের দেহ পরীক্ষার জন্য ডাক পড়ল বাংলাদেশের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার ডক্টর হাসান, মানে ছোটকার। আর ছোটকা যেখানেই, সেখানেই ঘটনাক্রমে সঙ্গী নিশু। কিন্তু সেই ‘তুষারমানব’-এর দেহ পরীক্ষা করে ছোটকা উপস্থিত সবাইকে চমকে দিলেন একটা ঘোষণা দিয়ে, এটা আসল তুষারমানব নয়। এদিকে এক অচেনা লোক নিশুর হাতে তুলে দিল একটা টকিং রোবট, তার পরেই খুন হল সেই মানুষটি। টকিং রোবট শোনাল একেবারে বাংলায় একটা ধাঁধার ছড়া। এ ছড়ার মানে কী? আসল ‘তুষারমানব’ই বা কোথায়? এদিকে ‘র্যাট্ল স্নেক’ নামের এক ভয়ংকর দল মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে ছোটকা আর নিশুকে। এরকম বিজ্ঞানের সত্য আবিষ্কারকে অবলম্বন করে রহস্য আর অ্যাডভেঞ্চারের এক অনুপম কাহিনি শুনিয়েছেন ঔপন্যাসিক, শিশুসাহিত্যিক ও গীতিকার সেজান মাহমুদ।
📌 ফেসবুকের বন্ধু
নিশু যখন ফেসবুকে স্টিফানি নামের এক আমেরিকান কিশোরীর সঙ্গে বন্ধুত্বে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ছোটকার আমন্ত্রণ এল আমেরিকার ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেল্থ থেকে। এবারেও ছোটকার সঙ্গী হল নিশু, আর সুইটজ়ারল্যান্ড থেকে আসবে ছোটকার মেয়ে, নিশুর বন্ধু রিয়া। কিন্তু ছোটকা আর নিশু যেখানে, সেখানেই অঘটন আর অ্যাডভেঞ্চার। শুরু হল ছোটকার হাতব্যাগ ছিনতাই দিয়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে জট বাঁধতে থাকে এক মারাত্মক রহস্যের। কারা প্রতিশোধ নিতে চায় ছোটকার উপরে? পৃথিবীর বুক থেকে সাদা ছাড়া বাকি মানুষদের নিশ্চিহ্ন করতে চায় এক উন্মাদ সাম্প্রদায়িক দল। তাদের হাতে পৃথিবীর ভয়াবহতম অস্ত্র—জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করে তৈরি মৃত্যুময় রোগজীবাণু। এবার কি পারবেন ছোটকা শেষরক্ষা করতে? আর ফেসবুকের বন্ধু স্টিফানির ভূমিকাই বা কী? এ রহস্যের উত্তর আর আমেরিকার সামরিক গোয়েন্দাদের ছাপিয়ে বাংলাদেশের ছোটকা-নিশুর কৃতিত্ব নিয়েই এ আনকোরা অ্যাডভেঞ্চার। অত্যাধুনিক, বিজ্ঞাননির্ভর বিষয়, অভিনব ও জটিল কাহিনিবিন্যাসের এ গল্প আবারও শোনালেন ঔপন্যাসিক, শিশুসাহিত্যিক ও গীতিকার সেজান মাহমুদ।
প্রতিক্রিয়া লেখার আগে উপন্যাসিকাগুলির ভূমিকা লিখে দেওয়ার কারণ বিষয়বস্তু, যাতে বুঝতে সুবিধে হয়। সেজান মাহমুদের লেখার সঙ্গে পরিচয় আমার এই বইয়ের মাধ্যমেই। কল্পবিশ্বকে ধন্যবাদ এমন বইটি এপার বাংলায় প্রকাশ করার জন্য। এই বই কিন্তু কল্পবিজ্ঞানের গল্প নয়, বিজ্ঞানের বিষয়কে কেন্দ্র করে লেখা অ্যাডভেঞ্চার গল্প, সঙ্গে রহস্য-রোমাঞ্চ। তা-ই বলে আবার এই গল্পগুলিকে গোয়েন্দা কাহিনি ভেবে বসবেন না যেন! আবার হার্ড সাই-ফাইও নয়! কিশোরদের উপযোগী বিজ্ঞাননির্ভর অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি, যা কিনা বড়ো-বুড়ো সবারই ভালো লাগবে।
মাহমুদবাবুর লেখায় আমি একটা অদ্ভুত সুন্দর মিষ্টত্ব খুঁজে পেয়েছি, যা কিনা পাঠপ্রবাহে ভীষণ উপযোগী হয়েছে। খুবই সাবলীল ভাষায় কাহিনি লেখা। কাহিনির বিবরণ এবং সংলাপ কোনোটিতেই টিপিক্যাল বাংলাদেশি ছাপ নেই, শুধু ‘চাইছি’—‘চাচ্ছি’, ‘জল’—‘পানি’ এগুলি ছাড়া। তাই মনে হয় না, ভারতীয় বাঙালিদের পড়তে কোনো অসুবিধে হবে!
বিষয়নির্বাচনে মাহমুদবাবু দারুণ বৈচিত্র্যের পরিচয় দিয়েছেন। সামুদ্রিক গ্যাস, প্রাগৈতিহাসিক মানুষের দেহ, বায়ো-টেররিজ়্ম, প্রতিটি কাহিনি বৈচিত্র্যপূর্ণ। বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি, সঙ্গে টানটান রোমাঞ্চ। বাঙালি পাঠকের আর চাই কী! খুব গুছিয়ে লেখা, যে কারণে একবার শুরু করলে শেষ না করে ছাড়া যায় না বইটি। আর লেখকের সার্থকতা এখানে—তিনি পাঠককে বইতে মশগুল করে রাখতে সফল। একটুও বোরিং লাগেনি কোথাও।
কাহিনির মূল চরিত্র দুজন, ছোটকা (ড. হাসান) এবং নিশু। কাকা-ভাইপোর কেমিস্ট্রিটা দারুণ। শুরুতেই লেখক চরিত্রদের ভিত্তি দিয়েছেন, তারপর এগিয়েছে গল্প। এতে পাঠক এই চরিত্রদের সঙ্গে একাত্ম বোধ করে, সর্বোপরি এই একাত্মতা পাঠে সুবিধে এনে দেয়। তিনটি কাহিনিই বাস্তবধর্মী। খুব সুন্দর পরিবেশনায় রচিত।
🌿 Final Verdict:
সেজান মাহমুদ রচিত ‘বিজ্ঞাননির্ভর অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ১’ বইটি এককথায় খুবই সুন্দর একটি বই। ভালো লেখা, বুদ্ধিদীপ্ত বাস্তবধর্মী বিজ্ঞানভিত্তিক রোমাঞ্চকর কাহিনি সংকলন। লেখকের আরও লেখাপাঠের অপেক্ষায় রইলাম। ভালো বই আমি সব সময় অন্যদের পড়বার জন্য সাজেস্ট করে থাকি। এই বইটিও ব্যতিক্রম হবে না। মূলত কিশোর পাঠকদের উদ্দেশ করে লেখা হলেও, এই কাহিনিগুলি সব বয়সের পাঠকদের সমান আনন্দ দেবে বলেই আমার বিশ্বাস। আমার তরফ থেকে হাইলি রেকমেন্ডেড।
‘বিজ্ঞাননির্ভর অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ১’ বই প্রকাশ করেছে ‘কল্পবিশ্ব পাবলিকেশনস’। বইয়ের গুণগতমান, ছাপা, পৃষ্ঠা, বাঁধাই দুর্দান্ত। তবে এই বইতে হেডপিস এবং কিছু অলংকরণ খুব দরকার ছিল বলেই আমার মনে হয়েছে, সেগুলো না-থাকায় একটু ফাঁকা-ফাঁকা ঠেকেছে!
Tags: অনির্বাণ ঘোষ (দীপ), একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা
