ঊর্ধ্বসীমা
লেখক: প্রতীক বসু
শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব
গভীরতার মধ্যে একটা অনাবিল সৌন্দর্য রয়েছে। অন্তত আমি বরাবর তেমনটাই ভেবে এসেছি। আর ভাবব না-ই-বা কেন? সব সুন্দর জিনিসেরই যত গভীরে যাওয়া যায়, ততই তার সৌন্দর্য মুগ্ধ করে। আর সত্যি কথা বলতে, আমার জীবনের একটা বড়ো অংশ—আমার পড়াশোনা, আমার কাজ—একরকম এই গভীরতা নিয়েই। কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে?—আমি ততটা নিশ্চিত নই।
এত গভীরে আমি আগে কখনও আসিনি। গভীরতা যত বাড়ছে, তত যেন মনে হচ্ছে, আমরা এগিয়ে চলেছি নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের দিকে। ধীরে ধীরে কমে আসছে সূর্যের আলো—যেন কেউ সযত্নে পর্দা টেনে দিচ্ছে আমাদের চোখের সামনে দিয়ে। আরেকটু গভীরে গেলেই আর খালি চোখে কিছু দেখা যাবে না। সামনে প্রেশার গেজের কাঁটাটা সমান গতিতে উপরের দিকে উঠে চলেছে—জানান দিচ্ছে যে আমাদের চারপাশে এখন সাংঘাতিক পরিমাণ চাপ। আর সেই চাপ উপেক্ষা করেই আমাদের ছোট্ট সাবমেরিন এগিয়ে চলেছে গন্তব্যের দিকে।
“ক্রসিং ফিফটিন হান্ড্রেড।” স্পষ্ট, অভ্যস্ত কণ্ঠে বলে ওঠে পাইলট।
আমি নিশ্চিত, পাইলট ছেলেটি বেশ দক্ষ এবং অভিজ্ঞ। এই গভীরতায় এতবার সে এসেছে যে, সম্ভবত এটা তার মাস্ল মেমোরিতে পরিণত হয়েছে। তার শান্ত অভিব্যক্তি তারই প্রমাণ। কিন্তু আমার শরীর এই গভীরতায় এখনও অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। এর আগে যতবার ডাইভিং করেছি, তা এত গভীরে নয়। কিন্তু সেই পাঁচশো মিটার গভীরতাতেও জলের চাপ বেশ ভালোভাবেই টের পাওয়া যায়। আমার শরীর হয়তো তাই সেরকমই কিছু আশা করছিল। কিন্তু তারপরেই খেয়াল হল যে, কেবিনে বায়ুর চাপ এতটুকুও বদলায়নি। কিছুই বদলায়নি। এসবই মনের ভুল। সেই একই ছোট্ট কেবিন, একই ধাতব গন্ধ। কিন্তু তবু, কেন জানি না, এই জায়গাটা যেন এখন আরও ছোটো বলে মনে হচ্ছে। মহাসমুদ্র যেন আমাদের আরও কাছে চলে এসেছে।
এই ছোট্ট টাইটেনিয়ামের গোলকের ভিতরে আমরা চারটি প্রাণী। এর চেয়ে বেশি ধরতও না যদিও। লোকে যা মনে করে, তার তুলনায় এই কেবিন বেশ অনেকটাই ছোটো। পুরোনো দিনকার প্রকাণ্ড সব সাবমেরিন দেখে যা ধারণা হয়, সেরকম মোটেই নয় এই ইনস্পেকশন সাব। কোনোমতে এর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছি আমরা। আমরা, মানে আমি আর আমার তিন সহকর্মী। সত্যি কথা বলতে, এদের সঙ্গে আমার আগে থেকে পরিচয় নেই। মিশনের শুরুতে এদের নামগুলো জেনেছি মাত্র। সামনে একদম মধ্যিখানে বসে রয়েছে পাইলট বিবেক সারথি। দক্ষ হাতে সাবমেরিনের কনট্রোল ধরে রেখেছে সে। তার সামনে একরাশ বোতাম আর কলকবজা, যা তাকে যন্ত্রটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করছে। তার ঠিক সামনেই প্রধান ভিউপোর্ট। টাইটানিয়ামের পুরু দেওয়ালে নিখুঁতভাবে বসানো মোটা অ্যাক্রিলিকের জানালা। অন্ধকারে বাইরে স্পষ্ট কিছু দেখা যায় না। এখন আমাদের একমাত্র সম্বল কৃত্রিম আলো।
“প্রেশার স্টেব্ল।” পাইলটের ডানদিকের আসন থেকে বলে ওঠে পবিত্র নিয়োগী, মেরিন সিস্টেমস ইঞ্জিনিয়ার। বয়স আমাদের মতোই হবে। তার চোখ স্ক্রিনের প্রেশার রিডিং থেকে সরছে না। কিছু মানুষ থাকে, যারা নিজের কাজ ছাড়া আর কিছু বোঝে না; যেটুকু দেখলাম, আমার একে সেরকম লোক বলেই মনে হয়।
পাইলটের ঠিক পিছনে আমার বাঁদিকে বসে আমাদের আজকের মিশন হেড বিজয় শ্রীবাস্তব, মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ওভারসাইট অফিসার। বাকিদের তুলনায় বেশ বয়স্ক, বেশ সিনিয়রও বটে। প্রতিফলিত আলোয় তার মুখে নীলের আভা ফুটে উঠেছে। চিন্তিত মুখে তাঁর কনসোলে তিনি নজর রাখছেন ইনজেকশন ডেটার উপর।
“বায়োলজি।” মাথা না ঘুরিয়েই তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন, “তুমি ঠিক আছ তো?”
হায় ভগবান! আমার একটা নামও আছে…। কী আর বলি!
“আজ্ঞে হ্যাঁ, আয়্যাম ফাইন।” আমি বলে উঠি। অনেকটা প্রতিবর্ত ক্রিয়ার মতোই এই উত্তরটা যেন মুখে লেগেই থাকে। সে যা-ই হোক।
“আমার নাম পল্লবী।” এটাও যোগ করে দিলাম সঙ্গে।
“হুমম্, রাইট।” কনসোল থেকে চোখ না তুলেই গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন তিনি।
“টু থাউজ়্যান্ড মিটারস।” আবার ঘোষণা করে বিবেক। ভিউপোর্টের দিকে তাকিয়ে দেখি, জলের রং এতক্ষণে পুরোনো কালির মতো কালচে হয়ে গিয়েছে। সাবমেরিনের আলো এই গভীর অন্ধকারে বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারছে না। আরেকটু উপরে যখন ছিলাম, তখন ভিউপোর্টে চোখ রাখলে মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছিল ব্রিস্লমাউথ, ল্যান্টার্ন ফিশ, কম জেলি, গ্লাস স্কুইড ইত্যাদি নানা প্রজাতির প্রাণী। এখন তা-ও দেখা যাচ্ছে না।
আমি আরও একবার মনে করার চেষ্টা করি যে, আমরা এখানে কেন এসেছি। এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছেন যে এটা কোনো রিসার্চ এক্সপিডিশন নয়; আজ কোনো আবিষ্কার বা এক্সপ্লোরেশনের জন্য আমরা এত নীচে আসিনি। এমন একটা কাজের জন্য এসেছি যে, এখানে আমার থাকার কোনো মানেই হয় না।… সে যাক গে।
মি. শ্রীবাস্তব হঠাৎ মৃদু কেশে গলা পরিষ্কার করে বললেন, “তাহলে আরেকবার আমাদের অ্যাজেন্ডাটা ঝালিয়ে নেওয়া যাক?” কথাটা আমার দিকে না তাকিয়ে বললেও আমি বেশ বুঝতে পারলাম যে আমার জন্যই বলা। এই ছোট্ট কেবিনে আমিই একমাত্র এই ব্যাপারে অনভিজ্ঞ। নেহাত ঠেকায় পড়ে আমায় আনা। নতুন রেগুলেশন অনুযায়ী এই ধরনের ডিপ সি মিশনে নাকি একজন বায়োলজিস্ট অবজ়ার্ভার থাকা খুবই প্রয়োজন। আমার জায়গায় অন্য একজনের আসার কথা ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে সে আসতে না-পারায় ডিপার্টমেন্ট থেকে অগত্যা আমাকেই পাঠানো হয়েছে।
আমি পল্লবী সামন্ত। মেরিন বায়োলজিস্ট। গভীর মহাসাগরের জীবজগৎ নিয়ে আমার দিনযাপন। তবে আমার কাজ বরাবরই ডাঙায় থেকে ভিডিয়ো ফিডে মহাসাগরের গভীরতায় চোখ রাখা, বা পেশাদার ডুবুরিদের নিয়ে আসা নমুনা পর্যবেক্ষণ করা। এক-দুবার ডাইভ করে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা যে অর্জন করিনি, তা নয়। কিন্তু সে আর কতটুকু! সাবমেরিনে এই আমি প্রথমবার। তাও এরকম একটা খুবই বোরিং কাজের জন্য। হেহ্!… তাও পাওনার মধ্যে এই, যে গভীর সমুদ্রের কিছু প্রজাতির দেখা ইতিমধ্যেই পেয়েছি।
“আমরা যাচ্ছি আমাদের দেশের ডিপ সি কার্বন সিকুয়েস্ট্রেশন পরিকাঠামোর সাদার্ন সেগমেন্টের কিছু অংশের ইনস্পেকশনে।” তিনি বলে চললেন, “গত প্রায় দু-মাস ধরে আমরা এই অংশের ডেটায় কিছু প্রেশার ইরেগুলারিটি লক্ষ করেছি। অর্থাৎ, পাইপলাইনে যে পরিমাণ চাপ থাকার কথা, তার থেকে খানিকটা কম চাপ দেখা যাচ্ছে। খুবই কম, কিন্তু ব্যাপারটা উপর থেকে কিছুতেই ঠিক করা যাচ্ছে না। আর কেন এমনটা ঘটছে, সেটাও ঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না।”
“কম, কিন্তু লং টার্মে ব্যাপারটা সমস্যাজনক হতে পারে।” তার কনসোল থেকে চোখ না তুলেই বলল ইঞ্জিনিয়ার পবিত্র। তাকে বেশ চিন্তিত শোনাচ্ছে। তারপরেই পিছনদিকে ঘাড়টা হালকা ঘুরিয়ে বলল, “ব্যাপারটা কীভাবে কাজ করে, মোটামুটি জানো নিশ্চয়ই?” প্রশ্নটা আমাকেই করা হচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
“হ্যাঁ, জানি।” বললাম আমি। আর জানব না-ই-বা কেন। জিয়োলজিক্যাল কার্বন সিকুয়েস্ট্রেশন—বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের নিরাময় হিসেবে মানবজাতির বেছে নেওয়া এখনও পর্যন্ত সব চেয়ে কার্যকর সমাধান। নামটা বেশ কঠিন শোনালেও, মূল ব্যাপারটা বোঝা বেশ সহজ। বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত কার্বন ডাইঅক্সাইডকে বায়ুমণ্ডল থেকে আলাদা করে, অথবা ভারী শিল্পক্ষেত্র থেকে যে কার্বন নির্গত হয়, তাকে সরাসরি কমপ্রেস করে, সেটাকে সুদীর্ঘ পাইপলাইনের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ সচ্ছিদ্র শিলায় নিয়ে গিয়ে বন্দি করা। এক্ষেত্রে সেই শিলা সমুদ্রের নীচে, প্রায় সাড়ে তিন হাজার মিটার গভীরে অবস্থিত সমুদ্রতলে। কার্বন সেখানে শিলার মধ্যে ধীরে ধীরে খনিজে পরিণত হয়, এবং সেখানেই শতসহস্র বছর আটকে থাকতে পারে।—দুর্দান্ত সমাধান।
একটা সময় ছিল, যখন মানবজাতির স্পেস এক্সপ্লোরেশন এবং অন্য গ্রহে গিয়ে সেটাকে পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য করে তোলা (অর্থাৎ টেরাফর্মিং) নিয়ে প্রচণ্ড উৎসাহ ছিল। ধনকুবেররা মনে করতেন যে, মুনাফার জন্য পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, জীবমণ্ডলকে ধ্বংস করে দিয়ে তারপর সেই টাকা রকেটে আর ব্যক্তিগত স্পেস এক্সপ্লোরেশনে নিয়োগ করে অন্য গ্রহে চলে যাবেন, আর সেই গ্রহের টেরাফর্মিং করে সেখানে পালিয়ে বাঁচতে পারবেন। কিন্তু তাদের ধারণা যে কতটা ভুল, তা নিয়ে একদিন জনসমক্ষে বক্তৃতা রাখলেন এক জনপ্রিয় জ্যোতিঃপদার্থবিদ। কিছুটা স্রোতের বিপরীতে গিয়েই তিনি বললেন যে, অন্য কোনো গ্রহকে পৃথিবীর মতো করে তোলার থেকে অনেক অনেক বেশি সহজ হল পৃথিবীকে আগের মতো বাসযোগ্য অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। তৈরি হতে লাগল জনমত।
তখনকার যেসব রাষ্ট্রনেতা কোটিপতিদের ইশারায় ওঠা-বসা করতেন, তাদেরকে বোঝানো এবং রাজি করা মোটেই সহজ ছিল না। কিন্তু তখনও জনমতের গুরুত্ব ফুরিয়ে যায়নি। পরিবর্তন এল, দেশগুলোর মধ্যে সমঝোতা হল, এবং কার্বন ডাইঅক্সাইডকে জব্দ করার এই প্রযুক্তি বিরাট স্কেলে ইমপ্লিমেন্ট করা শুরু হল। আমাদের দেশও বাদ গেল না। তার বহু আগে থেকেই কার্বন ফুটপ্রিন্ট, কার্বন ট্যাক্স ইত্যাদিতে জেরবার হয়ে গিয়ে শেষে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হল যে, এই প্রযুক্তি ইমপ্লিমেন্ট করতে হবে, এবং তাতে বিরাট বাজেট বরাদ্দ করা হল… আর তার বহু বছর পর আজ আমরা এখানে।
“হ্যাঁ, লং টার্মে সমস্যা তো হবেই।” বললেন মিশন হেড, “কারণ, যদি প্রেশার ১%-ও কমে যায়, তাহলে আমাদের দেশের অর্থনীতির উপর তার বিরাট ইমপ্যাক্ট হতে পারে।” তিনি বলে চললেন, “আমাদের যা কার্বন এমিশন, মানে যতটা কার্বন আমরা সমুদ্রতলে পাঠাচ্ছি, তার ১% যদি তুমি ক্যালকুলেট করো, তাহলে দেখবে পার্থক্যটা বেশ অনেকটা। আর সেটাই মাথাব্যথার কারণ। আর কী কারণে যে এই ফ্লাকচুয়েশনটা হচ্ছে, আমরা কিছুতেই ধরতে পারছি না।”
এত বোঝানো যে আমার উপস্থিতির কারণেই, তা আর বলে দিতে হয় না। সে যাক গে।
“আচ্ছা, আপনাদের কী মনে হয়? মানে, কোনো ধারণা তৈরি করেছেন আপনারা যে, কীভাবে এটা ঘটতে পারে? কোনো সম্ভাব্য কারণ?” বললাম আমি।
“হ্যাঁ, আমরা ডেটা স্টাডি করে যা অনুমান করছি, কোনো মাইক্রো ওশ্যান কারেন্ট হতে পারে, বা টেকটনিক প্লেটের অ্যাকটিভিটিও হতে পারে—যার কারণে প্রেশার রিডিং-এ গোলমাল দেখা দিচ্ছে বা হয়তো সমুদ্রতলের সেডিমেন্ট প্যাটার্ন বা রাসায়নিক ধর্মেরও পরিবর্তন ঘটছে। বিভিন্ন ধরনের কারণ থাকতে পারে এর পিছনে। সেটা এখন না দেখে বলা যাচ্ছে না।” উত্তরটা এল পবিত্রর কাছ থেকে।
আমি কী বলব, বুঝে পেলাম না। আমি খালি ভাবছি, গভীর সমুদ্রের জলস্রোত কিংবা ভূগর্ভস্থ পাতের চলাফেরার জন্য প্রেশার রিডিং এরকমভাবে বদলাতে পারে কি না…। হতেই পারে, অস্বাভাবিক কিছু না যদিও। এসব টেকনিক্যাল ব্যাপারস্যাপার আমি আর কী বুঝি!
কিছু মুহূর্ত সব চুপ। তারপর—
“কী ব্যাপার, তুমি এত চুপচাপ যে?” সিটে পিছনের দিকে গা-টা সামান্য এলিয়ে দিয়ে আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে প্রশ্নটা করল পবিত্র।
“ভাবছি।”
“কী বিষয়ে?”
কিছু মুহূর্ত থমকালাম। তারপর বললাম, “এটাই যে মিশনটা কতটা বোরিং হতে চলেছে।”
হেসে উঠল পবিত্র, “হেহ্! কী যে বলো! এটা হল সব থেকে সেরা মিশন। এই গোটা পরিকাঠামোটা একটা ইঞ্জিনিয়ারিং মার্ভেল, বুঝলে কিনা? সেখানে, মানে, একদম সাইটে যেতে পারা তো ভাগ্যের ব্যাপার।”
এতক্ষণে আমার খেয়াল হল যে, তার কনসোল থেকে নজর সরিয়ে আড়চোখে পবিত্রর দিকে তাকিয়ে আছেন বিজয় শ্রীবাস্তব।
“আমি ঠিক জানি না। দেখা যাক।” কোনোমতে বললাম আমি।
আমার কথার উত্তরে একবার কাঁধ ঝাঁকিয়ে তার স্ক্রিনে ফিরে গেল সে। ইঞ্জিনিয়ারদের এই এক সমস্যা। তারা তাদের নিজেদের কাজের মধ্যেই থাকতে ভালোবাসে। বাকি দেশ-দুনিয়া সম্পর্কে তাদের বিশেষ মাথাব্যথা নেই।
“তিন হাজার মিটার।” জানায় সারথি।
বিজয় শ্রীবাস্তব বলে উঠলেন, “আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা সাইটে পৌঁছে যাব। ভিশুয়ালসের জন্য তৈরি থেকো।”
“কপি দ্যাট,” উত্তর দেয় বিবেক, “থ্রাস্টারস অ্যাডজাস্টিং।” বলার সঙ্গে সঙ্গেই সাবমেরিন সামনের দিকে সামান্য কাত হল। বুঝলাম যে গন্তব্য আর বেশি দূরে নেই।
আমি আর বসে থেকে কী করব! বরং আমার ট্যাবে এনভায়রনমেন্টাল ডেটাগুলোয় একবার চোখ বোলাতে শুরু করলাম—বেসলাইন কেমিস্ট্রি, পুরোনো ডেটা, অ্যাসিডিফিকেশন কার্ভ ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার সহকর্মীরা যা-ই মনে করুন-না কেন, আমি আগে এইসব ডেটা নিয়ে বিস্তর ঘাঁটাঘাঁটি করেছি। এবং সেটা সম্পূর্ণ পেশাগত কারণেই। কারণ, এই পরিকাঠামোর গভীর সমুদ্রের জীবজগতের উপর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে কি না, সেটাও আমার গবেষণার একটা অংশ। কিন্তু সেসব আর খোলসা করে বললাম না। বেকার কথা বাড়িয়ে কী লাভ! চুপচাপ বসে নিজের কাজটুকু করি বাবা! একে আমি ইঞ্জিনিয়ারিং ডোমেইনের না, তার মধ্যে আবার মেয়ে। তাই খুব একটা অপ্রত্যাশিত না ব্যাপারটা।
কিন্তু একটা বিষয় আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না যে, পাইপলাইনের প্রেশারটা নিজে থেকে অ্যাডজাস্ট হচ্ছে কী করে? যতদূর শুনেছি, এমন নয় যে গত দু-মাসে চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়নি। কিন্তু প্রতিবারেই একটা নির্দিষ্ট সীমায় গিয়ে চাপ থমকে গেছে। যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি একটা লিমিট সেট করে দিয়েছে ইনজেকশন প্রেশারের উপর।
“আচ্ছা, একটা কথা। এমনটাও তো হতে পারে যে, পাইপলাইনে কোনো লিকেজ সৃষ্টি হয়েছে, যেখান থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড বেরিয়ে সোজা জলে মিশে যাচ্ছে?” বললাম আমি।
পবিত্র একবার আমার দিকে তাকাল। তারপর কিছুটা ভেবে নিয়ে বলল, “মন্দ বলোনি। হতেই পারে। যদিও পাইপলাইনগুলো খুবই টেকসই উপাদান দিয়ে তৈরি, তাও কোনো কারণে ফ্র্যাকচার হয়ে যাওয়া অসম্ভব কিছু না। দেখা যাক, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা জানতে পেরে যাব।”
“ভিশুয়ালস ইন টেন সেকেন্ডস।”
সামনের আলো ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বুঝলাম, প্রতিফলিত হওয়ার মতো কোনো একটা বাধা তার সামনে এসে হাজির হয়েছে। একটু একটু করে সি-বেডটা আমাদের চোখের সামনে ফুটে উঠছে। তারপরেই চোখে পড়ল পাইপলাইনের আবছা অবয়ব। এবড়োখেবড়ো সমুদ্রতলের মধ্যে দিয়ে একটা সরলরেখা যেন চলে গিয়েছে এদিক থেকে ওদিকে। দেখে খুব সহজেই বলা যায় যে এই সরলরেখা এখানকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নয়। কিছু দূরে দূরেই জয়েন্টগুলো দেখে বোঝা যায়, সেখানে শিলার গভীরে ঢুকে গেছে পাইপের কিছু শাখা।
পাইপের কাছাকাছি গিয়ে সমুদ্রতলে ধীরে ধীরে থিতু হতে লাগল আমাদের সাবমেরিন।
“আমরা এসে গেছি।” বলল বিবেক।
কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায় যে এই পরিকাঠামো খুব নতুন নয়। নকশায় দেখে যেরকম ঝাঁ-চকচকে সুন্দর লাগে, এখান থেকে দেখে মনে হচ্ছে যেন খানিকটা বুড়িয়ে গেছে এইসব কিছু। সময়ের ঘষা লেগে শিলালিপি অবধি ক্ষয়ে যায়, সেখানে এরা তো সমুদ্রের এত গভীরে! জলের চাপ, রাসায়নিক বিক্রিয়া—সব মিলিয়ে পাইপের কিছু কিছু জায়গা যেন কালচে হয়ে গেছে। আর নীচের দিকে তার গায়ে জমা হয়েছে পলির বিক্ষিপ্ত প্রলেপ।
“কী বুঝছ?” আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে প্রশ্নটা করে পবিত্র।
“বোঝার আর কী আছে?” বললাম আমি, “বোঝা তো আপনাদের কাজ।”
মুচকি হেসে নিজের কনসোলে চোখ ফেরাল সে।
“নাও, এবার যন্ত্রপাতিগুলো কাজে লাগাও সারথি।” বললেন মি. শ্রীবাস্তব।
“ইয়েস, স্যার।” বলে অভ্যস্ত হাতে তার সামনের কনট্রোল প্যানেলের কয়েকটা বোতাম টিপে দিল সারথি। ভিউপোর্টে দেখতে পেলাম, কিছু রোবোটিক আর্ম বেরিয়ে এসেছে আমাদের ছোট্ট সাবটি থেকে। তারা এখন আশপাশে ডেটা সংগ্রহ করতে ব্যস্ত।
“প্রেশার কত এখন?” জিজ্ঞেস করলেন শ্রীবাস্তব।
“প্রায় সাড়ে তিনশো এটিএম, স্যার। অ্যারাউন্ড পাঁচ হাজার দেড়শো পিএসআই।” বলে বিবেক।
“আরে ধুত, ওই প্রেশার না। পাইপলাইনের ভেতর প্রেশার কত?”
“ওহ্, সরি স্যার।… পবিত্র?”
“হ্যাঁ, দাঁড়ান। ডেটা লোড হতে একটু সময় লাগছে।” বলল পবিত্র।
“হুমম্, দেখে বলো।”
“স্যার, ওই যেমনটা ছিল, তেমনই রয়েছে। ৮৪% ক্যাপাসিটিতে এসে প্রেশার আটকে রয়েছে, যেখানে হওয়ার কথা ৮৫.৩৫%।”
“হুমম্,” চিন্তিত শোনাচ্ছে মি. শ্রীবাস্তবকে, “আচ্ছা সারথি, ক্যামেরায় দ্যাখো তো, কোথাও কোনো লিকেজ খুঁজে পাচ্ছ কি না।”
“অন ইট”—রোবোটিক আর্মের সঙ্গে লাগানো ক্যামেরা ফিডগুলো ভেসে উঠল আমাদের সামনের একটা স্ক্রিনে। ভিউপোর্টের ঠিক উপরে।
আমি জানি না, কী আশা করছিলাম—হয়তো কোনো স্পষ্ট ফ্র্যাকচার লাইন, ভিজ়িব্ল ড্যামেজ, জলের বুদ্বুদ বা এমন কোনো কিছু, যার থেকে এই সমস্যার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু না। কোথাও কিচ্ছু নেই। সব কিছু ঠিকঠাক লাগছে। একটু বেশিই ঠিকঠাক।
“জলের pH লেভেলটা কত আছে, দ্যাখো তো।” বলে উঠলাম আমি।
সবার চোখ এখন আমার দিকে।
“ওটা দেখলে বোঝা যাবে যে, আদৌ কোনো লিকেজ রয়েছে কি না। কারণ, যদি লিকেজ থাকে, তাহলে এখানকার জল একটু বেশিই অ্যাসিডিক হবে।” বললাম আমি।
মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল বিবেক। তার সামনের ছোট্ট একটা স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে বলল, “৭.৬৭, ম্যাম।”
“আর বেসলাইন কত?”
“৭.৭৫।” উত্তর দেয় পবিত্র। কিছুটা অন্যমনস্ক শোনাচ্ছে তাকে।
“স্ট্রেঞ্জ! যদি কোনো লিকেজ না-ও হয়ে থাকে, তাহলেও তো pH লেভেলের থেকে অনেক কম হওয়ার কথা, তা-ই না?” আমার বিস্ময় লুকোতে পারলাম না আমি।
“হ্যাঁ,” উত্তর দেয় সে, “আমাদের গণনা অনুযায়ী এই কয়েক বছরে pH লেভেল নেমে হওয়ার কথা ৭.৫৭। কিন্তু এখানকার ডেটা তো অন্য কথা বলছে। আর সেটাই ভাবাচ্ছে আমাকে।” তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
“তার মানে দাঁড়াচ্ছে, এখানে আদৌ কোনো লিকেজ হয়নি। যদি হত তাহলে এই সংখ্যাটা ৭-এর নীচে চলে যেত হয়তো।”
“আচ্ছা বিবেক,” হঠাৎ বলে উঠল পবিত্র, “ওই ফ্ল্যাঞ্জটার কাছে একটু জ়ুম করো তো—ওই যেখানে পাইপটা মাটির নীচে চলে গেছে।” কোনো একটা সম্ভাবনা তার মাথায় উঁকি দিয়েছে।
একটা ক্যামেরা পাইপের কানেক্টরটার কাছে এগিয়ে গেল।
দেখে তো সব কিছু ঠিকঠাকই লাগছে। কোনো ক্র্যাক বা ফ্র্যাকচার তো চোখে পড়ছে না!
কিছু মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না। সবাই মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে স্ক্রিনে ফুটে-ওঠা ছবিটা। তারপর হঠাৎ—
“নিয়োগী,” বলে উঠলেন মি. শ্রীবাস্তব, “কিছু বুঝছ?” তাঁর মুখ থমথমে।
“কিছু বুঝতে পারছি না, স্যার।… এটা কী করে সম্ভব?” চিন্তিত স্বরে উত্তর দিল পবিত্র।
“ভাল্ভটা ঘুরল কীভাবে?! দেখছ? এটা ঠিকঠাক অ্যালাইনড নেই।”
“হ্যাঁ, স্যার। অ্যালাইনমেন্ট মার্কার থেকে স্পষ্টতই কিছুটা সরে গিয়েছে ভাল্ভের মুখ। এমনটা তো হওয়ার কথা নয়।”
এতক্ষণে আমারও নজরে এসেছে ব্যাপারটা। আমি এর আগে নিজের চোখে দেখিনি এইসব কলকবজা, তাই প্রথমে ধরতে পারিনি।
“টর্ক শিফট হতে পারে,” বলল পবিত্র, “প্রেশার সাইক্লিং…?”
“থার্মাল এক্সপ্যানশন?” বিবেকের মাথাতেও এখন কাজ করছে সম্ভাবনার পারমুটেশন-কম্বিনেশন।
“এই গভীরতায়?” মাথা নাড়ে পবিত্র, “উঁহুঁ, এখানে তাপমাত্রা বদলায় না।”
“আচ্ছা, এমনটা কি হতে পারে যে, কেউ ওটা ঘুরিয়েছে?” একটু ইতস্তত করার পর প্রশ্নটা করেই ফেললাম আমি। এমন একটা কিছু আমার চোখে পড়েছে, যেটা আমার মাথায় এই চিন্তাটাই চলছে বেশ কিছুক্ষণ ধরে।
তিনটে মাথাই ঘুরে গেল আমার দিকে। তাদের চোখে জিজ্ঞাসা, বিস্ময়, অবিশ্বাস।
“নীচের সেডিমেন্টটা লক্ষ করুন। স্বাভাবিক মনে হচ্ছে কি? দেখে মনে হচ্ছে না যে, এখানে কোনো কিছুর উপস্থিতি ছিল?”
“কী বলতে চাইছ? সমুদ্রের এত গভীরে এসে কেউ এটা ঘুরিয়ে দিয়ে গেছে?” প্রশ্নটা করলেন মি. শ্রীবাস্তব।
“সেটা তো ঠিক বলতে পারছি না, কিন্তু জয়েন্টের কাছে সেডিমেন্টটা দেখুন, কীরকম ক্ষয়ে গেছে। আর ব্যাপারটা প্রত্যেকটা জয়েন্টের ক্ষেত্রেই ঘটেছে।” খুবই সূক্ষ্ম পরিবর্তন, কিন্তু চোখে পড়লে অসম্ভব বলে মনে হয়।
“জলের স্রোত হয়তো।” ছবিগুলোর দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে বলল পবিত্র।
“হতে পারে,” বললাম আমি, “কিন্তু স্রোত কি এরকমভাবে নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় ক্ষয় করে? সেভাবে ক্ষয় হলে সেটা বেশ কিছু জায়গায় হত, তা-ই না? শুধু এই জয়েন্টগুলোর কাছে হত না নিশ্চয়ই?”
“হুমম্, খুব একটা ভুল বলোনি।” তার হাত এখন চিবুকে, চোখ দুটো কুঞ্চিত হয়ে আছে। “আমারও এখন দেখে মনে হচ্ছে, এগুলোকে কেউ বা কারা ঘুরিয়েছে।”
বিবেক প্রশ্ন করল, “এমনটাও তো হতে পারে যে এর আগের মেইনটেনেন্স টিম এটা ঘুরিয়ে গেছে?”
“উঁহুঁ,” মাথা নেড়ে বলে পবিত্র, “শেষ ছ-মাসে এখানে কোনো মেনটেনেন্স টিম আসেইনি। আর গোলমালটা শুরু হয়েছে দু-মাস আগে থেকে। আর বেশ কয়েকবার চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটা ৮৪%-এ এসে থেমে গেছে।”
নিজের আসনে এবার বেশ নড়েচড়ে বসলেন মি. শ্রীবাস্তব, “লগের সঙ্গে একবার ক্রস-চেক করে দ্যাখো তো।”
“করে দেখে নিয়েছি, স্যার। লগের ডেটায় কোনো ভুল নেই।”
কেবিনটা হঠাৎ যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কারও মুখে কোনো কথা নেই। সবাই চিন্তায় মগ্ন। এই বিষয়ে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই যে ভাল্ভগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ঘোরানো হয়েছে। কিন্তু কেন? কে করল এই কাজ?
“তার মানে তোমরা বলছ, কেউ এসেছিল এখানে?” নীরবতা ভাঙল বিবেক।
“আমি শুধু বলছি যে, এটা আমরা করিনি। আর দেখে মনে হচ্ছে না, এটা জলের স্রোতে বা চাপের কারণে হয়েছে।” একটু ভেবে উত্তর দেয় পবিত্র।
“কিন্তু প্রশ্ন হল, এটা কার কাজ?” শ্রীবাস্তবের মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট, “শত্রু দেশের কারসাজি নয় তো?”
“শত্রু দেশ? মানে—”
“হ্যাঁ, ভেবে দ্যাখো। যেমনটা আগেই বললাম, আমাদের দেশের ইনজেকশন এফিশিয়েন্সি যদি ১%-ও কমে যায়, তাতে ন্যাশনাল কার্বন অ্যাকাউন্টিং-এ বিরাট পরিবর্তন আসবে। তার প্রভাব পড়বে বৈদেশিক বাণিজ্যে। কার্বন ট্যারিফ বাড়বে। সব মিলিয়ে ক্ষতি হবে অর্থনীতির।” গম্ভীর মুখে বলে চললেন মি. বিজয় শ্রীবাস্তব।
“তার মানে, কেউ যদি আমাদের ভাল্ভ নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করতে পারে, তাহলে আমাদের কার্বন ফুটপ্রিন্ট বাড়বে, আর টান পড়বে আমাদের ফরেইন রিজ়ার্ভে।… আর তাতে লাভবান হবে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ। রাইট?” বলে পবিত্র।
“একদমই তা-ই। আর যদি এটাই হয়ে থাকে, তাহলে ব্যাপারটা বেশ সিরিয়াস।”
“হুমম্। ব্রিলিয়ান্ট।”
ইঞ্জিনিয়ার মশাইয়ের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে প্রভূত জ্ঞান দেখে অবাক হলাম বটে। দেখে মনে হয়নি, ও দেশ-দুনিয়ার খবর রাখে বলে।
ভিউপোর্টের দিকে চোখ ফিরিয়ে বিবেক বলল, “তার মানে আপনাদের ধারণা, কোনো শত্রু দেশ এই ৩৫০০ মিটার গভীরতায় ডুবুরি পাঠাচ্ছে আমাদের ইনজেকশন রেট কমানোর জন্য?”
“না, ঠিক সেটা না।” উত্তর দিলেন শ্রীবাস্তব, “হয়তো ডুবুরির বদলে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র পাঠাল বা এরকম ছোট্ট সাবমেরিন। অনেকভাবেই এটা করা সম্ভব, বুঝলে? আর ডুবুরির সম্ভাবনাটাও নেহাত উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”
“যদি এটা শত্রু দেশের কাজ হয়ে থাকে, তবে এরকম প্রেশার রেগুলেট করার থেকে পাইপলাইনটার ক্ষতি করা বেশি সুবিধাজনক হত না কি?” সযত্নে শব্দ চয়ন করে বলেই ফেললাম আমি, “করার হলে তো অনেক কিছুই করা যায়। ধরুন, হয়তো পাইপলাইনটা ধ্বংসই করে দিল বা জ্যাম করে দিল, যাতে পুরো পরিকাঠামোটা বিকল হয়ে যায়।”
“হুমম্,” সম্মতিসূচকভাবে মাথা নেড়ে বলল পবিত্র, “এত কাঠখড় পুড়িয়ে শেষে ১% চাপ কমাবে? এর চেয়ে বেশিও তো কমানো যেত।”
“যদি না ১%-ই যথেষ্ট হয়ে থাকে।” গম্ভীর মুখে বললেন শ্রীবাস্তব, “ধরো, তারা হয়তো বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায় না। আফটার অল, ভুলে গেলে চলবে না, আমরা নিউক্লিয়ার পাওয়ার। কোনো দেশই ওইভাবে আমাদের পিছনে লাগতে সাহস পাবে না। একবার যদি প্রমাণ হয়, এর পিছনে ওদের হাত রয়েছে, তাহলে ব্যাপারটা কী হবে, বুঝতেই পারছ। যুদ্ধ লেগে যেতে পারে।”
কিছু মুহূর্ত সবাই চুপ।
“তাহলে এখন আমাদের কী করণীয়?” প্রশ্ন করল বিবেক।
“গোটা পাইপলাইনটা একবার ঘুরে দেখব, ভিশুয়াল ডেটা সংগ্রহ করব, তারপরে ফিরে যাব। ট্যাম্পারিং-এর যাবতীয় প্রমাণ আমাদের নিয়ে ফিরতে হবে। গট ইট?”
“ইয়েস, স্যার।”
তার সামনের কলকবজার দিকে ফিরে কিছু একটা করতে যাচ্ছিল বিবেক। তাকে থামিয়ে দিয়ে পবিত্র বলে উঠল, “ইয়ে, বলছিলাম যে,” কিছুটা ইতস্তত করল সে, তারপর বলল, “একবার চাপ বাড়িয়ে দেখলে হয় না?”
“মানে?” সপ্রশ্ন চোখে তাকালেন শ্রীবাস্তব।
“মানে, যদি আমরা ইনজেকশন রেট একটু বাড়াই, এবং তারপর ঘুরে দেখা শুরু করি… যদি কোনো লিকেজ হয়ে থাকে, সেটাও দেখা যাবে। যদি কোনো মেকানিক্যাল সমস্যা হয়ে থাকে, সেটাও বুঝতে পারব।”
“ম্যানুয়াল ওভাররাইড?” প্রশ্ন করে বিবেক।
“হ্যাঁ, লোকাল কনট্রোল। চাইলে মেকানিক্যাল আর্ম ব্যবহার করে আমরা পাইপলাইনে চাপ বাড়াতে পারি। সেটুকু অনুমোদন আমাদের আছে।”
কী যেন একটা ভেবে মাথা নাড়লেন মি. শ্রীবাস্তব, “হুমম্, ঠিক আছে, করো। ২%। কিন্তু বিশেষ লাভ কিছু হবে বলে মনে হচ্ছে না।”
“ওকে, স্যার,” পবিত্রর আঙুলগুলো তার ছোট্ট কনসোলের উপর ঘোরাফেরা করল খানিকক্ষণ, “হয়ে গেছে।”
সামনের স্ক্রিনে দেখতে পাচ্ছি, চাপ বাড়ছে ধীরে ধীরে।
৮৪.৫, ৮৫, ৮৫.৫, ৮৬…
“ব্যাস, ব্যাস, এবার থামিয়ে দাও।” বললেন শ্রীবাস্তব।
তারপর সব চুপ। কতক্ষণ এরকম চলল, বলতে পারব না। সবার চোখ স্ক্রিনের ছবিগুলোতে। যেন খুঁজে নিতে চাইছে কোনো সূক্ষ্ম পরিবর্তন, কিছু একটা, যেটা খুব সহজ কোনো ব্যাখ্যা তুলে ধরবে আমাদের সামনে। কিন্তু—
“ওটা কী?” একটা ভিডিয়ো ফিডের দিকে আঙুল দেখিয়ে আচমকা বলে ওঠে বিবেক। তার কণ্ঠস্বরে মিশে রয়েছে বিস্ময়, অবিশ্বাস… আর ভয়।
এতক্ষণে ব্যাপারটা আমারও চোখে পড়েছে। একটা জয়েন্টের কাছে কী যেন একটা নড়ে উঠল। খুব সূক্ষ্ম একটা চলাফেরার আভাস যেন পাওয়া যাচ্ছে।
একটা ভাল্ভের কাছে কিছু যেন একটা নড়ছে, এতদূর থেকে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
“এই, ওখানটায় একটু জ়ুম করো তো।” বলল পবিত্র।
“হুমম্।”
দেখলাম, একটা আবছা অবয়ব বেরিয়ে এল জয়েন্টের পিছন থেকে। যা দেখছি, তা কি সত্যি? নাকি—
ধীরে ধীরে অবয়বটা হালকা প্রসারিত হল। এখনও ঠিক বোঝা যাচ্ছে না এটা কী। যেন এখানকার শিলাস্তরের সঙ্গে মিশে রয়েছে অবয়বটা।
অবয়বের কিছুটা অংশ লম্বা হয়ে বেরিয়ে এল, আর জড়িয়ে ধরল জয়েন্টটাকে।
আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়।
পবিত্র ফিশফিশ করে বলল, “দেখছ?”
কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, “হ্যাঁ।”
আরেকটা অংশ বেরিয়ে এল ঠিক তার পাশ দিয়ে। লম্বা, মোটা জিনিসটা একপ্রান্তে যেন খানিকটা সরু হয়ে গেছে। সেই প্রান্তটা দিয়েই সে ধীরে ধীরে চেপে ধরল ভাল্ভটাকে। আর—
“অবিশ্বাস্য!” বলে ওঠে পবিত্র। তার কনসোলের দিকে তাকায় সে, “প্রেশার কমছে।”
“বায়োলজিক্যাল ইনটারভেনশন?!” এতক্ষণে মৌন ভাঙলেন মিশন হেড। স্পষ্টতই তিনিও বিস্মিত। তাঁর চোখ ছানাবড়ার মতো গোল-গোল হয়ে গেছে। “বায়োলজি… ইয়ে, মানে, পল্লবী… বুঝতে পারছ কিছু? কী এটা?”
কী বলি এখন আমি? একটা ক্ষীণ সম্ভাবনার কথা মাথায় ঘুরছে, কিন্তু সেটা খুব বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না। সেটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে বললাম, “আজ্ঞে, ঠিক বুঝতে পারছি না, স্যার।”
কেউ কোনো কথা বলছে না। সবার চোখ ওই অজানা অবয়বের কার্যকলাপের দিকে।
দেখতে দেখতে অন্ধকার থেকে আরও কিছু অবয়ব এসে হাজির হল। সবাই মিলে ঘিরে ধরেছে ভাল্ভটাকে।
৮৫.৫, ৮৫, ৮৪.৫, ৮৪… তারপর থেমে গেল কমতে-থাকা প্রেশার রিডিং।
অস্ফুটস্বরে বলে উঠল পবিত্র, “সেই ৮৪%।”
“হোয়াদ্দা—” বিস্ময় লুকোতে পারছে না বিবেক সারথি।
বিজয় শ্রীবাস্তব চুপ। একদৃষ্টে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি। তাঁর চোয়াল শক্ত।
সব ক-টা ভিডিয়ো ফুটেজ ঘেঁটে দেখা গেল, অন্তত চারটে জয়েন্টে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। হয়তো আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে তার থেকেও বেশি।
পাইপলাইনের চাপ এক জায়গায় থিতু হতেই কিছু অবয়ব সরে যেতে লাগল পাইপ থেকে, মিলিয়ে যেতে লাগল গাঢ় অন্ধকারে। আর কিছু অবয়ব আগের মতোই পাইপের সঙ্গে লেগে থাকল। আমাদের উপস্থিতি তাদেরকে এতটুকুও বিব্রত করছে না।
“একটা ব্যাপার লক্ষ করে দেখেছ?” স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই বলল পবিত্র, “ওরা কিন্তু কোনো কিছুর ক্ষতি করছে না।”
“হুমম্।” আমার মাথায় এতক্ষণ ধরে ভিড় করে ছিল সম্ভাব্য ব্যাখ্যাদের দল। মনে হল, ধীরে ধীরে সেই ভিড় যেন পাতলা হয়ে যাচ্ছে। সেই ভিড়ের মধ্যে আসল জনকে মনে হয়, চিনতে পারছি। কিছু একটা বুঝতে পারছি।
ঠিক। ওরা কিছুর ক্ষতি করছে না। ওরা—
“ওরা হয়তো ক্ষতি রোধ করছে?”
আবার তিনটে মাথা আমার দিকে ঘুরে গেছে।
“ঠিক কী বলতে চাইছ, বলো তো?” প্রশ্ন করলেন শ্রীবাস্তব।
“এটাই বলছি যে, এরা যে-ই হোক-না কেন, এরা এখানকার পরিবেশের ভারসাম্যকে রক্ষা করছে বলে মনে হচ্ছে। একটা বিষয় স্পষ্ট যে এরা ভায়োলেন্ট নয়, এরা আমাদের শত্রু নয়। এরা আমাদের ক্ষতি করতে চাইছে না। এরা আমাদের পরিকাঠামোটাকে ভেঙেও ফেলতে চাইছে না। এরা শুধু সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করে এই পরিবেশটাকে বাঁচাতে চাইছে হয়তো।”
“কী ভুলভাল বকছ? তোমার মনে হয়, ওদের মাথায় এত বুদ্ধি যে ওরা এইভাবে পরিবেশ রক্ষা করবে?” শ্রীবাস্তবের গলায় এখন মিশে রয়েছে রাগ আর ভর্ৎসনা। “আর কে বলল, আমরা ওদের পরিবেশের ক্ষতি করছি? আমরা কি অন্যসব দেশের মতো সোজা জলে কার্বন মেশাচ্ছি? কার্বন তো যাচ্ছে সমুদ্রতলের নীচের শিলায়। এইসব গাঁজাখুরি ব্যাখ্যা কিন্তু উপরমহল মোটেই ভালো চোখে দেখবে না।”
জানতাম, ঠিক এটাই হবে। তাই তো এতক্ষণ ধরে চুপ করে আছি। যা দেখছি, যা মনে হচ্ছে, তা আমার নিজের কি খুব বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হচ্ছে? কিন্তু আমরা তো ভুল দেখিনি। চারটে মানুষ তো একসঙ্গে ভুল দেখতে পারে না। ভিডিয়ো পর্যন্ত উঠেছে ব্যাপারটার।
অনেক সাহস সঞ্চয় করে বললাম, “কিন্তু স্যার, এ ছাড়া আর কী ব্যাখ্যা হবে, বলুন? এ ছাড়া আর কোনো কারণ তো দেখা যাচ্ছে না। আর এমন নয় যে শুধু আমাদের কথায় ওদের বিশ্বাস করতে হবে। আমাদের কাছে ভিডিয়ো প্রুফ আছে।”
“সে আছে, কিন্তু তুমি যা বলছ, সেটা কেবলমাত্র অনুমান।” গজগজ করতে শুরু করলেন মি. শ্রীবাস্তব, “তা ছাড়া তুমি এখনও বলতে পারোনি যে এটা কী ধরনের প্রাণী।”
“আমার মাথায় একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, কিন্তু ঠিক নিশ্চিতভাবে বলার সাহস পাচ্ছি না। একটু ভাবতে হবে আমায় যে এটা আদৌ সম্ভব কি না।”
“যে প্রাণীই হোক-না কেন, এখন আমাদের কর্তব্য ওদেরকে এখান থেকে সরানো। ইনফ্রাস্ট্রাকচারটা আমাদের দেশের জন্য খুব সেন্সিটিভ। একদল আনআইডেন্টিফায়েড প্রাণী অনুমোদনের বাইরে গিয়ে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। হয়তো ভবিষ্যতে এটার ক্ষতিও করবে। আর এর কোনো ক্ষতি হোক, সেটা আমরা কেউই চাই না।”
আঁতকে উঠলাম আমি। কী বলছে কী এই লোকটা? এঁর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?
“না!! কী বলছেন আপনি?!” আমার অজান্তেই চিৎকার করে উঠলাম আমি, “এটা ওদের বাড়ি, স্যার। ওরা এখানেই থাকে। আর অনুমোদনের কথা বলছেন? ওদের বাসস্থানে এসে বিষবাষ্পের পাইপ লাগানোর সময়ে আমরা অনুমোদন নিয়েছিলাম?”
এক মুহূর্ত সব চুপ। তারপর—
“পল্লবী ঠিক কথাই বলেছে, স্যার,” আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে ওঠে পবিত্র, “ওদেরকে বিরক্ত করা ঠিক হবে না। আফটার অল, এটা ওদেরই প্রাকৃতিক বাসভূমি। এখানে আমরা জোর খাটাতে পারি না।”
আমি তাকালাম তার দিকে। এই মানুষটাকে আজ শুরু থেকেই ভুল ভেবে এসেছি আমি। মনুষ্যত্ব তার মানে আজও মরে যায়নি!
“কী বলছ পবিত্র? ওরা আমাদের পরিকাঠামোর ক্রিটিক্যাল কম্পোনেন্টের সঙ্গে ইনটার্যাক্ট করছে। তুমি বলছ, আমরা এটা হতে দেব?” শ্রীবাস্তবের কণ্ঠে এখন বিস্ময়। তাঁর পদমর্যাদা ভুলে তাঁর বিরুদ্ধে যে কেউ কথা বলবে, এটা হয়তো তিনি ভাবতে পারেননি।
“হ্যাঁ, স্যার। আমরা চাইলেই এক্ষুনি শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে ওদেরকে ওখান থেকে সরিয়ে দিতে পারি। কিন্তু আমার ধারণা, সেটা করাটা খুব বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।”
কিছুটা থামল সে। তারপর বলল, “আমাদের পরিকাঠামো কার্বন ট্র্যাপ করার অন্যান্য পদ্ধতির তুলনায় অনেকটাই সেফ, কিন্তু একদম কোনো ক্ষতি যে করে না, সেটা বললে ভুল হবে। দীর্ঘদিন ধরে যদি এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে, একটা সময়ে গিয়ে ওই শিলা সংলগ্ন সমুদ্রের জলের অ্যাসিডিটি কিঞ্চিৎ বৃদ্ধি পেতে পারে। এবং সেটা আমরা আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং মডেলে গণনাও করে রেখেছিলাম। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, কোনো এক অজানা প্রাণীর হস্তক্ষেপের কারণে এই অঞ্চলের অ্যাসিডিটি ততটা বাড়েনি, যতটা বাড়ার কথা।
“হয়তো পরিবেশের সহ্যক্ষমতারও একটা আপার লিমিট থাকে, স্যার, যেটা আমাদের গণনা-করা লিমিটের থেকে আলাদা হতেই পারে। আর এইজন্যই পল্লবীর মতো মেরিন বায়োলজিস্টদেরকে আমাদের সঙ্গে পাঠানোর নিয়ম হয়েছে।” আমার দিকে তাকায় পবিত্র, “আমাদের প্রযুক্তি গভীর জলের ইকোসিস্টেমকে কোনোভাবে প্রভাবিত করছে কি না, সেটা দেখাও আমাদের কর্তব্য। তাই এখানে ঠিক কী ঘটছে, তা না বুঝে কোনো অ্যাকশন নেওয়া ঠিক হবে না।”
মি. শ্রীবাস্তব কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময়ে পাইলটের সামনের কনট্রোল প্যানেলে একটা লালবাতি জ্বলে উঠল। আর বাজতে শুরু করল একটা অ্যালার্ম।
“স্যার, আমাদের লাইফ সাপোর্ট কিন্তু আর বেশি নেই,” শ্রীবাস্তবের দিকে ফিরে বলে ওঠে বিবেক, “এখানে বেশিক্ষণ থাকলে কিন্তু পরে সমস্যা হতে পারে।”
“হুমম্।” অল্প ভেবে নিয়ে গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন শ্রীবাস্তব। তাঁর মুখ থমথমে। তিনি ভেবে চলেছেন কিছু একটা। হয়তো পবিত্রর কথাগুলোই তাঁকে ভাবাচ্ছে। “অ্যাসেন্ট শুরু করো। এবারে ফেরা যাক। যা দেখার, আমরা দেখে নিয়েছি।”
“ওকে, স্যার।” সাবমেরিনের কনট্রোল আবার হাতে তুলে নিল বিবেক সারথি। বোতামে খুটখাট করে সাবমেরিনটাকে নিয়ে ফিরে চলল আমাদের বাসভূমির দিকে।
বেশ খানিকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। ছোট্ট কেবিনটায় বিরাজ করছে নিস্তব্ধতা। বোধহয় গত এক ঘণ্টার অভিজ্ঞতা সবাইকেই অস্থির করে তুলেছে। সবাই চিন্তায় মগ্ন। যা দেখে এলাম, তার ব্যাখ্যা দেব কীভাবে?
“আচ্ছা পল্লবী,” নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে ওঠে পবিত্র, “ওটা কোন প্রাণী ছিল, কিছু আন্দাজ করতে পারলে?… বলছিলে যে একটু ভাবা দরকার। ভেবে পেলে কিছু?”
“হ্যাঁ,” উত্তর দিলাম আমি, “কিছুটা অনুমান করতে পারছি।”
“কী সেটা, যদি একটু বলো…। ফিরতে তো এখনও খানিকটা সময় রয়েছে। ব্যাপারটা নিয়ে একটু আলোচনা হয়ে যাওয়া দরকার। কারণ, আমাদেরকে রিপোর্ট জমা দিতে হবে।” শ্রীবাস্তবের দিকে একবার তাকিয়ে বলল সে।
“ওই ধরনের বিহেভিয়ার আমি আগে দেখেছি।” বললাম আমি।
সবার মনোযোগ এখন আমার দিকে।
“কীরকম?” প্রশ্ন করে বিবেক।
“তুমি যন্ত্রটা চালানোয় মন দাও।” বলে ওঠেন শ্রীবাস্তব। ভদ্রলোকের মুড এখনও খিঁচড়ে রয়েছে, দেখছি।
তারপর আমার উদ্দেশে বললেন, “কী বলছ, একটু পরিষ্কার করে বলো তো। ব্যাপারটা ভালো করে বোঝা দরকার আমাদের।”
“হ্যাঁ স্যার, নিশ্চয়ই।” বলে আমি বলতে শুরু করলাম, “যেসব অঞ্চলে সমুদ্রের গভীরতা এতটা বেশি নয়, সেখানে কিছু প্রজাতির সেফালোপডদের মধ্যে এই ধরনের ব্যবহার দেখা যায়।”
“সেফালোপ—” বলে ওঠে পবিত্র, “মানে অ—”
“হ্যাঁ,” তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বললাম আমি, “অক্টোপাস।… ওরা কিন্তু প্রচণ্ড বুদ্ধিমান হয়। ওদের মধ্যে অত্যাশ্চর্য বুদ্ধিমত্তার নিদর্শন আমরা ইতিমধ্যেই পেয়েছি। ওদের আটটা বাহুর মধ্যে ছড়িয়ে থাকে অসংখ্য ছোটো ছোটো নিউরন, এবং ওদের প্রত্যেকটা বাহু মস্তিষ্কের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরেও স্বাধীনভাবে ভাবতে পারে, কাজ করতে পারে। বলা হয়, ওদের প্রত্যেকটা বাহুতে একটা করে পৃথক মস্তিষ্ক থাকে।”
খানিকটা থামলাম আমি। তারপর আমার ট্যাব থেকে একটা ভিডিয়ো বার করে ওদের সামনে চালিয়ে ধরলাম। তাতে দেখাচ্ছে, কীভাবে একটা কৌটোয় বন্দি অক্টোপাস বেরিয়ে আসছে কৌটোর প্যাঁচ খুলে। তারপর দেখাচ্ছে, কীভাবে তারা একটা ঝিনুক ব্যবহার করে তৈরি করে নিচ্ছে বাসস্থান বা শিকার ধরার ফাঁদ।
“অক্টোপাসের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে আমরা উন্নত পর্যায়ের প্রবলেম সল্ভিং, যন্ত্রপাতির ব্যবহার, ক্যামোফ্লাজিং, এমনকি স্মৃতিশক্তির প্রমাণ পেয়েছি। অনেকে দাবি করেন যে, মানুষের পর যদি আর কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী এই পৃথিবীতে উন্নত সভ্যতা গড়ে তোলার সামর্থ্য রাখে, তা হল এই অক্টোপাস।” বলে থামলাম আমি।
খানিকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। তারপর খানিকটা ভেবে পবিত্র বলল, “কিন্তু পল্লবী…”
আমি তাকালাম তার দিকে, “হ্যাঁ, বলো।”
“তুমি যেগুলো বললে, সেগুলো তো অগভীর জলের প্রজাতিদের মধ্যে দেখা যায়, তা-ই না? যেমন—কমন রিফ অক্টোপাস, ডে অক্টোপাস, মিমিক অক্টোপাস বা এমনকি প্যাসিফিক অক্টোপাস—এরা সবাই তো শ্যালো ওয়াটারে থাকে। অত গভীর জলের প্রজাতিরা কি এত বুদ্ধিমান হয়?”
আমি বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে।
“কী? আরে বাবা, এত অবাক হচ্ছ কেন? মাঝে মাঝে ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিক আমিও দেখি।” তার ঠোঁটে খেলা করছে একটা মুচকি হাসি।
“ঠিক বলেছ,” মুচকি হেসে উত্তর দিলাম আমি, “অত বেশি গভীরতার অক্টোপাসদের মধ্যে আমরা সেই স্তরের বুদ্ধিমত্তা এখনও পর্যন্ত দেখতে পাইনি, এ কথা ঠিক। আমাদের ধারণা, তারা তুলনামূলকভাবে একটু কম বুদ্ধিমান। কিন্তু এখানে এটাও দেখতে হবে যে, আমরা ‘বুদ্ধিমত্তা’-কে বিচার করছি আমাদের মানুষী ধারণা দিয়ে। আমরা মনে করি, জার খুলতে পারা, পাজ়্ল সল্ভ করা, গোলকধাঁধায় পথ খুঁজে বের করা বা রং বদলানো—এগুলোই কেবলমাত্র বুদ্ধিমত্তার নিদর্শন। হতেও তো পারে যে, কিছু বুদ্ধিমত্তা এইভাবে বিচার করা যায় না?”
“যেমন?”
“মানে ধরো, আমরা এতদিনে যতটা দেখেছি এবং জানতে পেরেছি, তার ভিত্তিতে আমরা এটা বলতেই পারি যে, গভীর জলের অক্টোপাসদের মধ্যে সেই স্তরের বুদ্ধিমত্তা দেখা যায়নি, যেমনটা তাদের শ্যালো-ওয়াটার আত্মীয়দের মধ্যে দেখতে পেয়েছি। কিন্তু এটাও তো দেখতে হবে যে, অত গভীর জলে বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করার খুব একটা সুযোগও কিন্তু নেই।” আমি বলতে থাকলাম, “ওদের মধ্যে এখনও সেইরকম বুদ্ধিমত্তা দেখা যায়নি মানে এটা কিন্তু কখনোই নয় যে ওদের মধ্যে সেই সামর্থ্য নেই। তার মানে এই নয় যে ওরা বুঝতে পারে না, শিখতে পারে না বা পরিবর্তনশীল পরিবেশের মধ্যে অ্যাডাপ্ট করতে পারে না।
“আসলে কী বলো তো, আমরা যতই মনে করি-না কেন যে, আমরা ওদের পরিবেশের তেমন কোনো ক্ষতি করছি না, আসলে কিন্তু ব্যাপারটা অতটা সহজ নয়। পরিবেশের খুব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিবর্তনও কিন্তু গভীর জলের প্রজাতিরা বুঝতে পারে। ওদের সেই ক্ষমতা আছে। যখন আমরা দীর্ঘ সময় ধরে ওদের বাসস্থানের নীচ দিয়ে কার্বন ডাইঅক্সাইড পাঠাচ্ছি, আমরা কিন্তু শুধু সেই অঞ্চলের অম্লতা বৃদ্ধি করছি না—বরং রাসায়নিক ধর্মের পরিবর্তন ঘটাচ্ছি, জলের স্রোতে পরিবর্তন ঘটাচ্ছি, পলির স্তরের স্থিতিশীলতাকে বিঘ্নিত করছি। যখন পাইপের মধ্যে কার্বনের চাপ বাড়ে, তখন সেটা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে একটা মৃদু কম্পনের সৃষ্টি করে। ওরা সেটা বুঝতে পারে। আর সেটা বুঝতে পেরেই হয়তো সেটা নিয়ন্ত্রণ করার উপায় তারা খুঁজে নিয়েছে ধীরে ধীরে?” এতটা বলে থামলাম আমি।
“সারভাইভাল ইনস্টিংট,” অস্ফুটস্বরে বলে পবিত্র, “ইনটারেস্টিং!”
“হ্যাঁ, আমার তা-ই ধারণা। এবার বাকিটা গবেষণা না করে বলা যাচ্ছে না।”
“তাহলে এবার আমাদের কী কর্তব্য, স্যার?” পিছনদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে প্রশ্ন করে বিবেক সারথি।
মি. বিজয় শ্রীবাস্তব এতক্ষণ ধরে মন দিয়ে সব শুনছিলেন। গত কয়েক মিনিটে তিনি কোনো কথা বলেননি। হয়তো ভাবছিলেন, এর পরের পদক্ষেপ কী হবে, ডাঙায় ফিরে কর্তৃপক্ষকে রিপোর্টে কী জবাব দেবেন। মৌন ভেঙে তিনি বললেন, “রিপোর্টে আমরা যা দেখেছি, তা-ই লিখব। ভিডিয়ো ফুটেজ আমাদের সঙ্গে আছে, তাই বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না, আশা করছি। মিশনে থাকা বায়োলজিস্টের কী মতামত, সেটাও বিস্তারিত জানাব রিপোর্টে। যতক্ষণ না এদের নিয়ে ডিটেইলে স্টাডি করা যাচ্ছে, ততক্ষণ কিছু জানা যাবে না।”
একটা প্রশান্তির হাসি খেলে গেল আমার মুখে। একটা কী বিশাল চাপ থেকে যেন মুক্ত হলাম।
পবিত্রর দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার মুখেও হাসি। লজ্জায় চোখ নীচু করলাম আমি। ছেলেটার সম্পর্কে কী ভুলই-না ভেবেছিলাম আমি শুরুতে! মানুষ আজও প্রকৃতির কথা ভাবে, জীবজগতের কথা ভাবে!
ওই দূরে আলো দেখা যাচ্ছে। কৃত্রিম না, প্রাকৃতিক আলো—সূর্যের আলো। আলোর দেশ আর বেশি দূরে নেই।
তমসো মা জ্যোতির্গময়!
Tags: একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা, প্রতীক বসু
