নীরব মহাকাশ
লেখক: কৃশানু নস্কর
শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব
অসীম শূন্য মহাকাশে জ্বলছে কোটি কোটি নক্ষত্র। আজ নয়, কোটি কোটি বছর আগে থেকেই এমনভাবে আকাশ জুড়ে মিটমিট করছে তারা। হয়তো জ্বলবে আরও কোটি কোটি বছর। সে অসীম মহাকাশের এককোণে, একটা সর্পিল গ্যালাক্সির একটা সর্পিল বাহুতে অবস্থিত এক নক্ষত্রের গ্রহজগতে এই কাহিনির শুরু। সে নক্ষত্রের চারদিকে পরিভ্রমণরত চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রহের কক্ষপথের মাঝে যে বিরাট শূন্যস্থান, সেটি কিন্তু সম্পূর্ণ শূন্য নয়। সেখানে আছে গ্রহাণুপুঞ্জের বলয়। বলয়ের কাছে গিয়ে একটু ভালো করে দেখলে দেখা যাবে, চিরপরিচিত গ্রহাণুপুঞ্জের গ্রহাণুগুলোর পাথুরে শরীর ছাড়াও এখন সেখানে বেশ কিছু অচেনা বস্তুর ভগ্নাংশ আছে, যাদের উৎপত্তি কোনোমতেই প্রাকৃতিক নয়। সে ভগ্নাংশ যে কৃত্রিম বস্তুর, তা ছিল বিশালকায় প্রায় এক অর্ধেক গ্রহের মতো বড়ো একটি মহাকাশযান। সদ্য ধ্বংস-হয়ে-যাওয়া সে মহাকাশযান আর বসবাসকারী প্রজাতিটি একদা গ্যালাক্সির প্রতিটি প্রাণসম্ভাবনাময় গ্রহ ও সভ্যতার কাছে ত্রাসের অপর নাম ছিল। সে ত্রাসকে সকলে, অর্থাৎ সব বুদ্ধিমান জীবের সভ্যতাই চিনত ‘ইবু’, অর্থাৎ গ্রহগ্রাসী নামে।
নামটা শুনে পাঠকেরা কি চমকে উঠলেন? চেনা লাগছে নামটা? তা লাগতেই পারে। পৃথিবীতে বিশ শতকের শেষে একটা ছোট্ট জনপদে বসবাসকারী এক সামান্য মানুষের স্বপ্নে দেখা-দেওয়া মহাবিশ্বের পর্যটকের সঙ্গে যদি কোনোদিন ভ্রমণে বেরিয়ে থাকেন, তাহলে নামটা আপনার চেনা হতেই পারে।
কিন্তু সেসব কথা এখন থাক। ‘বিশ শতকের শেষে মহাবিশ্বের সে পর্যটক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে, প্রায় তিনশো বছর পরে ইবুরা পৌঁছোবে পৃথিবীতে’—সে ভবিষ্যদ্বাণী পুরোপুরি মেলেনি। ইবুরা পৃথিবীতে ঠিক তিনশো নয়, প্রায় সাতশো বছর পরে পৌঁছোল। তবে ঠিক পৃথিবীতে তাদের পৌঁছোনো হয়নি। কয়েক কোটি কিলোমিটার দূরে মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝে গ্রহাণুপুঞ্জের বলয়ের মধ্যেই তাদের যাত্রা শেষ হয়েছে চিরকালের মতো।
কী করে? তা না হয় পরে জানবেন। আপাতত তাকিয়ে দেখুন ইবুদের যানের ধ্বংসাবশেষের কয়েক লক্ষ কিলোমিটার দূরে ভাসতে-থাকা ছোটো স্পেস ফাইটারটার দিকে। ফাইটার শিপটাও অবশ্য অক্ষত নয়। তার সামনের ভিউস্ক্রিনে ফাটল ধরেছে, সেটা গ্রাফিন ইনডিউসড ALON, অর্থাৎ অ্যালুমিনিয়াম অক্সি-নাইট্রাইড ও ন্যানোস্ট্রেইনড ডায়মন্ড কম্পোজ়িট দিয়ে তৈরি স্বচ্ছ সেরামিক-জাতীয় জিনিস হলেও। তার বাঁদিকের থ্রাস্টার ইঞ্জিন ভেঙে উড়ে গেছে। সারা শরীরের জায়গায় জায়গায় দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। একটামাত্র ইঞ্জিনের সামান্য ধাক্কায় সেটা পৃথিবীর দিকে এগিয়ে চলেছে বটে, কিন্তু এই গতিতে চললে পৃথিবীতে পৌঁছোতে তার লেগে যাবে কয়েক মাস।
শিপটার ক্ষুদ্র ককপিটে বসে-থাকা একক পাইলট অবশ্য এসব বিষয়ে চিন্তিত বলে মনে হচ্ছে না। তার হাত কাঁপছে। কম্পিত হাতেই সে বারবার হাত বোলাচ্ছে সামনের ছোটো কম্পিউটার স্ক্রিনে ফুটে-ওঠা লাল বিন্দুগুলোর উপর। তার ভাঙা-ভাঙা কণ্ঠস্বর, তার আহ্বান বেতারতরঙ্গের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে মহাশূন্যে।
“ইনফিনিটি স্কোয়াড্রন রেসপন্ড। ইনফিনিটি স্কোয়াড্রন রেসপন্ড! দিস ইজ় স্কোয়াড্রন লিডার কলিং… প্লিজ় রেসপন্ড। ইনফিনিটি স্কোয়াড্রন—”
কম্পিউটার স্ক্রিনে ফুটে-ওঠা লাল বিন্দুগুলোর অর্থ সে জানে। ওগুলো সব এক-একটা স্পেস ফাইটারের প্রতীক। ওগুলো লাল মানে ফাইটারটার অবস্থান স্ক্যানারে ধরা পড়ছে না। এর মানে কী, তা খুব ভালোই জানে এই পাইলট। কিন্তু সে বিশ্বাস করতে পারছে না, বা করতে চাইছে না। বারবার, বারবার প্রায় ভিক্ষা চাইবার ভঙ্গিতে সে ডেকে চলেছে, “স্কোয়াড্রন রেসপন্ড! দিস ইজ় স্কোয়াড্রন লিডার কলিং। রেসপন্ড!”
সামান্য থেমে ফের ভাঙা কণ্ঠস্বর ও কষ্টের সঙ্গে নেওয়া শ্বাস ফেলতে ফেলতে সে আবার ডাকতে লাগল, এবার নাম ধরে:
“ভলক রেসপন্ড!
মিরাচ রেসপন্ড!
জ্যাগার রেসপন্ড!”
“সুনারি রেসপন্ড।
এনিবডি?… প্লিজ় রেসপন্ড।”
অবিরাম ডেকে গেল সে। উত্তর নেই। উত্তর আসছে না, তবুও সে থামল না, ততক্ষণ, যতক্ষণ না সে বুঝতে পারল যে, তার ডাকের উত্তর দেবে কেবল মহাকাশের অসীম শূন্যতা এবং বেতারযন্ত্রে ভেসে-আসা সাবস্পেসের ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ়।
হেলমেটের স্ট্র্যাপটা ধরে টানাটানি করতে লাগল সে, যেন সেটা তার গলায় চেপে বসে তার দম আটকে দিচ্ছে। অক্সিজেন মাস্কটা টেনে প্রায় ছিঁড়ে ফেলার মতো করে খুলে ফেলল। উত্তেজনায় সে ভুলেই গেল, এই ফাইটার শিপের সব কিছু তার মস্তিষ্কের সঙ্গে সিংক করা আছে। একটা মানসিক আদেশ দিয়েই সে হেলমেট আর মাস্ক সরিয়ে ফেলতে পারত।
কাঁপা-কাঁপা হাতে আবার স্ক্রিনের লাল বিন্দুগুলোর উপর হাত বোলাল সে। আবার একবার বেতারে ডাকতে যাবে, এমন সময় বেতারযন্ত্রটা নিজেই সক্রিয় হয়ে উঠল, “ইনফিনিটি স্কোয়াড্রন রেসপন্ড! দিস ইজ় G.L.A.R.E. কমান্ড ভেসেল হরাইজ়ন। ইনফিনিটি স্কোয়াড্রন রেসপন্ড।”
অর্ধেক শ্বাসের সঙ্গে ভাঙা-ভাঙা কণ্ঠে সে উত্তর দিল, “দিস ইজ় স্কোয়াড্রন লিডার। মিশন অ্যাকমপ্লিশড।”
“হোয়াট হ্যাপেনড টু স্কোয়াড্রন?”
“গন… অল… গন…।” বলতে গিয়ে আবার যেন শ্বাস আটকে গেল তার।
ওপাশের ব্যক্তিও যেন একটু থমকে গেল, তারপর বলল, “কপি স্কোয়াড্রন লিডার। আপনার লোকেশন কনফার্মড। রেসকিউ ভেসেল পাঠাচ্ছি।”
“কপি।” বলে বেতারটা বন্ধ করল সে।
সামনের ভিউস্ক্রিনের দিকে তাকায় সে। ক্লান্ত, ভেঙে-পড়া একটা মুখ, চোখ লাল, ঠোঁট কাঁপছে। ভিউস্ক্রিনে ফুটে-ওঠা অস্পষ্ট প্রতিবিম্বটা স্ক্রিনের ফাটলগুলোর জন্য ভেঙে ভেঙে গেছে। যেন সে নিজেই একটা ভাঙা মানুষ।
আরেকবার কম্পিউটার স্ক্রিনের লাল বিন্দুগুলোর উপর হাত বোলায় সে। পঁয়ত্রিশটা লাল বিন্দু, মানে পঁয়ত্রিশটা ফাইটার; পঁয়ত্রিশজন পাইলট, যারা তার পেছনে এসেছিল। আরেকবার ভিউস্ক্রিনের প্রতিবিম্বটার দিকে তাকাল সে। এবার আর সে নিজেকে দেখতে পেল না, দেখতে পেল একটা দানবকে। এক দানব, যে একাই খেয়ে ফেলেছে পঁয়ত্রিশটা তরতাজা প্রাণ।
তার চোখ শূন্য হয়ে যায়। সে দেখতে পায় তার চারপাশে পঁয়ত্রিশটা মুখ, তারা ফিশফিশ করে বলছে তারই কণ্ঠস্বরে, “তুমি আমাদের নিয়ে এসেছিলে। তুমি আমাদের এখানে কবর দিয়েছ। এবং এখন তুমি একা ফিরে যাচ্ছ!! কেন? কেন শুধু তুমি?”
এ প্রশ্নের উত্তর নেই তার কাছে। তার বেদনার্ত মুখ হঠাৎ হাঁ হয়। আর্তনাদসদৃশ এক চিৎকার বেরিয়ে আসে তার হৃদয় নিংড়ে। কিন্তু মহাকাশে বাতাস নেই। সেখানে শব্দ শোনা যায় না। কেউ শুনতে পায় না তার চিৎকার, কেউ শোনে না তার কান্না। তার নীরব কান্না!

* * *
রাত প্রায় বারোটা। গ্যালাকটিক ইউনিয়নের মিলিটারি অ্যাকাডেমির মেন বিল্ডিং-এর বিশাল করিডর ধরে হেঁটে আসছেন এক মহিলা, মধ্যম উচ্চতা, ঘন গাত্রবর্ণের সে মহিলার বয়স আন্দাজ চল্লিশের ঘরে, মাথার চুল আইস ব্লন্ড, অর্থাৎ দুধসাদা, পরনে ঘন নীলরঙা G.L.A.R.E., অর্থাৎ গ্যালাকটিক লিগ অব আর্মাডা ফর রেসকিউ অ্যান্ড এক্সপ্লোরেশন-এর ইউনিফর্ম। ইউনিফর্মের ব্লেজ়ার ও তার কাঁধে লাগানো ফ্ল্যাপের তারকাগুলো দেখলেই বোঝা যায় তিনি বেশ উচ্চপদস্থ কোনো অফিসার, চেহারার মধ্যে সে র্যাংকের উপযুক্ত গাম্ভীর্য ও দৃঢ়তা পরিষ্কার। হাঁটার ভঙ্গি ঋজু ও আত্মবিশ্বাসী। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই একটা দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন তিনি। ভুরু কুঁচকে তাকালেন দরজাটার দিকে, তারপর পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন সেদিকে।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তিনি দেখলেন, তিনি উপস্থিত হয়েছেন একটা স্পেস ফাইটারের ককপিটে। চারদিকে অসীম মহাশূন্য। ভিউস্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে, বিরাট বিরাট পাথরের টুকরো ছুটে আসছে ফাইটার শিপটা লক্ষ করে। শিপের পাইলট সিটে একজন তাঁর দিকে পেছন ফিরে বসে শিপ চালানোয় মগ্ন। সে অতীব দক্ষতায় সেসব পাথরের আঘাত বাঁচিয়ে শিপটা চালিয়ে নিয়ে চলেছে দূরে দৃশ্যমান একটা গ্রহের সমান বিশাল বড়ো প্রায় একটা গোলকের দিকে।
মহিলা এমন ভয়ানক দৃশ্য দেখেও একটুও বিচলিত হলেন না। তিনি জানেন এসব কিছুই সত্যি নয়। তিনি এ মুহূর্তে উপস্থিত সিমুলেশন চেম্বারে। যা দেখছেন চারপাশে, তা থ্রিডি হলোগ্রাফি সৃষ্ট মায়া ছাড়া কিছুই নয়। তিনি শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না, অচিরেই শিপটা ভয়ানকভাবে কেঁপে উঠল যেন কিছুর সঙ্গে ধাক্কা লেগেছে। একটা যান্ত্রিক কণ্ঠ বলে উঠল, “স্লাগ হিট। শিপ ডেস্ট্রয়েড।”
সঙ্গে সঙ্গে সব কিছু মিলিয়ে গিয়ে আলো জ্বলে উঠল। একটা বিশাল ফাঁকা ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন মহিলা এবং একটি কমবয়সি মেয়ে, যে হতাশায় বাতাসে ঘুসি চালাল।
“ড্যাম। ফেইলড এগেন!!” বলে উঠল সে।
“ক্যাডেট অ্যাডোরা।” পেছন থেকে ডাকলেন মহিলাটি।
সিমুলেশনে পাইলটের ভূমিকাপালনকারী মেয়েটি, যে হতাশায় ফেটে পড়েছিল, সে প্রায় চমকে ফিরে তাকাল।
“কমান্ডার উইলা!! ম্যাম।” বলে ফিরে দাঁড়িয়ে অ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে নিজের ডান হাতটা ভূমির সমান্তরালে বুকের সামনে ধরল সে। এটাই এখন স্যালুট দেওয়ার নিয়ম।
“অ্যাট ইজ়।” সামান্য মাথা নেড়ে স্যালুটটা গ্রহণ করার সময়েই বললেন কমান্ডার।
অ্যাডোরা পা ফাঁক করে দু-হাত পেছনে দিয়ে দাঁড়াল। মনে মনে নিজেকে ধমক দিচ্ছিল সে। তার মতো ব্যাট্ল রেডি অ্যান্ড্রয়েডের শরীরের প্রক্সিমিটি সেন্সরস এত খারাপ হওয়ার কথা নয়। তার দশ মিটারের মধ্যে কেউ এলেই তার টের পাওয়ার কথা। কিন্তু এই সিমুলেশনে তার সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ থাকায় সেন্সরি সিস্টেম কাজ করেনি। করলে কমান্ডার তাকে এভাবে চমকে দিতে পারতেন না।
“তুমি কী করছ, ক্যাডেট?” জিজ্ঞেস করলেন কমান্ডার উইলা।
উত্তর দেওয়ার সময় সামান্য দ্বিধাগ্রস্ত মনে হল অ্যাডোরাকে, একটু বেশি সময় নিয়ে সে সতর্ক ভঙ্গিতে বলল, “নাথিং ম্যাম, জাস্ট প্র্যাকটিসিং।”
“কী প্র্যাকটিস করছ?” জানতে চাইলেন কমান্ডার।
“জাস্ট… সামথিং নিউ।” আগের মতোই সতর্ক উত্তর অ্যাডোরার।
কমান্ডার যদি তার শরীরের পেছনে লুকোনো হাত দেখতে পেতেন বা যে মানসিক আদেশ সে গোপনে সিমুলেশন চেম্বারের কম্পিউটারকে দিচ্ছে, তা শুনতে পেতেন, তাহলে জানতে পারতেন যে এই মুহূর্তে অ্যাডোরা তার শেষ সিমুলেশন ডেটা লগ মুছতে ব্যস্ত। কমান্ডার কয়েক মুহূর্ত তার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন, তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “এই সিমুলেশন আইডিয়া কোথায় পেলে?”
“কোথাও না।” তড়িঘড়ি উত্তর দিল অ্যাডোরা, “জাস্ট ওয়াইল্ড ইমাজিনেশন!”
“ইমাজিনেশন…” তার শেষ শব্দটা সন্দেহপ্রবণ স্বরে প্রতিধ্বনি করলেন কমান্ডার, তারপর বললেন, “ওকে, ডিসমিস।”
“থ্যাংক ইউ, ম্যাম।” আরেকবার স্যালুট করে দ্রুতপদে ঘর ছেড়ে চলে গেল বা বলা উচিত যেন পালিয়ে গেল অ্যাডোরা। সে ঘর ছেড়ে চলে গেলে পায়ে পায়ে ঘরের মাঝে এগিয়ে এলেন উইলা। দু-হাত সামনে তুলে দু-হাতের তর্জনী দুটো ঠেকিয়ে তারপর দু-দিকে আড়াআড়ি সরালেন। ভূমির সমান্তরালে একটা প্রায় স্বচ্ছ হলোগ্রাফিক স্ক্রিন দেখা দিল। স্ক্রিনের মধ্যে খুব দ্রুত গতিতে নীচ থেকে উপরে সরে যাচ্ছে প্রচুর সংখ্যা ও বিজাতীয় চিহ্ন ও সংকেত। স্ক্রিনের মাঝে একটা ট্যাপ করে সে গতিশীলতা বন্ধ করলেন উইলা। তারপর আঙুলের সাহায্যে ধীরে ধীরে স্ক্রোল করে দেখতে লাগলেন সংখ্যা ও চিহ্নগুলো।
সিমুলেশন ডেটা ও লগ মোছার যে আদেশ অ্যাডোরা দিয়েছিল, তার কারণে প্রায় নব্বই শতাংশ ডেটাই মুছে গেছে। যে দশ শতাংশ ডেটা মুছে যাওয়ার আগেই সে আদেশ বাতিল করেছেন কমান্ডার, সেই দশ শতাংশ ডেটাই এখন পরীক্ষা করতে লাগলেন তিনি। তাঁর ভুরু ভীষণভাবে কুঁচকে গেছে।
নিশ্বাস ফেলার ক্ষমতা যদি থাকত তাহলে অ্যাডোরা একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলত কমান্ডার উইলার সামনে থেকে সরে আসার পর। দ্রুতপদে নিজের রুমের দিকে যাওয়ার সময় অ্যাডোরার স্মৃতিতে রি-রান হচ্ছিল এক সপ্তাহ আগের সেই থিয়োরেটিক্যাল ক্লাসের ঘটনা, যখন এসব শুরু করেছিল সে।
G.U.A.R.D., অর্থাৎ গ্যালাকটিক ইউনিয়নস অ্যাডভান্সড রেসপন্স ডিভিশন বা অন্য কথায়, স্পেস ফাইটিং ফোর্সের একজন উইং কমান্ডার বিভিন্ন অ্যাটাক প্যাটার্ন বা ফাইটিং ম্যানুভার শেখাচ্ছিলেন। যদিও অ্যাডোরার অন্যতম লক্ষ্য GUARD-এ ফাইটার পাইলট হওয়া এবং স্পেস ফাইটের স্কিল বা মহাকাশে ডগফাইটিং তার প্রথম আগ্রহের বিষয়, তবুও ক্লাসে মন ছিল না তার। সে ফাইটার পাইলট হতে চায়, স্পেস ফাইটার নিয়ে ভেসে যেতে চায় অনন্ত মহাকাশে, শত্রুপক্ষের স্পেস ফাইটারের ঝাঁকের মধ্যে বারংবার ঝলসে উঠবে তার পাল্স ক্যানন, উল্কার বেগে ছুটে যাবে ব্যারিওনিক মিসাইল, ভিউস্ক্রিনে সুপারনোভার মতো ঝলসে উঠবে শত্রুর ফাইটার ধ্বংস হওয়ার দৃশ্য, এই না হলে জীবন!! সত্যি যুদ্ধ না হলেও অন্তত সিমুলেশন চেম্বারে তো প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস হিসেবে শেখানো যেত অ্যাটাক প্যাটার্নগুলো, শুকনো থিয়োরির ক্লাসে কি আর মন ভরে? বিশেষ করে যখন অ্যাডোরা ইতিমধ্যেই রপ্ত করে ফেলেছে এমন দুখানা অ্যাটাক প্যাটার্ন, যেগুলোকে ধরাই হয় GUARD-এর সব অ্যাটাক প্যাটার্নের মধ্যে ক্রাউন জুয়েল।
এ দুটো নাকি শেখানো হয় অ্যাকাডেমির ট্রেনিং সেশনের শেষ বছরগুলোতে। এগুলো এমনই কঠিন যে অভিজ্ঞ পাইলটরাও নাকি এগুলো ঠিকমতো আয়ত্ত করে উঠতে পারেন না। ফাইলের তথ্যানুসারে অনেকদিন আগে একমাত্র ইনফিনিটি স্কোয়াড্রনের পাইলটরা এগুলো নিখুঁতভাবে করতে পারত। কিন্তু সেই স্কোয়াড্রন বা তার পাইলটদের সম্পর্কে কোনো বিশদ তথ্য ফাইলে নেই। যদি থাকত, তাহলে অ্যাডোরা অবশ্যই তাদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করত। মনে মনে সে এখন থেকেই নিজেকে ইনফিনিটি স্কোয়াড্রনের পাইলট বলেই ভাবতে শুরু করেছে। অ্যাকাডেমিতে ট্রেনিং শেষ হলে যখন সে GUARD জয়েন করবে, তখন অতি অবশ্যই সে চেষ্টা করবে ইনফিনিটি স্কোয়াড্রন জয়েন করার! করবে না-ই-বা কেন? ইনফিনিটি স্কোয়াড্রনের পাইলটদের মতোই সে-ও তো সব চেয়ে কঠিন অ্যাটাক প্যাটার্ন দুটো রপ্ত করে ফেলেছে। অবশ্যই আসল স্পেস ফাইটার ওড়ায়নি সে, কিন্তু সিমুলেশনের সঙ্গে আসল পরিস্থিতির বিশেষ তফাত নেই। বিশেষ করে এই কোয়ান্টাম কম্পিউটেশন এবং রিয়েল লাইফ থ্রিডি হলোগ্রাফির যুগে।
ক্লাসে বসে এইসব চিন্তা করতে করতেই কণাদের দিকে নজর পড়েছিল অ্যাডোরার। ক্লাসের সব চেয়ে ভালো ছাত্র, এ যুগের সাভান্ত বলে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত কণাদ মনোযোগ দিয়ে লেকচার শুনছে এবং তার হলোগ্রাফিক ভার্চুয়াল প্যাডে নোট নিচ্ছে। তার দিকে একটা রেজ়োনেটিং থট ইমপাল্স ছুড়ে দিয়েছিল আডোরা। কণাদের মস্তিষ্কের ন্যানোচিপে সেটা নিশ্চয়ই একটা ফুটবলের মতো গিয়ে লেগেছিল। কণাদের বিরক্তিটা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিল অ্যাডোরা, কণাদ কিন্তু ফিরে তাকায়নি, একই রকম কিন্তু আরও জোরালো একটা থট ইমপাল্সের সঙ্গে ছুড়ে দিয়েছিল নিজের বিরক্তিমিশ্রিত প্রশ্নটা—“কী হয়েছে?”
“কথা আছে। বাইরে চল।” বলল অ্যাডোরা।
“ক্লাস চলছে তো।” বলল কণাদ।
“নিকুচি করেছে ক্লাসের। বাইরে চল। বলছি-না, কথা আছে।”
একটা হতাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে রেকর্ডিং চালু করে উঠে দাঁড়িয়েছিল কণাদ। ক্লাস চলাকালীন বেরোতে অবশ্য অসুবিধা নেই, কারণ লেকচার প্রদানকারী উইং কমান্ডার তাদের সামনে নেই। তিনি বর্তমানে নেপচুনের স্টারবেসে পোস্টেড। সেখান থেকেই ভার্চুয়াল ক্লাস নিচ্ছেন তিনি। ব্যান্ডউইথ বাঁচানোর জন্য ভিডিয়ো ফিড কেব্ল একমুখী, সুতরাং ক্লাসে কে কী করছে, তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। অ্যাকাডেমিক অথরিটি অবশ্য ক্লাস মনিটর করে, কিন্তু সে মনিটরিং বটগুলোকে ধোঁকা দেওয়া কণাদের কাছে এক মিনিটের ব্যাপার, তা জানে অ্যাডোরা। সুতরাং দুজনেই বাইরে বেরিয়ে এল সকলের চোখের সামনেই। কেউ কিছু বলল না। ব্যাচের দায়িত্ববান ছেলে স্যামর অবশ্য মৃদু আপত্তি জানিয়েছিল, কিন্তু অ্যাডোরা পাত্তাই দিল না।
বাইরের লনে এসে এক জায়গায় বসল দুজনে।
“নে, এবার বল কী ব্যাপার?” জিজ্ঞেস করল কণাদ।
“এটা দেখ।” নিজের ভার্চুয়াল হলোস্ক্রিন তার সামনে মেলে ধরল অ্যাডোরা।
“হুম… একশো, একশো!! এগুলো কী?” জিজ্ঞেস করল কণাদ।
“আমার সিমুলেশন স্কোর।”
“কীসের সিমুলেশন?”
“WAP-1 অ্যান্ড 2।” সামান্য অহংকারমিশ্রিত স্বরে বলল অ্যাডোরা।
“হোয়াট!! WAP-1 অ্যান্ড 2!!” কণাদের চোখ প্রায় কপালে উঠে গেল, “তুই সব চেয়ে কঠিন দুটো ম্যানুভারিং-এর সিমুলেশনে পারফেক্ট স্কোর করেছিস?”
“ইয়েস, স্যার।” একই রকম গর্বোদ্ধত ভঙ্গিতে বলল অ্যাডোরা।
“ওকে।” তথ্যটার সঙ্গে ধাতস্থ হতে একটু সময় নিল কণাদ, তারপর বলল, “GUARD-এ তোর জায়গা পাকা আর এসব থিয়োরি ক্লাস না করলেও তোর চলবে, তা বুঝতে পারছি। কিন্তু আমাকে বাইরে ডেকে আনলি কেন?”
“তোর হেল্প চাই আমার।” বলল অ্যাডোরা।
“কী ব্যাপারে?”
“WAP-3 খোঁজার ব্যাপারে।”
“WAP-3!! সেটা আবার কী?” ভুরু কোঁচকাল কণাদ।
“একটা টপ সিক্রেট অ্যাটাক ম্যানুভারিং আছে, শুনেছি।” বলল অ্যাডোরা, “সেটার সব ফাইল ক্লাসিফায়েড। সেটা নাকি কারও শেখার অনুমতি নেই। টপ র্যাংকের পাইলটরাও নাকি সেটা পারফেক্টলি করতে পারে না।”
“এত কঠিন?” বিস্ময় প্রকাশ করল কণাদ।
“তা-ই তো শুনেছি।” বলল অ্যাডোরা।
“কিন্তু ক্লাসিফায়েড যদি তাহলে তুই এত কিছু জানলি কী করে?”
“আহা, জানি না, কিন্তু জানতেই তো চাইছি।”
“তার মানে?” বলে অ্যাডোরার মুখের দিকে চেয়েই প্রায় লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল কণাদ, “নো, নট দ্যাট! একেবারেই না। নো, অ্যান্ড অ্যান এমফ্যাটিক নো।”
কণাদের উত্তেজনা অ্যাডোরার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল না। সে শান্তভাবেই বলল, “এই সামান্য কাজটা পারবি না?”
“করব না।” আগের মতোই উত্তেজিত কিন্তু দৃঢ়কণ্ঠে বলল কণাদ, “তুই যতই যা বল, আমি এর মধ্যে নেই।”
“তোর মতো বন্ধু যদি ‘না’ বলে দেয় তাহলে আমি কার কাছে যাব, বলতে পারিস?” যতটা সম্ভব বিষাদ কণ্ঠস্বরে মেশানোর চেষ্টা করল অ্যাডোরা।
“এসব ইমোশনাল গেম একদম খেলার চেষ্টা করবি না।” বলে উঠল কণাদ, “প্রথম কথা, তোকে ইমোশন মানায় না। দ্বিতীয় কথা, আমি মোটেই কোনো বিশেষ লোক নই!”
“আরে তুই এ যুগের গ্রেট সাভান্ত।” বলল অ্যাডোরা।
“হতে পারি, কিন্তু আমি ভাইস অ্যাডমিরালের মেয়ে নই।” উত্তর দিল কণাদ, “ধরা পড়লে তোর কিছু হবে না, কিন্তু আমার লাইফ শেষ।”
“আরে, ধরা পড়বি কেন?” বলল অ্যাডোরা, “আর ধরা পড়লে সব দোষ আমি নিয়ে নেব।”
কণাদের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে সে ফের বলল, “বিশ্বাস হচ্ছে না? আচ্ছা, তুই আমার অ্যাকসেস কোড ব্যবহার করে ডেটাবেসে ঢুকিস?”
“তোর অ্যাকসেস কোড দিয়ে!” কণাদ একটু থমকে গেল। তার মুখে ফুটে-ওঠা নিমরাজি ভাবটা দেখেই তাকে আর বেশি ভাবার সুযোগ দিল না অ্যাডোরা। যেন বিশাল অফার দেওয়া হচ্ছে এমন ভঙ্গিতে বলল, “আর কাজটা করে দিলে আমিও তোর একটা কাজ করে দেব।”
“কী কাজ?” ভুরু কোঁচকাল কণাদ।
“তোকে গার্লফ্রেন্ড জুটিয়ে দেব।”
কণাদ হেসে ফেলল, “গার্লফ্রেন্ড! কাকে জুটিয়ে আনবি?”
“কেন, আমার রুমমেট!!?”
“তোর রুমমেট… মানে ফেলিনা!! রক্ষা কর।” দু-হাত জড়ো করল কণাদ, “ওই বাঘিনিকে তোর কাছেই রাখ। আমার চাই না।”
“সে কী রে? কেন?” অবাক হওয়ার ভান করল অ্যাডোরা, “তোরা মানুষরা তো ওইরকম সোনালি চুল, নীল চোখ নিয়ে খুব অবসেসড। তুই তো ওই যে কী সব লিখিস… কী যেন বলে… কবিতা!!”
“ফেলিনার চোখ নীল নয়।” কণাদ গম্ভীর হয়ে গেল, “ওর আসল চোখ বাঘিনির মতোই। যাক গে, বাদ দে। তবে যদি তোর WAP-3 খুঁজে পাই, তোকে পরে পাঠিয়ে দেব।”
চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছিল কণাদ। অ্যাডোরা পেছন থেকে বলল, “আমার অ্যাকসেস কোড নিবি না?”
“লাগবে না।” চলে যেতে যেতেই হাত নেড়ে বলেছিল কণাদ।
অ্যাডোরা আর কিছু বলেনি। সে জানত, কণাদ ইচ্ছা করলেই, কোনো ট্রেস না রেখে একেবারে পাক্কা ক্রিমিন্যালের মতোই গ্যালাকটিক ইউনিয়নের ডেটাবেস হ্যাক করতে পারে। সুতরাং WAP-3-এর ফাইল যত ক্লাসিফায়েডই হোক-না কেন, যত সুরক্ষিতই হোক-না কেন, তা বের করে আনা কণাদের কাছে ছেলেখেলা।
বেশি অপেক্ষা অবশ্য করতে হয়নি। পরের দিনই তার কাছে ছুটে এসেছিল কণাদ। অত্যন্ত উত্তেজিত মনে হচ্ছিল তাকে।
“ভয়ংকর ব্যাপার!” একটা ডেটা ক্রিস্টাল অ্যাডোরার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল কণাদ।
“কেন? কী হয়েছে?” জিজ্ঞেস করেছিল অ্যাডোরা।
“এই ফাইলটা ভয়ানকরকম ক্লাসিফায়েড।” বলল কণাদ, “এটা ক্লাসিফায়েড করার অর্ডার এসেছিল সর্বোচ্চ GUARD কমান্ড থেকে।”
“স্পেস মার্শাল?” ভুরু কুঁচকেছিল অ্যাডোরা।
“চিফ মার্শাল।” বলেছিল কণাদ, “এবং এর সঙ্গে আরও অনেকগুলো ফাইল ক্লাসিফায়েড করা আছে, যার প্রতিটা খুলতে অন্তত স্পেস মার্শাল, মানে সেকেন্ড ইন GUARD কমান্ড লেভেলের ক্লিয়ারেন্স লাগে। শুধু তা-ই নয়, এই ফাইলের ভেতরের কিছু ডেটা ডিলিটও করে ফেলা হয়েছে।”
“তুই রিকভার করার চেষ্টা করিসনি?” জিজ্ঞেস করল অ্যাডোরা।
“তোর কি মাথা খারাপ?” বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল কণাদ, “আমি একে বেআইনিভাবে সিস্টেমে ঢুকে স্পেস মার্শাল লেভেলের সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স বাইপাস করছি। তার মধ্যে আবার কাজ মিটিয়ে ঝটপট বেরিয়ে না এসে ওখানে বসে ডেটা রিকভারি করব!”
“আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে; বুঝেছি।” বলেছিল অ্যাডোরা, “কিন্তু এতে আসল জিনিসটা আছে তো? মানে WAP-3 গোটা ম্যানুভারিংটা?”
“জানি না।” বলেছিল কণাদ, “কিছু কিছু ডেটা ডিলিটেড বললাম না। তা ছাড়া আমি ফ্লাইট ম্যানুভারিং ভালো বুঝিও না। তুই দেখে নিস। তবে হ্যাঁ, এই ফাইলে একটা রেড নোটিশ আছে, সেটা খুব ইনটারেস্টিং। দেখিস।”
“কেমন নোটিশ?” জিজ্ঞেস করেছিল অ্যাডোরা।
“দেখে নিস।” বলে একটা রহস্যময় হাসি হেসে চলে গিয়েছিল কণাদ।
দেখে নিয়েছিল বই-কি। এটাই প্রথম দেখেছিল অ্যাডোরা। বড়ো বড়ো লাল হরফে লেখা ছিল:
NEVER TO BE TAUGHT! NEVER TO BE TRIED!
Survival Possibility = 0%,
Operational Viability = 0%,
Strategic Necessity: Absolute
Nobody Perfected it except The Creator.
নোটিশের মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারেনি অ্যাডোরা। স্ট্র্যাটেজিক নেসেসিটি যদি অ্যাবসোলিউটই হবে তাহলে তার অপারেশনাল ভায়াবিলিটি জ়িরো কেন? মানেটা এমন দাঁড়ায়: যেটার প্রয়োজন ষোলোআনা, কিন্তু করার উপায় নেই!! ভেবে ভেবে কূলকিনারা না পেয়ে আর ও নিয়ে মাথা ঘামায়নি সে।
কিন্তু শেষ বাক্যটা তাকে তাতিয়ে দিয়েছিল।
“নো বডি পারফেক্টেড ইট একসেপ্ট দ্য ক্রিয়েটর।”
নির্মাতা ব্যতিরেকে কেউ এটা আয়ত্ত করতে পারেনি! কী এমন ম্যানুভার যে কেউ পারেনি? কেউ পারবে না? গোটা ফাইলটা খুঁটিয়ে দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল সে। হ্যাঁ, স্পেস ফাইটার ফ্লায়িং ম্যানুভার চ্যালেঞ্জ যদি কিছু হয় তাহলে এমনটাই। এই ম্যানুভার যে আয়ত্ত করতে পারবে, তাকে সত্যিই সেরা পাইলট বলা ছাড়া উপায় নেই। এর আবিষ্কর্তা সেই অজানা ব্যক্তিটির প্রতি শ্রদ্ধায় ভরে গিয়েছিল অ্যাডোরার মন। সে নাকি এই ম্যানুভারিং নিখুঁতভাবে করতে পারত!! নিজের মনেই সেই নামহীন অজানা ব্যক্তিটিকে নিজের আইডল, নিজের হিরোর আসনে বসিয়ে নিয়েছিল অ্যাডোরা।
হ্যাঁ, নামহীন ব্যক্তি। কারণ, WAP-1, WAP-2 ফাইলগুলোর মতোই এই WAP-3 ফাইলেও নির্মাতার নাম নেই। কোনো পরিচয় দেওয়া নেই। কোনোভাবে বোঝার বা জানার উপায় নেই লোকটি কে হতে পারে। এমনটা কেন করা হয়েছে, তা বুঝতে পারেনি অ্যাডোরা। এমন ভয়ানক কঠিন অ্যাটাক প্যাটার্ন তৈরি এবং নিখুঁতভাবে আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন যিনি, সেই লেজেন্ডারি পাইলটের নাম এভাবে ইতিহাস থেকেই মুছে ফেলা হয়েছে কেন? এ প্রশ্নের উত্তর সে খুঁজে পায়নি। কাউকে জিজ্ঞেস করতেও পারেনি। বেআইনিভাবে ক্লাসিফায়েড ফাইল অ্যাকসেস করার পর সে ফাইলের তথ্য বিষয়ে যে কাউকে প্রশ্ন করা যায় না, তা ভালোই বোঝে অ্যাডোরা। সুতরাং যেটা করা যায়, সেটাই সে করেছিল। WAP-3-এর উদ্ভাবকের নাম খোঁজার বদলে তাঁর মূল কৃতিত্বটাকে ছোঁয়ার মনস্থ করেছিল সে!
মুশকিল হল, সে চেষ্টাটাও করতে হচ্ছে লুকিয়ে। কেউ যেন বুঝে না ফ্যালে যে, সে WAP-3 ম্যানুভারিং প্র্যাকটিস করছে। সুতরাং সকলের নজর এড়িয়ে সকলের অনুপস্থিতিতে গভীর রাতে সিমুলেশন চেম্বারে উপস্থিত হয় অ্যাডোরা। প্রায় সারারাত প্র্যাকটিস করে প্রায় শেষরাতে চুপচাপ নিজের রুমে ফিরে আসে। আসার আগে অবশ্য সিমুলেশন লগ এবং ডেটা মুছে ফেলতে ভোলে না।
এমনটাই চলছিল গত চার-পাঁচ দিন ধরে। কিন্তু আজ সব গোলমাল হয়ে গেল। কমান্ডার উইলা এমন হঠাৎ করে সিমুলেশন চেম্বারে এসে উপস্থিত হবেন, তা কে জানত?
“না, এবার থেকে আরও সাবধান হতে হবে।” ভাবল অ্যাডোরা। কমান্ডার উইলা এমনিতে ভালো মানুষ, কিন্তু নিয়মকানুনের ব্যাপারে খুব স্ট্রিক্ট! তাঁর থেকে সাবধানে থাকতে হবে।
* * *
যেদিকে তাকানো যায়, শুধু কালো আকাশের গায়ে মিটমিট করে জ্বলতে-থাকা নক্ষত্রের সজ্জা। এ অনন্ত শূন্য মহাকাশের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে আছে সে। না, একা নয়! দূরে ওই বিরাট গ্রহটা কী? ওটা তো গ্রহ নয়। ও তো ইবুদের সেই শিপটা। ওটা আবার এল কী করে? আর দুরন্ত বেগে তার দিকে ছুটে যাচ্ছে ওগুলো—ওগুলো তো ইনফিনিটি স্কোয়াড্রন ফাইটার!! কিন্তু… সামনে অ্যাস্টরয়েড ফিল্ডটা রয়েছে যে। ওহ্ না… উল্কার গতিতে ছুটে আসছে পেছন থেকে বিরাট বিরাট চকচকে টাংস্টেন-স্টিল অ্যালয়ের সিলিন্ডার। প্লামবব ক্যাননের বুলেট! আর অ্যাস্টরয়েড ফিল্ডের মধ্যে দুর্ভেদ্য পাঁচিলের মতো ইবুদের বিশাল গ্রহযান আর তার অভেদ্য শিল্ড!!
কী করে বাঁচবে ফাইটারগুলো?
বাঁচল না কেউ, বাঁচল না। অ্যাস্টরয়েডে ধাক্কা খেয়ে জ্বলে গেল কেউ। প্লামবব বুলেট গুঁড়ো করে দিল কয়েকটাকে। শিল্ডের গায়ে আছড়ে পড়ে নিমেষে বাষ্পীভূত হল কয়েকটা। কোনো শব্দ নেই। কোনো বিস্ফোরণ শোনা গেল না। কিন্তু প্রতিটা ফাইটার ধ্বংস হওয়ার সময় চিৎকার করে উঠছিল সে, “না! না!! না!!!”
সে চিৎকারগুলো পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছিল সে। কিন্তু তার সে বুকফাটা আর্তনাদ সামনের ঘটনাবলিতে কোনো প্রভাব ফেলতে পারল না!
শেষ ফাইটারটা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরেই সেই মুখগুলো আবার ঘিরে ধরল তাকে। করতে লাগল সেই এক প্রশ্ন: “তুমি একা কেন ফিরে গেলে স্কোয়াড্রন লিডার? তুমি বলেছিলে, আমরা পারব। তোমাকে বিশ্বাস করে আমরা এসেছিলাম! তাহলে আমাদের ছেড়ে তুমি একা ফিরে গেলে কেন? কেন? কেন? কেন?”
প্রতিটা ‘কেন’ হাতুড়ির মতো ঘা মারতে লাগল তার অন্তরে। অসহ্য বেদনায় ছটফটিয়ে উঠে আবার একবার আর্তনাদ করে উঠল সে….
এবং সেই আর্তনাদের সঙ্গেই জেগে উঠে বসে হাঁপাতে লাগল সে। ধীরে ধীরে পরিপার্শ্ব সম্পর্কে সচেতনতা ফিরে এল তার মধ্যে। মহাকাশে ইবুদের যানের সামনে নয়, নিজের ঘরেই বিছানাতে বসে আছে সে।
বিছানা থেকে নেমে বেসিনের সামনে গিয়ে মুখে জল দিল সে। তারপর একটা পাতলা শাল গায়ে জড়িয়ে রাতপোশাক পরেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল। করিডর ধরে হেঁটে গিয়ে বেরিয়ে এল বিল্ডিং-এর বাইরে। শেষরাতের আকাশে জ্বলজ্বল করছে অসংখ্য নক্ষত্র। তাদের মধ্যে একটা বৃহৎ স্থির আলো দেখে চিহ্নিত করা যায় বৃহস্পতি গ্রহটাকে। সেদিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে, তারপর এগিয়ে গেল সামনের বিল্ডিংটার দিকে। ভেতরে ঢুকে একটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নক করল সে।
দরজা খুলে সামনে এসে দাঁড়াল দৈত্যের মতো বিশাল ও লোমশ শরীরের এক ব্যক্তি। তারও পরনে রাতপোশাক।
“হ্যালো, ওল্ড ফ্রেন্ড। আবার সেই স্বপ্ন?” জিজ্ঞেস করল দৈত্যসদৃশ ব্যক্তিটি।
কোনো উত্তর না দিয়ে কেবল অল্প মাথা ঝাঁকাল সে। বিশালদেহী ব্যক্তিটি তাকে আলতো করে বুকে জড়িয়ে ধরল। বিশাল দুটো হাতের মধ্যে যেন হারিয়ে গেল তার তুলনামূলক ছোটোখাটো শরীর।
“আমি কি তোমার সঙ্গে একটু বসতে পারি?” মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল সে।
“অবশ্যই, মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড!” কোমলকণ্ঠে বলল বিশালকায় দৈত্যটি।
একটা করুণ কিন্তু তৃপ্তির হাসি হাসল সে। দৈত্যের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করে হালকাস্বরে, কিন্তু গভীর আবেগের সঙ্গে বলল, “গোদা গোরিলা, তুমি আমার জীবনের সব চেয়ে বড়ো সাপোর্ট!”
“সব সময়, বন্ধু!!” আগের মতোই কোমলকণ্ঠে বলল, “গোদা গোরিলা, এসো, ভেতরে এসো।”
একসঙ্গে রুমে ঢুকে গেল দুজনে।
* * *
বিশাল পাথরের চাঁইটা ভীষণ গতিতে এসে আছড়ে পড়ল ভিউস্ক্রিনে। সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার হয়ে গেল চারদিক, এক মুহূর্তের জন্য সব স্তব্ধ, তারপর আবার আলো জ্বলে উঠল। একটা যান্ত্রিক কণ্ঠ বলে উঠল, “অ্যাস্টরয়েড হিট। শিপ ডেস্ট্রয়েড।”
“এগেইন।” বলে উঠল অ্যাডোরা।
আবার শুরু হয়ে গেল সিমুলেশনটা। এবার আরও বেশি মনোযোগের সঙ্গে শিপটা চালাতে লাগল অ্যাডোরা। আর কিছুতেই অ্যাস্টরয়েডে ধাক্কা লাগতে দেবে না সে। অতীব দক্ষতায় একের পর এক পাথর ও বরফের চাঁইগুলোকে কাটিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎই প্যানেলে লাল আলো ব্লিংক করল একটা এবং পরক্ষণেই প্রচণ্ড ঝাঁকুনির সঙ্গে ফের চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। ফের শোনা গেল সেই যান্ত্রিক কণ্ঠ, “স্লাগ হিট, শিপ ডেস্ট্রয়েড।”
“এগেইন।” জেদি ভঙ্গিতে বলে উঠল অ্যাডোরা। এবার আরও বেশি জেদের সঙ্গে পাইলটিং করতে শুরু করল সে, আর অ্যাস্টরয়েডে ধাক্কা নয়, ঠিক সময়ে এড়িয়ে গেল পেছন থেকে আসা স্লাগটাও। কিন্তু সেটাকে ডানদিক দিয়ে বেরিয়ে যেতে দেওয়া মাত্র বাঁদিক থেকে ছুটে এল একটা বিরাট অ্যাস্টরয়েড, প্রাণপণে শিপটা আরও ডানদিকে রোল করল অ্যাডোরা, এবং ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ সব কিছু থেমে গেল। টিভি-তে পজ় বাটন টিপলে যেমন ছবি দাঁড়িয়ে যায়, ঠিক তেমনি।
ব্যাপারটা কী হল, সেটা বোঝার আগেই পেছন থেকে একটা গলা শুনে চমকে উঠল সে।
“ক্যাডেট অ্যাডোরা।” গম্ভীরস্বরে ডাকলেন কমান্ডার উইলা।
ফের একবার নিজের প্রক্সিমিটি সেন্সরের মুণ্ডপাত করতে করতে ঘুরে দাঁড়িয়ে স্যালুট করল অ্যাডোরা।
“এটা কী প্র্যাকটিস করছ তুমি?” সোজা তার চোখের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলেন কমান্ডার।
এবারে আর র্যানডম সিমুলেশন বলে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। সিমুলেটেড এনভায়রনমেন্ট এখনও তাদের চারদিকে স্থির হয়ে আছে। শুধু তা-ই নয়, চেষ্টা করেও সেটা সরাতে বা নষ্ট করতে পারছে না অ্যাডোরা। উইলা নিশ্চিত, সেটার কনট্রোল লক করে দিয়েছেন নিজের অথরিটি কোড ব্যবহার করে।
কী বলবে, সেটা ভাবতে কয়েক মিলি সেকেন্ড সময় লাগল অ্যাডোরার, কণাদ বলেছিল WAP-3 ফাইল অ্যাকসেস পেতে স্পেস মার্শাল লেভেলের ক্লিয়ারেন্স লাগে। সুতরাং কমান্ডার হয়তো জানেন না এটা কী!
“আমি একটা চ্যালেঞ্জিং সিমুলেশন বানিয়ে…”
অ্যাডোরার কৈফিয়তটা শেষ হল না, উইলা বজ্রকণ্ঠে ধমক দিলেন, “সত্যি কথা বলো ক্যাডেট!”
এই ধমকে যে-কোনো মানুষের নার্ভ ফেল করত এবং হয়তো সত্যি কথা বলে ফেলত। কিন্তু অ্যাডোরার সে সমস্যা নেই। কিছুক্ষণ আগে তার প্রক্সিমিটি সেন্সর তাকে ধোঁকা দিলেও এখন তার স্টেবিলিটি ম্যাট্রিক্স তার সঙ্গ ছাড়ল না। সুতরাং সে যথাসম্ভব শান্তকণ্ঠে বলল, “সত্যি বলছি ম্যাম, আমি জাস্ট একটা চ্যালেঞ্জিং সিমুলেশন ট্রাই করছিলাম।”
কমান্ডার উইলা কয়েক মুহূর্ত তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে অ্যাডোরার দিকে চেয়ে রইলেন, তারপর গম্ভীর কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে বললেন, “সাত দিনের জন্য তোমার সিমুলেশন চেম্বার টাইম অফ করা হল। আর তারপরেও যেন তোমাকে এই সিমুলেশন রান করতে না দেখি।”
কথাটা বলে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন উইলা, কিন্তু এ সময় অ্যাডোরা মরিয়া ভঙ্গিতে বলে উঠল, “ইউ কান্ট ডু দিস টু মি!”
থমকে দাঁড়ালেন উইলা, তারপর আবার ঘুরে অ্যাডোরার চোখে চোখ রেখে আগের মতোই কর্তৃত্বপূর্ণ স্বরে বললেন, “তুমি কি আমার অথরিটি চ্যালেঞ্জ করছ, ক্যাডেট?”
সে দৃষ্টির সামনে গুটিয়ে গেল অ্যাডোরা। চোখ এবং গলা দুটোই নামিয়ে মৃদুকণ্ঠে সে শুধু বলল, “নো, কমান্ডার।”
“গুড, ডিসমিসড।” বললেন উইলা।
অ্যাডোরা চলে যাওয়ার পর হাতের এক ইশারায় সিমুলেশনটা বন্ধ করলেন উইলা। তারপর সিমুলেশন চেম্বার ডেটাবেস থেকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেললেন সেটা।
নিজের রুমের দিকে যেতে যেতে রাগে প্রায় গজগজ করছিল অ্যাডোরা। সাত দিনের জন্য সিমুলেশন চেম্বারে যেতে না পারলে তার চলবে কী করে? কমান্ডার তাকে এমন ভয়ানক শাস্তি দেবেন, তা সে ভাবতেই পারেনি। আর তাও আবার একটা অজানা সিমুলেশন রান করানোর জন্য বা আউট অব কোর্স একটা ফাইট ম্যানুভারিং প্র্যাকটিস করার জন্য!
আচ্ছা, কমান্ডার কোনোভাবে বুঝে যাননি তো যে, সে নিষিদ্ধ ম্যানুভারিং WAP-3 প্র্যাকটিস করছে? না, না, তা হতে পারে না। বুঝতে পারলে এত সামান্য শাস্তি হত না। তা ছাড়া বুঝবেনই-বা কী করে? এই ম্যানুভারিং কোথাও শেখানো হয় না। ফাইল হাইলি ক্লাসিফায়েড। ওই ফাইলে কমান্ডারের অ্যাকসেস নেই!
কিন্তু তাহলে কমান্ডার এত খেপে গেলেন কেন? অ্যাডোরা মিথ্যে বলছে, সেটা বুঝতে পেরে? নাকি এই কঠিন ম্যানুভারিং সে নিজে নিজে শিখে ফেলছে কোনো ইনস্ট্রাক্টরের সাহায্য ছাড়াই, সেজন্য?
হুঁ, তা-ই হবে। এই GLARE কমান্ড থেকে আসা অফিসারদের সমস্যা এটাই। নিজেরা চিরকাল বড়ো ট্যাকটিক্যাল বা এক্সপ্লোরেশন শিপে ডিউটি করেন, যাঁরা ক্লোজ় কোয়ার্টার কমব্যাট করেনই না কখনও। অথচ GUARD ফাইটার পাইলটদের মনে করেন উদ্ধত, হটশট! যুদ্ধের সময় GUARD-এর ফাইটার পাইলটরাই যে মূল যুদ্ধটা করে, সেটা এঁরা ভুলেই যান। নিজেরা তো কোনোদিন স্পেস ফাইটারের ককপিটে বসলেন না, কিন্তু কেউ সেখানে পৌঁছোনোর চেষ্টা করলে তাকে আটকাবেন।
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নিজের রুমে ঢুকেই অ্যাডোরা দেখল, ফেলিনা জেগে বসে আছে।
“কী রে, আজ এত জলদি ফিরে এলি?” জিজ্ঞেস করল সে।
অ্যাডোরা উত্তর না দিয়ে চুপচাপ নিজের বেডে এসে শুয়ে পড়ল। ফেলিনা কিছুক্ষণ তার দিকে চেয়ে রইল, তারপর ফের জিজ্ঞেস করল, “কিছু গোলমাল হয়েছে?”
“শুয়ে পড়। বাজে বকিস না।” বলল অ্যাডোরা।
ফেলিনা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল, তারপর হঠাৎ একলাফ দিয়ে নিজের বিছানা থেকে প্রায় উড়ে গিয়ে পড়ল অ্যাডোরার ঘাড়ে। অবশ্য প্রকৃত অর্থে ঘাড়ে পড়া হল না, কারণ অ্যাডোরার প্রক্সিমিটি সেন্সর আর থ্রেট রেসপন্স ট্রিগার দুইই সক্রিয় ছিল। সে তড়িদ্গতিতে পাশ ঘুরে ফেলিনার ছোটোখাটো শরীরটাকে শূন্যেই লুফে নিল।
“এক আছাড় মারব না, বুঝবি মজা।” বিরক্তভাবে বলল অ্যাডোরা, “বললাম না, শুয়ে পড়।”
ফেলিনা শূন্যে দোদুল্যমান অবস্থাতেই দাঁত বের করল, “তোর শোয়ার দরকার পড়ে না, আর আমি রাতে ঘুমোই না, তুই জানিস। তাহলে চল, একটু না হয় আছাড় মারার খেলাই খেলি!”
অ্যাডোরা কিছু না বলে ফেলিনাকে মাটিতে নামিয়ে দিল। ফেলিনা বলল, “হ্যাভক স্যার কী বলেছিলেন, মনে আছে তো? এই রুমে আমরা দুজনে দুজনকে মেরে ফেললেও কেউ কিছু বলবে না। ঠিক কর, কী করবি, কথা বলবি? না মারামারি করবি?”
অ্যাডোরা উঠে বসে হতাশ ভঙ্গিতে বলল, “তুই একটা যন্ত্রণা, জানিস তো!!”
ফেলিনা ফের দাঁত বের করল, তারপর বলল, “সেদিন সেই হাই গ্র্যাভিটি সিমুলেশনে তোর সুযোগ ছিল এ যন্ত্রণাটাকে ওই জঙ্গলেই ফেলে আসার! কিন্তু তুই তা না করে যন্ত্রণাটাকে ঘাড়ে তুলে বেসে ফিরিয়ে এনেছিলি। এখন তো আর এ যন্ত্রণা তোর ঘাড় থেকে নামবে না!”
“ইমোশনাল প্রিডেটর!! অ্যাঁ!!” হাসল অ্যাডোরা, “বোস এখানে।”
নিজের পাশটা চাপড়াল সে। ফেলিনা হেসে প্রায় তার কোলের উপর বসে পড়ল, বলল, “নে, এবার বল, কী হয়েছে?”
অ্যাডোরা মাথা নেড়ে বলতে শুরু করল। WAP-3 প্র্যাকটিস এবং দু-দুবার কমান্ডার উইলার কাছে ধরা পড়ে বকা খাওয়া আর শেষ অবধি সিমুলেশন টাইম অফ হয়ে যাওয়া, সবই খুলে বলল অ্যাডোরা।
সব শুনে ফেলিনা একটু অভিমানী স্বরে বলল, “তুই আমাকে বন্ধু বলিস আর এগুলো এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলি? যাক গে, তোর সমস্যায় পড়ার মতো কিছু হয়নি।”
“তার মানে?” জিজ্ঞেস করল অ্যাডোরা।
“মানে আবার কী?” হাসল ফেলিনা, “তোর সিমুলেশন টাইম অফ হয়েছে, আমার তো হয়নি। আমার কোড দিয়ে প্র্যাকটিস করবি।”
“না, না, এসব করা যাবে না।” আপত্তি জানাল অ্যাডোরা, “ধরা পড়লে আমার সঙ্গে তুইও এক্সপেলড হবি!”
“ভালোই তো হবে।” উৎসাহের সঙ্গে বলে উঠল ফেলিনা, “তুই বলেছিলি না, পৃথিবীতে আমার প্রজাতি এখনও প্রিমিটিভ ফর্মেই আছে আর মানুষরা তাদের পোষ্য রাখে?”
“হ্যাঁ, একটা প্রজাতি। ডোমেস্টিক ক্যাট!” সতর্ক ভঙ্গিতে উত্তর দিল অ্যাডোরা, ফেলিনা কী বলতে চায়, তা বুঝতে পারছিল না সে।
ফেলিনা আগের মতোই উৎসাহের সঙ্গে বলল, “দুজনকেই বের করে দিলে তোকে নিয়ে ক্রোনার ফিরে যাব। তোকে আমার পেট রাখব। মজা হবে না?”
“দূর হ লক্ষ্মীছাড়া বিড়ালনি।” বলে এক ধাক্কায় ফেলিনাকে বিছানা থেকে মেঝেতে ফেলে দিল অ্যাডোরা।

* * *
দিন দুয়েক বাদে কমান্ডার উইলার চেম্বারে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল অ্যাডোরা ও ফেলিনা। দুজনের কারও মুখেই কথা নেই, সামান্য পা ফাঁক করে হাত পেছনে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুজনে কমান্ডারের টেবিলের সামনে। টেবিলের উলটোদিকে নিজের চেয়ারে বসে উইলা স্থিরদৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করছেন দুজনকে। বলা বাহুল্য, তাদের দুজনের ষড়যন্ত্র দু-দিনের বেশি চলেনি। কমান্ডার অ্যাডোরার গতিবিধির উপর নজর রেখেছিলেন। সুতরাং ফেলিনার অ্যাকসেস কোড ব্যবহার করে অ্যাডোরা সিমুলেশন চেম্বারে ঢুকলেও ফের একবার তার প্র্যাকটিস সেশনের মাঝেই চেম্বারে ঢুকে পড়েছিলেন উইলা। হাতেনাতে ধরা পড়ে গিয়েছিল অ্যাডোরা ও ফেলিনা দুজনেই।
“তুমি কত বড়ো অপরাধ করেছ, তোমার ধারণা আছে?” গম্ভীরস্বরে জিজ্ঞেস করলেন কমান্ডার।
অ্যাডোরা উত্তর দিল না। উত্তর পাওয়ার জন্য এ প্রশ্ন যে করা হয়নি, তা সে ভালোই বুঝেছে।
উইলা বললেন, “তুমি নিজে তো আমার ডিরেক্ট অর্ডার ভায়োলেট করেইছ, আবার নিজের অপরাধের সঙ্গী করেছ অন্য একজনকে।”
এস ময় ফেলিনা বলে উঠল, “আমাকে কেউ জোর করেনি, ম্যাম; আমি নিজের ইচ্ছায় ওকে আমার কোড ব্যবহার করতে দিয়েছি!”
“শাট আপ!” ধমক দিলেন উইলা, “তোমাকে তো আমি পরে দেখছি। ফর নাউ, আমার সামনে থেকে দূর হও!”
ফেলিনা ইতস্তত করছিল, কিন্তু উইলা বজ্রকণ্ঠে বলে উঠলেন, “নাউ ক্যাডেট!”
ফেলিনা বেরিয়ে গেল আর কথা না বলে। উইলা আবার অ্যাডোরার দিকে তাকালেন, “এবার বলো, নিজের সঙ্গে বন্ধুদেরও বিপদে ফেলছ কেন? ইউনিয়নের ডেটাবেস হ্যাক করে ক্লাসিফায়েড ফাইল নামানো কত বড়ো অপরাধ, তা জানো?”
অ্যাডোরা একবার চোখ তুলে তাকাল। ডেটাবেস হ্যাক করার কথাটা ম্যাম জানলেন কী করে?
ঠিক যেন তার অকথিত প্রশ্নটার উত্তরে কমান্ডার বললেন, “তোমার বন্ধুভাগ্য খুব ভালো, কণাদও নিজের ঘাড়ে দোষ নিয়ে তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিল।”
আরও অবাক হল অ্যাডোরা। সে কণাদের সাহায্যে ডেটাবেস হ্যাক করেছে, সেটাই-বা ম্যাডাম জানলেন কী করে? আবার একবার তার অকথিত প্রশ্নটা যেন আন্দাজ করে উইলা বললেন, “তোমরা ভাবলে কী করে যে, আমাকে ঠকাতে পারবে? তোমাদের কে কী করতে পারো, তা আমি বুঝি না, ভেবেছ?”
অ্যাডোরা বুঝল আর লুকোনোর চেষ্টা করে লাভ নেই। কমান্ডার সবই বুঝে ও জেনে গেছেন। সে বলল, “আমার বন্ধুদের কোনো দোষ নেই, ম্যাম। ওরা যা করেছে, তা আমার জোরাজুরিতে করেছে। আই টেক ফুল রেসপনসিবিলিটি। দয়া করে ওদের এর মধ্যে জড়াবেন না।”
“অনলি ইফ ইউ ওবে মাই অর্ডার।” বললেন উইলা, “ওই সিমুলেশন আর কখনও প্র্যাকটিস করবে না।”
“ম্যাম, প্লিজ়!” অনুনয়ের ভঙ্গিতে বলল অ্যাডোরা, “আপনি জানেন, আমার ড্রিম ফাইটার পাইলট হওয়া।”
“সেজন্যই তোমাকে শেষ সুযোগ দিচ্ছি।” বললেন উইলা।
“ম্যাম, প্লিজ়।” ফের বলল অ্যাডোরা, “আপনি একবার এই অ্যাটাক প্যাটার্নটা দেখুন। হোয়াট আ চ্যালেঞ্জ! হোয়াট আ বিউটি!! দিস ইজ় হলমার্ক অব এনি ফাইটার পাইলট’স অ্যাচিভমেন্ট।”
উইলার চোখে হঠাৎ করেই যেন বিষণ্ণতা ঘনিয়ে এল। তিনি বললেন, “আমাকে শেখানোর চেষ্টা কোরো না ক্যাডেট। আমি খুব ভালো করে জানি আত্মবিশ্বাস আর আত্মহত্যার পার্থক্য! WAP-3 নিষিদ্ধ! এবং কোনো জিনিস নিষিদ্ধ করা হয় কোনো কারণ থাকলেই।”
“এটা নিষিদ্ধ করার কোনো কারণ নেই, ম্যাম।” নাছোড়বান্দার ভঙ্গিতে বলল অ্যাডোরা, “এমন চ্যালেঞ্জিং ফ্লাইট ম্যানুভারিং সব পাইলটের শেখা…”
“আই অ্যাম সেয়িং এগেন।” বাধা দিলেন উইলা, “আমি খুব ভালো বুঝি, ক্যাডেট, কোনটা শেখা উচিত আর কোনটা নয়। আমার সঙ্গে তর্ক কোরো না।”
দোষ স্বীকার, অনুনয়, যুক্তি কোনো কিছুতেই কাজ না-হওয়াতে হঠাৎ করেই যেন অ্যাডোরার স্টেবিলিটি ম্যাট্রিক্স ওভারলোডেড হয়ে গেল। সে আর আগে-পিছে না ভেবে তীক্ষ্ণকণ্ঠে বলে উঠল, “উইথ অল ডিউ রেসপেক্ট ম্যাম, আপনি জীবনে কখনও ফাইটার শিপের ককপিটে বসেননি। আপনি কী করে জানবেন একজন ফাইটার পাইলটের জন্য কোনটা ইম্পরট্যান্ট?!?”
উইলার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। কেউ যেন হঠাৎ করে হাতুড়ির বাড়ি মেরেছে তাঁর মাথায়। কিছুক্ষণ বাক্যহারা হয়ে অ্যাডোরার দিকে চেয়ে রইলেন তিনি, তারপর যেন অতি কষ্টে বললেন, “ডিসমিসড, ক্যাডেট!”
অ্যাডোরা চলে যাওয়ার পরে টেবিলের ডানদিকের ড্রয়ারটা খুললেন তিনি। একটা ছোটো ফোটোফ্রেম তার ভেতর উলটো করে শোয়ানো ছিল। সেটা বের করে তাতে লাগানো ফোটোটার দিকে কিছুক্ষণ অপলকে চেয়ে রইলেন তিনি। তারপর ফের সেটা উলটো করে ড্রয়ারের ভেতরে রেখে দিয়ে নিজের হলোস্ক্রিন অন করলেন। একটা কল লগ স্ক্রিনে টেনে এনে সেখান থেকে ‘লেফটেন্যান্ট হ্যাভক’ নামটাতে ট্যাপ করলেন। একটা ভিডিয়ো কল জেনারেটেড হল।
কিছুক্ষণ বাদে কলটা কানেক্ট হতেই স্ক্রিনে লেফটেন্যান্ট হ্যাভকের বিরাট গোরিলাসদৃশ মুখটা ভেসে উঠল।
“ও আবার চেষ্টা করছে, হ্যাভক।” কোনো ভণিতা না করে সরাসরি কাজের কথায় এলেন উইলা।
হ্যাভক দুঃখিতভাবে মাথা নাড়লেন, “জেদি!” বললেন তিনি, “তোমার মতোই!!”
উইলা অসন্তুষ্টভাবে মাথা ঝাঁকালেন, “এটা প্রশংসা নয়, হ্যাভক। আমার মতো ওকে হতে দেব না। ওকে থামাতে হবে।”
“তুমি একটু বেশিই কঠোর হচ্ছো, উইলা।” বললেন হ্যাভক।
“হচ্ছি, এবং তুমি জানো, তার কারণ আছে।” বললেন উইলা, “কথা বলো ওর সঙ্গে। দ্যাখো, একে ভালো কথায় বুঝিয়েসুঝিয়ে থামাতে পারো কি না। নইলে আমাকে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
“চেষ্টা করছি।” বললেন হ্যাভক, “কিন্তু তুমি এত পার্সনালি নিয়ো না এটা। ও তোমাকে ঘৃণা করতে শুরু করবে, উইলা।”
“আই ডোন্ট কেয়ার।” বললেন উইলা, “যে-কোনো মূল্যে ওকে থামাব আমি। আমার অবস্থায় ওকে আসতে দেব না কিছুতেই।”
“এত উত্তেজিত হোয়ো না। আমি দেখছি।” বললেন হ্যাভক।
লাইনটা কেটে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন উইলা, তারপর উঠে গিয়ে জানলার সামনে দাঁড়ালেন।
নিজেদের রুমে ফিরে এসে গুম হয়ে বসে রইল অ্যাডোরা। ফেলিনাও তার পাশেই বসল, কিন্তু কথা বলল না। দীর্ঘক্ষণ চুপ করে পাশাপাশি বসে রইল দুজনে। তাদের এমন চুপ করে যাওয়ার কারণ আর কিছুই না, উইলার ঘর থেকে বেরিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চলে আসেনি তারা। অপেক্ষা করছিল আরেকবার তাঁর সঙ্গে দেখা করে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করবে বলে, সে সময় ভেতরে উইলা এবং হ্যাভকের কথাবার্তা শুনে ফেলেছে তারা। ঠিক ইচ্ছা করে আড়ি পাতেনি তারা। কিন্তু উইলার উত্তেজিত স্বর, ফেলিনার অতিরিক্ত সেন্সিটিভ শ্রবণযন্ত্র এবং অ্যাডোরার উন্নত সেন্সর—সব মিলিয়ে ব্যাপারটা ঘটিয়ে ফেলেছে। কথাগুলো শোনার পরে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ায়নি তারা।
সব শোনার পরে আর উইলার সঙ্গে কথা বলা অর্থহীন তা বুঝেছিল দুজনেই।
“আমার মনে হয়েছিল, ম্যাম একটু পার্সনালি নিচ্ছেন ব্যাপারটা।” দীর্ঘক্ষণ বাদে নীরবতা ভঙ্গ করল অ্যাডোরা, “কিন্তু উনি আমাকে নিয়ে এত ইনসিকিয়োরড, তা ভাবিনি।”
“সত্যি, আমিও এরকম ভাবিনি।” বলল ফেলিনা, “ভাব, আমরা ওঁর হয়ে ইভানের সঙ্গে ঝগড়া করেছি। আর উনি তোকে নিয়ে এমন ভাবেন!!”
“এবারে হ্যাভক স্যার আসবেন আমাকে বোঝাতে।” বলল অ্যাডোরা।
“কী করবি তুই?” জিজ্ঞেস করল ফেলিনা।
“থেমে যাব।” বলল অ্যাডোরা।
“সে কী?”
“থেমে যাব, তবে শুধু অ্যাকাডেমি লাইফের জন্য!” জানাল অ্যাডোরা, “অ্যাকাডেমির পরে আর কমান্ডার আমার জীবনে থাকবেন না। আমি GUARD জয়েন করবই করব। এবং আমি WAP-3 শিখব, তুই দেখে নিস, আমি WAP-3 পারফেক্টলি আয়ত্ত করবই একদিন।”
ফেলিনা একটু হেসে উৎসাহ দেওয়ার ভঙ্গিতে অ্যাডোরার ঊরুতে চাপড় দিল কয়েকবার; তারপর বলল, “দেখতে গেলে তো আমাকে তোর সঙ্গে থাকতে হবে।”
অ্যাডোরা সামান্য ঘুরে সোজাসুজি ফেলিনার মুখের দিকে তাকাল। ফেলিনা বলল, “আমিও GUARD জয়েন করব। তোর মতো পাইলট হয়তো হতে পারব না। কিন্তু তোর কি একজন ন্যাভিগেটর বা গানার দরকার পড়বে না?”
অ্যাডোরা হেসে উঠে দাঁড়াল, তারপর ফেলিনার ঘাড়ের কাছে ধরে তাকে বেড়ালছানার মতো শূন্যে তুলে ফেলল, “তার মানে, এ যন্ত্রণা থেকে আমার মুক্তি নেই! বল?”
ফেলিনা শূন্যে ঝুলন্ত অবস্থাতেই দাঁত বের করল, “তুই কি মুক্তি চাস?”
“না, চাই না।” বলল অ্যাডোরা, “লক্ষ্মীছাড়া বিড়ালনি! চিরকাল আমার সঙ্গেই থাকিস।”
ফেলিনাকে জড়িয়ে ধরল সে। ফেলিনাও তার কোলে উঠে পড়ে বলল, “হ্যাঁ, চিরকাল থাকব।”
* * *
কেটে গেছে অনেকটা সময়। গ্যালাকটিক ইউনিয়ন যেহেতু বিভিন্ন সভ্যতার সমন্বয়ে গঠিত এবং সব সভ্যতার সময়ের হিসাব আলাদা, সুতরাং গ্যালাকটিক ইউনিয়নে একটা ভিন্ন কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড সময়ের একক আছে, সেটা বিভিন্ন সভ্যতার থেকে আসা সব সদস্যই ব্যবহার করে। কিন্তু সে জটিল এবং অচেনা পদ্ধতি ব্যবহারের চেয়ে আমরা বরং পৃথিবীর চেনা সময়ের হিসাবই ব্যবহার করি এবং বলি যে, প্রায় দশ বছর কেটে গেছে।
দশ বছরে বহু কিছু পালটে যায়। শিশুরা কিশোর হয়, কিশোররা তরুণ এবং তরুণরা পূর্ণযৌবনে উপনীত হয়ে তাদের তারুণ্যের স্বপ্নের পেছনেই ছুটতে শুরু করে।
পৃথিবীর থেকে অনেকটা দূরে নেপচুনের উপগ্রহ টাইটানের কাছে গ্যালাকটিক ইউনিয়নের যে মিলিটারি বেসটা রয়েছে, তার স্পেস-ডক-এ অপেক্ষারত ওই বিশাল কলোনি ক্লাস ডেস্ট্রয়ার শিপটার মধ্যে এই মুহূর্তে উপস্থিত তেমনই কয়েকজন যুবক যুবতি, যাদের পাঠক দেখেছেন তাদের তরুণ বয়সে, অ্যাকাডেমিতে। এবার একবার তাদের সঙ্গে দেখা করে আসা যাক।
ডেস্ট্রয়ার শিপগুলো বিশাল হয় এমনিতেই, কারণ সেগুলো বড়ো যুদ্ধের জন্য বিশেষভাবে তৈরি। এই কলোনি ক্লাস শিপগুলো তার চেয়েও বড়ো। এক-একটা প্রায় দু-কিমি লম্বা ও পাঁচশো-সাতশো মিটার ব্যাসের হয়। এটা প্রকৃত ডেস্ট্রয়ার ও বড়ো ব্যাট্ল ক্রুজ়ার বা এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ার শিপের মাঝামাঝি। এখানে শুধু GLARE-এর সৈন্যরাই নয়, বরং GUARD-এর একটা ছোটো স্কোয়াড্রনও থাকে তাদের স্পেস ফাইটারগুলো-সহ।
এই যে শিপটা আমরা দেখতে যাচ্ছি, সেটা একটা নতুন তৈরি শিপ, যার নাম ‘ইটারনিটি’। এই শিপটা এখনও অবধি স্টারবেস ছেড়ে বেরোয়নি। তৈরি হচ্ছে তার প্রথম যাত্রার জন্য। এই শিপের দায়িত্ব যার উপর, তারও ক্যাপটেন হিসাবে এটাই প্রথম পোস্টিং। প্রথম ক্যাপটেনকে সাধারণত ডেস্ট্রয়ারের দায়িত্ব দেওয়া হয় না, কিন্তু এই ক্যাপটেনকে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং প্রথম দায়িত্ব পেয়েই একটা কলোনি ক্লাস ডেস্ট্রয়ার স্টারশিপ নিয়ে বেরোতে চলেছে ক্যাপটেন স্যামর। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন স্যামর, অ্যাকাডেমির ক্লাসের সেই দায়িত্ববান ক্যাডেটটি, যে নিজে শুধু বোরিং ক্লাসগুলো করতই না, বরং বন্ধু ও ব্যাচমেটরা ক্লাসের থেকে বেরিয়ে গেলে তাদের আটকানোরও চেষ্টা করত। GLARE-এর ইতিহাসে সে সব চেয়ে কমবয়সি ক্যাপটেন। শুধু নিজের ব্যাচমেট নয়, বরং নিজের বেশ কিছু সিনিয়রকেও সে এখন আউটর্যাংক করে দিয়েছে, অর্থাৎ পদোন্নতিতে টপকে গেছে। এমনটা হল কী করে, সে ইতিহাস নয় পরে শুনবেন, আপাতত চলুন, ইটারনিটির ভেতরে ঘুরে দেখা যাক, যদি আর কোনো পরিচিত মুখ দেখা যায়।
পরিচিত মুখ দেখতে পাওয়া অবশ্য খুবই স্বাভাবিক, কারণ এই শিপের ক্রু-দের বিশেষ করে ব্রিজ বা প্রধান অফিসারদের স্যামর নিজে বেছে নিয়েছে এবং সেখানে প্রাধান্য পেয়েছে তার একদা ব্যাচমেটরাই। সুতরাং এখানে চিফ ইঞ্জিনিয়ারের দায়িত্বে আছে ইভান, চিফ সায়েন্স অফিসার কণাদ। দুজনেই এখন লেফটেন্যান্ট। চিফ কমিউনিকেশন অফিসারের দায়িত্বে লেফটেন্যান্ট গ্রিনা, যে সেই অ্যাকাডেমি থেকেই স্যামরের প্রেমিকা। বেশ কিছুদিন আলাদা আলাদা শিপে ডিউটি করার পর এখন আবার মিলিত হতে পেরেছে দুজনে। বলা বাহুল্য, এটাও স্যামরের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে।
শিপের বিশাল শাটলবে বা হ্যাঙার, যেখানে গোটাকতক শাট্ল এবং গোটা পনেরো স্পেস ফাইটার রাখা, তার এককোণে একটা আলাদা পুরোনো মডেলের ফাইটার শিপের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল যে মেয়েটি, সে পেছন থেকে কারও ডাক শুনে ঘুরে তাকাতেই বোঝা গেল সে-ও পরিচিত মুখ, লেফটেন্যান্ট অ্যাডোরা। GUARD থেকে GLARE-এ সদ্য বদলি হয়ে এসেছে সে মূলত স্যামরের অনুরোধে। সে-ই এখন শিপের চিফ হেল্ম কনট্রোল অফিসার বা পাইলট। হ্যাঁ, তার একটা স্বপ্নপূরণ হয়েছে বটে। GUARD-এর বেস্ট পাইলটের স্বীকৃতি ইতিমধ্যেই পেয়ে গেছে সে।
তার এই উত্থানে সর্বদা তার পাশে ছিল যে, সেই ‘লক্ষ্মীছাড়া বিড়ালনি’ এখানেও তার সঙ্গ ছাড়েনি। যেমন কথা দিয়েছিল, ঠিক তেমন করেই কথা রেখেছে সে। এই শিপেও অ্যাডোরার পাশের আসনটা তার জন্যই রাখা, কারণ সে শিপের চিফ ন্যাভিগেশন অফিসার লেফটেন্যান্ট ফেলিনা, এই মুহূর্তে তার ডাকেই ঘুরে তাকিয়েছে অ্যাডোরা।
ফেলিনা দৌড়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল, “খবর শুনেছিস?”
“কী খবর?” জিজ্ঞেস করল অ্যাডোরা।
“স্যামরের ফার্স্ট অফিসার হয়ে কে আসছেন, জানিস?” বলল ফেলিনা।
“কে?” ভুরু কোঁচকাল অ্যাডোরা।
“কমান্ডার উইলা!!” জানাল ফেলিনা।
“কমান্ডার উইলা!! মানে—” অ্যাডোরার প্রশ্নটা মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে ফেলিনা বলল, “হ্যাঁ, তুই যার কথা ভাবছিস, তিনিই!”
“তিনি অ্যাকাডেমি ছেড়ে হঠাৎ শিপে অ্যাকটিভ ডিউটিতে?” অবাক হল অ্যাডোরা, “আমি যতদূর জানি, শেষ বিশ বছরে তিনি অ্যাকাডেমির বাইরে পা রাখেননি।”
“যে কারণে তুই-আমি এখানে, ঠিক সেই কারণেই।” বলল ফেলিনা।
“স্যামর?” সন্দিগ্ধ কণ্ঠে বলল অ্যাডোরা।
ফেলিনা সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল, “স্যামরের ক্যাডেট ফেজ় এখনও কাটেনি, মনে হচ্ছে। কিংবা এখানে একটা আলাদা অ্যাকাডেমি খুলতে চায়। পুরোনো ইনস্ট্রাক্টরদের নিয়ে আসছে এখানে।”
“আর কে আসছেন?” জিজ্ঞেস করল অ্যাডোরা।
“হ্যাভক স্যার।” জানাল ফেলিনা, “উনি এখন লেফটেন্যান্ট কমান্ডার হয়ে গেছেন। উনি চিফ অব সিস্টেমস হয়ে আসছেন, মানে এখানে ইভান আর কণাদের বস।”
“লাকি দেম।” মন্তব্য করল অ্যাডোরা, “কিন্তু কমান্ডার উইলা যদি আসেন তাহলে তো আমি এখানে থাকতে পারব না।”
ফেলিনা কিছু বলল না। অ্যাডোরা কেন এ কথা বলছে, সে খুব ভালোই জানে। বস্তুত সে সব চেয়ে ভালোভাবে জানে। স্যামরও যে একেবারে জানে না অ্যাডোরা এবং কমান্ডার উইলার সম্পর্কের কথা, তা নয়। তবুও সে দুজনকেই ডেকেছে এবং মজার ব্যাপার, উইলা, যিনি গত বিশ বছর অ্যাকাডেমির বাইরে পা বাড়াননি, তিনি স্যামরের ডাকে সাড়া দিয়ে তার অধীনে ফার্স্ট অফিসার হতে রাজিও হয়ে গেছেন। হ্যাভক অবশ্য শেষ চার-পাঁচ বছর ধরে অ্যাকটিভ শিপ ডিউটি করছেন। তাঁকে চিফ সিস্টেম অফিসার হিসেবে ডাকার একটা মানে আছে। কিন্তু কমান্ডার উইলা!! তিনি কেন?
প্রশ্নটা মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই ফেলিনা দেখল, অ্যাডোরা হ্যাঙার ছেড়ে শিপের ভেতরদিকে হাঁটতে শুরু করেছে।
“কোথায় যাচ্ছিস?” জিজ্ঞেস করল ফেলিনা।
“ক্যাপটেনের কাছে।” যেতে যেতেই উত্তর দিল অ্যাডোরা।
কথাটা শুনেই ফেলিনা বুঝল, তার বন্ধুটি খেপে গেছে। এখন সে যার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে, সে লোকটি তার ব্যাচমেট স্যামর নয়, এই শিপের ক্যাপটেন।
“পাগলামি করিস না অ্যাড।” চেঁচিয়ে বলল ফেলিনা।
অ্যাডোরা কোনো কথা না বলে হ্যাঙার থেকে বেরিয়ে গেল। তার শরীর ফেলিনার চোখের আড়ালে যাওয়ার মুহূর্তে তার ছুড়ে-দেওয়া টেলিপ্যাথিক বার্তাটা ফেলিনার মাথায় আঘাত করল, “শাট আপ!!”
ফেলিনা কী করবে, বুঝতে পারছিল না। এ খবরটা অ্যাডোরাকে দেওয়াটা ভুল হল কি না, সেটাই বোঝার চেষ্টা করছিল সে, কিন্তু অ্যাডোরা তো এটা জানতে পারতই!! কী করবে, সেটা বুঝে ওঠার আগেই ফেলিনা দেখল, একটা শাট্ল বাইরে থেকে হ্যাঙারে ঢুকছে। কৌতূহলী হয়ে দাঁড়িয়ে গেল সে! কে এল?
শাট্ল থেকে যে দুজন বেরোলেন, তাঁদের নিয়েই এতক্ষণ কথা বলছিল সে। লেফটেন্যান্ট কমান্ডার হ্যাভক এবং কমান্ডার উইলা। দুজনেরই পরনে GLARE ইউনিফর্ম। হাঁটার ভঙ্গি দেখলে কেউ বলবে না যে, দুজনের বয়স দশ বছর করে বেড়ে গেছে।
ফেলিনার দিকেই এগিয়ে এলেন তাঁরা। ফেলিনা একটু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হেসে স্যালুট করল।
হ্যাভক সামান্য হেসে স্যালুট ফিরিয়ে দিলেন। উইলা যেন ফেলিনাকে দেখতেই পেলেন না। তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ ফেলিনার পেছনে দাঁড় করানো সেই পুরোনো মডেলের ফাইটার শিপটার দিকে। তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিকে তাকানোমাত্র হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন হ্যাভক।
“এই শিপটা এখানে কেন?” জিজ্ঞেস করলেন তিনি, “কে চালায় এটা?”
“কেউ না, স্যার।” উত্তর দিল ফেলিনা, “এটা অ্যাডোরার মেমেন্টো বলতে পারেন। ওর প্রাইজ়।”
“তার মানে?” ভুরু কোঁচকালেন হ্যাভক।
“এটা লেজেন্ডারি ইনফিনিটি স্কোয়াড্রনের ব্যবহার করা ফাইটার, স্যার।” বলল ফেলিনা, “অ্যাডোরা অনেক খুঁজে GUARD-এর একটা পুরোনো হ্যাঙার থেকে এটা পেয়েছে। শিপটা একদম ভেঙেচুরে প্রায় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ও এটা সারিয়ে, নতুন করে আবার ব্যবহারযোগ্য করেছে। ওর মতে এটা একটা লেজেন্ডের অংশ। ও যেখানে যায়, এটা সঙ্গে নিয়ে যায়। ওর প্রিয় স্মারক।”
“আই সি।” বললেন হ্যাভক।
এতক্ষণ বাদে উইলা তাকালেন ফেলিনার দিকে, বললেন, “কিছু লেজেন্ড, কিছু ইতিহাস চাপা দিয়েই রাখতে হয়, ক্যাডেট। সব ইতিহাসের পাতা ওলটাতে নেই। তা ছাড়া ভাঙা খেলনা নিয়ে খেলা করার বয়সও নেই তোমাদের। এসো হ্যাভক, লেট’স মিট দ্য ক্যাপটেন।”
ফেলিনাকে হতভম্ব অবস্থায় রেখেই হ্যাঙার ছেড়ে চলে গেলেন দুজনে। তাঁদের শরীর সামনে থেকে অপসৃত হওয়ার পর একটা হাঁপ ছেড়ে সে নিজের মনেই বলল, “ম্যাম আর পালটালেন না। এখনও আমাদের ক্যাডেট মনে করেন। আর কী যে বলেন, কিছু বুঝি না। যাক গে, অ্যাড যদি না থাকে তাহলে আমিও এখানে থাকব না।”
মুখ গোমড়া করে ক্যাপটেনের কেবিন থেকে বেরিয়ে এল অ্যাডোরা। যে উদ্দেশ্যে সে এখানে ছুটে এসেছিল, তা সফল হয়নি। প্রথমত, কথা বলে কাজ হাসিল করার ব্যাপারে সে কোনোদিনই তেমন পটু নয়, আর স্যামরের প্রতি তার একটা সুপ্ত দুর্বলতা আছে, যার জন্য কিছুতেই স্যামরের কোনো অনুরোধ বা কথা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করতে পারে না সে।
এখনও তা-ই হয়েছে, সে কিছুতেই স্যামরকে বোঝাতে পারেনি যে কমান্ডার উইলার সঙ্গে একত্রে কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। বরং স্যামর উলটে তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে কমান্ডার উইলার গাইডেন্স ও অ্যাডোরার স্কিল দুটোই এ শিপের জন্য কত প্রয়োজনীয়। এবং তাদের দুজনের মধ্যে যাতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি না হয়, তা দেখার দায়িত্ব স্যামরের। সে-ই নাকি দুজনের মধ্যে যোগাযোগের সেতু হয়ে থাকবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
কমান্ডার উইলার সঙ্গে তার যোগাযোগের সব সেতু যে বহু বছর আগেই ভেঙে পড়েছে, তা আর বোঝাতে পারেনি অ্যাডোরা। এ শিপ ছেড়ে আবার GUARD-এ ফিরে যাওয়ার কথাও জোর গলায় বলতে পারেনি। আসলে স্যামরের মুখোমুখি হলেই তার ইমোশনাল ফিডব্যাক লুপ কেন যে এমন ওভারড্রাইভ মোডে চলে যায়, তা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না অ্যাডোরা। বিশেষ করে যদি আবার গ্রিনা স্যামরের সঙ্গে থাকে, যেমন এখন ছিল।
নিজের উপরেই একরাশ বিরক্তি নিয়ে করিডরে বেরিয়েই উইলা ও হ্যাভকের মুখোমুখি হল অ্যাডোরা। তাঁরা দুজনে ক্যাপটেনের কেবিনের দিকেই আসছিলেন। থমকে গেলেন দুজনেই অ্যাডোরাকে দেখে, অ্যাডোরাও থমকে গেল।
উইলা এবং হ্যাভক দুজনেই যেন দশ বছর আগের সেই অ্যাকাডেমির সময়ের বয়সটাই ধরে রেখেছেন। ত্বক বা মুখের পেশি কোনোটাই একটুও আলগা হয়নি, শরীরের বাঁধুনি এবং হাঁটার ভঙ্গিও ঠিক আগের মতোই আছে। উইলার সব চুল এমনিতেই সাদা, সুতরাং চুলের রঙেও কোনো তফাত ঘটেনি, হ্যাভকের ঘন বাদামি চুল ও লোমের মধ্যে অবশ্য রুপোলি রেখার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। চোখের দৃষ্টিও ঠিক আগের মতোই, হ্যাভকের উদাসীন ও কোমল, উইলার তীক্ষ্ণ ও নির্বিকার, যদিও সেটা শীতল কঠোরতার ভিন্নরূপ বলে মনে হয় অ্যাডোরার।
কয়েক মিলিসেকেন্ডের বিমূঢ় ভাব কাটিয়ে উঠে স্যালুট করল অ্যাডোরা, মৃদুস্বরে সৌজন্যসূচক ভঙ্গিতে যথাক্রমে উইলা ও হ্যাভকের উদ্দেশে বলল, “কমান্ডার। স্যার।” তারপর দ্রুতপদে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
সে করিডরের বাঁকে অদৃশ্য হলে হ্যাভক উইলার দিকে তাকালেন, “ও এখনও তোমাকে ঘৃণা করে। আমি বলেছিলাম তোমাকে!”
“ইউ থিংক, আই কেয়ার?” বললেন উইলা, “অল আই কেয়ার ইজ়—”
থেমে গিয়ে ক্যাপটেনের কেবিনের দিকে পা বাড়ালেন তিনি। হ্যাভক একটা হতাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাঁকে অনুসরণ করলেন।
কেবিনের দরজার অ্যালার্ট বিপ শুনে টেবিলে রাখা ছোটো হলোস্ক্রিনটার দিকে এক পলক দেখে নিল স্যামর। দরজার বাইরে কারা আছে, তাদের দেখা যায় এখানে।
“কাম ইন।” বলল সে।
উইলা ও হ্যাভক ঘরে ঢুকে টেবিলের সামনে এসে স্যালুট করলেন। স্যামর উঠে দাঁড়াল, গ্রিনাও। স্যালুট ফিরিয়ে দিল দুজনেই।
উইলা ক্ষণিকের জন্য একবার গ্রিনার দিকে তাকিয়েই ফের স্যামরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার পার্সনাল টাইমে ডিস্টার্ব করার জন্য দুঃখিত, ক্যাপটেন।”
“নো, নো, ইট’স অফিশিয়াল টাইম, কমান্ডার।” তাড়াতাড়ি বলে উঠল স্যামর; তারপর গ্রিনার দিকে ফিরে বলল, “ওকে লেফটেন্যান্ট, ডিসমিসড।”
গ্রিনা একটা স্যালুট করল, প্রথমে স্যামরকে, তারপর উইলা ও হ্যাভকের দিকে ফিরেও স্যালুট করে বলল, “ম্যাম! স্যার!!”
দুজনেই সামান্য মাথা নাড়লেন। গ্রিনা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। এতদিন পর আবার উইলা ও হ্যাভকের মুখোমুখি হল সে। তাঁদের চেহারা শুধু নয়, তাঁদের মানসিক তরঙ্গও, যা গ্রিনার টেলিপ্যাথিক মননে প্রতিধ্বনিত হয়, তাও এখনও একই রকম আছে। শান্তি ও বিষণ্ণতা! অস্থিরতা ও কোমলতা!! দুজনের সঙ্গে আলাদাভাবে মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে গ্রিনা জানে, এই শান্ত, কোমলতার ধ্বনি আসে হ্যাভকের থেকে, এবং অস্থির বিষণ্ণতার সমুদ্র লুকিয়ে আছে উইলার কঠোর বহিরঙ্গের অনেক গভীরে।
গ্রিনা চলে যাওয়ার পর স্যামর যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। সামান্য ইনফর্মাল ভঙ্গিতে সে বলল, “কমান্ডার ম্যাম, কমান্ডার স্যার! প্লিজ় বসুন।”
“আফটার ইউ, ক্যাপটেন।” বললেন উইলা।
“ওকে।” স্যামর বসল। তার মুখোমুখি টেবিলের উলটোদিকে বসলেন উইলা ও হ্যাভক।
স্যামর বলল, “ম্যাম, স্যার, এখন আমরা একা। প্লিজ় কল মি স্যামর!”
উইলা মৃদু হাসলেন। হ্যাভক তাঁর দিকে চেয়ে বললেন, “বলেছিলাম কি না?”
“হি ইজ় নট আওয়ার ক্যাডেট এনিমোর, হ্যাভক।” বললেন উইলা।
স্যামর বলে উঠল, “নো ম্যাম, আপনাদের জন্য আমি সব সময় সেই ক্যাডেট!”
“তুমি আমাদের ছাড়িয়ে গেছ, স্যামর।” বললেন উইলা, “ইউ আর দ্য বেস্ট উই হ্যাড।”
“ধন্যবাদ, ম্যাম।” বলল স্যামর, “এবং ধন্যবাদ আমার সঙ্গে কাজ করতে রাজি হওয়ার জন্য!”
“সে ব্যাপারে আমি এখনও শিয়োর নই।” বললেন উইলা, “হ্যাভকের এক্সপার্টিজ় অবশ্যই তোমার কাজে লাগবে। কিন্তু আমি শুধু স্ট্রিক্টনেস ছাড়া আর কিছুই দিতে পারব না, তা ছাড়া আমি ঠিক ‘ইয়েস ম্যান’ও নই।”
“আই অ্যাম কাউন্টিং অন দ্যাট, ম্যাম। আর আপনার এক্সপার্টিজ় সম্পর্কে বলি, আই নো এভরিথিং নাউ, ম্যাম। এখন আপনার গোটা ফাইলে আমার অ্যাকসেস আছে।”
উইলার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। কাটা-কাটা শ্বাসের সঙ্গে বললেন, “এবং তাও তুমি আমাকে ফার্স্ট অফিসার চাও? আই উইল বি আ লায়াবিলিটি ফর ইউ, স্যামর।”
স্যামরও উঠে দাঁড়াল, হ্যাভকও। স্যামর বলল, “না, ম্যাম। এখন আমি নিশ্চিত জানি যে আপনি আমার বেস্ট অ্যাসেট। প্লিজ় ম্যাম, আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না।”
উইলা ইতস্তত দ্বিধাগ্রস্ত ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন, “আমি নিশ্চিত নই। আমি—”
হ্যাভক উইলার কাঁধে হাত রাখলেন, “গিভ হিম আ চান্স, উইলা, গিভ ইয়োরসেল্ফ আ চান্স।”
উইলা হ্যাভকের দিকে চেয়ে একটা মৃদু তৃপ্তির হাসি হাসলেন। তারপর একটা গভীর শ্বাস নিয়ে স্যামরের দিকে চেয়ে বললেন, “ঠিক আছে, আমি জয়েন করব, কিন্তু—”
“কেউ জানবে না, ম্যাম।” উইলার বাক্যটা শেষ হওয়ার আগেই বাধা দিয়ে বলে উঠল স্যামর।
“থ্যাংক ইউ।” বললেন উইলা।
“নো, থ্যাংক ইউ, ম্যাম।” বলে স্যালুট করল স্যামর।
উইলা এবং হ্যাভকও অ্যাটেনশন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে স্যালুট করলেন। ঘর ছেড়ে যাওয়ার সময় দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ ফিরে দাঁড়ালেন উইলা, “অ্যান্ড ওয়ান মোর থিং, ক্যাপটেন। আপনার টেলিপ্যাথ বন্ধুকে বলে দেবেন যেন আমার মাইন্ড রিড করার চেষ্টা না করে।”
* * *
আট মাস প্রায় কেটে গেছে, ইটারনিটি নেপচুনের স্টারবেস ছেড়ে দূর মহাকাশের উদ্দেশে প্রথমবার পাড়ি দেওয়ার পর। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে ক্রু-রা একে অপরকে চেনা ও জানার সুযোগ পেয়েছে। যারা আগে থেকেই একে অপরকে জানত বা চিনত, তাদের পরিচয় আরও গভীর হয়েছে। যারা বহুদিন একে অপরের দেখা পায়নি, তারা এখন পরস্পরের সান্নিধ্যে অবসর যাপন করে নিজেদের দীর্ঘ বিচ্ছেদ ও বিরহের ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করছে। বেশির ভাগ সমবয়সি বা কাছাকাছি বয়সি হওয়াতে সুবিধাও হয়েছে। যাঁরা একটু সিনিয়র, তাঁরাও নিজেদের সমবয়সি বা সমপ্রজাতি বা সামাজিক গ্রুপমতো তৈরি করে ফেলেছেন। একজনমাত্র আছেন, যিনি এ ধরনের কোনো গ্রুপে নেই। একজন ব্যতিরেকে তাঁর কোনো বন্ধুও নেই। তিনি হলেন কমান্ডার উইলা।
ডিউটি আওয়ারের বাইরে তিনি নিজের কেবিন ছেড়ে কদাচিৎ বেরোন। কাফেটেরিয়াতে এলেও সাধারণত কোনার দিকে ছোটো টেবিল দখল করে বাইরে অনন্ত মহাকাশের বুকে নক্ষত্রের সজ্জা দেখতে থাকেন। একমাত্র লেফটেন্যান্ট কমান্ডার হ্যাভক ব্যতিরেকে ডিউটি আওয়ারের বাইরে কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বলার সাহস করে না।
তাঁর পেশাদারি দক্ষতা প্রায় অকল্পনীয়। যেমন দক্ষতার সঙ্গে তিনি অ্যাকাডেমিতে কাজ করতেন, তেমনই শীতল দক্ষতার সঙ্গে তিনি এই শিপের প্রতিটি বিষয়ে নজর রাখেন। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবন অ্যাকাডেমির মতোই এখানেও নির্লিপ্ত কাঠিন্যের এক বুদ্বুদ দিয়ে ঘেরা। বাইরে থেকে তাঁকে দেখা যায়, কিন্তু কাছে ঘেঁষা যায় না।
অবশ্য কেউ যে বিশেষ ঘেঁষতে চায়, তাও না। বরং কিছু লোক তো সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রাখতে বা এড়িয়ে চলতে পারলেই বাঁচে। এদের মধ্যে আছে কণাদ বা ফেলিনার মতো ব্রিজ অফিসাররাও। দশ বছর আগে অ্যাকাডেমিতে অ্যাডোরার বেআইনি কাজে সাহায্য করার জন্য তাদের যে ধমক উইলা দিয়েছিলেন, তা এখনও যেন তাদের স্মৃতিতে তাজা হয়ে আছে। তাঁর সামনে গেলে তারা এখনও সেই ভীরু ক্যাডেট হয়ে যায়। অবশ্য উইলা এখন আর ধমক দেন না। শীতল কণ্ঠে পেশাদারি ভঙ্গিতে নিজের বক্তব্যটুকু বলেন বা আদেশটা দেন। বলা বাহুল্য, সে বক্তব্যের বিরোধিতা করার বা আদেশটা ঠিকভাবে পালন না-করার সাহস কারোই হয় না।
এই বিশাল শিপে প্রায় দেড়শোজন ক্রু ও অফিসারের মধ্যে একমাত্র যে লোকটি কমান্ডার উইলাকে উপেক্ষা করার বা বিরোধিতা করার সাহস দেখায়, সে হল লেফটেন্যান্ট অ্যাডোরা। এবং তার এই অভ্যাস আজ নয়, বরং দশ বছর আগে থেকেই আছে। অ্যাকাডেমিতে থাকাকালীন সে WAP প্র্যাকটিস করা বন্ধ করেছিল বটে, কিন্তু কমান্ডার উইলার সঙ্গে তার এক অদৃশ্য শত্রুতা শুরু হয়ে গিয়েছিল।
কমান্ডার হয়তো কোনো থিয়োরির ক্লাসে শেখাচ্ছেন, শত্রুর মিসাইল ছুটে এলে কেমন করে ইভাসিভ ম্যানুভার করতে হবে, অ্যাডোরা উঠে প্রায় চ্যালেঞ্জের সুরে বলত, “ইভাসিভ ম্যানুভার কেন? এর বদলে টর্পেডো রোল করে আমি পালটা পাল্স ক্যানন চালিয়ে এনিমি ফাইটারটা উড়িয়ে দিতে পারি মিসাইলটা হিট করার আগেই!!?”
কমান্ডার চেয়ে থাকতেন কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে, তারপর হয়তো বলতেন, “থার্টি কিমি পার সেকেন্ড স্পিডে ওড়া ফাইটার নিয়ে হঠাৎ টর্পেডো রোল আর পাল্স ক্যানন চার্জিং!! জি ফোর্স যা জেনারেটেড হবে, তাতে মানুষ তো বটেই, তুমিও সেন্সলেস হয়ে পড়বে, মিসাইলটা ডজ করতে পারা যাবে কি না, সে কথা ছেড়েই দিলাম। এমন করে আত্মহত্যা করা যায়, যুদ্ধ জেতা যায় না। বোসো।”
অ্যাডোরা বসত না, উদ্ধত ভঙ্গিতে বলে উঠত, “ইভাসিভ ম্যানুভার মানে পালানো। পালিয়ে জেতা যায় না। জিততে হলে সাহস আর নতুন কিছু করার উৎসাহ লাগে। ওই WAP ম্যানুভারিং যিনি বানিয়েছিলেন, তাঁর মতো। অবশ্য যারা চিরকাল অ্যাকাডেমিতে থিয়োরির ক্লাস করিয়েছে, কোনোদিন ফাইটার শিপ চালায়নি, তারা এসব বুঝবে না।”
তার ব্যাচমেটদের মতোই যেন স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ অ্যাডোরার দিকে তাকিয়ে থাকতেন উইলা, তারপর ধীরকণ্ঠে বলতেন, “বোসো ক্যাডেট। ক্লাসটা করো।”
ব্যাপারটা কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি। দু-দিন পরেই সিমুলেশন চেম্বারে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল। অ্যাডোরা প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে, তিরিশ কিমি প্রতি সেকেন্ড গতিতেও টর্পেডো রোল করে মিসাইল ডজ এবং পাল্স ক্যানন ফায়ার করে এনিমি শিপ উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। সিমুলেশন কম্পিউটার তাকে সাবধান করেছিল “অতীব বিপজ্জনক সিমুলেশন” বলে, কিন্তু সেসব সিকিউরিটি প্রোটোকল ওভাররাইড করে সিমুলেশন চালায়, এবং এ সময় সে একা ছিল না। তার সঙ্গে ন্যাভিগেটর হিসেবে ছিল তার ‘লক্ষ্মীছাড়া বিড়ালনি’।
ফলাফল ঠিক তা-ই হয়েছিল, যা উইলা বলেছিলেন। টর্পেডো রোল করামাত্র ভয়ানক জি ফোর্সের কারণে দুজনেই অজ্ঞান হয়ে যায়। সিমুলেশনে দুজনেই মারা যেত, যদি ঠিক সময়ে উইলা এসে সিমুলেশন বন্ধ করে দুজনকে না বের করতেন। ফেলিনার বায়োলজিক্যাল শরীর বেশি আহত হয়েছিল। সিমুলেশন চেম্বারে আর বেশিক্ষণ থাকলে ব্রেন হ্যামারেজ হয়ে সে মারাও যেতে পারত। অবশ্য সুস্থ হয়ে ওঠার পরেও সে অ্যাডোরাকে এজন্য দোষারোপ করেনি। সর্বদা জোর গলায় বলেছে, “কেউ আমাকে জোর করেনি। আমি সব জেনেই ওর সঙ্গে গেছিলাম।”
অ্যাডোরা যে মাত্র এক মাস ‘সিমুলেশন টাইম’ বন্ধ হওয়ার মতো ছোটো শাস্তিতেই রেহাই পায়, তার কারণ হয়তো সে ভাইস-অ্যাডমিরালের মেয়ে বলে বা হয়তো উইলা তার কেরিয়ার শেষ করে দিতে চাননি বলে!
এ ঘটনার পরেও অবশ্য অ্যাডোরা বদলায়নি। বরং উইলা যখন তাকে ‘বেপরোয়া’ বলে ভৎর্সনা করেন, তখন সে উদ্ধত ভঙ্গিতে বলেছিল, “ফাইটার পাইলটদের বেপরোয়া সাহসীই হতে হয়। সারাজীবন ডেস্কে বসে ম্যানুয়াল পড়ে কেউ যুদ্ধ জেতা শেখাতে পারে না।”
এবারও হতভম্ব বিবর্ণ দৃষ্টিতে অ্যাডোরার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার পর উইলা শুধু দুটো শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন, “ডিসমিসড, ক্যাডেট।”
আজ এই দশ বছর বাদেও দুজনের মধ্যে সম্পর্ক সেই একই রকম আছে। উইলা যেন শিপের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড নন, বরং আজও সেই অ্যাকাডেমির ইনস্ট্রাক্টর এবং অ্যাডোরা যেন আজও সেই উদ্ধত ক্যাডেট! শুধু তার ঔদ্ধত্যের চরিত্র পালটে গেছে। ব্রিজে স্যামরের অনুপস্থিতিতে যখন উইলা দায়িত্বে থাকেন, তখন অ্যাডোরার শিফট থাকলে সে দেরিতে আসে। শিফট শেষ হওয়ামাত্র সে ব্রিজ ছেড়ে চলে যায় পরের জনের অপেক্ষা না করেই। ফেলিনা বা অন্য কোনো ন্যাভিগেটর যে পাশে থাকে, সে তড়িঘড়ি পরিস্থিতি সামলায়।
হ্যাঙারে রাখা তার প্রাইজ় মেমেন্টো, ইনফিনিটি স্কোয়াড্রনের ফাইটারটাকে যে উইলা ‘ভাঙা খেলনা’ বলে বিদ্রুপ করেছেন, তা সে শুনেছে। সেজন্যই সম্ভবত উইলা কোনো কাজে হ্যাঙারে গেলে অ্যাডোরা তাঁর সামনে ওই ফাইটারটার অতিরিক্ত পরিচর্যায় একশো ভাগ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। উইলা অবশ্য এসবে বিশেষ বিচলিত হন না, অ্যাডোরার এসব কিছুর উত্তরে তিনি একমাত্র যে প্রতিক্রিয়া দেখান, তা হল শীতল নীরবতা। তাঁর এই নীরব উপেক্ষা যেন অ্যাডোরাকে আরও খেপিয়ে তোলে। যে-কোনো উপায়ে উইলার সঙ্গে সংঘাতে যেতে সে যেন বদ্ধপরিকর।
তার চেষ্টা প্রায় চরমে উঠল, যখন ওরাইয়ন নেবুলার দিকে পৃথিবী থেকে প্রায় সাড়ে আটশো আলোকবর্ষ দূরে রিজেল নামে একটা নীল সুপার জায়ান্ট নক্ষত্রের কাছে অবস্থিত গ্যালাকটিক ইউনিয়নের একটা মাইনিং কলোনিতে স্টেমনেল ড্রোয়েড পাইরেটদের আক্রমণ ঠেকানো ও উদ্ধারকার্যে সহায়তার জন্য ইটারনিটিকে যেতে বলা হল। উইলার নিষেধ সত্ত্বেও অ্যাডোরা একটা অ্যাকটিভ ম্যাগনেটার, অর্থাৎ ম্যাগনেটিক নিউট্রন স্টারের কাছ দিয়ে শিপ চালাল এবং তার রেডিয়েশন বার্স্টের সঙ্গে শিপের পেছনের শিল্ড হারমোনিকস ও রেডিয়েশন সেইল বা পাল অ্যালাইন করল। তার যুক্তি ছিল, ওই ভয়ানক রেডিয়েশন বার্স্ট শিপকে বিনা জ্বালানিতেই অনেকটা দূর এগিয়ে দেবে। ঠিক যেমন বিরাট ঢেউয়ের মাথায় চড়ে সার্ফাররা দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যায়।
উইলা কোনো সংঘাতে গেলেন না, শুধু ইভানকে বলে দিলেন সমস্ত নন-এসেনশিয়াল পাওয়ার শিপের অ্যাফ্ট শিল্ড, অর্থাৎ পেছনের শিল্ড ও সোলার সেইলের ডিফ্লেক্টরে পাঠাতে।
অ্যাডোরার পরিকল্পনা কাজ করল বটে, তবে সে ঠিক যেভাবে ভেবেছিল, সেভাবে নয়। আগেকার আমলে পৃথিবীতে প্রবল সামুদ্রিক ঝড় যেমন করে জাহাজগুলোকে কোনো একদিকে ছুড়ে দিত, এখানেও ম্যাগনেটারের ভয়ংকর রেডিয়েশন বার্স্ট ইটারনিটিকে যেন ছুড়ে ফেলল কয়েক কোটি কিলোমিটার দূরে।
স্যামর সে সময় নিজের কেবিনে ছিল। ভয়ানক ওলট-পালট খেয়ে শিপের প্রায় সব কিছু লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ার পর ইটারনিটি যখন আবার স্থির হল, তখন স্যামর ব্রিজে কল করে জানতে চাইল কারণটা।
অ্যাডোরার চোখে চোখ রেখে উইলা জানালেন, “সরি ক্যাপটেন, আমি একটু অতিরিক্ত অ্যাডভেঞ্চারপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম, বিনা জ্বালানিতেই অনেকটা রাস্তা ট্রাভেল করা যাবে। আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি। এমনটা আর হবে না।”
স্যামর কী বুঝেছিল, সে-ই জানে। সে আর কিছু না বলে কল কেটে দিল। উইলা কণাদকে বললেন ইভানের টিমের সঙ্গে যোগ দিয়ে জাহাজের অ্যাফ্ট শিল্ড জেনারেটরগুলো দ্রুত মেরামত করতে। এরপর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এলটাকে ব্রিজের দায়িত্বে রেখে হ্যাভককে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন শিপের সিস্টেম ও অন্য স্টাফদের অবস্থা সরেজমিনে দেখতে।
এই সূক্ষ্ম সংঘাত নগ্নরূপে বেরিয়ে এল রিজেল নক্ষত্রের কাছে মাইনিং কলোনিতে ডিফেন্স অ্যান্ড রেসকিউ অপারেশনের পর। ইটারনিটি যখন সেখানে পৌঁছোল, তখন পরিস্থিতি বেশ খারাপ। গ্যালাকটিক ইউনিয়নের সাম্প্রতিকতম দুশ্চিন্তা স্টেমনেল ড্রোয়েড পাইরেটদের একটা বিশাল দল, প্রায় ষাট-সত্তরটা স্পেস ফাইটার মাইনিং কলোনিটাকে ছেঁকে ধরেছে। তাদের উপর্যুপরি আক্রমণে কলোনির কাউন্টার মেজ়ার পুরোপুরি বিধ্বস্ত এবং যে-কোনো মুহূর্তে শিল্ড ভেঙে পড়বে।
ইটারনিটির প্রধান মিশন হয়ে দাঁড়াল, কলোনির লোকেদের উদ্ধার এবং যতক্ষণ না উদ্ধারকাজ পুরো হচ্ছে, ততক্ষণ অবধি পাইরেটদের ঠেকানো। GUARD-এর যে ছোটো ইউনিটটা ইটারনিটিতে পোস্টেড, তাদের কমান্ডিং অফিসার অ্যাডোরা তাদের নিয়ে বেরিয়ে এল বাইরে। পনেরোটামাত্র স্পেস ফাইটার সত্তরটা শত্রুপক্ষীয় ফাইটারের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করে জিততে পারবে না। তাই ট্যাকটিক্যাল অফিসার হ্যাভকের পরিকল্পনা ছিল যে, অ্যাডোরার টিম ইটারনিটির কাছাকাছিই থাকবে এবং রেসকিউ অপারেশন চলাকালীন শুধু প্রতিরক্ষা করবে। যতক্ষণ না অতিরিক্ত GLARE ও GUARD সাহায্য ও ফাইটার এসে পৌঁছোয়। ইটারনিটির কামানগুলো অ্যাডোরার ইউনিটকে দরকারি সাপোর্ট ও কভার দেবে, এমনটাই ভাবা হয়েছিল।
কার্যক্ষেত্রে অবশ্য এমনটা হল না। কিছুক্ষণ আশপাশে ঘোরাফেরা ও হালকা ডগফাইটের পর অ্যাডোরা যখন দেখল, শত্রুদের আক্রমণ ঠেকানো ও উদ্ধারপ্রক্রিয়াটাকে যথাযথভাবে বাঁচানো—কোনোটাই ঠিকভাবে করা যাচ্ছে না শত্রুপক্ষের ফাইটারগুলোর সংখ্যাধিক্যের কারণে, তখন সে পুরোদস্তুর আক্রমণে যাওয়া মনস্থ করল। তার কণ্ঠস্বর বেতারবাহিত সংকেতের রূপে ছড়িয়ে পড়ল তার ইউনিটের কাছে, “দিস ইজ় লেফটেন্যান্ট অ্যাডোরা, আই অ্যাম গোয়িং ফর অ্যাটাক। এনগেজিং WAP-1, ফলো মাই লিড!!”
“নো। নো!! নট WAP-1!” ইটারনিটির ব্রিজে দাঁড়িয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠলেন উইলা, “লেফটেন্যান্ট, ডোন্ট এনগেজ!! এখানেই থাকো। স্টিক টু দ্য প্ল্যান!!”
বলা বাহুল্য, অ্যাডোরা সে আদেশ রক্ষা করার প্রয়োজন মনে করল না। তার ইউনিট চোখের নিমেষে ইটারনিটির সুরক্ষা ছেড়ে দূর মহাকাশে শত্রুব্যূহের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
স্যামর উইলার দিকে তাকাল।
“ওদের পেছনে যেতে হবে, ক্যাপটেন।” অত্যন্ত উত্তেজিত ভঙ্গিতে বললেন উইলা, “অসম লড়াই এটা। ওরা কমপ্লিটলি আউটনাম্বারড।”
ইটারনিটি রেসকিউ অপারেশন ছেড়ে দূর মহাকাশে এগিয়ে গেল, যেখানে প্রায় ষাটটা শত্রুপক্ষীয় ফাইটার ঘিরে ধরেছে অ্যাডোরার ইউনিটকে। ইটারনিটির ভারী কামানের সাপোর্ট ও অ্যাডোরার অসাধারণ ফ্লাইট ম্যানুভারিং-এর সঙ্গে যদি আর কিছুর কথা বলতে হয়, তবে তা ফেলিনার নিশানাবাজির দক্ষতা। অ্যাডোরার শিপের গানার হিসেবে ওই জটিল ফ্লাইট প্যাটার্নের মধ্যেও সে নিখুঁত নিশানায় উড়িয়ে দিল কুড়িটার বেশি শত্রুপক্ষীয় ফাইটার। এতেও শেষরক্ষা হত না, যদি GLARE-এর ব্যাট্ল ক্রুজ়ার ‘আলটিমেটাম’ একটা পুরো GUARD স্কোয়াড্রনের সঙ্গে এসে উপস্থিত না হত। তাদের অকুস্থলে দেখে পাইরেটরা হাল ছেড়ে দিয়ে পালাল তাদের অবশিষ্ট তিরিশটা ফাইটার নিয়ে। ইটারনিটির স্পেস ফাইটার ইউনিটের পাঁচটা ফাইটার নষ্ট হলেও তাদের পাইলট ও ন্যাভিগেটররা ঠিক সময়ে এসকেপ করায় প্রাণে বেঁচে গেল।
যুদ্ধের পরে ইটারনিটির ক্যাপটেনের মিটিং রুমে আলোচনার সময় উইলা আর ধৈর্য রাখতে পারলেন না। “তুমি ডিরেক্ট আদেশ ভায়োলেট করেছ, লেফটেন্যান্ট।” অ্যাডোরাকে বললেন তিনি।
“আমরা যুদ্ধে জিতেছি, কমান্ডার।” স্থিরকণ্ঠে উত্তর দিল অ্যাডোরা।
“সেটা এখানে আসল কথাই নয়।” বললেন উইলা, “আমরা যুদ্ধ করতে আসিনি, আমাদের মিশন ছিল ডিফেন্স অ্যান্ড রেসকিউ!”
“ওটাই আসল কথা, কমান্ডার।” সপাটে উত্তর দিল অ্যাডোরা, “যুদ্ধটা না জিতলে রেসকিউটা হতই না!”
“তুমি অর্ডার ভায়োলেট করেছ।” ফের বললেন উইলা, “বেহিসেবি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজের ইউনিটকেও বিপদে ফেলেছ। আমি তোমাকে এনগেজ করতে বারণ করেছিলাম। তোমার ইউনিট WAP-1 এখনও ঠিকমতো করতে পারে না।”
“আমি পারি।” বলল অ্যাডোরা গর্বোদ্ধত ভঙ্গিতে, “আপনি জানেন, আমি পারি, সেই অ্যাকাডেমির সময় থেকেই।”
“তুমি তোমার গোটা ইউনিট নও, লেফটেন্যান্ট।” তীক্ষ্ণকণ্ঠে বলে উঠলেন উইলা, “কী ভেবে তুমি তিরিশটা লোককে মৃত্যুর মুখে টেনে নিয়ে গেলে? পনেরোর বিরুদ্ধে ষাট!! সামান্য একটা অঙ্কও বোঝো না?”
দুজনের উত্তপ্ত তর্কের মাঝে প্রায় স্তব্ধ হয়ে নির্বাক বসে ছিল অন্যসব অফিসারই। স্যামর, হ্যাভক, এলটা, কণাদ, ফেলিনা, ইভান—সবাই শুধু নীরব সাক্ষী থাকছিল এই কথোপকথনের। গ্রিনা বুঝতে পারছিল, কমান্ডার উইলার মনের গভীরে থাকা সেই বিষণ্ণতার সমুদ্রে রাগের তুফান উঠেছে। তারই বিক্ষুব্ধ ঢেউ হয়ে যেন ওঁর কথাগুলো আছড়ে পড়ছে মিটিং রুমের নিস্তব্ধ পরিবেশে।
আর অ্যাডোরা? তার ইমোশনাল ফিডব্যাক অ্যালগোরিদ্ম বা স্টেবিলিটি ম্যাট্রিক্স গ্রিনার মস্তিষ্কে কোনো টেলিপ্যাথিক প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করে না বটে, কিন্তু তার স্বরের গভীরতা ও তীক্ষ্ণতা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, কখন তার স্টেবিলিটি বা ইমোশনাল ফিডব্যাক ওভারড্রাইভ মোডে চলে যাচ্ছে। এখন ঠিক তেমনই একটা মুহূর্ত। গ্রিনা বেশ বুঝতে পারল যে, কোনো সময়ে একটা বিস্ফোরণ হতে চলেছে! এবং হলও তা-ই।
“সেটাই তো, কমান্ডার।” বলে উঠল অ্যাডোরা, “আপনি ডেস্কে বসে শুধু অঙ্ক মেলাতে ব্যস্ত থাকেন। যুদ্ধটা অঙ্ক দিয়ে হয় না। ইনফিনিটি স্কোয়াড্রনের ফাইটাররা একাই দশটার বেশি শত্রু ফাইটারের মহড়া নিতে পারত এই WAP-1 ও 2 ব্যবহার করেই! আই গেস, তখনও আপনি এরকম ডেস্কে বসে বসে দেখতেন, কীভাবে আপনার সব হিসাব তারা উলটে দিচ্ছে?”
অতীতের মতো এবারও অ্যাডোরার এই তীক্ষ্ণ অভিযোগের মুখে যেন বাক্যহারা হয়ে গেলেন কমান্ডার উইলা। হ্যাভক উৎকণ্ঠিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন। স্যামর এ সময় হঠাৎই প্রায় গর্জে উঠল, “এনাফ, লেফটেন্যান্ট!”
বরাবরের মতোই অ্যাডোরা থামল না। স্যামরের দিকে ফিরে আগের মতোই তীক্ষ্ণকণ্ঠে বলল, “কেন আমি চুপ করব, ক্যাপটেন? আমরা যুদ্ধটা জিতেছি। আমি একার দায়িত্বে যুদ্ধটা জিতিয়েছি। অথচ এখন আমাকেই দোষারোপ করা হচ্ছে! উনি সেই অ্যাকাডেমির দিন থেকে আমার সঙ্গে এমনটা করে আসছেন। সব সময় আমাকে আটকেছেন! কিন্তু আজ আমি GUARD-এর বেস্ট পাইলট; আর আমাকে এমন একজনের উপদেশ শুনতে হবে, যে কোনোদিন ফাইটার শিপ ওড়ায়নি!!”
“শাট আপ অ্যাডোরা, জাস্ট শাট আপ!!” প্রায় চিৎকার করে উঠে দাঁড়াল স্যামর, “তুই কাকে কী বলছিস! জানিস উইলা, ম্যাম কী করতেন? উনি…!”
“স্যামর!!!” উইলার বজ্রকণ্ঠ চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল স্যামরের অসমাপ্ত কথার মাঝে।
স্যামরের সঙ্গে সঙ্গে সকলেই উঠে দাঁড়িয়েছিল। উইলার কথায় চমকে গিয়ে স্যামর তো বটেই, প্রত্যেকে তাঁর দিকে ফিরে তাকাল।
কয়েকটি নিস্পন্দ নীরব মুহূর্ত অতিবাহিত হওয়ার পর উইলা একটা শ্বাস নিয়ে এপাশ-ওপাশ সকলের বিহ্বল মুখের দিকে তাকালেন, তারপর দু-হাত পেছনে দিয়ে যান্ত্রিক স্বরে বললেন, “সরি, ক্যাপটেন! আমি কি যেতে পারি?”
স্যামর যেন কোনো অপরাধ করেছে এমন ভঙ্গিতে ইতস্তত করে বলল, “কমান্ডার…।”
“পারমিট মি টু লিভ দ্য রুম, ক্যাপটেন।” ফের একবার আগের মতোই যান্ত্রিক স্বরে বললেন উইলা।
“ইয়েস।” বলল স্যামর।
উইলা চেয়ারটা পেছনে সামান্য ঠেলে বেরিয়ে এলেন এবং একবারও পেছনে না তাকিয়ে ঘর ছেড়ে চলে গেলেন।
তিনি বেরিয়ে যাওয়ার পরে হ্যাভক স্যামরের দিকে চেয়ে অনুমতি চাইবার ভঙ্গিতে বললেন, “ক্যাপটেন?”
স্যামর অনুমতি দেওয়ার ভঙ্গিতে সামান্য মাথা নাড়ল, হ্যাভকও বেরিয়ে গেলেন।
ফেলিনা চুপিচুপি একটা টেলিপ্যাথিক বার্তায় অ্যাডোরাকে বলল, “ব্যাপারটা কী হল, বল তো?”
“শাট আপ!” টেলিপ্যাথিক ধমক দিল অ্যাডোরা।
স্যামর এক হাতে চোখ ঢেকে ক্লান্ত ভঙ্গিতে ফের বসে পড়ল। কণাদ ও এলটা একবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তারপর কণাদ বলল, “ক্যাপটেন তাহলে…।”
“ডিসমিসড। সবাই!” চোখ থেকে হাত না সরিয়েই বলল স্যামর।
সকলে ফের একবার পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল, তারপর একে একে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। গ্রিনা সকলের শেষে ছিল। সে দরজার সামনে গিয়ে একবারের জন্য ফিরে দাঁড়াল, কিন্তু এ সময় স্যামর মুখ না তুলেই বলল, “গ্রিনা, প্লিজ়!!”
গ্রিনা আর কোনো কথা না বলে বেরিয়ে গেল।
জাহাজের দুজন প্রধান অফিসারের মধ্যের ব্যক্তিগত সংঘাত এমনভাবে প্রকাশ্যে এসে পড়ায় সব ব্রিজ অফিসারই যে চরম অস্বস্তিতে ভুগতে শুরু করেছে, তা পরদিনই বোঝা গেল, যখন স্যামর আর কমান্ডার উইলার দিকে সরাসরি তাকাচ্ছিল না। কোনো সাধারণ কথা বলার সময়ও ইতস্তত করছিল। কমান্ডার উইলাও আজ যেন অতিরিক্ত পেশাদার, আল্ট্রা ফর্মাল হয়ে গেছেন। স্যামরের কথার উত্তর দেওয়ার সময় ‘ক্যাপটেন’ শব্দটা যোগ না করে কোনো বাক্য বলছেন না। অন্য সকলের সঙ্গে এমনকি তাঁর পুরোনো বন্ধু হ্যাভকের সঙ্গে কথা বলার সময়ও নামের আগে তার র্যাংকটা উল্লেখ করে সম্বোধন করছেন।
ব্রিজের এই চাপা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি কতক্ষণ চলত, বলা যায় না, কিন্তু এ সময় হঠাৎ গ্রিনা বলল, “ক্যাপটেন GLARE কমান্ড থেকে স্পেশাল মেসেজ আছে আপনার জন্য। স্টেমনেল পাইরেটদের একটা লুকোনো বেসের সন্ধান পাওয়া গেছে। মেসেজটা আপনার স্টেশনে ফরওয়ার্ড করলাম।”
“ধন্যবাদ, লেফটেন্যান্ট।” বলে নিজের হলোস্ক্রিন খুলে মেসেজটায় চোখ বোলাল স্যামর। তারপর একটু উচ্চকণ্ঠে সকলকে উদ্দেশ করে বলল, “ওকে অফিসারস, লিস্ন আপ! স্টেমনেল পাইরেটদের সব চেয়ে বড়ো ঘাঁটির সন্ধান পেয়েছে কমান্ড, থ্যাংকস টু S.E.R.A.P.H.S.।”
এলটার দিকে চেয়ে একবার ধন্যবাদ জানানোর ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল স্যামর। SERAPHS, অর্থাৎ স্পেশালাইজ়ড এক্সপিডিশিওনারি রেসপন্স অ্যান্ড প্ল্যানেটারি হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিভিশন-এর প্রতি প্রেরণযোগ্য ধন্যবাদটা ব্রিজে উপস্থিত একমাত্র প্রাক্তন SERAPHS অপারেটিভ মেজর এলটা, বর্তমানের লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এলটার উদ্দেশে প্রেরিত হল।
“কমান্ড একটা বড়ো অ্যাসল্ট প্ল্যান করছে।” নিজের কথা চালু রাখল স্যামর, “ওই বেসটা HD36981 স্টার সিস্টেমের কাছে গ্যালাকটিক ইউনিয়নের সীমানায়। আমরা এবং আলটিমেটাম সব চেয়ে কাছে রয়েছি। সো উই উইল বি লিডিং দি অ্যাসল্ট। কমান্ড উইল সেন্ড ব্যাকআপ সুন।”
কথা শেষ করে কণাদের দিকে তাকাল স্যামর। সে সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আমাদের কারেন্ট লোকেশন থেকে ওখানে পৌঁছোতে দু-দিনমতো সময় লাগবে, ক্যাপটেন।”
স্যামর উইলার দিকে চেয়ে ফের ইতস্তত ভঙ্গিতে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সে কিছু বলার আগেই উইলা বললেন, “অল সিস্টেমস গ্রিন, ক্যাপটেন। উই আর গুড টু গো।”
“থ্যাংক ইউ, কমান্ডার।” বলে অ্যাডোরার দিকে তাকাল স্যামর, “সেট আ কোর্স, লেফটেন্যান্ট।”
ব্রিজ অফিসারদের মধ্যের সংঘাতজনিত অচলাবস্থা আপাতত মিশনের উত্তেজনায় চাপা পড়ল। ইটারনিটি পূর্ণগতিতে যাত্রা করল HD36981 নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে।
* * *
নিজের পুরোনো ফাইটার শিপটার দিকে চেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল সে। দুঃস্বপ্ন আবার একবার তার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ঘর থেকে বেরিয়ে প্রায় উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে হাঁটতে নিজের অজান্তেই এখানে এসে পৌঁছেছে সে। এমন অযাচিতভাবে নিজের পুরোনো সঙ্গীর মুখোমুখি হয়ে যেন বিহ্বল সে।
কাঁধে কারও হাতের স্পর্শ পেয়ে সে ঘুরে তাকাল। তার পুরোনো বন্ধু ‘গোদা গোরিলা’ এসে দাঁড়িয়েছে পেছনে।
“মনে হয়েছিল, তোমাকে এখানে পাব।” বলল গোদা গোরিলা।
“আশ্চর্য ব্যাপার, তা-ই না?” মন্তব্য করল সে, “তুমি যতই পালাতে চেষ্টা করো-না কেন, তোমার অতীত তোমার সামনে এসে দাঁড়াবেই।”
“সাইলেন্ট ফিউরি এবং তার পাইলট এক লেগ্যাসির অংশ, বন্ধু।” বলল গোদা গোরিলা, “তুমি তাকে মুছে ফেলতে পারবে না।”
“সাইলেন্ট ফিউরি আর তার পাইলট দুজনেই চিরকালের মতো নীরব হয়ে গেছে।” বলল সে, “তারা সাইলেন্টই থাকবে। যত তাড়াতাড়ি মানুষ তাদের ভুলে যায়, ততই ভালো।”
কথাটা বলে ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল সে। যেন যত তাড়াতাড়ি শিপটার সামনে থেকে সে সরে যাবে, ততই তাড়াতাড়ি নিজের অতীত থেকে পালাতে পারবে সে। সেই অতীত, যার চারদিকে তুলে-রাখা দেওয়ালগুলো ক্রমশ ভেঙে পড়ছে।
* * *
“ঝাপসা ফোটোটার মধ্যে রোজ কী দেখিস, বল তো?” হাতের উপর মাথার ভর দিয়ে একপাশে কাত হয়ে শুয়ে জিজ্ঞেস করল ফেলিনা।
অ্যাডোরা একটা ফোটোফ্রেমে বাঁধানো ফোটো হাতে নিজের বিছানায় বসে ছিল। সে মুখ তুলে তাকাল। শিপের প্রধান অফিসাররা সাধারণত আলাদা ও নিজস্ব কেবিন পায়। কিন্তু সব নিয়মের যেমন ব্যতিক্রম আছে, তেমনি এই শিপেও এ নিয়মের ব্যতিক্রম হল ফেলিনা ও অ্যাডোরা। দশ বছর আগে অ্যাকাডেমিতে তারা রুমমেট ছিল, এখনও তারা রুমমেট। ইন ফ্যাক্ট, স্যামর যখন তাদের আলাদা কেবিনে থাকার কথা বলেছিল, তখন ফেলিনা উত্তর দিয়েছিল, “রোজ একবার মারামারি না করলে আমাদের ঘুম হয় না, জানিস না? তুই কি চাস, মারামারিটা আমরা বাইরে সকলের সামনে করি?”
স্যামর হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “তোরা আমার সামনে থেকে দূর হ তো! যা পারিস, কর।”
এখন ফেলিনার প্রশ্নটা শুনে অ্যাডোরা মুখ তুলে তাকাল, বলল, “এটা শুধু একটা ঝাপসা ছবি নয় রে। এটা একটা লেজেন্ডের অংশ, যার নাম ছিল ইনফিনিটি স্কোয়াড্রন। এটা স্কোয়াড্রনের একমাত্র গ্রুপ ফোটো! এখানে সবাই আছে। অল থার্টি ফাইভ অব দেম। জানি না, কেন এটা এভাবে ঝাপসা করে দেওয়া হয়েছে?”
“ওদের ইন্ডিভিজুয়াল ফোটো তো আছে?” বলল ফেলিনা।
“আছে, কিন্তু গ্রুপ ফোটো এই একটাই।” বলল অ্যাডোরা, “এটাও আবার ঝাপসা, কাউকে চেনার উপায় নেই।”
“কী হয়েছিল ওদের?” জিজ্ঞেস করল ফেলিনা।
“জানি না।” বলল অ্যাডোরা, “সব ফাইল ক্লাসিফায়েড। কেউ কিছু বলতে চায় না। যা শোনা যায়, কোনো একটা মিশনে গিয়ে সবাই এমআইএ [মিসিং ইন অ্যাকশন] হয়ে যায়।”
“তার মানে সবাই ডেড।” বলল ফেলিনা, “মিসিং ইন অ্যাকশন তো অফিসের ফাইলে লেখার জন্য।”
“না, সবাই নাকি মারা যায়নি।” বলল অ্যাডোরা, “নানারকম গুজব শোনা যায়, জানিস। কোনো একজনকে নাকি GUARD অথরিটি লুকিয়ে রেখেছে। সে এমনিতে বেরোয় না, কিন্তু কোনো অসম্ভব মিশনে সে নাকি আজও আসে তার ফাইটার নিয়ে। সাহায্য করে, তারপর আবার অদৃশ্য হয়ে যায়।”
“বুঝলাম, আবার একটা ভূতের গল্প, সেই উইলা ম্যাম যেমন বলেছিলেন।” বলল ফেলিনা, “ইভান ঠিকই বলত, এলিট অফিসাররাও কুসংস্কার এড়াতে পারে না।”
উইলার নাম শুনে অ্যাডোরা গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। সে বলল, “ইনফিনিটি স্কোয়াড্রন কোনো গল্প নয়। ইভান বা কমান্ডার, যে-ই বলুক, এটা কোনো গল্প নয়।”
“ইনফিনিটি স্কোয়াড্রনটা গল্প কে বলেছে?” আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে বলল ফেলিনা, “কিন্তু তুই বল, লাস্ট দশ বছরে আমরাই তো কতসব কঠিন অপারেশন করেছি। কোনোদিন কোনো ইনফিনিটি স্কোয়াড্রনের ফাইটার শিপ দেখেছিস? তোর ওই মেমেন্টো বাদ দিয়ে বলছি।”
অ্যাডোরা কিছু বলল না। বস্তুত বলার মতো, অর্থাৎ ফেলিনার প্রশ্নটার উত্তর দেওয়ার মতো কিছু তার কাছে ছিলও না। সে চুপ করে ফোটোটা ড্রয়ারে রেখে দিল।
ফেলিনা সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে ফের বলল, “ইনফিনিটি স্কোয়াড্রন আর নেই। এখন আছি শুধু আমরা। তুই এখন GUARD-এর বেস্ট পাইলট আর আমি তোর ন্যাভিগেটর, কাল হয়তো আবার একটা বড়ো লড়াই হবে। বেশি ভাবিস না, তোর প্রসেসরকে ঠান্ডা হতে দে।”
পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল ফেলিনা, অ্যাডোরা আরও কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল, তারপর আলো নিবিয়ে ছয় ঘণ্টার জন্য স্লিপ মোড অন করল।
* * *
“ট্রাস্ট মি, ক্যাপটেন। উই ক্যান ডু ইট।” বেতারে ভেসে এল অ্যাডোরার আত্মবিশ্বাসী স্বর।
স্যামর দ্বিধাগ্রস্ত ভঙ্গিতে একবার সামনে দাঁড়ানো উইলা এবং তারপরেই নিজের স্টেশনে বসা হ্যাভকের দিকে তাকাল।
উইলা আগের মতোই উত্তেজিতভাবে দু-দিকে মাথা নাড়লেন। হ্যাভক সংশয়ী ভঙ্গিতে হাত ওলটালেন।
এ সময় বেতারে ফেলিনার গলা ভেসে এল, “অ্যাডোরার উপর আমার ভরসা আছে, ক্যাপটেন। সি ইজ় দ্য বেস্ট! ও যদি বলে, আমরা পারব তাহলে আমরা পারব।”
যে ব্যাপার নিয়ে ইটারনিটির ব্রিজ অফিসাররা এই মুহূর্তে চিন্তিত, তার সূত্রপাত দু-ঘণ্টা আগে যখন ইটারনিটি ও আলটিমেটাম একই সঙ্গে এসে পৌঁছেছিল HD36981 নক্ষত্রপুঞ্জের কাছে এই অঞ্চলে, যেখানে স্টেমনেল পাইরেটদের সব চেয়ে বড়ো ঘাঁটির সন্ধান পেয়েছে SERAPH। এই ঘাঁটিটি ধ্বংস করার জন্যই আলটিমেটাম ও ইটারনিটির যৌথ অভিযান।
কিন্তু এখানে পৌঁছোনোর পরে বোঝা গেল, কাজটা তত সহজ হবে না, যতটা ভাবা গিয়েছিল।
একটা পুরোনো রেড জায়ান্ট নক্ষত্রের চারদিকে পরিভ্রমণরত একটা ঠান্ডা মৃত গ্রহ, যার প্রায় অর্ধেকটা ভেঙে উড়ে গেছে কোনো দুর্ঘটনায় এবং সেই ভাঙা অংশ বা টুকরোগুলো মহাকাশের জঞ্জাল বা স্পেস ডেব্রির রূপে ছড়িয়ে আছে তার চারপাশে, সেই গ্রহটার প্রায় কেন্দ্রস্থলে যেখানে সামান্য তাপীয় জ্বালানি এখনও অবশিষ্ট, ঠিক সেখানে স্টেমনেল পাইরেটদের ঘাঁটি। সেই শক্তি ব্যবহার করে পাইরেটরা ওই ছোট্ট ভাঙা গ্রহটার চারদিকে একটা ম্যাগনেটো ফিজ়িক্যাল শিল্ড তুলে রেখেছে। দূর থেকে কোনো বড়ো শিপ মিসাইল মেরে ওই ঘাঁটি ধ্বংস করতে পারবে না। ওই শিল্ড সে আঘাত সহ্য করে নেবে। কাছে গিয়ে ভারী পাল্স ক্যানন বা স্লাগ ক্যানন চালানো যাবে না, কারণ গ্রহটাকে ঘিরে-থাকা ওই পাথরের টুকরোর মধ্যে দিয়ে কোনো বড়ো শিপ যেতেই পারবে না।
ছোটো ফাইটার শিপ হয়তো যেতে পারে, কিন্তু তাদের অস্ত্র শিল্ড ভাঙতে পারবে না।
একমাত্র আশা, যদি অনেকগুলো ছোটো ফাইটার কাছাকাছি গিয়ে শিল্ডের কোনো একটা নির্দিষ্ট অংশে একত্রে পরপর মারতে থাকে তাহলে হয়তো শিল্ড দুর্বল হতে পারে বা হয়তো শিল্ডে গর্ত তৈরি হতে পারে, যেমন একই জায়গায় পরপর হাতুড়ি মারলে খুব কঠিন দেওয়ালেও ফাটল দেখা দেয়।
কিন্তু এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার জন্য যখন ইটারনিটি ও আলটিমেটাম থেকে GUARD-এর স্পেস ফাইটারগুলো বেরিয়ে এল, তখন দেখা গেল, পাইরেটরাও সে পরিকল্পনাটা বুঝেছে এবং তাদের স্পেস ফাইটারগুলোও বেরিয়ে এসেছে অ্যাস্টরয়েড ফিল্ডের ঠিক বাইরে। কোনো GUARD ফাইটারকে গ্রহের কাছে যেতে দেবে না তারা।
সুতরাং অ্যাস্টরয়েড ফিল্ডের বাইরে শুরু হয়ে গেল ভয়ানক ডগফাইট। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে যুদ্ধ চললেও এখনও পাইরেটদের ব্যূহ ভেদ করে কোনো GUARD ফাইটার গ্রহের কাছে ঘেঁষতে পারেনি। একটা-দুটো ফাইটার গিয়ে অবশ্য কোনো লাভও নেই।
কিছুক্ষণমাত্র আগে হ্যাভক, কণাদ ও এলটা মিলে ভেবেছে একটা নতুন প্ল্যান, যেখানে একটা ফাইটারও যদি শিল্ডের কাছাকাছি যেতে পারে তাহলেও কাজ হবে। প্ল্যানটা খুবই সহজ। ইটারনিটি স্লাগ কামানগুলো দূর থেকেই চালাবে শিল্ডের কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল লক্ষ করে, মোটামুটি একই অঞ্চলে অনেকগুলো স্লাগ হিট হলে হয়তো শিল্ডে গ্যাপ তৈরি হবে এবং তখন কোনো ফাইটার কাছাকাছি থাকলে হয়তো সেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকে শিল্ড জেনারেটরগুলোকে নষ্ট করতে পারবে।
“কিন্তু সবই নির্ভর করছে ওই ‘হয়তো’র উপরে।” বলছিল কণাদ, “ঠিক যখন শিল্ডে ক্র্যাক হবে, তখনই সেখান দিয়ে ঢুকতে হবে, শিল্ড রিক্যালিব্রেটেড হয়ে সে ক্র্যাক আবার বন্ধ হওয়ার আগেই। ওই সময়ে সেখানে থাকাটাই চ্যালেঞ্জ। একটা একা শিপ ওইখানে ঘোরাঘুরি করবে কী করে? পাইরেটরা আগেই তাকে এনগেজ করবে।”
কণাদের কথা শেষ হয়নি, বেতারে ভেসে এসেছিল অ্যাডোরার গলা, যে বাইরে ডগফাইটের মধ্যেও ব্রিজের কথোপকথন সব শুনছিল, “গ্রেট প্ল্যান, কণাদ!” বলেছিল সে, “দিস উইল ওয়ার্ক।”
“এটা ডেঞ্জারাস প্ল্যান।” বলেছিল কণাদ।
“সেজন্যই গ্রেট।” বলেছিল অ্যাডোরা, “আমি ঠিক শিল্ডের পেছনে ঢুকে যাব।”
“কী করে?” জানতে চেয়েছিল স্যামর, “ওখানে তুই বেশিক্ষণ ঘোরাঘুরি করতে পারবি না। ওদের ফাইটার আর কামানগুলোর কথা ভাব।”
“আমি ভেবেছি।” বলেছিল অ্যাডোরা, “আমি ওখানে থাকব না, আমি ওখানে যাব! আমি ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় পৌঁছে যাব। আমি WAP-3 ব্যবহার করব।”
এ সময় আগের বারের মতো উত্তেজিত আতঙ্কিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন উইলা, “নোওও!! নট WAP-3! নট এগেইন।”
চমকে গিয়েছিল ব্রিজে উপস্থিত সকলে। কিন্তু স্যামর কিছু বলার আগেই ভেসে এসেছিল অ্যাডোরার কণ্ঠ, যে উইলার নিষেধ শুনতে পেয়েছিল, “ট্রাস্ট মি, ক্যাপটেন। আই ক্যান ডু ইট!”
উইলা কোনো কথা না বলে শুধু মাথা নেড়ে এবারে নিষেধ করেছিলেন স্যামরকে। হ্যাভকের মতোই সংশয়ী ভঙ্গিতে হাত উলটে ছিল এলটা ও কণাদও। অন্যদিকে অ্যাডোরার প্রস্তাবে নিজের পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করছিল ফেলিনা।
“ক্যাপটেন!” ফের একবার বলল অ্যাডোরা। তার গলা শুনেই বোঝা যায়, তার এ আর্জি নিজের ব্যাচমেটের কাছে নয়, বরং শিপের ক্যাপটেনের কাছে, “দিস ইজ় দি ওনলি ওয়ে! WAP-3 একমাত্র রাস্তা। আর আমি করতে পারব। আপনি জানেন, আমি পারব।”
স্যামর উইলার দিকে তাকাল, তার আগে গ্রিনাকে একটা ইশারা করে বলল বেতারটা বন্ধ করতে।
“আই অ্যাম সরি, কমান্ডার।” বলল স্যামর, “কিন্তু আমাদের আর কোনো অপশন নেই।”
উইলা কিছুক্ষণ স্যামরের দিকে চেয়ে রইলেন বিস্ফারিত দৃষ্টিতে, যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না যে, স্যামর এ কথা বলছে। তারপর ধীরে ধীরে তাঁর চোখের দৃষ্টি স্বাভাবিক হয়ে এল, শ্বাসের গতি স্বাভাবিক হল। কিন্তু যেন অত্যন্ত কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এমন ভঙ্গিতে তিনি বললেন, “তাহলে তো আমারও আর ব্রিজে বসে থাকা সম্ভব নয়, ক্যাপটেন!!”
প্রায় পাঁচ মিনিট যোগাযোগ বন্ধ থাকার পর ফের একবার বেতারযন্ত্রটা সরব হয়ে উঠল অ্যাডোরা ও ফেলিনার জন্য।
স্যামরের কণ্ঠস্বর শোনা গেল, “আমরা আলটিমেটামের সঙ্গে কোঅর্ডিনেট করছি। স্ট্যান্ডবাই ফর আওয়ার মার্ক অ্যান্ড ব্যাকআপ!!”
“ইয়েস!!” অ্যাডোরার টেলিপ্যাথিক উচ্ছ্বাস স্পষ্ট শুনতে পেল ফেলিনা। সে বলল, “মার্ক তো বুঝলাম, কিন্তু ব্যাকআপটা কী ব্যাপার?”
“জানি না।” বলল অ্যাডোরা, “অ্যান্ড আই ডোন্ট কেয়ার।”
* * *
বহু বহুদিন পর আবার একবার এই ককপিটে বসল সে, বহু বছর পর এই শিপের অনবোর্ড কম্পিউটার সিংক করল তার মস্তিষ্কের সঙ্গে। অনেকদিন পর আবার কনট্রোল প্যানেলে হাত বোলাল সে। পরিচিত হাতের স্পর্শে যেন ফের জেগে উঠল সাইলেন্ট ফিউরি। হেলমেটটা মাথায় চাপানোর আগে একবার ভিউস্ক্রিনের দিকে দেখল সে। সেই দানবটাকে কি এখনও দেখা যাচ্ছে?
গর্জন করে উঠল সাইলেন্ট ফিউরির শক্তিশালী ইঞ্জিন ঠিক সেই পুরোনো দিনের মতো। নীল-সাদা আগুনের শিখা বেরিয়ে এল তার জেট থেকে।
“আর-একবার, পুরোনো বন্ধু!” কনট্রোল প্যানেলে হাত রেখে বলল সে, “আজ আমি আর একা ফিরব না।”
পূর্ণ গতিতে যেন মহাকাশ চিরে অ্যাস্টরয়েড ফিল্ডের দিকে ছুটে গেল সাইলেন্ট ফিউরি।
* * *
“উই আর রেডি, লেফটেন্যান্ট।” কমান্ডার হ্যাভকের কণ্ঠস্বর ভেসে এল বেতারে, “ফার্স্ট রাউন্ড স্লাগ ফায়ার হবে ইন টেন… নাইন…”
উলটো কাউন্টডাউন শুরু হওয়ামাত্র টানটান হয়ে বসল অ্যাডোরা। চরম পরীক্ষার সময় উপস্থিত। এত বছর ধরে সিমুলেশনে বারংবার চেষ্টা করেও সে WAP-3 পারফেক্টলি এগজ়িকিউট করতে পারেনি। কিন্তু আজ তাকে পারতেই হবে। তার ক্যাপটেন, তার ব্যাচমেট, তার বন্ধুরা, সবাই তার উপর ভরসা করে আছে। আজ সে ব্যর্থ হবে না, হতে পারে না—
“লেফটেন্যান্ট অ্যাডোরা!!” একটা কর্কশ কাটা-কাটা কণ্ঠস্বর বেতারবাহিত হয়ে এসে তার একাগ্রতা ভঙ্গ করল।
“সিংক ইয়োর ফ্লাইট উইথ মি।” নির্দেশ দিল সে কণ্ঠ, “আই উইল লিড WAP-3।”
“হু আর ইউ?” চমকে উঠে এদিক-ওদিক তাকাল অ্যাডোরা এবং দেখতে পেল।
তার শিপের পাশে, কয়েকশো মিটার দূরে উড়ছে একটা ইনফিনিটি স্কোয়াড্রন ফাইটার!! ঠিক তাদের শিপের হ্যাঙারে রাখা তার প্রাইজ় মেমেন্টোর মতো একটা শিপ, ভেতরে বসে আছে একক পাইলট, যার সারা মাথা-মুখ ঢাকা ফ্লাইট সুটের হেলমেট আর অক্সিজেন মাস্কে।
অ্যাডোরার শরীরে কোনো রোম নেই, কিন্তু থাকলে ফেলিনার মতো তারও গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠত নিশ্চিত! এ কে? কোথা থেকে এল এই ফাইটার? তবে কি কুড়ি ঘণ্টা আগে যে গুজব নিয়ে তারা আলোচনা করছিল, তা গুজব নয়, সত্যি!! সত্যিই তবে ইনফিনিটি স্কোয়াড্রনের কোনো এক পাইলট আজও আসে কোনো অসম্ভব মিশনে সাহায্য করতে? এই কি তবে সেই ব্যাকআপ!
বেশি কিছু ভাবার সময় পেল না অ্যাডোরা। সেই কর্কশ কণ্ঠ ফের ধমক দিল, “সিংক ইট, নাউ! বি মাই মিরর।”
কিছু না ভেবেই নিজের শিপ ওই শিপটার সঙ্গে মিরর সিংক করল অ্যাডোরা।
মিরর সিংক, অর্থাৎ একটা শিপ উলটো হয়ে প্রায় লেগে যাবে আরেকটা শিপের গায়ে, দুজনের মধ্যে ফাঁক থাকবে মাত্র চার-পাঁচ মিটারের। ঠিক যেন একটা শিপ আরেকটার প্রতিবিম্ব। মহাকাশে যেহেতু উপর-নীচ বলে কিছু নেই, সুতরাং খুব সহজেই এমনটা করা যায়। পৃথিবীতে হলে নীচের শিপের পাইলট সর্বক্ষণ উলটে থাকার অনুভূতি পেতে থাকবে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের জন্য। কিন্তু মহাকাশে সে সমস্যা নেই। মিরর সিংকে একটা শিপ প্রাইমারি, অন্যটা সেকেন্ডারি হয়ে যায়। মূল ম্যানুভারিং প্রাইমারি শিপের পাইলটই করবে, সেকেন্ডারি শিপের পাইলটের কাজ শুধু সিংকটা বজায় রাখা। সেটাও কঠিন অবশ্যই, তবে WAP-3 এগজ়িকিউট করার তুলনায় ছেলেখেলা।
শিপ সিংক করামাত্র ইনফিনিটি ফাইটারটা প্রাইমারি কনট্রোল নিয়ে নিল। ঠিক সেই মুহূর্তে কাউন্টডাউন শেষ হল এবং দূরে ইটারনিটি ও আলটিমেটামের কামানের ঝলক দেখা গেল। প্রথম রাউন্ড ফায়ার।
ডগফাইট ছেড়ে স্লাগগুলোর প্রায় সঙ্গেই অ্যাস্টরয়েড ফিল্ডের মধ্যে ঢুকে পড়ল দুটো ফাইটার। এবারেই আসল পরীক্ষা পাইলটের। এ জিনিস এতদিন শুধু সিমুলেশন চেম্বারে দেখেছে অ্যাডোরা ও ফেলিনা দুজনেই। দুরন্ত গতিতে ছুটে আসছে বিশাল বিশাল পাথরের চাঁই, সামনে দূরে দেখা যাচ্ছে প্রথম রাউন্ডে মারা স্লাগগুলো। সেগুলোর বেগ শিপের চেয়ে অনেক বেশি। ফাইটার ফুল থ্রট্লে গেলেও তাদের ধরতে পারবে না। কিন্তু পেছন থেকে যে সেকেন্ড রাউন্ড, থার্ড রাউন্ড স্লাগগুলো ছুটে আসছে, সেগুলোর সঙ্গেই ফাইটারটা পৌঁছোবে শিল্ডের কাছে। যদিও সব স্লাগ শিল্ডে ঘা মারবে না, কিছু অ্যাস্টরয়েডে আটকে যাবে, কিন্তু বেশ কিছু পৌঁছোবে, তাদের আঘাতে শিল্ডে ফাটল ধরবে। ঠিক সেই মুহূর্তে যেন ফাইটার সেই ফাটলের সামনে থাকে। আগেও না, পরেও না। সে দু-ক্ষেত্রেই শিল্ডে ধাক্কা খেয়ে ফাইটার জ্বলে যাবে।
আবার এর সঙ্গে এটাও খেয়াল রাখতে হবে, পেছন থেকে আসা সেকেন্ড বা থার্ড রাউন্ড স্লাগ যখন ফাইটারকে টপকে যাবে, তখন তাদের গতিপথে ফাইটার যেন না থাকে। তাহলে নিজেদের গোলাতেই ফাইটার গুঁড়িয়ে যাবে।
একই সময় ফাইটার পাইলটকে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে সে সামনে অ্যাস্টরয়েডে ধাক্কা না খায়, পেছন থেকে আসা ফ্রেন্ডলি ফায়ারের মুখে না পড়ে, আবার ঠিক সময়ে শিল্ডের ঠিক যে জায়গায় ফাটল হল, সেখানে যেন পৌঁছে যায়। এই প্রায় অসম্ভব মরণদৌড়ই হল WAP-3, যা কোনো দুর্ভেদ্য শিল্ড ভেঙে ঢোকার একমাত্র উপায়।
যতবার আগে চেষ্টা করেছে, প্রতিবার ব্যর্থ হয়েছে অ্যাডোরা। কণাদ একবার বলেছিল, এটা ম্যাথেম্যাটিক্যালি অসম্ভব ম্যানুভারিং। কিন্তু অ্যাডোরা মানতে চায়নি। যদিও প্রতিবার তার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে আর সিমুলেশন শেষ হয়ে আলো জ্বলে উঠেছে।
কিন্তু আজ এখানে ব্যর্থ হলে আলো জ্বলে উঠবে না, তা জানে অ্যাডোরা ও ফেলিনা দুজনেই, আজ ব্যর্থ হলে নিবে যাবে সব আলো চিরকালের মতো। কিন্তু ওই ইনফিনিটি ফাইটার যেন ব্যর্থ হতে শেখেনি। অ্যাস্টরয়েড ফিল্ডের মধ্যে দিয়ে প্রায় ফুল থ্রট্লে ছুটে চলেছে যে শিপটা, তার গতি যেন এক কুশল নর্তকীর নৃত্য! ফুল থ্রট্লে পঞ্চাশ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড বেগে ধাবমান সে ফাইটার মহাকাশের বুকে রচনা করছে যেন এক জটিল জ্যামিতি, যার সামনে এসে থমকে দাঁড়াচ্ছে পদার্থবিদ্যার নিয়মগুলো, কণাদের গাণিতিক অসম্ভাব্যতার তত্ত্বও তার থেকে মুখ লুকোচ্ছে লজ্জায়। সাবলীল ভঙ্গিতে প্রতিটি পাথর এড়িয়ে, পেছন থেকে ছুটে-আসা স্লাগগুলোকে ফাঁকি দিয়ে ঠিক নিজের লক্ষ্যে অবিচল সে। তার মিরর ইমেজ হয়ে নিরাপদে চলেছে অ্যাডোরার শিপ।
পনেরো থেকে বিশ সেকেন্ডের মধ্যে শিল্ডের প্রায় সামনে চলে এল শিপ দুটো। সামনে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে স্লাগগুলো একের পর এক আছড়ে পড়ছে শিল্ডের গায়ে, তুলছে একের পর এক তরঙ্গমালা। সে তরঙ্গমালার ছেদবিন্দুগুলোর মধ্যে তৈরি হওয়া ফাটল উজ্জ্বল সাদা রেখার আকারে ফুটে উঠছে ফাইটারের অনবোর্ড কম্পিউটার স্ক্রিনে।
“ইট’স টাইম।” বেতারে ভেসে-আসা সেই কর্কশ কণ্ঠের সঙ্গে সঙ্গেই মিরর সিংক ব্রেক করে একটা রোল করল ইনফিনিটি ফাইটার। সে রোলিং-এর ফলে উদ্ভূত কেন্দ্রাতিগ বলই যেন দুটো ফাইটারকে দু-দিকে ছিটকে দিল শিল্ডের গায়ে হওয়া দুটো ফাটলের দিকে। পঞ্চাশ মিটার লম্বা, দশ মিটার চওড়া সে দুটো ফাটলের মধ্যে দিয়ে মসৃণ গতিতে গলে গেল দুটো ফাইটার!
WAP-3 এর নিখুঁত এগজ়িকিউশন! এমন সহজে যে এটা করা যাবে, তা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি অ্যাডোরা। GUARD-এর বেস্ট পাইলটের স্বীকৃতি-পাওয়া পাইলট আজ বুঝতে পারল, সেরা পাইলটিং স্কিল বলতে ঠিক কী বোঝায়।
“হেডস আপ, লেফটেন্যান্টস। এনিমি ফ্লিট ইনকামিং!!” বেতারবার্তাটা শুনে সামনে তাকাল অ্যাডোরা।
শিল্ডের ভেতরে তারা ঢুকে পড়েছে বটে, কিন্তু পাইরেটদের ঘাঁটি এখানে একেবারে অরক্ষিত নয়। প্রায় কুড়ি-বাইশটা পাইরেট ফাইটার ধেয়ে আসছে তাদের দিকে।
“কুড়ি বনাম দুই!! অডস আর হেভি!!” টেলিপ্যাথিক বার্তায় বলল ফেলিনা, “বাট আই লাভ অডস।”
ঠিক যেন তার চিন্তার প্রতিধ্বনিতে ভেসে এল ইনফিনিটি পাইলটের গলা, “লেফটেন্যান্ট অ্যাডোরা, এনগেজ WAP-2। লেফটেন্যান্ট ফেলিনা, দে আর অল ইয়োরস! গিভ দেম হেল!!”
“ড্যাম রাইট, স্যার!!” প্রায় একত্রে বলে উঠল অ্যাডোরা ও ফেলিনা দুজনেই।
অ্যাকাডেমির দিন থেকে WAP-2-তে পারফেক্ট স্কোর-করা অ্যাডোরা এই প্রথম সুযোগ এবং নির্দেশ পেল তার এই দক্ষতা কাজে লাগানোর। GUARD-এর বেস্ট পাইলটের বেস্ট ফ্রেন্ড, তার লক্ষ্মীছাড়া বিড়ালনি ও নিজের নিশানাবাজির দক্ষতা প্রমাণ করার সুযোগ ছাড়ল না। অচিরেই মহাকাশের কালো পশ্চাৎপটে ঝলসে উঠল কুড়িটা উজ্জ্বল আলোকবিন্দু। কুড়িটা ফাইটারের ধ্বংসচিহ্ন। অন্যদিকে ইনফিনিটি ফাইটারটা অতুলনীয় দক্ষতায় প্রায় চোখের পলকে উড়িয়ে দিল শিল্ড জেনারেটরগুলো।
ইটারনিটিতে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার হ্যাভক মিসাইল চার্জ করার আদেশ দেওয়ার আগে পাঠিয়ে দিলেন একটা বেতারবার্তা: “ক্লিয়ার আউট নাউ! মিসাইলস কামিং!”
মিনিট তিনেক পরে অ্যাস্টরয়েড ফিল্ডের মধ্যে দিয়ে সাবধানে ফাইটারটা চালাতে চালাতে অ্যাডোরা বলল, “ইনফিনিটি ফাইটারটা কোনোদিকে গেল, দেখ! খুঁজে বের কর।”
“এখান থেকে আগে বেরো।” রাডার স্ক্রিনে চোখ রেখে বলল ফেলিনা, “এত ইনটারফিয়ারেন্সের মধ্যে কিছু বোঝা যাচ্ছে না।”
“এবার দেখ।” খোলা মহাকাশে বেরিয়ে এসে বলল অ্যাডোরা। সে নিজেও রাডার স্ক্রিনে চোখ রাখল। তার ব্যক্তিগত ধারণা ছিল যে, ওই ফাইটারটা নিশ্চিত আলটিমেটাম থেকে এসেছে এবং সেখানেই ফিরে যাবে।
কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে ফেলিনা বলে উঠল, “শিপটা ইটারনিটির দিকে যাচ্ছে রে।”
“হোয়াট!” প্রায় চমকে উঠল অ্যাডোরা। তাহলে কি এতদিন বাদে তার স্বপ্নপূরণ হতে চলেছে? সত্যিই কি আজ ইনফিনিটি স্কোয়াড্রনের সেই লেজেন্ডারি পাইলটদের একজনকে দেখতে পাবে সে? কথা বলতে পারবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে? নিজের ফাইটারটা পূর্ণ বেগে ইটারনিটির দিকে চালিয়ে দিল অ্যাডোরা।
প্রায় একই সঙ্গে ইটারনিটির হ্যাঙারে এসে ঢুকল দুটো ফাইটার। শিপের ইঞ্জিন বন্ধ করেই লাফ দিয়ে বেরিয়ে এল অ্যাডোরা। হেলমেটটাও খোলার সময় হয়নি তার। বাইরে এসে কোনোক্রমে সেটা খুলে একদিকে ছুড়ে ফেলে ইনফিনিটি ফাইটারটার দিকে দৌড়োল সে। ইনফিনিটি ফাইটারটারও ইঞ্জিন বন্ধ হয়েছে। তার একক পাইলট বেরিয়ে আসছে হেলমেট ও মাস্ক খুলে। ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর সামনে গিয়ে উপস্থিত হল অ্যাডোরা এবং বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল।
পাইলট কোনো পুরুষ নন, যেমনটা তার কর্কশ কণ্ঠস্বর শুনে ভেবেছিল অ্যাডোরা। তিনি একজন মহিলা। কিন্তু অ্যাডোরার বিস্ময়ের কারণ সেটা নয়। বিস্ময় এ কারণে যে এই মহিলা তার অতি পরিচিত। পুরোদস্তুর ফ্লাইট সুটে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন…
“কমান্ডার উইলা!!!” হতভম্বভাবে বলল ফেলিনা। সে-ও এসে দাঁড়িয়েছে অ্যাডোরার পাশে এবং বন্ধুর মতোই বিস্ময়ে হতবাক সে-ও।
“আপনিই নির্দেশ দিচ্ছিলেন?” কোনোক্রমে বলল অ্যাডোরা।
“সিমুলেটেড ভয়েস, আমার এক বন্ধুর।” মৃদু হেসে বললেন উইলা, “আমার গলা শুনলে তো তুমি নির্দেশ মানতে না। তাই… সরি।”
“কিন্তু… আপনি…. এই শিপ…” এবারেও অ্যাডোরার প্রশ্নটা শেষ হল না, উইলা আগের মতোই শান্তভাবে বললেন, “না বলে তোমার খেলনাটা নিয়ে যাওয়ার জন্য দুঃখিত! কিন্তু তুমি এটাকে খুব ভালো কন্ডিশনে রেখেছ, একেবারে নতুনের মতো! ধন্যবাদ!”
এতক্ষণে পেছনের ফাইটারটা ভালো করে লক্ষ করল অ্যাডোরা। যুদ্ধের উত্তেজনায় সে বুঝতেই পারেনি যে, ফাইটারটাকে দেখে সে আবেগে উদ্বেলিত, সেটা আসলে তার ওই প্রাইজ় মেমেন্টোটাই, যেটা GUARD-এর পুরোনো হ্যাঙার থেকে খুঁজে এনে সারিয়ে আবার ব্যবহারযোগ্য করে রেখেছিল সে।
“কিন্তু আপনি এই শিপ ওড়ালেন।” অ্যাডোরার বিস্ময় উত্তরোত্তর বাড়ছিল, সে বুঝতে পারছিল, তার স্টেবিলিটি ম্যাট্রিক্সে ক্রমাগত চাপ বাড়ছে, “আপনি WAP-3 এগজ়িকিউট করলেন!! এত নিখুঁতভাবে!! কী করে? ওহ্ মাই গড!!!”
অ্যাডোরা বুঝল, তার ইমোশনাল ফিডব্যাক লুপ হঠাৎ ওভারড্রাইভে চলে গেছে, কারণ তার মেমোরি মডিউল হঠাৎ খুঁজে এনেছে বহুদিন আগে দেখার WAP-3 ফাইলের রেড নোটিশের অন্তিম বাক্য—
“নোবডি পারফেক্টেড ইট একসেপ্ট দ্য ক্রিয়েটর!!!”
“নির্মাতা ব্যতিরেকে কেউ নিখুঁতভাবে এটা পারে না!!” মুখের উপর হাত চাপা দিয়ে দু-পা পিছিয়ে এল অ্যাডোরা। তার স্টেবিলিটি ম্যাট্রিক্স অতি আয়াসে তার শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখল।
“আপনিই WAP-3-র ক্রিয়েটর!!” বলল সে, “আপনি উইলা!! তার মানে… তার মানে… WAP… মানে উইলাস অ্যাটাক প্যাটার্ন!! (Willa’s Attack Pattern)”
উইলার মুখে বিষাদের অন্ধকার ঘনিয়ে এল।
“ঠিকই ধরেছ।” ধীর বিষণ্ণ কণ্ঠে বললেন তিনি, “WAP-এর W আমারই নামে। চেয়েছিলাম যেন কেউ জানতে না পারে। যেন সবাই ভুলে যায়!”
“কিন্তু কেন?” বলে উঠল ফেলিনা, “WAP ম্যানুভারিং GUARD-এর ক্রাউন জুয়েল। আপনি তো GUARD-এর হিরো!!”
“না, আমি নই।” একই রকম বিষাদভরা কণ্ঠে বললেন উইলা, “যে একা ফেরে, ইতিহাস তাকে হিরো বলে না। WAP-3 নিষিদ্ধ, কারণ এটা একটা গণকবরের নাম।”
“তার মানে?” আবার প্রশ্ন ফেলিনার।
উইলা কিছু বললেন না। মুখ নীচু করে দু-দিকে মাথা নাড়লেন। কিন্তু ফেলিনার প্রশ্নের উত্তর এল হ্যাভকের কণ্ঠে, “আমি বলছি।”
পেছন ফিরে তাকাল অ্যাডোরা ও ফেলিনা দুজনেই। উইলাও মুখ তুলে তাকালেন। লেফটেন্যান্ট কমান্ডার হ্যাভকের সঙ্গে সব ব্রিজ অফিসার, এমনকি ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে ইভানও এসে উপস্থিত হয়েছে হ্যাঙারে। ফেলিনা ও অ্যাডোরা সিনিয়র অফিসারদের সামনে দেখেও স্যালুট করতে ভুলে গেল। ভুলে গেলেন অতি পেশাদার, কঠোরভাবে প্রোটোকল মেনে-চলা উইলাও। পরিবর্তে ঠিক যে স্বরে তিনি স্যামরকে থামিয়েছিলেন, সেই স্বরে কিন্তু তুলনামূলক শান্ত নিষেধের ভঙ্গিতে বললেন, “হ্যাভক!”
হ্যাভক অবশ্য থামলেন না। উলটে মৃদু অনুযোগের সুরে বললেন, “আজ নয়, উইলা। আজ নয়!! আজ আর লুকিয়ে রাখা যাবে না।”
উইলা আর কিছু না বলে একবার স্যামরের দিকে তাকালেন। সে সম্মতি ও সাপোর্টের ভঙ্গিতে নীরবে মাথা নাড়ল। উইলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হ্যাঙার ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। তাঁর শরীর সকলের চোখের আড়ালে চলে গেলে সবাই আবার হ্যাভকের দিকে তাকাল।
তিনি ধীর পদক্ষেপে উইলার ছেড়ে-যাওয়া ফাইটারটার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তারপর বলতে শুরু করলেন, “উইলার কথা বলার আগে বলতে হয় ইনফিনিটি স্কোয়াড্রনের কথা। বিশ বছর আগে তারা ছিল GUARD-এর ক্রাউন জুয়েল, এক সে এক তুখোড় ফাইটার পাইলট! GUARD-এর বেস্ট ফাইটার ফোর্স। যে-কোনো যুদ্ধে তাদের উপস্থিতি টাইড অব দ্য ব্যাট্ল আমাদের দিকে ঘুরিয়ে দিত। আমার মনে আছে কারনাক্স যুদ্ধের কথা। আওয়ার ফ্লিট ওয়াজ় আন্ডার হেভি ফায়ার। শত্রুর সংখ্যা ছিল আমাদের প্রায় তিনগুণ। আমার চোখের সামনে আমাদের দু-দুটো হেভি ফাইটার স্কোয়াড্রন ফ্যান্টম আর ফ্যালকন ধুলোয় মিশে যাচ্ছিল, আমি তখন GLARE-এর ডেস্ট্রয়ার হরাইজ়নের ব্রিজে দাঁড়িয়ে। ভাবছি সব শেষ।”
অ্যাডোরা ও অন্য সকলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে। হ্যাভক বলে চলেছেন, “ঠিক তখনই ওরা এল! আমাদের শেষ আশা। মহাকাশের বুকে ফুটে উঠল ইনফিনিটি স্কোয়াড্রনের সেই বিখ্যাত সলিড ট্রায়াঙ্গল ফর্মেশন। মাখনের মধ্যে গরম ছুরি চালানোর মতো তাদের আক্রমণ চিরে ফেলল শত্রুর ফ্লিট…”
“এক মিনিট, স্যার।” হঠাৎ বলে উঠল কণাদ।
থমকে গেলেন হ্যাভক। গল্পে বাধা পড়ায় সবাই বিরক্ত হয়ে তাকাল কণাদের দিকে।
“কী হল তোর?” ধমক দিল ফেলিনা।
কণাদ পাত্তা দিল না। সে হ্যাভকের দিকে চেয়েই বলল, “সলিড ট্রায়াঙ্গল বললেন আপনি, স্যার? কিন্তু পঁয়ত্রিশটা ফাইটার মিলে একটা সলিড ট্রায়াঙ্গল তৈরি করতে পারে না, ওটা ট্রায়াঙ্গুলার নাম্বার নয়।”
হ্যাভক হাসলেন, “ভেরি শার্প, মাই বয়! ইউ আর রাইট। কিন্তু তারা পঁয়ত্রিশজন ছিল না। ত্রিভুজের মাথায়, তোমার হিসেবে যেখানটা ফাঁকা থাকার কথা, সেখানে থাকত তাদের লিডারের শিপ, দ্য সাইলেন্ট ফিউরি, এই শিপটা!!”
পেছনে দাঁড়ানো শিপটার দিকে আঙুল দেখালেন হ্যাভক, “আর এই ককপিটে তখন বসত, এস (ACE) অব দ্য স্কোয়াড্রন, অ্যাকাডেমির বেস্ট পাইলট… GUARD-এর ইতিহাসের সব চেয়ে কমবয়সি স্কোয়াড্রন লিডার, যাকে সবাই বলত ফিউচার স্পেস মার্শাল!”
একটু থামলেন হ্যাভক, ঘরটায় যেন পিনপতন নীরবতা। সবাই প্রায় শ্বাস আটকে প্রতীক্ষারত।
“উইলা!!” একটা ছোটো শ্বাসের সঙ্গে বললেন হ্যাভক।
“কমান্ডার উইলা!!!” প্রায় চিৎকার করে উঠল অ্যাডোরা।
“না, স্কোয়াড্রন লিডার উইলা।” সংশোধন করে দিলেন হ্যাভক, “সে তখন GUARD-এর রাইজ়িং স্টার। দু-দুখানা অ্যাটাক প্যাটার্ন ডিজ়াইন করে ফেলেছে। WAP-1, WAP-2। কেবল বেস্ট পাইলটরাই সে প্যাটার্ন আয়ত্ত করতে পারত, সে সময় পারত শুধু ইনফিনিটি স্কোয়াড্রনের ফাইটার পাইলটরা। আর উইলা…?”
হ্যাভক একটা গভীর শ্বাস নিলেন, “তোমরা কেউ শোনোনি সেই কল, সেই বেতারবার্তা, যা পুরো ব্যাট্লফিল্ডকে পালটে দিত।”
হ্যাভকের চোখ স্বপ্নাতুর হয়ে গেল। তিনি যেন এখনও শুনতে পাচ্ছেন যৌবনের উদ্দীপনায় পূর্ণ উইলার আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠস্বর, “দিস ইজ় স্কোয়াড্রন লিডার উইলা, ব্রেকিং ফর্মেশন… আই অ্যাম গোয়িং ইন। ফলো মি হুএভার ইউ ক্যান!”
“সাবস্পেসের প্রতিটি ব্যান্ডে, প্রতিটি চ্যানেলে সে বেতারবার্তা ছড়িয়ে পড়ত।” বললেন হ্যাভক, “এই ছিল তার ব্যাট্লকল। শত্রুরাও যখনই এ বার্তা শুনত, তাদের অন্তর কেঁপে যেত, কারণ তারা জানত, এবার নরক নেমে আসবে। আসতও তা-ই। উইলা তার সাইলেন্ট ফিউরি নিয়ে যেত সবার আগে ফুল থ্রট্লে, পেছনে বাকি পঁয়ত্রিশজন। WAP-1, WAP-2 ছিন্নভিন্ন করে দিত এনিমি লাইন। উলটে দিত সব হিসাব।”
হ্যাভক থামলেন। গোটা হ্যাঙার আবার পিনপতন নীরবতায় ডুবে গেল। অ্যাডোরার চোখে অশ্রুগ্রন্থি নেই, থাকলে নিশ্চিত তার চোখে এতক্ষণে জলের ধারা নামত। তার ইমোশনাল ফিডব্যাক লুপ ওভারড্রাইভ মোডে বারবার ওভারলোড করে দিচ্ছিল তার স্টেবিলিটি ম্যাট্রিক্সকে। তার মেমোরি মডিউল বারংবার ফিরিয়ে আনছিল কমান্ডার উইলার সঙ্গে তার প্রতিটি সংঘাতের দৃশ্য, বিশেষ করে চার দিন আগে কনফারেন্স রুমের ঘটনাটা, যখন সে বলেছিল, “আপনি ডেস্কে বসে দেখতেন, কীভাবে তারা আপনার সব হিসাব উলটে দিচ্ছে।”
“তারপর কী হল?” জিজ্ঞেস করল গ্রিনা।
হ্যাভকের চোখে বিষাদ ঘনিয়ে এল। তিনি বললেন, “তারপর এল ইবুরা বা গ্রহগ্রাসীরা। তাদের বিরাট গ্রহের মতো যানটা দেখা দিল সৌরজগতের প্রান্তে। তাদের লক্ষ্য এবার পৃথিবী।”
সকলে একবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। এই ঘটনার ব্যাপারে কেউই প্রায় কিছু জানে না। একমাত্র ব্যতিক্রম কণাদ। বিশ বছর আগে সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ কণাদ সহসা স্বপ্নে দেখতে পেয়েছিল একটা গ্রহের মতো বিশাল মহাকাশযান আর তার অভ্যন্তরীণ খুঁটিনাটি। ঘুম ভাঙার পরেও সে নিখুঁতভাবে এঁকে দিতে পারত স্বপ্নে দেখা প্রতিটি দৃশ্য। তার সেই ডিজ়াইনগুলো নাকি কোনো গোপন অপারেশনে গ্যালাকটিক ইউনিয়নের খুব কাজে লেগেছিল। পরে অ্যাকাডেমিতে এসে সে জেনেছিল ‘ইবু’ বা গ্রহগ্রাসী নামটা। এখন হ্যাভকের কথা শুনে আবার তার স্মৃতিপটে ভেসে উঠল সেইসব দৃশ্য।
কণাদ বাদে অন্য সকলের কৌতূহল নিবারণার্থে হ্যাভক বললেন, “এক প্রাচীন জাতি হল ইবু। তাদের বিরাট গ্রহের মতো যানটা হাজার হাজার বছর ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল গ্যালাক্সির এই অঞ্চলে। তাদের অরিজিন কেউ জানে না। তাদের চলার পথে কোনো প্রাণসম্পদ ও অন্যান্য সম্পদে পূর্ণ গ্রহ পড়লে তারা সে গ্রহকে ধ্বংস করে সেখানের সব কিছু লুঠ করে নেয়। সেই লুঠ-করা সম্পদের জোরেই তারা টিকে থাকত, তারা ছিল যেন মহাজাগতিক হায়েনা। কেউ তাদের আটকাতে পারেনি। তাদের যানের চারদিকে ছিল এক দুর্ভেদ্য ম্যাগনেটো ফিজ়িক্যাল শিল্ড, যার মেটিরিয়ালটা ছিল তপ্ত প্লাজ়মা। কোনো কামান, কোনো মিসাইল বা লেজ়ার ওই শিল্ড ভেদ করতে পারত না। আর তাদের উপর আক্রমণ করতে গেলে তারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করত প্লাজ়মা ব্লাস্ট! কয়েক লক্ষ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড উষ্ণতার ব্লাস্ট এক মুহূর্তের মধ্যে ছাই করে ফেলত যে-কোনো ফাইটার শিপ।
“সৌরজগতে ঢোকার পর তাদের সঙ্গে আমাদের প্রথম লড়াই হয় নেপচুনের অরবিটের কাছে। দু-দুটো GLARE ডেস্ট্রয়ার আর একটা ব্যাট্ল ক্রুজ়ার উইথ আ ফুল GUARD স্কোয়াড্রন ছাই হয়ে যায়।
“তাদের আটকানোর একমাত্র উপায় ছিল, যদি কোনোমতে তাদের শিল্ড জেনারেটর নষ্ট করা যায় এবং শিপের মূল পাওয়ার কোর যেটা, সেখানে মিসাইল মারা যায়। থ্যাংকস টু ডিজ়াইন ফ্রম সাম আননোন সোর্স, আমাদের এগুলো সব জানা ছিল। SERAPHS-এর ড্রোন থেকে তোলা ডিটেলড ফোটো ও ভিডিয়ো সে ডিজ়াইন কনফার্মও করেছিল। সুতরাং আমরা জানতাম, কোথায় ওদের মারতে হবে।
“কিন্তু মুশকিল ছিল একটাই, ওই শিল্ড জেনারেটর বা পাওয়ার কোর সবই ওই দুর্ভেদ্য শিল্ডের পেছনে। ওখানে পৌঁছোনোর উপায় নেই। নেপচুনের কাছে লড়াইতে আমাদের সব চেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র প্লামবব কামানও ওদের শিল্ড ভাঙতে পারেনি।
“কিন্তু তখনই একটা আশার আলোও দেখা গিয়েছিল। প্লামবব স্লাগ ওই শিল্ডে সামান্য ডেন্ট করতে পারে অতি সামান্য সময়ের জন্য। আমরা তৈরি হচ্ছিলাম মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝের অ্যাস্টরয়েড ফিল্ডে যেখানে আমাদের প্লামবব কামানের মূল ব্যাটারিটা আছে, সেখানে শেষ লড়াইয়ের জন্য।
[কণাদ, এলটা বা ফেলিনারা আটাশ শতকের লোক তাই প্লামবব কামান কী, তা ওরা জানে। কিন্তু একুশ শতকের পাঠকের জন্য এই জিনিসটার একটু বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন। যাঁরা বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক তত্ত্বের কচকচি শুনতে চান না, তাঁরা এই অংশটুকু বাদ দিয়ে গল্পটা পড়ে যেতে পারেন।
১৯৫৭ সালের আগস্ট মাসে আমেরিকার নেভাদা টেস্ট সাইটে ‘অপারেশন প্লামবব’-এর অংশ হিসেবে মাটির নীচে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ সংক্রান্ত কিছু পরীক্ষা করা হচ্ছিল। তার মধ্যে একটি পরীক্ষা Pascal-A-তে মাটির মধ্যে প্রায় পাঁচশো ফুট গভীর একটা গর্ত বা বোরহোল করে নীচে একটা পারমাণবিক বোমা রেখে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। দেখা যায়, বিপুল পরিমাণ শক্তি ও আগুন ওই গর্ত দিয়ে বাইরে চলে আসে। এই বিপুল শক্তিকে মাটির নীচেই আটকে রাখার উদ্দেশ্যে ৯০০ কিলোগ্রাম ওজনের একটা স্টিলের প্লেট দিয়ে গর্তের মুখটা ঢেকে ঝালাই করে আটকে দেওয়া হয় পরবর্তী পরীক্ষা Pascal-B টেস্টের সময়।
কিন্তু যখন বিস্ফোরণ হয়, তখন দেখা যায়, প্রচণ্ড ঘাতবল ওই ঢাকনাটিকে ভীষণ গতিতে উপরদিকে ছুড়ে দেয়। প্রতি সেকেন্ডে এক হাজার ফ্রেম ধারণ করতে পারে এমন উচ্চগতির ক্যামেরাতেও একটিমাত্র ফ্রেমে ঢাকনাটির একটিমাত্র ছবি ওঠে, সেই ছবি বিশ্লেষণ করে বৈজ্ঞানিকরা জানান যে, ঢাকনাটি পৃথিবীর মুক্তিবেগ (escape velocity)-এর ছয়গুণ বেগে, অর্থাৎ প্রায় সাতষট্টি কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড বেগে ছুটে গিয়েছিল মহাকাশের দিকে। ঢাকনাটি আর পাওয়া যায়নি। মনে করা হয়, বায়ুমণ্ডলের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় ঘর্ষণে উদ্ভূত তাপে সেটি পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়।
এই Pascal-B পরীক্ষার নীতিকে কাজে লাগিয়েই গ্যালাকটিক ইউনিয়নের ডিফেন্স ডিভিশন তৈরি করেছে প্লামবব কামান। গ্রহাণুপুঞ্জের বলয়ে থাকা দেড়-দু-কিমি বা তার চেয়ে বড়ো ব্যাসের গ্রহাণুগুলোর গায়ে ওইরকম দেড়-দুশো মিটার বোরহোল করে রাখা হয়েছে থার্মোনিউক্লিয়ার বোমা, তার উপরে দেড়-দুশো মিটার বরফের স্তম্ভ এবং তার উপরে বসানো হাজার টনের টাংস্টেন-স্টিল সংকর ধাতুর নিরেট সিলিন্ডার বা প্লামবব স্লাগ। পারমাণবিক বিস্ফোরণজনিত তাপ এক মুহূর্তে ওই বরফস্তম্ভকে বাষ্পে পরিণত করে। সেই প্রচণ্ড চাপে ওই হাজার টনের সিলিন্ডার প্রায় সত্তর-আশি কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড বেগে ছিটকে যায় গোলার মতো। সত্তর কিমি প্রতি সেকেন্ড বেগে ছুটতে-থাকা হাজার টনের সিলিন্ডারের অকল্পনীয় গতিশক্তি ভেঙে ফেলতে পারে যে-কোনো বাধা। আমাদের গল্পে এমন কামানের সারি বসানো আছে অ্যাস্টরয়েড বেল্টের মধ্যে। পৃথিবীর শেষ ডিফেন্স।]
“কিন্তু তবু আমরা ফলাফল বিষয়ে নিশ্চিত ছিলাম না।” বললেন হ্যাভক, “সে সময়ই উইলা তৈরি করল তার অন্তিম অ্যাটাক ম্যানুভার, WAP-3!!
“আজ তোমরা দেখেছ, WAP-3 কী। সেদিনও এটাই ছিল পরিকল্পনা। ইবুদের শিপ অ্যাস্টরয়েড ফিল্ডে ঢুকলেই দেড়শো প্লামবব কামানের প্রথম রাউন্ড প্রায় চল্লিশটা স্লাগ ফায়ার করা হবে। তারপর প্রতি দু-সেকেন্ডে দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ রাউন্ড। প্রথম রাউন্ড ফায়ার হলেই অ্যাস্টরয়েড ফিল্ডের মধ্যে লুকিয়ে-থাকা ফাইটার শিপগুলো তাদের পেছনে ছুটবে, যদিও ধরতে পারবে না, কারণ স্লাগ ভেলোসিটি সেকেন্ডে সত্তর কিমি বা তার বেশি, এদিকে ফাইটারগুলো ফুল থ্রট্লেও যায় মোটামুটি সেকেন্ডে পঞ্চাশ কিমি বেগে। কিন্তু ওই দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ রাউন্ড স্লাগগুলোর সঙ্গেই ফাইটারগুলোর শিল্ডের সামনে পৌঁছোনোর কথা। যদি না—”
বাক্যটা আর সম্পূর্ণ করলেন না হ্যাভক। কিন্তু তার আর প্রয়োজনও ছিল না। আজ সবাই বুঝেছে WAP-3 সফল হতে হলে কী হওয়া জরুরি?
অ্যাডোরা শুধু অস্ফুটে একবার জিজ্ঞেস করল, “তারপর?”
“তারপর এল সেই অভিশপ্ত দিন।” ভারী গলায় বললেন হ্যাভক, “এই ভয়ংকর ম্যানুভারিং আর কারা করত ইনফিনিটি স্কোয়াড্রন ছাড়া? সেদিন ওই অ্যাস্টরয়েড ফিল্ডের মধ্যে যখন প্লামবব কামানের প্রথম রাউন্ড ফায়ার হল, তাদের পেছনে উইলা বেরোল ফুল থ্রট্লে, এনগেজ করল WAP-3, ডাকল তার স্কোয়াড্রনকে। প্রতিবারের মতোই তারা তাদের লিডারের পেছনে গেল, কিন্তু সেদিন আর কেউ ফিরে এল না। অ্যাস্টরয়েডের ধাক্কায়, স্লাগের ঘায়ে, শিল্ডে আছড়ে পড়ে একে একে আমাদের পঁয়ত্রিশজন কমরেড, বন্ধু, পঁয়ত্রিশজন ভাইবোন আকাশের গায়ে আলোকবিন্দু হয়ে গেল। কেউ শিল্ডের ভেতরে ঢুকতে পারল না, উইলা ছাড়া!
“সে একা ভেতরে ঢুকল, একা লড়াই করে নষ্ট করল শিল্ড জেনারেটরগুলো, তারপর আমাদের মিসাইল ফায়ার করার আগেই তার একমাত্র মিসাইলটা পাঠিয়ে দিল ইবুদের শিপের পাওয়ার কোরের সুড়ঙ্গে। একার হাতে পৃথিবীকে রক্ষা করে বেরিয়ে এল সে তার ক্ষতিগ্রস্ত শিপ নিয়ে। ফিরে এল একা! ফেরার পথে আকুল হয়ে সে ডাকছিল তার স্কোয়াড্রনকে। বারবার ডাকছিল প্রতিটি ফাইটারের নাম ধরে। যদি কেউ সাড়া দেয়! কিন্তু কেউ ছিল না সাড়া দেওয়ার মতো! GUARD-এর বেস্ট ফাইটার স্কোয়াড্রন চিরকালের মতো হারিয়ে গেল ওই গ্রহাণুগুলোর মধ্যে।”
হ্যাভক থামলেন একটু। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। অ্যাডোরা বাদে সব শ্রোতারই চোখ ভেজা।
“সেদিন গ্র্যান্ড হলে তিলধারণের জায়গা ছিল না।” ফের বলতে শুরু করলেন হ্যাভক, “GUARD, GLARE, SERAPHS তিনটে উইং-এরই সব বড়ো থেকে ছোটো অফিসাররা এসেছিলেন সেই নায়িকাকে দেখার জন্য, যে একার হাতে রক্ষা করেছে পৃথিবী। উইলা, দ্য সেভিয়ার অব আর্থ, সেভিয়ার অব হিউম্যানিটি। তাকে ইতিমধ্যেই উইং কমান্ডার ঘোষণা করা হয়েছিল। চিফ মার্শাল স্বয়ং গ্যালান্ট্রি মেডেল হাতে দাঁড়িয়েছিলেন মঞ্চে।
“কিন্তু উইলা মেডেল নিল না। সে বলল, তার স্কোয়াড্রনের পঁয়ত্রিশজন পাইলটের মৃত্যুর বিনিময়ে পাওয়া এ মেডেল সে নিতে পারবে না। এ মেডেল তার বোঝা হয়ে থাকবে সারাজীবন। বদলে সে চাইল অন্য কিছু পুরস্কার।”
“কী পুরস্কার?” জিজ্ঞেস করল ইভান।
“সে চাইল বিস্মৃতি।” বললেন হ্যাভক, “সে চিফ মার্শালকে অনুরোধ করল WAP-3 ক্লাসিফায়েড করার জন্য। সে চাইল যেন সব WAP ফাইল থেকে তার নাম মুছে ফেলা হয়। ইনফিনিটি স্কোয়াড্রন সংক্রান্ত সব তথ্য ও উইলার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক যেন গোপন করা হয়। এবং সে নিজে GLARE কমান্ডে যোগ দিয়ে বদলি চাইল অ্যাকাডেমিতে।
“সেদিন স্কোয়াড্রন লিডার উইলার মৃত্যু হল। জন্ম নিল কড়া মেজাজের অ্যাকাডেমি ইনস্ট্রাক্টর কমান্ডার উইলা যে ক্যাডেটদের রেকলেস আচরণ, বেহিসেবি ঝুঁকি সহ্য করতে পারত না। কারণ সে জানত বেহিসেবি ঝুঁকির মূল্য কতখানি।”
হ্যাভক চুপ করলেন। অ্যাডোরা পায়ে পায়ে এসে দাঁড়াল সাইলেন্ট ফিউরির সামনে, এই সেই শিপ যা ধরে রেখেছে এক একক যোদ্ধার সংগ্রাম। শিপের ভিউস্ক্রিনে আর নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল না অ্যাডোরা। বদলে দেখল সেই একক যোদ্ধার ছবি, যে তার নির্বিকার কঠোরতার নীচে লুকিয়ে রেখেছে এক সমুদ্রপ্রমাণ কান্না।
ফেলিনা ফিশফিশ করে হ্যাভককে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু স্যার, আপনি কেন অ্যাকাডেমিতে এলেন?”
হ্যাভক বিষণ্ণ হাসলেন, “অব অল দ্য পিপ্ল হিয়ার, এই প্রশ্নটা তুমি করলে? তুমি!! যে আজও নিজস্ব কেবিন প্রত্যাখ্যান করে বন্ধুর সঙ্গে রুম শেয়ার করে!! আমি তো শুধু কিছু বছর বন্ধুর সঙ্গে ওয়ার্কপ্লেস শেয়ার করেছি।”
ফেলিনা লজ্জায় মাথা নীচু করল। হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়েছে এমনভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে অ্যাডোরা স্যামরকে বলল, “তুই—তুই সব জানতিস, তা-ই না?”
“হ্যাঁ, জানতাম।” স্বীকার করল স্যামর, “এত বিশদে না হলেও ম্যামের ফাইল আমি দেখেছিলাম ক্যাপটেন হওয়ার পর।”
“আমাকে বলিসনি কেন?” তীব্রস্বরে বলল অ্যাডোরা, “কেন আমার ভুল ধরিয়ে দিসনি? তুই আমার বন্ধু, ব্যাচমেট! তুই তো জানতিস, আমি কত বড়ো অপরাধ করে চলেছি প্রতিনিয়ত।”
“বলতে গেছিলাম।” বলল স্যামর, “ম্যাম ধমক দিলেন, মনে নেই?”
“তোরা সবাই মিলে আমার এ কী সর্বনাশ করলি!!” বলতে বলতে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল অ্যাডোরা, “আমার সব কিছু শেষ হয়ে গেল। আমার আর কিছু রইল না। কিচ্ছু না।”
মেঝেতে দু-হাত রেখে মাথা ঝোঁকাল সে। সবাই চুপ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর গ্রিনা এগিয়ে এসে অ্যাডোরার কাঁধে হাত রাখল। নরম সুরে বলল, “কিছু শেষ হয়নি, অ্যাড। আমরা এখনও তোর বন্ধু, তুই এখনও GUARD-এর বেস্ট পাইলট, আর উইলা ম্যাম এখনও তোর আইডল। যা, ওঁর সঙ্গে কথা বল গিয়ে।”
“আমি পারব না। পারব না।” বলে উঠল অ্যাডোরা, “কী করে ওঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াব? তোরা কেউ চল আমার সঙ্গে। আমি একা যেতে পারব না।”
কথাগুলো বলতে বলতে অ্যাডোরা আশাভরা দৃষ্টিতে একে একে তাকাল তার সব বন্ধুর দিকে। কারও এমনকি ফেলিনার পর্যন্ত মুখ দেখে মনে হল না যে, তারা কেউ অ্যাডোরাকে সঙ্গ দেওয়ার কথা ভাবছে।
হ্যাভক এগিয়ে এসে তাঁর বিশাল দু-হাতে অ্যাডোরার দুই কাঁধ ধরে তাকে তুলে দাঁড় করালেন, তারপর তার চোখে চোখ রেখে বললেন, “কিছু যুদ্ধ সবাইকেই একা লড়তে হয়, ক্যাডেট! উইলা তারটা বিশ বছর ধরে লড়ছে। তুমি এই একদিন পারবে না? যাও, ওর সঙ্গে দেখা করো গিয়ে।”
কমান্ডার উইলার কেবিনের সামনে এসেও ফের থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল অ্যাডোরা। অনেক সাহস সঞ্চয় করে সে এতটা এসেছে বটে, কিন্তু দরজার অ্যালার্ট বিপটা ট্রিগার করার মতো কাছে গিয়ে দাঁড়াবে কি না, সেটা ঠিক করতে পারছিল না সে।
এ সময় তার দ্বিধার অবসান ঘটিয়ে ডোর ইনটারকম থেকে উইলার গলা ভেসে এল, “কাম ইন, অ্যাডোরা।”
ঘরের ভেতরে প্রায় অন্ধকার। যেটুকু আলো আছে, মানুষের দেখার পক্ষে যথেষ্ট নয়, তবে অ্যাডোরার অসুবিধা হচ্ছিল না। ঘরের দূরতম প্রান্তে পোর্ট উইন্ডোর সামনে দণ্ডায়মান কমান্ডার উইলাকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল সে। বাইরে দৃশ্যমান অনন্ত নক্ষত্ররাজির দিকে তাকিয়ে তার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।
অ্যাডোরা ভেতরে এসে দাঁড়ালে উইলা তার দিকে না ফিরেই বললেন, “হ্যাভক সব কিছু ডিক্লাসিফায়েড করে দিয়েছে, তা-ই না?”
“ইয়েস, ম্যাম।” বলল অ্যাডোরা।
“গোদা গোরিলাটা আমাকে বড্ড ভালোবাসে।” জানলার দিকে তাকিয়েই বললেন উইলা, “বিশ বছর ধরে ওর চওড়া কাঁধ দুটো আমার একমাত্র সাপোর্ট।”
কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন দুজনে। তারপর অ্যাডোরা অনুতপ্ত কণ্ঠে বলল, “দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দিন ম্যাম। আমি জানতাম না—”
“দ্যাট ওয়াজ় দ্য পয়েন্ট, লেফটেন্যান্ট।” বাধা দিয়ে বললেন উইলা, “তোমার জানার কথা নয়। কারও জানতে পারার কথা নয়!! কেউ যেন কোনোদিন স্কোয়াড্রন লিডার উইলার কথা না জানতে পারে, কেউ যেন আর কোনোদিন তার পেছনে না আসে, সেটাই চেয়েছিলাম।”
অ্যাডোরা চুপ করে রইল। উইলা নিজেই আবার বললেন, “ওরা আমার পেছনে গিয়েছিল, আমার কথায় ভরসা করেছিল। ভেবেছিল, আমি ওদের ফিরিয়ে আনব, যেমন প্রতিবার আনি। কিন্তু আমি পারিনি। আমি একা ফিরলাম! একা!! কেন? কারণ আমি পারিনি তাদের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে।”
“আপনার দোষ ছিল না, ম্যাম।” বলার চেষ্টা করল অ্যাডোরা, কিন্তু উইলা জোর গলায় বলে উঠলেন, “অবশ্যই আমার দোষ, লেফটেন্যান্ট। আমি ওদের টেনে নিয়ে গেছিলাম ওই মৃত্যুফাঁদে।”
সামান্য থামলেন উইলা, তারপর কয়েক পা পাশে সরে একটা সোফায় গিয়ে বসলেন। অ্যাডোরাকেও বসতে ইশারা করলেন, তারপর ফের ধীরকণ্ঠে বললেন, “মিশনের আগে ব্রিফিং-এ ওরা সবাই সংশয়ী ছিল! নতুন ম্যানুভারিংটা যথেষ্ট প্র্যাকটিস করতে পারেনি কেউ। সিমুলেশন আওয়ার বেশি ছিল না। সাকসেস রেট প্রায় শূন্য ছিল। কিন্তু আমি বলেছিলাম, আমরা পারব। আমরা ইনফিনিটি স্কোয়াড্রন। যদি আমরা না পারি, তবে কে পারবে? আমরা অবশ্যই পারব। মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে ওদের নিয়ে গেলাম আমার সঙ্গে। কিন্তু কেউ পারল না। আমার কথায় ভরসা করে যারা মৃত্যুর মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ল, তারা কেউ ফিরল না। ফিরে এলাম শুধু আমি। একা। সকলের মৃত্যুর দায় কাঁধে নিয়ে।”
অ্যাডোরা কী বলবে, বুঝতে পারছিল না, তবে এটা বুঝতে পারছিল, বহু বছর পাথর চাপা থাকার পর আজ কমান্ডার উইলার বেদনার উৎসমুখ ফের খুলে গেছে। আজ আর তিনি থামতে পারছেন না।
“আমি ক্রিপ্টিন থেকে আসা রিফিউজিদের বংশধর।” বললেন উইলা, “সাতশো বছর আগে আমাদের গ্রহ ধ্বংস করেছিল ইবুরা। যারা সে সময় পালিয়ে যেতে পেরেছিল, তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ঘুরে বেড়িয়েছে আশ্রয়ের সন্ধানে। পৃথিবী আমাদের দ্বিতীয় ঘর। তাই ইবুরা যখন এখানে এল, তখন তাদের ঠেকাতে, প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর ছিলাম আমি। তাই ওই অসম্ভব কাজ করতে বলেছিলাম আমার স্কোয়াড্রনকে।”
“কাজটা তো অসম্ভব নয়, ম্যাম।” বলল অ্যাডোরা।
“হ্যাঁ, হয়তো আমার কাছে।” বললেন উইলা, “কিন্তু সবাই পারবে না, তা তো আমি জানতাম। আমি সকলের চেয়ে ভালো এই সূক্ষ্ম অহংকার তো আমার মধ্যে ছিলই। নইলে কেন আমি সব সময় বলতাম, ‘ফলো মি হুএভার ইউ ক্যান?’ সেদিনও বলেছিলাম। আর ওরা অন্ধের মতো আমাকে ফলো করল।”
“ম্যাম, আপনি পৃথিবীকে বাঁচিয়েছিলেন।” বলল অ্যাডোরা, “WAP-3 একমাত্র রাস্তা ছিল।”
“বড়ো কিছুর জন্য ছোটো কিছুর স্যাক্রিফাইস।” উইলা যেন হাসলেন, “সেটা আমার একার করা উচিত ছিল। ওরা কেন? সেদিনই আমি ঠিক করেছিলাম যে, আর কখনও কাউকে আমার পথে চলতে দেব না। WAP-3 নিষিদ্ধ ঘোষণা করালাম। সব জায়গা থেকে আমার নাম মুছে ফেললাম, ইনফিনিটি স্কোয়াড্রনের লিডারকে যাতে কেউ মনে না রাখে, সে ব্যবস্থা করলাম। চলে এলাম অ্যাকাডেমিতে। সবাইকে বেপরোয়া, বেহিসেবি ঝুঁকির রাস্তায় না-চলা শেখাতে লাগলাম।
“তারপর হঠাৎ একরাতে দেখতে পেলাম, এক ইয়াং প্রমিসিং ক্যাডেট লুকিয়ে WAP-3 প্র্যাকটিস করছে। আমার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। যে মৃত্যুফাঁদ আমি এত কষ্টে চাপা দিয়েছি, তা এই মেয়ে কোথায় পেল!! জানতে চাইলাম! তুমি মিথ্যে বললে। তুমি বোধহয় ভাবছিলে, এত ক্লাসিফায়েড ফাইল তো ম্যাম দেখতে পাবেন না, সুতরাং যা হোক বলে দিলেই হবে।”
লজ্জায় আর মাথা তুলতে পারল না অ্যাডোরা দশ বছর আগের সেই দিনটার কথা ভেবে।
“আমি তোমার ফাইল দেখলাম।” বললেন উইলা, “বুঝলাম, ভবিষ্যতে তুমি GUARD-এর বেস্ট অ্যাসেট হয়ে উঠবে। সুতরাং আমার মতো, আমার পথে তোমাকে চলতে দেওয়া যাবে না। তোমাকে বাধা দিলাম, বোঝাতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু তুমি আমার উপর খেপে উঠলে।”
“আমি ভুল বুঝেছিলাম, ম্যাম।” বলল অ্যাডোরা, “আমি আপনার আর হ্যাভক স্যারের মধ্যে কথা শুনে ফেলেছিলাম। ভেবেছিলাম, আপনি আমার সাফল্যে ঈর্ষা করেন। আমাকে এগোতে দিতে চান না।”
“আমি শুধু তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।” বললেন উইলা, “তোমার নিজের থেকে। প্রতিবার তুমি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে আর আমি দেখতে পেতাম দশ বছর আগের উইলাকে। উদ্দাম, বেপরোয়া, বেহিসেবি উইলা, যে পঁয়ত্রিশটা তরতাজা শবদেহ ঘাড়ে নিয়ে এখন ঘুরছে।
“আজও যখন তুমি বললে, ‘আমি জানি, আমি পারব।’ আর তোমার বন্ধুও তোমাকে সাপোর্ট করে বলল, ‘ও যখন বলছে, পারব, তখন আমরা নিশ্চয়ই পারব’; তখন আমার মনে হল, আমি বিশ বছর আগের সেই ব্রিফিং রুমে উইলার গলা শুনছি, ‘আমরা পারব’; আর তার বন্ধুরা তার উপর ভরসা করে বলছে, ‘উইলা যখন বলেছে, তখন নিশ্চয়ই পারব’।”
কিন্তু আজ আমি বদ্ধপরিকর ছিলাম যে, সেই এক ভুল আর হতে দেব না। তাই ছুটে বেরোলাম। এত বছর পর! কিন্তু দ্যাখো, ঠিক সেই আগের মতো… মাস্ল মেমোরি… সব ঠিক ঠিক হল!!”
চুপ করলেন উইলা।
অ্যাডোরা উঠে দাঁড়াল, বলল, “না ম্যাম, আগের মতো হয়নি। আজ একটু অন্যরকম হয়েছে!”
উইলা মুখ তুলে তাকালেন।
অ্যাডোরা বলল, “সেদিন আপনি একা ফিরেছিলেন, ম্যাম। আজ আপনি আমাদের নিয়ে ফিরেছেন। ইনফিনিটি স্কোয়াড্রন শেষ হয়নি, ম্যাম।”
একবারের জন্য থেমে অ্যাটেনশন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে স্যালুট করল অ্যাডোরা; বলল, “স্কোয়াড্রন লিডার! ম্যাম। প্লিজ় আমাকে আপনার স্কোয়াড্রন জয়েন করার অনুমতি দিন।”
উইলাও উঠে দাঁড়ালেন। বহুদিন পর আবার এই সম্বোধন শুনলেন তিনি। তাঁর চোখ লাল হয়ে আছে। কিন্তু একটা রিটার্ন স্যালুট করে ধরা-গলায় তিনি বললেন, “পারমিশন গিভ্ন, ক্যাডেট।”
এক-পা পিছিয়ে গিয়ে ড্রয়ার থেকে একটা ফোটোফ্রেম বের করে অ্যাডোরার হাতে তুলে দিলেন তিনি, বললেন, “ইনফিনিটি স্কোয়াড্রন এখন থেকে তোমার লেফটেন্যান্ট।”
অ্যাডোরা ফোটোটা দেখল। তার কাছে যেটা আছে, সেই গ্রুপ ফোটোটাই। পার্থক্য এই যে এটা ঝাপসা নয়! প্রতিটি মুখ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। এবং আজ অ্যাডোরা লক্ষ করল যে, সে কোনোদিন গুনে দেখেনি তাই, নইলে অনেক আগেই জানতে পারত, ফোটোতে পঁয়ত্রিশ নয়, ছত্রিশজন আছে। সামনের সারির ঠিক মাঝে বসে আছেন GUARD-এর ইউনিফর্মে সুসজ্জিতা উইলা।
“ধন্যবাদ, ম্যাম।” ফোটোটা বুকে জড়িয়ে ধরে বলল অ্যাডোরা।

* * *
দু-মাস পর একটা ছোট্ট শাট্ল ভেসে চলেছে মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝের অ্যাস্টরয়েড বেল্টের দিকে। ঠিক সেই অঞ্চলে, যেখানে স্পেস ডেব্রি রূপে আজও হয়তো দেখা যাবে ইবুদের শিপের টুকরোগুলো।
শাট্লের ইঞ্জিন বন্ধ করে উইলার দিকে তাকাল অ্যাডোরা, “আই অ্যাম রেডি, কমান্ডার।”
উইলা সামান্য মাথা নাড়লেন, তারপর বলতে শুরু করলেন:
“ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সুনারি।
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মিরাচ!
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ভলক!…”
প্রতিটি নাম উচ্চারণ করছিল অ্যাডোরাও এবং প্রতিটি নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে একটা করে ফ্লেয়ার ছাড়ছিল সে।
পঁয়ত্রিশটি নাম। পঁয়ত্রিশটা ফ্লেয়ার। বিশ বছর আগে এখানে আলোকবিন্দু হয়ে গিয়েছিল যে পঁয়ত্রিশজন সাহসী পাইলট, বিশ্বাসী কমরেড, বন্ধু, তাঁদের স্মরণে পঁয়ত্রিশটি আলোকবিন্দু। অতি উজ্জ্বল যা পৃথিবী থেকেও হয়তো দেখা যাবে। ইনফিনিটি স্কোয়াড্রনের বিখ্যাত সলিড ট্রায়াঙ্গল ফর্মে সাজানো হয়েছে ফ্লেয়ারগুলো। ত্রিভুজের মাথায় কমান্ডার উইলার শাট্ল।
মহাকাশে আজও বাতাস নেই। সেখানে শব্দ হয় না, কিন্তু আজ কেউ আছে, যে তার কান্না শুনতে পাচ্ছে। শুনতে পাচ্ছে, কারণ আজ বহু বছর পরে আবার একবার কান্নায় ভেঙে পড়েছেন স্কোয়াড্রন লিডার উইলা, কমান্ডার উইলা!!
Tags: একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা, কৃশানু নস্কর
