এক অভূতপূর্ব ভৌত কিংবা ভৌতিক অভিযান
লেখক: এডওয়ার্ড পেজ মিচেল, অনুবাদ: রুদ্র দেব বর্মন
শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব
(মূল গল্প: An Uncommon Sort Of Spectre by Edward Page Mitchell)
এডওয়ার্ড পেজ মিচেল (জন্ম: ১৮৫২—মৃত্যু: ১৯২৭)-এর ১৮৭৯ সালে লেখা এই গল্প এক অভূতপূর্ব অভিযানের কাহিনি। তবে সেই অভিযান কোনো দুর্গম পর্বতশীর্ষে, মহাসমুদ্রের অতল গভীরে বা মহাকাশের অজানা প্রান্তের অভিযান নয়, এই অভিযানে যাত্রা চতুর্থ মাত্রায়। পাঠক বিচার করবেন সেই অভিযান ভৌত না ভৌতিক।
তবে এই গল্পের পেছনেও আছে আরেক অভিযানের—না, গল্প নয়—ইতিহাস। সেই অভিযানও কিছু কম রোমাঞ্চকর ছিল না! সেই অভিযানের নায়ক ছিলেন কল্পবিজ্ঞান ময়দানের প্রথিতযশা লেখক, সম্পাদক এবং গবেষক স্যাম মস্কোভিটজ (জন্ম: ৩০ জুন, ১৯২০—মৃত্যু: ১৫ এপ্রিল, ১৯৯৭)। তাঁর সেই অভিযানও কিন্তু ছিল চতুর্থ মাত্রায়। আর্কাইভ থেকে অতীত ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে তিনিই উদ্ধার করে আনেন কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের হারিয়ে-যাওয়া বেশ কিছু মণিমুক্তো আর তাদের প্রকৃত মণিকারকে।
এডওয়ার্ড পেজ মিচেল ছিলেন সংবাদপত্রজগতের মানুষ। পেশাগত জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি কাটিয়েছেন সংবাদপত্রের জগতে। ১৮৯৭ থেকে ১৯২৭ সালে মৃত্যু পর্যন্ত তিনিই ছিলেন ‘নিউ ইয়র্ক সান’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক। মানুষ তাঁকে সংবাদপত্রের লোক হিসেবেই জানত। সাহিত্যের আঙিনায় তাঁর পদচারণা অথবা জঁর ফিকশন—আর বিশেষ করে তার মধ্যে কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের ময়দানে তাঁর লেখালেখির সংখ্যা খুব বেশি না হলেও যথেষ্ট। কিন্তু বেশির ভাগই তিনি লিখেছিলেন বেনামে। মানুষ তাই জানতে পারেনি। সমকালের পাঠকসমাজে সেইসব লেখা উপযুক্ত সমাদর পায়নি। অবশেষে সেগুলো সমাদৃত হল তাঁর মৃত্যুর ৪৬ বছর পরে ১৯৭৩ সালে, যখন স্যাম মস্কোভিটজের গবেষণা সেই লেখাগুলো পুনরাবিষ্কার করল—প্রকাশিত হল ‘দ্য ক্রিস্টাল ম্যান: ল্যান্ডমার্ক সায়েন্স ফিকশন’ নামের সংকলন। এই সংকলনেই ‘দ্য ক্লক দ্যাট ওয়েন্ট ব্যাকওয়ার্ড’—আধুনিক কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের প্রথম সময়ভ্রমণের গল্পের সঙ্গেই আছে ‘অ্যান আনকমন সর্ট স্পেকট্রা’। বেনামে প্রকাশিত এই গল্পটি লেখা আর তার প্রথম প্রকাশ হয় নিউ ইয়র্কের ‘দ্য সান’ পত্রিকার ১৮৭৯ সালের ৩০ মার্চের সংস্করণে।
সবাই জানে ওয়েইনস্টাইন (*১) নামের এই প্রাচীন দুর্গটি অবস্থিত রাইন নদীর উচ্চ অববাহিকার দুর্গম একপ্রান্তে। তেমনি এটাও সবাই জানে যে, ১৩৫২ সালের শরৎকালে সেখানেই বসবাস করতেন পরাক্রমশালী ব্যারন কালবসব্রেটেন। ওই দিগরের গোটা এলাকায় তিনি অবশ্য বিশ-বোতলি বুড়ো নামেই অধিক পরিচিত। আর এই বিশেষ ডাকনামটা তিনি অর্জন করেছিলেন যে, বিপুল পরিমাণ দ্রাক্ষাজাত পানীয় তিনি অনায়াসে দৈনিক হজম করে থাকেন, তাঁর সেই অভাবনীয় ক্ষমতার সুবাদে। অবশ্য সেটা ছাড়াও স্মৃতির মণিকোঠায় তুলে রাখার মতো আরও নানান গুণ কিন্তু ব্যারন কালবসব্রেটেনের ছিল। একদিকে তিনি ছিলেন একজন অতীব অমায়িক, হৃদয়বান, জনচিত্তে তুমুল আলোড়ন-উদ্রেককারী ভদ্রলোক, অন্যদিকে সদাশয়-হাস্যমুখে তিনি ইচ্ছেমতো লুটপাট করে থাকেন প্রতিবেশীদের গোরু-ভেড়া থেকে শুরু করে তাদের মা-বোনেদের। কেউ প্রতিবাদ করলেই তিনি তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে তো দেনই, তারপরেও তাদের তাড়িয়ে নিয়ে যান ওয়েইনস্টাইনের খাড়া পাহাড়ের দিকে, যাতে খাদে পড়ে মারা যায় তারা—আর এই সব কিছুই তিনি করে থাকেন নির্ভেজাল হাসিমুখে। ফলে তাঁর সমসাময়িক অভিজাতদের মধ্যে তাঁর এক আলাদাই সম্ভ্রমপূর্ণ প্রতিষ্ঠা তৈরি হয়েছিল।
এই সময় একদিন সন্ধেবেলা আমাদের মহান ব্যারন তাঁর ওয়েইনস্টাইন দুর্গের সুসজ্জিত বিশাল বসবার ঘরে একাকী বসে আছেন। বোঝাই যাচ্ছে মনমেজাজ তাঁর আনন্দে ভরপুর। দিল ভরপুর খুশ! প্রতিদিনের অভ্যাসমাফিক অতীব উপাদেয় এবং অত্যন্ত সুস্বাদু খাবারদাবার খেয়ে রাত্রিভোজন তিনি একটু আগেই সমাপ্ত করেছেন। সেই সদ্য বিগত কর্মের মধুর স্মৃতির এক অগ্রগামী বাহিনীর মতো বিংশতিসংখ্যক শূন্য-উদর পানীয়ের বোতল তখনও তাঁর সামনের টেবিলে সার বেঁধে দণ্ডায়মান। তবে সেই মুহূর্তে ব্যারনের নিজের উপর এবং জগৎসংসারের সব কিছুর উপর এতটা খুশি হওয়ার অবশ্য অন্য আরও একটা কারণ ছিল। তিনি যে সদ্যই সেদিন পিতা হয়েছেন, সেই সুখসমাচার তিনি কিছুক্ষণ আগেই পেয়েছেন এবং সদ্যপ্রাপ্ত পিতৃত্ব অর্জনের সংবাদশ্রবণের অসামান্য সেই অনুভূতিই সেই মুহূর্তে তাঁর মুখমণ্ডলকে উজ্জ্বল করে তুলেছিল। স্পষ্টতই সদ্য শূন্য-হওয়া বোতলস্থ সামান্য সেই সুরার ক্ষমতায় সেই উজ্বলতাপ্রাপ্তি কিছুতেই হতে পারত না।
“ওরে! কোথায় গেলি রে হতভাগারা! কে আছিস এখানে! অ্যাই সেনেশাল (*২)!” চিলচিৎকার দিয়ে হাঁকডাক শুরু করেছিলেন ব্যারন। সেই কণ্ঠস্বরের তীব্রতায় তাঁর সামনের কুড়িটা বোতলই একসঙ্গে নড়েচড়ে এমন সুরে বেজে উঠেছিল যেন সেগুলো কাচের তৈরি কোনো বাদ্যযন্ত্র। দেয়ালে ঝোলানো পূর্বপুরুষদের বর্মগুলোও তার সঙ্গে সঙ্গে ধাতব গম্ভীর শব্দে যথাযথ সংগত করতে শুরু করে দিয়েছিল। পরমুহূর্তে একছুটে সামনে এসে হাজির হয়েছিল তাঁর সেনেশাল।
“সেনেশাল,” তাঁর রক্তরাঙা চোখ দুটো পাকিয়ে বিশ-বোতলি বৃদ্ধ প্রশ্ন করলেন, “তুই তো আমাকে বলেছিস যে, ব্যারনেস ভালোই আছেন, তা-ই না?”
“আমাকে সেইরকমই জানিয়েছে।” অবনতমস্তক সেনেশাল মিনমিনে কণ্ঠে জবাব দেয়, “বলেছে যে, কর্ত্রী মহাশয়া যথাসম্ভব ভালোই আছেন।”
ব্যারন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। কিছু যেন ভাবছেন। অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সামনের শূন্য বোতলগুলোর দিকে। “তুই বোধহয় আমাকে আরও কিছু বলেছিলিস,” বোতলগুলোর দিক থেকে চোখ না সরিয়েই তিনি বলে উঠলেন, “ক-টা যেন—”
“চারটে,” গম্ভীর মুখে সেনেশাল উত্তর দেয়, “আমার কাছে একদম ভেতরের খবর আছে, চারটা বাচ্চা—সব ক-টাই ছেলে।”
“তাহলে তো সেটা একটা বিশাল ব্যাপার!” গর্বিত ব্যারনের গমগমে কণ্ঠস্বরে বলা কথাটা শেষ হওয়ার আগেই তাঁর পেশিবহুল শক্তপোক্ত হাতের মুষ্ট্যাঘাতে থরথর করে কেঁপে উঠেছিল সামনের টেবিলটা—“বিশেষ করে আজকের এই সময়ে, যখন ম্যালথাসের (*৩) সেই জঘন্য মতবাদটা আমাদের মতো অভিজাতদের মধ্যেও দানা বাঁধতে শুরু করেছে—তখন আমার জন্যে এটা সত্যিই একটা বিশাল বড়ো পাওনা। আমি তো বলব এইসবই সন্ত ক্রিস্টোফারের (*৪) আশীর্বাদ! আমাকে সেটা বলতেই হবে।”
আবার তাঁর দৃষ্টি গিয়ে স্থির হল শূন্যগর্ভ বোতলগুলোর উপরে। “সেনেশাল, আমার মনে হয়,” খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার পরে আবার মুখ খুললেন তিনি, “এই অবস্থায় নতুন কিছু করার উদ্যোগ তো আমাদের নিতেই হয়—”
“তার চাইতে ভালো আর কিছুই হতে পারে না।” সেনেশাল উৎসাহিত হয়ে ওঠে, “আমি এক্ষুনি আরেকটা বোতল নিয়ে আসছি। সব থেকে সেরাটা। সেই ১৩০৪ সালের বোতল, যেবার ধূমকেতু দেখা গিয়েছিল। আপনি কী বলেন, হুজুর?”
“কিন্তু…” কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন ব্যারন। কয়েক মুহূর্ত গোঁফে তা দিয়ে কিছু যেন ভেবে নিলেন। তারপর একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলেন, “আমার মনে হয়, তুই একটু আগেই বলেছিলিস যে, চারটে বাচ্চা হয়েছে। চারটেই ছেলে, তা-ই না?”
“একদম ঠিক কথা বলেছেন হুজুর, আপনি।” একেই তো হুজুর মা-বাপ, তার উপর গার্হস্থ্যকর্মের জন্যে রীতিমতো প্রশিক্ষিত এবং হুজুরের খাস তত্ত্বাবধায়ক সে। সেনেশাল সঙ্গে সঙ্গে হুজুরের ইঙ্গিত ধরে ফ্যালে, “আমি এখনই আরও চারটে বোতল নিয়ে আসছি।”
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অতীব দক্ষ খাস তত্ত্বাবধায়কটি তড়িদ্গতিতে চার-চারটে নতুন বোতল নিয়ে এসে হাজির হয়ে যায়। ব্যারনের সামনের টেবিলের উপরে তাঁর হাতের নাগালের মধ্যে বোতল চারটে সাজিয়ে দিতে দিতে বোধহয় হঠাৎই কথাটা তত্ত্বাবধায়কের মনে পড়ে গেছে এমনভাবে খুবই আলগা স্বরে সে বলে ওঠে, “হুজুর, সাধুসন্ন্যাসীর মতো দেখতে এক বুড়ো কেল্লার উঠোনে অনেকক্ষণ থেকে বসে আছে। খাবার আর রাতের আশ্রয় চাইছে। বলছে যে, সে নাকি আল্পসের ওপারের কোনো জায়গা থেকে আসছে, আর যাবে কোলোনের দিকে।”
“হুম।” সামান্য মাথা নাড়লেন ব্যারন। তারপর উদাসীন ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, “আমি ধরে নিচ্ছি, লোকটার কাছে লুঠ করার মতো মালপত্তর কী আছে-না আছে, সেসব তোদের খুঁজে দেখা হয়ে গেছে।”
“হুজুর, দুঃখের কথা, বুড়ো মানুষটা সবে আজ সকালে শুইঙ্কেনফেলসের কাউন্ট—আপনারই তুতোভাই কনরাডের এলাকা পেরিয়ে এসেছে।” অনুগত তত্ত্বাবধায়ক নীরস কণ্ঠস্বরে খবরটা জানায়, “কাজেই হুজুর, আপনি বুঝতেই পারছেন যে, তাঁর কাছে এখন বড়োজোর কয়েকটা তামার সুইস অচল পয়সা আছে।”
“আহা! কাউন্ট কনরাড! সে তো আরও এক কাঠি সরেস জিনিস!” দূর সম্পর্কের তুতোভাইটির উদ্দেশে মধু-মাখা কণ্ঠে ব্যারন বলে উঠলেন, “আমার জীবনের সব চেয়ে বড়ো দুর্ভাগ্য তো এটাই যে আমাকে এমন জায়গায় থাকতে হচ্ছে, যেখানে শুইঙ্কেনফেলস পেরিয়ে তবেই আসা সম্ভব। যাক গে, তা সে অচল হোক বা যা-ই হোক, বুড়ো সাধুর সেই তামার পয়সাগুলো তুই এতক্ষণে উঠিয়ে নিয়েছিস নিশ্চয়ই?”
“হুজুর,” ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে লাজুক হেসে সেনেশাল চোখ নামিয়ে নীচুস্বরে উত্তর দেয়, “ওগুলো নিয়েও কোনো লাভ হবে না।”
“ওরে শয়তান!” ব্যারন গর্জে ওঠেন, “তোরা তো আমাকে পাগল করে দিবি রে! পয়সা, আর সে নেওয়ার মতো না! হতে পারে ওগুলোর কোনো দাম নেই, কিন্তু আমাদের তো একটা নীতি আছে, না কী? ওরে গাধা, অন্তত সেটুকুর জন্যে হলেও তো বুড়োর তবিল পুরো সাফ করবি!”
সেনেশাল তার নতমস্তক আরও খানিকটা নত করে রেখে বিড়বিড় করে কিছু একটা কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছিল। তবে বুদ্ধিমান লোক। একই সঙ্গে একুশতম বোতলটাও খুলে দেয় সে। কারণ, ব্যাখ্যা মনঃপূত না হলেও কারণবারি যে হবেই, তা নিয়ে তাঁর মনে কোনো সন্দেহ ছিল না।
“আর যেন কখনও এরকম করেছিস বলে না শুনি।” মনে হচ্ছে ব্যারন এত তাড়াতাড়ি ছাড়ার পাত্র নন। কথার ঝাঁজ এখন অনেকটা কমেছে ঠিকই, কিন্তু কণ্ঠস্বর এখনও কঠোর। “যদি আমার ইজ্জত আর তোর পিঠের চামড়ার খেয়াল রাখতে চাস, তাহলে ভবিষ্যতে আর কখনও যেন আমার ‘যা পাও, লুটে নাও’ নীতি থেকে একচুলও তোকে সরতে না দেখি। ভুলে যাস না যেন যে, বিন্দু বিন্দু জলেই সিন্ধু হয়। কাজেই জীবনে সফল হতে হলে, ছোটো হোক বা বড়ো, সব দিকে চোখ-কান খোলা রেখেই কাজ করতে হবে। রাজনীতিই বল বা অর্থনীতি, সফলতার মূলমন্ত্র হচ্ছে সেটাই।”
ঠিক সেই সময়েই বাইশতম বোতলটির মুখ থেকে কর্কের ছিপিটা টেনে খোলার আওয়াজ তাঁর বক্তব্যের সুরে তাল মিলিয়ে বেজে উঠল।
“তবে…” ব্যারন না থেমে বলেই চললেন। যদিও ততক্ষণে তাঁর কণ্ঠস্বর আরও কিছুটা মোলায়েম হয়ে গিয়েছে, “ঘটনা হচ্ছে, আজ এমন একটা দিন যে এইসব তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে আমি আর খুব বেশি মাথা ঘামাতে চাইছি না। উচিতও নয়। চার-চারটে বাচ্চা, তার উপর আবার সব ক-টাই ছেলে! আজ ওয়াইনস্টাইন বংশের গৌরবের দিন। সেনেশাল, বাকি দুটো বোতলও খুলে ফেল, আর তারপর কোন নয়া সাধুবাবা এসেছে, নিয়ে আয় তাকে ভিতরে। গপ্পসপ্প করা যাক খানিক। মনে হচ্ছে, ফুর্তি বেশ ভালোই জমবে।”
ব্যারনের সামনে তখনও পর্যন্ত সাজানো সেই খান-কুড়ি খালি বোতলের সারির মধ্যে দিয়ে আগন্তুককে দেখে মনে হল, মানুষটার যথেষ্ট বয়স হয়েছে—আশির কিছু বেশিই হবে—অন্তত একদিন বেশি বই কম তো কিছুতেই হবে না। মানুষটার গায়ে জড়ানো রয়েছে ধূসর রঙের একটা ছেঁড়াখোঁড়া চাদর, হাতে তীর্থযাত্রীদের মতো একটা যষ্টি, সব মিলিয়ে অত্যন্ত সাধারণ নিরীহ ধরনের চেহারা। এতটাই সাধারণ আর নিরীহ যে তাঁর সঙ্গে দু-চার মিনিটও হাসি-মশকরা করা যাবে বলে তো মনে হচ্ছে না। শুধু শুধুই ডেকে আনা হল। মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিলেন ব্যারন। তবু মেজাজ ঠিক থাকলে তিনি এমনিতে যেহেতু একজন নিপাট ভদ্রলোক, তাই ভদ্রতার খাতিরে বসতে দিলেন। শুধু তা-ই নয়, কবেকার সেই ধূমকেতু আসার বছরের মদের বোতল থেকে খানিকটা একটা পাত্রে ঢেলে সেটা সেই বৃদ্ধের হাতে তুলেও দিলেন।
হাত জোড় করে বিনীত ভঙ্গিতে প্রণাম জানালেও সেই প্রণামের ভঙ্গিতে কোনো দাসসুলভ ব্যবহারের আভাস ছিল না। পাত্রটা নিয়ে বৃদ্ধ আগন্তুক প্রথমে সামান্য একটু চেখে দেখলেন। যেন স্বাদ-বিচার করে নিচ্ছে। তারপর কাঁপা-কাঁপা হাতে পাত্রটা আলোর দিকে তুলে গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু যেন দেখলেন। তারপর আবার একটা চুমুক দিলেন। এবার মনে হল, স্বাদটা তাঁর পছন্দ হয়েছে। তৃপ্তিতে উজ্জ্বল-হয়ে-ওঠা মুখে তিনি চোখ বুজে নিজের লম্বা ঝুলন্ত দাড়িতে হাত বুলিয়ে চলেছেন।
“মনে হচ্ছে তুমিও এ রসের একজন পাক্কা সমঝদার। স্বাদটা তোমারও জিবে বেশ জমেছে, তা-ই না?” পাশের দেয়ালে সারিবদ্ধ ঝোলানো রয়েছে তাঁর পূর্বপুরুষদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিকৃতি। তাদেরই একজনের দিকে এক চোখ টিপে ব্যারন প্রশ্নটা করলেন বৃদ্ধ আগন্তুককে।
“ভালোই তো,” আগন্তুক সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেন, “অনেকদিনের পুরোনো বলে বোধহয় এতটা ঘন হয়ে গেছে। তবে এই মদের সুবাস আর রং দেখে আমি চোখ বুজে বলতে পারি যে, মদটা তৈরি হয়েছে ১৩০৪ সালে জন্মানো আঙুর দিয়ে, আর সেই আঙুর জন্মেছে দুর্গের দক্ষিণ আর অগ্নিকোণ বরাবর যে দুটো রাস্তা খাড়াই ঢাল বেয়ে সোজা নেমে গেছে পাহাড়ের নীচ পর্যন্ত, সেই দুটো রাস্তার মাঝের ঢালের জমিতে। ওই জায়গাটার একটা আলাদাই গুরুত্ব আছে। এই দুর্গের মিনারে প্রতিফলিত সূর্যের আলো সেখানে যেভাবে গিয়ে পড়ে, সেটাই এই মদের স্বাদে এনে দেয় এক দুর্দান্ত আমেজ। কিন্তু আপনার গর্দভ চাকরবাকরেরা মনে হচ্ছে, বোতলগুলো রেখেছিল ভাণ্ডারের কোনো ভুলভাল জায়গায়। ওগুলো রাখা উচিত ছিল ভাণ্ডারের শুকনো দিকটায়। চতুর্থ বিবাহের রাস্তা সাফ করতে, আপনারই এক পূর্বপুরুষ, শ্রীযুক্ত সিগিসমুন্ড ভন ওয়াইনস্টাইন, একজন অতীব স্বেচ্ছাচারী লম্পটচূড়ামণি, যেদিকটায় তাঁর তৃতীয় স্ত্রী-কে নিজে হাতে জ্যান্ত পুঁতে দিয়েছিলেন।”
স্তম্ভিত ব্যারন অবাক বিস্ময়ে তাঁর অতিথির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। “তুমি তো আমাকে অবাক করে দিচ্ছ হে!” অবশেষে চমকটা সামলে নিয়ে তিনি বলে উঠলেন, “এখানকার আগাপাছতলা সব কিছুই দেখছি, তুমি জেনে বসে আছ।”
“জানি তো,” ধীরস্থিরভাবে মদের গেলাসে চুমুক দিতে দিতে অচেনা মানুষটা উত্তর দেয়, “আর জানাটাও খুবই স্বাভাবিক। ষাট বছর এখানেই, এই ছাদের নীচেই তো ছিলাম, এখানে কোথায় ফুটো আর কোথায় ফাটা—সব আমার জানা আছে। কারণ, আমি নিজেই একজন ভন ওয়াইনস্টাইন।”
এবারের চমকটা আরও জোরদার হল। তড়িঘড়ি নিজের বুকে ক্রস এঁকে ব্যারন তাঁর চেয়ারটা খানিক পিছনে টেনে বোতলগুলো থেকে তো বটেই, তার সঙ্গে সঙ্গে অচেনা আগন্তুকের সামনে থেকেও একটু দূরে সরে এলেন।
“ওহ্, আরে না, না,” বাধা দিয়ে হোহো করে হেসে ওঠেন বৃদ্ধ আগন্তুক; তারপর হাসি থামিয়ে বলেন, “আপনার ভয় পাওয়ার মতো কিছু হয়নি। হ্যাঁ—এটা অবিশ্যি জানি যে, যতই সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখা হোক-না কেন, পুরোনো যে-কোনো দুর্গেই পূর্বজদের প্রেতাত্মা থাকবে, সে তাঁরা থাকুন-না কেন, আমার তাতে কিছু এসে যায় না—আমি কিন্তু খাঁটি রক্তমাংসের মানুষ। কোনো ভূতপ্রেত নই। এমনকি খোদ এই ওয়াইনস্টাইন দুর্গেরও তো মালিক একদিন আমিই ছিলাম। অন্তত বছর বারো আগে পর্যন্ত। তারপর আমি অধ্যাত্মবিদ্যা শিখতে আরব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম, আর এসে দেখি, শয়তান মুনশি আর নায়েবদের দল জালিয়াতি করে সম্পত্তির মালিকানা থেকেই আমার নামটা মুছে দিয়েছে। এই তো, এই যে এই হলঘরটা দেখছেন—এটা আমি আমার সেই ছোট্টবেলা থেকে চিনি! একদম নিজের হাতের তালুর মতো! ওই যে ওই চুল্লিটা দেখছেন ওখানে—দাউদাউ করে আগুনের শিখা লাফাচ্ছে—ওখানেই ছোটোবেলায় আমি আমার ছোট্ট ছোট্ট পা দুটো সেঁকে নিতাম। আর ওই যে দেখছেন ওই জবরজং বর্মটা—ঠিক ওটার মধ্যেই আমি একদিন ঢুকে লুকিয়ে বসে ছিলাম—তখন বয়স কত হবে আমার? বছর ছয়েক—আর আমার দুষ্টুমিতে ত্রস্ত আমার মা—আমার প্রিয় মা—স্বর্গে শান্তিতে থাকুন তিনি!—আমাকে খুঁজে না পেয়ে ভয়ে তো প্রায় মরেই যাচ্ছিলেন। কতদিন আগের ঘটনা, অথচ মনে হচ্ছে যেন এই কালকের কথা। আর ওই যে, ওই দু-হাতি তলোয়ারটা—ওখানে দেয়ালে ঝুলছে—ওটার মালিক ছিল মহাবীর ফ্রাঞ্জ—আমাদেরই এক পূর্বপুরুষ, যাঁর একটামাত্র কান ছিল। ওটাই সেই তলোয়ারটা, যেটা দিয়ে আমি একটা কাণ্ড ঘটিয়েছিলাম। একদিন যখন আমার বাবা তাঁর সেদিনের কুড়ি বোতল মদ শেষ করে বুঁদ হয়ে বসে ছিলেন, ওই তলোয়ারটা দিয়ে আমি ওঁর গোঁফের খানিকটা উড়িয়ে দিয়েছিলাম। আর ওই হচ্ছে ওটার খাপটা—সে যাক গে, মনে হচ্ছে, এইসব ফালতু স্মৃতিকথা শুনে আপনি বিরক্ত হচ্ছেন। আশা করি, একজন বুড়ো মানুষের প্রগল্ভতা আপনি মাফ করে দেবেন, যে কিনা বহুকাল পরে আবার তাঁর শৈশব আর যৌবনের অতি পরিচিত আবাসে ফিরে এসেছে।”
ব্যারন হাঁ করে শুনছিলেন। এবার হাত দিয়ে নিজের কপাল টিপে ধরলেন। “আমার জীবনের গত পঞ্চাশটা বছরই কেটেছে এই দুর্গে।” কপাল টেপাটেপি সেরে এবার মুখ খুললেন তিনি, “তার উপর গত কয়েক পুরুষের প্রত্যেকের ইতিহাস-ভূগোল সব কিছুই আমার জানা আছে। কিন্তু তোমার সঙ্গে মোলাকাতের সৌভাগ্য এর আগে আমার কখনও হয়েছে বলে তো মনে পড়ছে না, বাপু। তা সে যা-ই হোক, আপাতত অনুমতি দাও, তোমার গেলাসটা আরেকবার ভরে দিই।”
“এই মদটাও অবিশ্যি খুবই ভালো,” আগন্তুক গেলাসটা এগিয়ে দিয়ে বলে ওঠেন, “তবে ১৩৯২ সালের আঙুরের কথাই আলাদা—তখনকার আঙুরগুলো—”
ব্যারন তাঁর অতিথিকে একবার ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন। তারপর শুকনো গলায় বললেন, “১৩৯২ সালের আঙুর পাকতে এখনও চল্লিশ বছর দেরি আছে। বাপু হে, মনে হচ্ছে, বুড়ো হয়ে গিয়ে তোমার মাথাটা আর ঠিকঠাক কাজ করছে না।”
“মাফ করবেন মহামান্য হুজুর,” আগন্তুক শান্তস্বরে উত্তর দেন, “গত চল্লিশ বছর ধরে ওই ১৩৯২ সালের আঙুর আপনার ভাণ্ডারে পচছে। মনে হচ্ছে, আপনি দিনক্ষণের হিসেব গুলিয়ে ফেলেছেন।”
“তা-ই? তাহলে এটা কোন বছর? তুমিই বলো।” আগন্তুককেই প্রশ্ন করলেন ব্যারন।
“পঞ্জিকা আর তিথিনক্ষত্রের হিসেবে তো বটেই, তা ছাড়া এমনিতেও সবাই জানে যে প্রভুর আবির্ভাব থেকে ধরলে এটা ১৪৩৩ সাল।”
“ঈশ্বর আমাকে রক্ষা করুন,” আঁতকে উঠে ব্যারন প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, “ভুল হলে আমার আত্মার সদ্গতি হবে না! কিন্তু প্রভুর আবির্ভাব থেকে হিসেব করলে এটা তো ১৩৫২ সাল।”
“অবশ্যই আমাদের কোথাও একটা ভুল হচ্ছে,” নৈর্ব্যক্তিক কণ্ঠে বৃদ্ধ আগন্তুক বলে ওঠেন, “আমার জন্মই তো হয়েছিল এখানে, এই জায়গায়, সেই ১৩৫২ সালেই। ঠিক যে বছর তুর্কিরা ইউরোপ আক্রমণ করেছিল।”
“ঈশ্বরের আশীর্বাদে এখনও পর্যন্ত তো কোনো তুর্কি ইউরোপে পা দিতে পারেনি।” বলার ভঙ্গিতে বোঝা গেল, বিশ-বোতলি বৃদ্ধ ব্যারন স্পষ্টতই এতক্ষণে নিজেকে সামলে নিতে পেরেছেন। “যা দেখছি, তুমি হয় কোনো জাদুকর হবে, আর নয়তো কোনো জোচ্চোর। তবে যা-ই হও-না কেন, এই বোতলটা শেষ করেই আমি হুকুম দেব তোমাকে ছিঁড়ে চার টুকরো করার। ততক্ষণ অবশ্য তুমি তোমার স্মৃতিচারণা চালিয়ে যেতে পারো, আর হ্যাঁ—মদটা শুধুশুধু বরবাদ না করে বরং খেয়ে নাও।”
“জাদুমন্ত্রের কারবার আমি জীবনে কখনোই করিনি,” আগন্তুক শান্তভাবে উত্তর দেন, “আর শুধুশুধু আমাকে জোচ্চোর বলে বদনাম না দিয়ে বরং ভালো করে আমার মুখটা একবার খুঁটিয়ে দেখে নিন। আমার মুখের গড়নে আপনি কি আপনার বংশের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাচ্ছেন না? এই যে আমার নাকটা—মোটা, ভোঁতা, লালচে—ঠিক আপনাদেরই মতো। আর কপালের এই বলিরেখাগুলো?—পাশাপাশি তিনটে সমান্তরাল আর দুটো আড়াআড়ি? আমি তো আপনার মুখেও ওগুলো সব দেখতে পাচ্ছি। একই রকম। তা ছাড়া আমার এই চামড়ার পাতলুনটা? এটা কি ওয়াইনস্টাইনদের কায়দার পাতলুন নয়? ভালো করে দেখুন। আমি তো বলব, আপনি বরং বিচারসভা ডাকুন। তদন্ত করে দেখে নিন।”
“হুম, মানতেই হবে যে তুমি আমাদেরই মতোই দেখতে।” ব্যারন স্বীকার করে নিলেন।
“আমরা যে চার ভাই একই দিনে একই সঙ্গে জন্মেছিলাম,” অচেনা বৃদ্ধ মানুষটা তখনও বলেই চলেছেন, “তাদের মধ্যে আমিই ছিলাম সর্বকনিষ্ঠ। আমার বাকি তিন ভাইই ছিল দুর্বল আর অসুস্থ। জন্মের পর অবশ্য কেউই বেশি দিন বাঁচেনি। সুতরাং ছেলেবেলায় আমি ছিলাম আমার বাবার চোখের মণি। পাঁড়মাতাল আর ঘোর লুঠেরা হলেও আমার বেচারা বাপের বেশ কিছু গুণও ছিল, যা উল্লেখযোগ্য।”
ব্যারন চোখ কুঁচকে তাকিয়ে আছেন আগন্তুকের দিকে।
“লোকে তাকে বলত বিশ-বোতলি বুড়ো। তবে আমার স্মৃতি যদি বিশ্বাসঘাতকতা না করে, তবে আমার মনে হয়, বোতলের সংখ্যা চল্লিশ বললেই বোধহয় সেটা সত্যের কাছাকাছি হত।”
“মিথ্যে কথা!” ব্যারন চিৎকার করে উঠলেন, “খুব কম দিনই আমি কুড়ি বোতলের বেশি খাই।”
“তবে যদি সমাজে তাঁর অবস্থানের কথা বলতে হয়,” ব্যারনের বাধা অগ্রাহ্য করে আগন্তুক বলেই চলল, “স্বীকার করতেই হবে যে, কিছুই তার চেয়ে খারাপ হতে পারে না। আশপাশের সমস্ত সৎ আর নিরীহ লোকের জন্যে তিনি ছিলেন রীতিমতো এক আতঙ্ক। এই গোটা এলাকার বাসিন্দাদের কারোই কোনো সম্পত্তির অধিকার বলতে কিছুই ছিল না, কারণ আমার পরলোকগত পিতার লোভের কোনো সীমা ছিল না। অবশ্য মুখ ফুটে প্রতিবাদ করার মতো সাহস কারোই আমার বাপের ছিল না, কারণ টাকাপয়সা অথবা গোরু-ভেড়ার চাইতে মানুষের জীবন তাঁর জমানায় খুব বেশি একটা নিরাপদে ছিল না। মানুষজন তাঁর ছায়া মাড়াতে পর্যন্ত ঘেন্না বোধ করত! আর পেছনে তাকে নোংরা ভাষায় গালাগালি করত! আমার রীতিমতো মনে আছে, তখন আমার চোদ্দো বছর বয়স—সেটা ছেষট্টি সাল হবে, যে বছর দুর্ধর্ষ তুর্কিরা অ্যাড্রিয়ানোপল দখল করে নিল—একদিন ঘানিওয়ালা লম্বু হুগো, আমাকে সামনে ডেকে বলেছিল: ‘খোকা, তোর নাকটা তো খুব সুন্দর।’ ‘হ্যাঁ, হুগো, আমার নাকটা খুব সুন্দর।’ নাকের গর্বে বুক ফুলিয়ে মাথা উঁচু করে আমি উত্তর দিয়েছিলাম। ‘কিন্তু পোক্ত আর মজবুত তো?’ প্রশ্নটা করে হুগো হাসছিল। সে হাসিতে ছিল বিদ্রুপের খোঁচা। ‘যথেষ্ট পোক্ত আর মজবুত,’ উত্তর দিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কিন্তু এ কী ধরনের বোকার মতো প্রশ্ন?’ ‘ঠিক আছে, খোকা।’ হুগো আর বেশি কথা না বাড়িয়ে পিছন ফিরে চলে যেতে যেতে শুধু বলেছিল, ‘তোর বাপের হাত ফাঁকা থাকলে নিজের নাকটা খেয়াল রাখিস, নইলে লুটের মালের অভাবে হয়তো দেখা যাবে, তোর মুখ থেকে তোর ওই নাকটাই হয়তো চুরি করে নিল তোর বাপ।’”
“সন্ত ক্রিস্টোফারের দিব্যি!” ব্যারন গর্জন করে উঠলেন, “ওই ঘানিওয়ালা লম্বু হুগো, তা-ই না? ঠিক আছে, দেখছি আমি। এর মূল্য ওকে চোকাতেই হবে। অনেকদিন থেকেই আমার সন্দেহ ছিল শয়তানটার উপর। এবার বাগে পেয়েছি। সন্ত ক্রিস্টোফারের দিব্যি গেলে বলছি, শয়তানটার শরীরের সব ক-টা হাড় আমি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব।”
“আপনার এই প্রতিশোধ বাসনা মাঠে মারা যাবে,” আগন্তুক শান্তস্বরে ঘোষণা করলেন, “কারণ লম্বু হুগো তাঁর কবরে শুয়ে পড়ার পর আজ ষাটটা বছর পেরিয়ে গেছে।”
“তা-ই তো,” ব্যারন দু-হাত দিয়ে নিজের মাথা টিপে ধরে তাঁর অতিথির দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠলেন, “আমি তো ভুলেই যাচ্ছি যে, এর মধ্যে কখন যেন নতুন শতাব্দী শুরু হয়ে গেছে—অবশ্য যদি না তুমি ভবিষ্যতের ভূত হয়ে থাকো।”
“আমাকে ক্ষমা করবেন আমার পূজনীয় পিতা,” এক মুহূর্তের জন্যে তাঁর মাথা ঝুঁকিয়ে আগন্তুক উত্তর দিলেন, “আমাকে তাহলে আপনার বক্তব্য যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করে দেখতেই হয়। কারণ, আপনার বক্তব্যে আপনি আমার সম্পর্কে এমন একটা সন্দেহ প্রকাশ করলেন, যা আমার শারীরিক বাস্তবতা তো বটেই, এমনকি আমার ব্যক্তিগত অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ঠিক আছে, প্রথমে দেখা যাক এই মুহূর্তে আমাদের আপেক্ষিক অবস্থান কী? আমার জন্ম যে হয়েছে প্রভুর আবির্ভাবের ১৩৫২ বছর পরে, সেটা তো আপনি মেনেই নিয়েছেন। কারণ এটা এমন একটা বিষয়, যেখানে আপনার স্মৃতিশক্তি যে ভুল করবে, তার সম্ভাবনা বলতে গেলে একদমই নেই। কিন্তু তারপর যে-কোনো কারণেই হোক, পঞ্জিকা থেকে শুরু করে ইতিহাস আর ঘটনার ঘনঘটা সব কিছু অগ্রাহ্য করে আপনি এখনও বলে যাচ্ছেন যে এটাই ১৩৫২ সাল। একমাত্র আপনি যদি সেই সপ্ত-নিদ্রালুদের একজন হতেন, তাহলে হয়তো আপনার এই অলীক বিভ্রম [তেমন কঠিন শব্দ ব্যবহার করতে চাইছি না] ক্ষমার যোগ্য হত, কিন্তু না আপনি সেই নিদ্রাবিষ্টদের কেউ, না ভাবসমাধিগ্রস্ত কোনো সাধুসন্ত। সুতরাং, আমার এই আশি বছর বয়সি জীবনের এতগুলো বছর ধরে অর্জিত বস্তা বস্তা অভিজ্ঞতার প্রত্যেকটাই কিন্তু আপনার বিস্ময়কর ভুলের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে। এখানে আমিই বরং আপনার শারীরিক অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করতে পারি, কিন্তু আমার সম্পর্কে করার মতো কোনো অধিকার এই মুহূর্তে আপনার থাকতে পারে না। আপনি কি কখনও শুনেছেন যে, ভূত, প্রেত, অশরীরী, অপদেবতা অথবা পিশাচেরা কেউ কখনও ভবিষ্যৎ থেকে এসে অতীতের মানুষকে দেখা দিয়েছে বা বিরক্ত করেছে কিংবা ভয় দেখাচ্ছে?”
ব্যারন স্বীকার করতে বাধ্য হলেন যে, তিনি কখনও শোনেননি।
“কিন্তু আপনি এমন ঘটনার কথা নিশ্চয়ই শুনেছেন, যেখানে হারিয়ে-যাওয়া অতীতের অন্ধকার ফুঁড়ে ভূত, প্রেত, অশরীরী, অপদেবতা, অথবা তাদের অন্য যে নামেই অভিহিত করুন-না কেন, উদ্ভূত হয়েছে ঘটমান বর্তমানে?”
এই নিয়ে দ্বিতীয়বার তাঁর বুকে ক্রস আঁকলেন ব্যারন। তারপর উৎকণ্ঠিত দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে দেখে নিলেন ঘরের অন্ধকার কোণগুলোর দিকে। “যদি তুমি সত্যিকারের ভন ওয়াইনস্টাইন হও,” ফিশফিশ করে কথা বলছিলেন তিনি, “তাহলে নিশ্চয়ই জানো যে এ দুর্গ ভূতে ঠাসা। রাত নামার পর তাদের অন্তত আধ ডজনের সঙ্গে ঠোক্কর না খেয়ে এখানে চলাফেরা করা খুবই কঠিন একটা কাজ।”
“সেক্ষেত্রে,” যুক্তিবিশারদ আগন্তুক তাঁর সহজাত ধীরস্থির কণ্ঠে এবার মোলায়েম সুরে বলতে শুরু করলেন, “আপনি এবার মোকদ্দমায় আপনার হার হয়েছে, সেটা মেনে নিন। তবে আপনি যা করলেন, আরব বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, পরমজ্ঞানী বেন ডাস্টি মহাশয় সেটা জানলে বলতেন, এ হচ্ছে নির্ণয়মূলক উপসংহারের এক চরম উদাহরণ। কারণ, আপনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে, ভবিষ্যতের ভূত বলে কিছু হয় না, আর অতীতের ভূত হরবখত না হলেও মাঝেমধ্যেই দেখা যায়। এই দুটি বিবৃতির ভিত্তিতে একজন যুক্তিশাস্ত্রের ছাত্র হিসেবে যে উপসংহারে পৌঁছোতে পারছি, সেটা এখন আমি আপনার সামনে রাখছি: ভূত হওয়ার সম্ভাবনা আমার যতটুকু হতে পারে, তার তুলনায় ভূত হওয়ার সম্ভাবনা আপনার অনেক অনেকগুণ বেশি!”
ব্যারনের চোখ-মুখ রাগে টকটকে লাল হয়ে উঠল। “নিজের জীবিত পিতার অস্তিত্ব অস্বীকার করছ,” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কি কোনো পুত্রসুলভ কাজ হচ্ছে?”
“নিজের বীর্যজাত পুত্রের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ করছেন,” আগন্তুক তাঁর সেই একই ধীরস্থির কণ্ঠে জানতে চাইলেন, “সেটাই কি তবে পিতৃসুলভ কাজ?”
“দুনিয়ায় যত সন্ত আছেন, আমি সবার নামে শপথ করছি!” ব্যারন ভয়ানক জোরে গর্জে উঠলেন। রাগ তখন তাঁর চরম পর্যায়ে উঠে গিয়েছে। মুখ-চোখ আরও রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। “আজই হবে এই প্রশ্নের ফয়সালা। অ্যাই, কে আছিস কোথায়, সেনেশাল!” তিনি বারবার করে উচ্চস্বরে ডেকেই চললেন, কিন্তু অরণ্যে রোদনের মতো তাঁর যাবতীয় হাঁকডাক সব নিষ্ফল হয়ে রইল।
“আপনার হাঁকডাক বন্ধ করে বরং এখনও বুকে যতটুকু দম আছে, সেটুকু বাঁচিয়ে রাখুন।” ধীরস্থির কণ্ঠে আগন্তুক পরামর্শ দেন, “এই দুনিয়ায় এমন কোনো তত্ত্বাবধায়ক নেই, তা সে যত বড়োই প্রশিক্ষিত গৃহকর্মনিপুণ সেনেশাল হোক-না কেন। আর আপনি যতই চিৎকার করে তাকে ডাকুন-না কেন, কবরখানায় মাটির নীচের বিছানা থেকে সে কিছুতেই উঠে বসবে না।”
জীবনভর রোজ কুড়ি বোতল মদ্যপান-করে-আসা বৃদ্ধ এবার তাঁর চেয়ারে অসহায়ভাবে এলিয়ে পড়লেন। তারপরেও মনে হল, কিছু যেন বলতে চাইছিলেন, কিন্তু তাঁর জিব আর গলা দুটোই বিদ্রোহ করে বসেছে। শুধু খানিক গোঁ-গোঁ শব্দ বের হচ্ছিল মুখ থেকে।
“এই তো—এবার ঠিক আছে,” সন্তুষ্ট হয়ে অতিথি মাথা নেড়ে অনুমোদন জানান, “গত শতাব্দীর একজন শ্রদ্ধেয় ভূতের মতো সম্মানযোগ্য আচরণ করুন। কোনো ভদ্র ভূত না কখনও চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করে ঝামেলা পাকায়, না হিংস্র হয়ে ঝঞ্ঝাট করে। যে-কোনো কারণেই হোক, মারা যাওয়ার আগে আপনি অতীব ভয়াবহ ধরনের হিংস্র মানুষ ছিলেন, কিন্তু এখন তো আর তার দরকার নেই, কাজেই আপনার বর্তমান অবস্থায় আপনি ইচ্ছে করলে শান্তশিষ্ট হয়ে থাকতেই পারেন।”
“আমি মরে গেছি?” ব্যারন যেন আঁতকে উঠলেন।
“অপ্রীতিকর কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যে” হাত জোড় করে আগন্তুক বলে উঠলেন, “আমাকে ক্ষমা করবেন।”
“আ..আ..আমি ম..ম..রে গেছি!” ব্যারন তোতলাচ্ছিলেন। তাঁর গলা কাঁপছে। তাঁর মাথার চুল সব খাড়া হয়ে গিয়েছে। “কী..কীভাবে কী হয়েছিল, আ..মাকে একটু খু..লে বলো। আমি বি..বিশদে শুনতে চাই।”
“তখন আমার বয়স কত? এই বড়োজোর পনেরো হবে,” খানিকক্ষণ চিন্তাভাবনা করে আগন্তুক বলতে শুরু করলেন, “তবু সেদিনের সেইসব ঘটনার খুঁটিনাটিও আমি কখনও ভুলতে পারব না। সেদিনের সেই ভয়ংকর জনবিদ্রোহ, যা আমার পিতৃদেবের মতো এক মহামহিম মানুষেরও জীবনান্ত করে ছেড়েছিল। আপনার অত্যাচার আর দুষ্কর্ম যখন মানুষের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন আশপাশের মাইলের পর মাইল জুড়ে বসবাস-করা মানুষজন একদিন একত্রিত হয়ে আমার সেই বন্ধু লম্বু হুগোর নেতৃত্বে গিয়ে পৌঁছোল শুইঙ্কেনফেলসে—আপনারই তুতোভাই কাউন্ট কনরাডের কাছে। আপনার অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা পেতে খড়কুটোর মতো তারা আঁকড়ে ধরল তাকেই। তিনিই তখন তাদের একমাত্র আশ্রয়। মসিহা। ভন শুইঙ্কেনফেলস কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েই শুনেছিলেন তাদের অভিযোগ, তাদের প্রার্থনা। শোনার পর তিনি তাদের বলেছিলেন যে, তিনি বেশ কিছুকাল ধরেই আপনার অত্যাচার আর দুষ্কর্মের দিকে নজর রেখেছেন; এমনকি বেশ কয়েকবার প্রতিবাদ জানিয়ে আপনাকে শুধরে যেতেও অনুরোধ করেছিলেন, যদিও সেসব অনুরোধ-উপরোধ অন্তিমে সবই ফুটো পাত্রে জল ঢালায় পর্যবসিত হয়েছিল। তিনি তাদের এটাও বলেছিলেন যে আপনি বংশের একজন কুলাঙ্গার, এলাকার ত্রাস। নির্লজ্জের মতো জনগণের রক্ত-মাখা ধনসম্পত্তি দিয়ে আপনি আপনার দুর্গ ভরতি করে চলেছেন। এরপরেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, জনগণের অনুরোধে এবং আইন ও নৈতিকতার রক্ষক হিসেবে সকলের মঙ্গলের জন্যে তিনি ওয়াইনস্টাইন আক্রমণ করে আপনাকে নির্মূল করবেন।”
“ওহ্ কনরাড! ব্যাটা ভালোমানুষের মুখোশ-পরা ভণ্ড জলদস্যু কোথাকার!” গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলেন জীবনভর রোজ কুড়ি বোতল সুরাপান-করে-আসা বৃদ্ধ।
“এরপর যা যা তিনি করলেন,” ব্যারনের চিৎকার-চেঁচামেচি অগ্রাহ্য করে আগন্তুক তখনও বলেই চলেছেন, “সেসব শুধু তাঁর নিজস্ব দলবল দিয়ে সম্ভবই হত না, যদি না আপনার নিজের অনুচরেরাও তাঁকে সাহায্য করত। এটা আমাকে মানতেই হবে যে, তা সত্ত্বেও আপনি অভাবনীয় প্রতিরক্ষা আর দুর্দান্ত প্রত্যাঘাত করতে পেরেছিলেন। শুধু যদি না আপনার ওই বদমাশ সেনেশাল নিজেকে শুইঙ্কেনফেলসের কাছে বিক্রি করে দিয়ে সেই সন্ধ্যায়, যখন আপনি আপনার রোজকার অভ্যাসমাফিক কুড়িটা বোতল গলাধঃকরণ করে মাতাল হয়ে বসেছিলেন, তখন দুর্গের প্রাচীর সেতুটা নামিয়ে না দিত, তাহলে সম্ভবত কনরাড এই দুর্গের ভিতরে ঢুকতেও পারতেন না, আর সদ্যযুবা আমার চোখ দুটোও সেদিন দুর্গের উত্তর-পশ্চিম মিনারের চূড়া থেকে ঝুলন্ত দড়ির প্রান্তে তাঁরই শ্রদ্ধেয় পিতার দেহ ঝুলতে দেখার মতো ভয়ংকর দৃশ্যের সাক্ষী হওয়ার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেত।”
দু-হাতে মুখ ঢেকে ব্যারন ততক্ষণে শিশুর মতো কাঁদতে শুরু করেছেন। “ওরা আমাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মেরেছে?” থরথর করে কাঁপছিল তাঁর শরীরটা।
“আমার মনে হয় না, যা ঘটেছিল, তার আর অন্য কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব।” নির্লিপ্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন আগন্তুক, “আপনি সারাজীবন যা করেছেন, তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি তো এরকমই কিছু হওয়ার ছিল। তারা আপনাকে ফাঁসিতে লটকে মিনার থেকে ঝুলিয়ে দম বন্ধ করে খুন করেছে; অথচ সেখানে উপস্থিত জনসাধারণের প্রত্যেকে একমত হয়ে রায় দিয়েছিল সেটাই আপনার উচিত শাস্তি। খুন নয়, ন্যায়সংগত হত্যা। আপনি কাঁদছেন! দেখুন পিতা, আমিও কাঁদছি। ওয়াইনস্টাইন বংশের সেই কলঙ্কময় অধ্যায়ের স্মৃতিতে কাঁদছি আমি! আসুন আমার বুকে। একবার জড়িয়ে ধরি আপনাকে।”
অনেকক্ষণ ধরে সস্নেহে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে রইলেন তাঁরা। আলিঙ্গনাবদ্ধ পিতা এবং পুত্র। দুজনেরই চোখে জল। অশ্রুধারায় ধুয়ে যাচ্ছিল ওয়াইনস্টাইন বংশের কলঙ্ক-কালিমা। আরও বেশ কিছুক্ষণ পর যখন আবেগের ঘোর কেটে গেল, চোখের জল মুছে ব্যারন অবাক হয়ে দেখলেন সেখানে আর কেউ নেই। শুধু রয়েছেন তিনি, সঙ্গী বলতে হৃদয়ে সদ্যজাগ্রত বিবেক আর সামনে শূন্য চব্বিশটি মদের বোতল। উধাও হয়ে গেছেন সেই আগন্তুক।
এদিকে ততক্ষণে দুর্গের মাতৃসদনে আঁতুড়ঘর সংলগ্ন সেবিকাকক্ষে শুরু হয়ে গিয়েছে ধুন্ধুমার কাণ্ড। তুমুল হট্টগোল, বিশৃঙ্খলা আর কান্নাকাটি। ঘরটার চারটে বিশাল বিশাল আরামকেদারায় বসে ছিল চার অভিজ্ঞ দাই। প্রত্যেকের কোলের উপর পাতা হাঁসের পালকভরা কাঁথা। প্রত্যেকটা কাঁথায় বিশ্রাম করছিল এক-একটা ছোট্ট মানুষ, যারা সদ্য সদ্যই সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে ওয়াইনস্টাইন বংশের। ঘটনা হচ্ছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত এক দাই ঘুমিয়ে পড়েছিল; যখন সে জেগে উঠল, দেখল তার কোল শূন্য। উদ্বিগ্ন সেবকদের তাৎক্ষণিক জনগণনা প্রকাশ করেছিল সেই বিস্ময়কর সত্য—যে চারটে আরামকেদারা, চার অভিজ্ঞ দাই-মা আর তাদের কোলের চারটে হাঁসের পালকের তৈরি কাঁথা বহাল তবিয়তে থাকলেও সেখানে সদ্যোজাত শিশুদের সংখ্যা ছিল মাত্র তিন। চটজলদি বাইরের মহল থেকে ডেকে আনা হয়েছিল দুর্গে উপস্থিতদের মধ্যে গণিত আর হিসাবশাস্ত্রের একমাত্র বিশেষজ্ঞ সেনেশালকে। অবশ্য তাঁর গণনা শুধু এটাই নিশ্চিত করেছিল যে, যা ভয় করা হচ্ছিল, সেটাই সঠিক। সদ্যোজাত চতুষ্কের একজন উধাও।
সেই ভয়াবহ সংকটময় পরিস্থিতিতে যা যা ব্যবস্থা নেওয়ার, তার প্রত্যেকটা নেওয়া হয়েছিল অত্যন্ত দ্রুত এবং আপৎকালীন ভিত্তিতে। তবে নিষ্ফল রইল ঘরটার প্রত্যেকটা কোণ উলটে-পালটে খুঁজে দেখার যাবতীয় প্রচেষ্টা। এরপর থরে থরে সাজানো যত কাঁথা-চাদর আর ঝুড়ি ভরতি ন্যাকড়া সব উঠিয়ে-সরিয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজে ফেলা হয়েছিল ঘরের সম্ভাব্য সমস্ত জায়গা। ফলাফল সেই লবডঙ্কা। অবশেষে অনুসন্ধানের আওতা বাড়িয়ে খুঁজে দেখা হল দুর্গের বাদবাকি সমস্ত জায়গা। সেনেশাল এমনকি তাঁর বিশ্বস্ত আর বিচক্ষণ অনুচরদের পর্যন্ত ঘোড়ায় চাপিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিল আশপাশের যাবতীয় গাঁ-গঞ্জে খোঁজখবর করতে। যদিও তাদের প্রত্যেকেই ফিরে এসেছিল ঘাড় লটকে মুখ ঝুলিয়ে; উধাও-হয়ে-যাওয়া ভন ওয়াইনস্টাইনের কোনো চিহ্ন কোথাও পাওয়া গেল না।
পরবর্তী গোটা একটা ঘণ্টা ধরে ঘরটার মধ্যে চলল তিনটে অবহেলিত শিশুর কান্না। সেই কান্না মিশে গেল তাদের হিস্টিরিয়াগ্রস্ত মায়ের বিলাপের সঙ্গে, কেন-না ততক্ষণে তাদের দায়িত্বে থাকা দাইরা আর তাদের দিকে নজর দিতে পারছিল না, তারা তখন অতীব ব্যস্ত তাদেরই মায়ের সেবায়। অবশেষে ঘণ্টাখানেক পরে সকলের যথাসাধ্য প্রচেষ্টায় খানিকটা সামলে উঠেই হুজুরাইন মহাশয়া তাঁর সেবিকাদের শেষবারের মতো গণনা করে দেখতে অনুরোধ করলেন, ভরসা সম্ভবত তাঁরও ছিল না, কিন্তু তবুও কেন কে জানে, অনুরোধ করে বসলেন। আর অবাক কাণ্ড—তিনটে কাঁথার উপরে শুয়ে শুয়ে একসুরে গলায় গলা মিলিয়ে তিনটে শিশু তখনও কেঁদে চললেও, চতুর্থ কাঁথার উপরে নিঃশব্দে শুয়ে ছিল চতুর্থ শিশু—মুখে তাঁর রহস্যময় হাসি, গালে সদ্য শুকিয়ে-যাওয়া অশ্রুর চিহ্ন।
*১ ওয়েইনস্টাইন (Weinstein): সুইটজ়ারল্যান্ডের মারবাখের কাছে অবস্থিত এই দুর্গের প্রতিষ্ঠা হয় ত্রয়োদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। রাইন নদীর উচ্চ অববাহিকায় অবস্থিত এই ব্যক্তিগত মালিকানাধীন মধ্যযুগীয় দুর্গটি জার্মানির মধ্যযুগের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
*২ সেনেশাল (Seneschal): মধ্যযুগীয় অভিজাত বা রাজপরিবারের গার্হস্থ্য কর্মসম্পাদনব্যবস্থার প্রধান, যিনি অন্যান্য সমস্ত চাকরবাকর, কর্মচারীর এবং তার সঙ্গে প্রয়োজনমাফিক এস্টেট বা দুর্গের যাবতীয় কার্য ইত্যাদির তত্ত্বাবধান করেন। মূলত একজন প্রধান তত্ত্বাবধায়ক।
*৩ ম্যালথাস (Thomas Robert Malthus): থমাস রবার্ট ম্যালথাস (জন্ম: ফেব্রুয়ারি ১৭৬৬—মৃত্যু: ডিসেম্বর ২৩, ১৮৩৪) একজন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ এবং অর্থনীতির উপর জনসংখ্যার প্রভাব বিষয়ক ম্যালথাস-তত্ত্বের জনক। তাঁর তত্ত্ব অনুসারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি সর্বদাই খাদ্য সরবরাহের সীমানা ছাড়িয়ে যাবে এবং প্রজননের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বিনা মানবজাতির উন্নতি অসম্ভব।
*৪ সন্ত ক্রিস্টোফার (St. Christopher): খ্রিস্টীয় বিশ্বাস অনুযায়ী সম্রাট ডেসিয়াসের (২৪৯-২৫১) সমসাময়িক সন্ত ক্রিস্টোফার (Saint Christopher) ছিলেন দীর্ঘদেহী এবং অত্যন্ত শক্তিশালী একজন মানুষ। বাইবেলে তাঁর নামের উল্লেখ না-পাওয়া গেলেও বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর জীবনে ঘটা বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনার সম্পর্কে বিবরণ পাওয়া যায়। গোটা বিশ্বে, বিশেষ করে ইটালিতে তিনি ব্যাপকভাবে সম্মানিত হয়ে থাকেন। কথিত আছে, তিনি শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন, ক্ষুধার্ত শিশুদের জন্যে রুটির ব্যবস্থা করতেন, নিজের কাঁধে চাপিয়ে পথিকদের নদী পারাপার করাতেন।
*৫ সপ্ত-নিদ্রালু (Seven Sleepers): ক্রিশ্চান আর মুসলিম, দুই ধর্মেই জনপ্রিয় এবং প্রাচীন এক কিংবদন্তি রয়েছে এই সপ্ত-নিদ্রালুদের নিয়ে। ক্রিশ্চানদের কিংবদন্তিটি এইরকম—সম্রাট ডেসিয়াসের অধীনস্থ ইফিশের সাতজন তরুণ ক্রিশ্চান সৈন্য (ম্যাক্সিমিলিয়ান, মার্টিনিয়ান, জন, ইয়ামলিকাস, ডায়োনিসিয়াস, কনস্টানটাইন এবং অ্যান্টোনিনাস) পাগান-ধর্মানুসারীদের উপাস্য পৌত্তলিক দেবতাদের উপাসনা করার বিরুদ্ধতা করার ফলে তৎকালীন রোমান শাসকদের বিষনজরে পড়ে যায়। প্রাণরক্ষার তাগিদে তারা পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেয় এক গুহার মধ্যে। রোমান সম্রাট সেই খবর পেয়ে বাইরে থেকে পাথর বসিয়ে বন্ধ করে দেয় সেই গুহার একমাত্র বেরোবার পথ। কথিত আছে যে, সেই সাতজন বিদ্রোহী ক্রিশ্চান যুবক সেই গুহার মধ্যে অলৌকিকভাবে নিদ্রাভিভূত হয়ে পড়ে থাকে বছরের পর বছর। প্রায় দু-তিনশো বছর পরে, যখন খ্রিস্টধর্ম আর শাসকের বিষনজরে নেই, সেই থিয়োডোসিয়াস দ্বিতীয়ের রাজত্বকালে যখন গুহাটি পুনরায় খোলা হয়, তখন তারা জেগে ওঠে। জেগে ওঠার পর তাদের ধারণা হয় যে, এর মধ্যে মাত্র এক বা দুই দিন কেটেছে। এই গল্পটি অর্থোডক্স চার্চ আর ক্যাথলিক চার্চ—উভয় মত অনুসারেই মৃতদেহের পুনরুত্থানের প্রমাণ হিসেবে সম্মানিত। ইসলামে ওই সাতজন আসহাব আল-কাহফ (গুহার সঙ্গী) নামে পরিচিত এবং কিংবদন্তিটি সামান্য অন্যরকমভাবে কোরানের সুরা ১৮-এ উল্লেখ করা আছে। দুটো কিংবদন্তিই বর্তমানকালের সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশন জাতীয় গল্পের মতো এবং সম্ভবত রিপ ভ্যান উইঙ্কলের লেখক এই কিংবদন্তিদ্বয়ের থেকে অনুপ্রাণিত হলেও হয়ে থাকতে পারেন।
Tags: একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা, এডওয়ার্ড পেজ মিচেল, রুদ্র দেব বর্মন
