হরণ
লেখক: অনুষ্টুপ শেঠ
শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব
চোখ খুলেছি, অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। শরীরে সাড় ফিরে আসার পর হাতের ভরে আস্তে আস্তে উঠে বসেছি, তারপর উঠে দাঁড়িয়েছি, সে-ও না হোক পনেরো মিনিট হবে! এতক্ষণে চোখ সয়ে গেছে অন্ধকারে।
যদিও পুরোপুরি অন্ধকার বলা ঠিক না। একটা সবুজ আলোর মৃদু আভা লেগে আছে বাতাসে। আলোটার কোনো উৎস এখনও অবধি চোখে পড়েনি। হয়তো এ গ্রহের বাতাসটাই অমন, আলোর আভায় ভরা। হ্যাঁ, হাতে লাগানো প্রোস্ক্যানার বলছে, এ গ্রহে বায়ুমণ্ডল আছে, যদিও তা পৃথিবীর তুলনায় বহুগুণ পাতলা।
কী ভাগ্যিস আমার স্পেসসুট-বর্মটার কোনো ক্ষতি হয়নি! সময়মতো স্কাইজাম্প মোডে ক্যাপসুল থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম কিনা! তবে গ্রহের মাধ্যাকর্ষ মেপে নেওয়ার সময় হয়নি, ল্যান্ডিং বেশ বাজেভাবেই হয়েছিল। স্পেসসুটের দয়ায় সেরকম চোট না হলেও, ঝাঁকুনি লেগেছিল ভালোই।
ক্যাপসুলটা ওইদিকে কোথাও পড়েছে। মাটিতে পড়ার পর আমার দিক গুলিয়ে গেলেও, আমার প্রোস্ক্যানার নির্ভুল বলে দিচ্ছে, কোনদিকে কতদূরে ওটা পড়ে আছে। তার অ্যানালিসিস অনুযায়ী, এই মুহূর্তে আশপাশে কোনো বিপজ্জনক কিছুও নেই।
দিক সেট করে পা বাড়ালাম। ক্যাপসুলটা সারিয়ে নেওয়া এখন আমার প্রথম কাজ। এর চেয়েও অনেক খারাপ ল্যান্ডিং-এ পড়েছি এর আগে, এই বায়োক্যাপসুলগুলো এতটাই মজবুত যে প্রায় কিছুই হেলদোল হয় না। শুধু একবার ঠিক পাসওয়ার্ড দিয়ে সিস্টেম রিবুট করে দিলেই নিজে থেকে যা দরকার, সারিয়েসুরিয়ে খাড়া হয়ে যায় পরবর্তী স্পেস-জাম্পের জন্য।
প্রথমদিকে সব ঠিকঠাকই চলছিল। সিকি রাস্তা যাওয়ার পর থামতে বাধ্য হলাম।
স্পেসসুটের হেলমেটের কাচ ঝাপসা হয়ে উঠছে কেন? গুঁড়ি-গুঁড়ি এই যে অজস্র দাগে ভরে যাচ্ছে চোখের সামনেটা… এগুলো…
যেন…
যেন বাইরে বৃষ্টি পড়ছে?
অবিশ্বাস্য! কারণ, প্রোস্ক্যানার খুব স্পষ্ট করেই জানাচ্ছে এ গ্রহে জল বা জলীয় বাষ্পের অস্তিত্ব নেই।
তবে একটু পরেই বুঝলাম ব্যাপারটা। ওগুলো জলই, তবে কাচের বাইরে না, ভিতরে।
বাইরের তাপমাত্রা এতই হিমশীতল যে আমার নিশ্বাসে যেটুকু জলীয় বাষ্প বের হচ্ছে, সব জমে যাচ্ছে কাচের সংস্পর্শে এসে।
জমুক, ক্ষতি নেই। এই জলই সুটের মাধ্যমে আবার আমার শ্বাসবায়ুর সঙ্গে মিশে শরীরে ফিরে যাবে। আবার এগোই। আমার হাতে পাক্কা দু-দিন আছে, তার মধ্যেই কাজ সেরে বেরিয়ে যেতে হবে এখান থেকে। পরের কাজের বায়না ঢুকে গেছে এর মধ্যেই।
কিন্তু এতক্ষণে কি কাছাকাছি এসে যাওয়া উচিত ছিল না? এখনও কিছু চোখে পড়ছে না কেন? আমার প্রোস্ক্যানার যে বলছে, সুটের অক্সিজেন লেভেল কমে এসেছে!
কেন, সেটা বুঝলাম আরেকটু পর। গ্রহটার জমি অসম্ভব উঁচুনীচু। সোজা পা ফেলে হাঁটা অসম্ভব, কম গর্ত দেখে ঘুরে ঘুরে উঠে নেমে যেতে হচ্ছে। কিন্তু উপর থেকে প্রোস্ক্যানার এই ঢালের ব্যাপারটা ঠিকমতো হিসাব করেনি… বললাম তো, তাড়াহুড়ো করে ফেলেছি, পুরো স্ক্যান না করে শুধু বেসিক চালিয়েই নেমে এসেছি… কাজেই সে সরলরেখায় দূরত্ব মেপে গ্র্যাভিটির হিসাব কষে ক্যাপসুল থেকে আমায় ইনজেক্ট করেছে।
সরলরেখা হলে এতক্ষণে পৌঁছে যেতাম।
এখন অক্সিজেন যা আছে, তাতে পৌঁছোতে পারব কি না বুঝতে পারছি না। নার্ভাস লাগে। যথাসম্ভব জোরে ছুটতে শুরু করি।
***
কীভাবে যে ছুটে ছুটে বাকি দূরত্ব পেরিয়েছি, আমিই জানি।
ক্যাপসুলটায় পৌঁছে, আগে একটা সিলিন্ডার টেনেহিঁচড়ে বার করে সুটে রিফিল করলাম। উফ, শান্তি! মাথা ঝিমঝিম করা শুরু হয়ে গিয়েছিল। যতখানি ভেবেছিলাম, তার চেয়েও বেশি চোট খেয়েছে ক্যাপসুলটা। তবে সারানো সম্ভব। একটু পরিশ্রম হল রিবুট করতে গিয়ে, সিকোয়েন্সটা যেখানে এন্ট্রি করতে হয়, সেখানে পৌঁছোতেই পারছিলাম না প্রথমে—অনেক কসরত করতে হল। সে যাক, এবার আমায় কাজের কাজটা করার প্ল্যান ছকতে হবে।
খিদে পাচ্ছে। কিন্তু ক্যাপসুলটা সোজা হয়ে না-দাঁড়ানো অবধি ওর মধ্যে ঢুকে র্যাশনের ব্যাগটা খুঁজে আনা মুশকিল। তার চেয়ে একটা বেলা পেটে কিল মেরে চালিয়ে দেওয়া ভালো। না খেয়ে থাকা তো নতুন কিছু না, সেই যখন থেকে বাপ-মা-পরিত্যক্ত হয়ে একা একা খুঁটে খেতে শিখেছি, তখন থেকেই উপোস করা অভ্যাস হয়ে আছে।
আমার পরিচয়টাই দিইনি, না? আমার নাম রুহানা। রুউউ-হান্না। এইভাবে উচ্চারণ করবেন। স্কিমিশি ভাষায় ওটার মানে সুন্দর মনের মেয়ে। স্কিমিশির নাম শোনেননি তো? শোনার কথাও না আপনাদের। বৃহস্পতির বসতিগুলোয় ল্যাবরেটরিতে বানানো এই কৃত্রিম ভাষাটা প্রচলন করেছিল যে নেতৃত্ব, তাদের উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর ভিন্ন ভাষাভাষীদের মধ্যে ঐক্য নিয়ে আসা। সে তো হলই না, মাঝ থেকে আমাদের মতো কয়েকটা জেনারেশন মায়ের ভোগে গেল, কারণ সরকার তাদের আজন্ম জবরদস্তি স্কিমিশি ছাড়া আর কোনো ভাষা ব্যবহার করতেই দেয়নি। আমার মতো যাদের ঘটে একটু পদার্থ ছিল, তারা বড়ো হয়ে নিজে নিজে কিছু অন্য ভাষা শিখে নিয়ে করেকম্মে খাচ্ছে—বাকিরা এখনও অনুবাদ যন্ত্রের সাহায্যে কায়ক্লেশে চালাচ্ছে।
এই ঐক্য জিনিসটা ভারী অদ্ভুত, মাঝে মাঝেই কোনো না কোনো দল দেখি, ঐক্য নিয়ে বেজায় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে। অথচ, মানুষ কোনোকালে সবাই একরকম ছিল নাকি, যে আজ একসঙ্গে একভাবে চলবে? এ তো আর রোবো গ্রেডের নিখুঁত প্রোডাকশন নয়! মানুষ মানেই খ্যাঁচাখেঁচি, আকচা-আকচি, হিংসে, লোভ, পেজোমি…
ভাগ্যিস! এগুলোর মধ্যে ওই লোভ নিয়ে আমার কারবার। মাঝে মাঝে খুবই ক্লান্ত লাগে, জানেন! সারাজীবন কী যে চক্কর কেটে গেলাম, অমুকের জন্য ইউরেনাসের হিরে বৃষ্টির মধ্যে তাক বুঝে হাতসাফাই করো, তমুকের জন্য মঙ্গল গ্রহের কোথায় আঁকাবাঁকা শিঙের মতো পাথর ফর্ম করেছে, লুকিয়ে গিয়ে ভেঙে আনো। সব কাজ এমন সাদামাটাও হয় না, একবার অ্যান্ড্রোমিডার প্রান্তে গ্যাসীয় স্তরের এক গ্রহ থেকে জাল ফেলে ফেলে এক বস্তা দুর্লভ কোয়ার্টজ় কণা তুলে আনতে গিয়ে আরেকটু হলেই পটোল তুলছিলাম! অবশ্য দামও পেয়েছিলাম তেমনি!
বুঝে ফেলেছেন হয়তো, আমি হলাম পেশাদার চোর। তবে চোর বলে অবজ্ঞা করবেন না। একটা স্পেস হেলমেট বা কিছুটা স্পেসশিপের ফুয়েল—এসব ছিঁচকে চুরি আমি করি না। আমি হলাম বিশেষজ্ঞ চোর—সংগ্রহযোগ্য বহুমূল্য জিনিসপত্র চুরি করতে ধনী লোকেরা আমায় ভাড়া করে। যেমন জিনিস, তেমন দাম বুঝে দেয়। স্পেস-আর্ট ডিলারদের মধ্যে আমার বিশাল কদর, হুঁ!
এ গ্রহের জিনিসটা ঠিক কী, তা এখনও আমি জানি না। এরকমই হয় স্পেশাল অর্ডারের ক্ষেত্রে। আমার সঙ্গের মেমো কার্ডে সমস্ত ডিটেলস আছে, কিন্তু সেটা পড়া যাবে একটা নির্দিষ্ট সময়েই শুধু। পাছে আমি আগে থেকে জেনে ফেলে অন্য কোনো ডিলার খুঁজে নিই, যে আমায় বেশি কমিশন দেবে—তাই এই সাবধানতা। গ্রহে না-নামা অবধি জানতেই পারব না শালা, কী করতে হবে। শুরুর দিকে কতবার হয়েছে, নির্দেশ দেখার পর মনে হয়েছে যে, অমুক যন্ত্রটা বা অস্ত্রটা আনা দরকার ছিল কাজটার জন্য! কিন্তু কিছু করার নেই, এ কাজের এমনই ধরন। সবরকম পরিস্থিতির জন্যই তৈরি হয়ে আসি এখন তাই।
আরও দেড় ঘণ্টা দেরি আছে সে সময়টা আসতে। ঘুমিয়ে নেব একটু, না কী?
গ্রহের এই সব্জেটে আলোটা বড্ড মুড অফ করে দিচ্ছে। সেসব কিছুর উপর শ্যাওলা জমে আছে যেন!
ধুত্তোর। ঘুমিয়েই নিই।
***
গ্রহের সব চেয়ে উঁচু জায়গা এই পাহাড়টা। ঘাড় কাত করে কেন, চিত হয়ে শুয়ে পড়লেও চূড়াটা চোখে পড়ছে না আমার। এটার উপরে উঠতে হবে আমাকে।
বিশ্বাস করুন, এইসব মুহূর্তে মনে হয়, কেন যে মরতে এসব করি! তার চেয়ে ফিরে গিয়ে কমিউনিটি কিচেনে ডাল সেদ্ধ করার কাজ নিয়েই না হয় কাটিয়ে দিই বাকি জীবন।
তারপর মাথার মধ্যে সেই চেনা সুরে বাঁশি বাজা শুরু হয়। পেশিতে পেশিতে ঢেউ তোলে সে সুর। শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়।
ওসব বাঁধা গতের জীবন কি আমার জন্য নাকি! আমি অসাধারণ! বিপদের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ে গায়ের জোরে মনের বলে বুকের সাহসে লড়ে জয় ছিনিয়ে আনার জন্যই আমি জন্মেছি! রক্তে আমার লেগেছে আজ সর্বনাশের নেশা…
স্পেসসুটের আঙুলে ম্যাগনেটো হোল্ডার আছে। অ্যাকটিভেট করে নিলে, ওগুলোর সাহায্যে যে-কোনো সারফেসে টিকটিকির মতো চলাফেরা করা যায়। পাহাড় যত উঁচুই হোক, উপরে ওঠাটা আমার কাছে সমস্যা নয়। সমস্যা হল উপরে ওঠার এমন একটা পথ খুঁজে নেওয়া, যাতে উপর থেকে আমায় চোখে পড়বে না।
এ পাহাড়ের চূড়াতেই গাঁথা আছে সেই মনোক্লিনিক ক্রিস্টাল-শেরুয়াইট, স্পেস-আর্টের দুনিয়ায় যাকে গজমোতির সমতুল্য বলা যায়। নির্দেশটা পড়ে প্রথমে আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না! শেরুয়াইট তো গল্পকথা বলেই জানতাম! এত বছর ধরে বিশ্বের এত জায়গা চষে এলাম, শেরুয়াইট নিয়ে জল্পনাকল্পনা ছাড়া কিছু শুনিনি কোথাও! এ মক্কেল কী করে জানল এর অস্তিত্ব?
এক-একবার এখনও মনে হচ্ছে, ব্যাটা পাগল না তো? হয়তো অমন কোনো রূপকথা কি গুজব শুনেই হুজুগে মেতে আমায় পাঠিয়ে দিয়েছে এই ধাপধাড়া গোবিন্দপুরে… থুড়ি, নেভাসেন্ট্রিকো বলয়ের এই ৬ নম্বর গ্রহাণুতে। এ কাজে এমন ভুলভাল মক্কেলও তো হয়! একজন একবার যেমন পৃথিবী গ্রহের কেদারতাল হ্রদের খানিকটা জল নিয়ে আসার জন্য আমায় ভাড়া করেছিল। স্রেফ খানিকটা জল বোতলে ভরে আনা—ঠিক আছে, জায়গাটা পারমাণবিক বিকিরণে ভরা আর হাই সিকিউরিটি জ়োন বলে প্রহরীরা কাউকে দেখতে পেলেই গ্রেফতার করে, কিন্তু আমার মতো স্কিলের কাউকেও লাগে না এসব পাতি কাজের জন্য! মাঝে মাঝে মনে হয়, যে যত ধনী, সে তত খ্যাপা!
যাক গে। আদ্ধেক পাওনা, যা অলরেডি অ্যাকাউন্টে ঢুকে গেছে, তা-ই যথেষ্ট বেশি। আর পাহাড়ের এই ঢালটা মনে হচ্ছে যথেষ্ট সামনে ঝোঁকা। উপর থেকে কেউ ঝুঁকে পড়লেও গা বেয়ে উঠে-আসা এইটুকুনি মানুষকে দেখতে পাবে না। এখান দিয়েই উঠি তবে!
উপর থেকে কে দেখে ফেলতে পারে বলে এত হিসাবনিকাশ, জানতে ইচ্ছে হচ্ছে তো? ব্যাপার হল, শেরুয়াইট যেমন শুধু গল্পকথা বলেই জেনেছিলাম এতদিন, মুগারু সম্বন্ধেও আমার জ্ঞান তথৈবচ। এক অজর অমর ভয়ানক দানব, যে পাহারা দেয় শেরুয়াইট পাথর—এই হল সব লোককথার মূল। কেউ বলে তার ছখানা হাত, মুগুরের মতো। কেউ বলে লাল টকটকে মুখ, চোখ থেকে লেজ়ার রশ্মি বেরোয়।
আমার সঙ্গে থাকা মারণাস্ত্রগুলোর একটাও এর উপর কাজ করবে কি?
জানি না। তবে নিজের উপস্থিতবুদ্ধি আর ক্ষিপ্রতার উপর আমার আস্থা আছে।
খুব সতর্কভাবে উপরে উঠতে থাকি হাত-পা চালিয়ে। একটাও নুড়ি যেন গড়িয়ে না পড়ে নীচে, এতটুকু শব্দও যেন মুগারুকে আমার উপস্থিতি জানান না দেয়।
***
বহুক্ষণ লাগল। পাহাড়টার উচ্চতা অনুযায়ী আরেকটু তাড়াতাড়ি হবে, আশা করেছিলাম, কিন্তু উপরদিকে পাহাড়ের গা-টা কিছুটা পিছল। এটা সিলেবাসে ছিল না। খুব একটা সমস্যা হয়নি অবশ্য, প্রাথমিক চমকটা কেটে যাওয়ার পর এক্সট্রা গ্রিপ মোড অন করে স্পিড কমিয়ে নিতেই ম্যানেজ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সময় লেগে গেল বেশি।
যাক গে। উপরে উঠে, মাটির উপর দিয়ে শুয়ে শুয়ে চলে এসেছি বেশ কিছুটা ভিতরে। এখনও অবধি কোথাও কোনো প্রাণের চিহ্ন নেই। প্রোস্ক্যানার জানাচ্ছে, ৩০ ডিগ্রি নর্থ-ইস্টে আরও কুড়ি মিনিটের দূরত্বে একটা অত্যুজ্জ্বল রত্নের উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে। সেটা যে কী, সে নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই আর! এমন সাইজ়, এমন শেপ… আর এতরকম রঙের বিশ্লেষণ… প্রোস্ক্যানার বলেই দিচ্ছে, চেনা কোনো মেটিরিয়ালের সঙ্গে মিল পায়নি। উত্তেজনায় আমার লোম খাড়া হয়ে উঠছে—মানে গায়ের লোম যদি লেজ়ার ট্রিটমেন্ট করে উড়িয়ে না দিয়ে থাকতাম তো খাড়া হয়ে উঠত আর কী! সত্যি সত্যি শেরুয়াইটের দেখা পেতে চলেছি আমি!
আলোটা কমে এল কেন হঠাৎ? না, আমার সুটের ব্যাটারি তো ঠিকই আছে। তবু, যেন…
প্রোস্ক্যানার বিপ বিপ করে উঠল। লাল ফ্ল্যাশ ঝলসে উঠল একবার চোখের সামনে।
বিপদ?
আবারও চারপাশ স্ক্যান করলাম। কিছুই ধরা পড়ল না।
অন্ধকারটা বেড়ে উঠতে ব্যাপারটা বোধগম্য হল। বিপদ আমার মাথার উপরে, আকাশ থেকে নেমে আসছে। যত কাছে আসছে, তার ছায়া তত গাঢ় হয়ে আমার দৃষ্টি ঢেকে দিচ্ছে।
ঝট করে গড়িয়ে চিত হয়ে গেলাম।
চোখ সরাতে পারছিলাম না।
বিশ্বসংসারে আমিই কি তবে প্রথম মানুষ, যে নিজের চোখে মুগারুকে দেখল?
***
উপর থেকে যে প্রাণীটা সাবমেরিনের ডেপ্থ চার্জের মতো গতিতে আমার দিকে নেমে আসছিল, সেটা দেখতে একটা অতিকায় প্রজাপতির মতো।
হ্যাঁ, আশ্চর্য শুনতে লাগলেও, চারদিকে ছড়ানো চারটে ডানা দেখে প্রথমে আমার তেমনই লাগল। কিন্তু না, দাঁড়ান! প্রজাপতি না বলে ফড়িং বলা ভালো. ল্যাজটা আগে দেখতে পাইনি, এখন পাচ্ছি। ওই তো সেটা এঁকেবেঁকে দুলে দুলে উঠছে!
যেভাবে নেমে আসছে, তাতে আমাকে যে দেখতে পেয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই! আড়াল খুঁজতে হবে এক্ষুনি।
গ্রহের জমির ভাঁজগুলোকে এখন আশীর্বাদ বলে মনে হচ্ছিল। ঝট করে একটার ঢালের পিছনে চলে যেতে পেরে সেকেন্ডের ভগ্নাংশে বেঁচে গেলাম ধারালো নখগুলোর থেকে। বোঁ করে ইউ-টার্ন করে আবার উঠে যাচ্ছে প্রাণীটা… ল্যাজের শেষে স্টিলের তরোয়ালের মতো একগুচ্ছ কাঁটা ঝলসে উঠল এই সবুজ আলোতেই।
মুগারু! মুগারু!!!
আমি ভুল দেখছি, নাকি গ্রহের বায়ুমণ্ডলের কারসাজি? যত উঠছে, তত আগুনের মতো তেতে উঠছে মুগারুর শরীর। এখন স্রেফ একটা আগুনের গোলা যেন… উফ! চেয়ে থাকতে পারছি না এত উজ্জ্বল।
নড়াচড়া করার সাহস হয় না, নিজেকে গর্তের খাঁজে মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি।
উল্কার মতো জ্বলন্ত শরীরটা আবার ছোঁ মারে নীচে, ঠিক আমার দিকে।
আবারও, এক ইঞ্চির জন্য বেঁচে যাই।
উঁহুঁ, এভাবে বেশিক্ষণ চলবে না। প্রাথমিক আতঙ্কটা কেটে গিয়ে মাথা ঠান্ডা হতে শুরু করে। চকিতে পরপর ভেবে নিই, ল্যাসো? লেজ়ার? ফায়ারবল? তির? কোন মোডটা একে ঘায়েল করার জন্য ব্যবহার করা উচিত?
ল্যাসো প্রথমেই বাতিল। এত বিশাল চেহারার প্রাণী ল্যাসো ছিঁড়ে বেরিয়ে যাবে। যতই সুপার টাইটানিয়ামের রজ্জু হোক। বা আরও খারাপ, আমায়-সুদ্ধু টেনে তুলে নিয়ে যাবে।
লেজ়ার এর উপর কাজ করবে কি? এমন তরল আগুনের মতো শরীর আগে কোনো প্রাণীরই দেখিনি। একই কথা ফায়ারবল সম্বন্ধেও। নীল আগুনের যে তীব্র ঝলকটা আমার স্পেসসুটের বর্ম পাঠাতে সক্ষম, সেটা এর গায়ে লেগে নিজেই ছ্যাঁকা খাবে না তো?
তাহলে রইল পড়ে তির।
আদিম যুগের অস্ত্রের নামে নাম রাখলেও, এ এক সাংঘাতিক হাতিয়ার আজকের দিনের। ম্যাগনেশিয়ামের মধ্যে সেরামিক সিলিকন কার্বাইডের ন্যানোপার্টিক্ল ইনফিউস করে তৈরি হয় স্ট্রংটিয়াম। সে ধাতু টাইটানিয়ামের চেয়েও ঢের শক্ত, অথচ হালকা। তিরগুলো তা-ই দিয়েই তৈরি। আর তিরের ফলা তো আরও মারাত্মক—ফাঁপা একটা স্ট্রাকচার, যা অসম্ভব ধারালো অনেকগুলো শলাকার সমাহার। লক্ষ্যবস্তু ভেদ করলে তিরের ফলাটা ফুল ফোটার মতো করে ছড়িয়ে পড়ে… আর ওই প্রচণ্ড তীক্ষ্ণ শলাকার মতো জিনিস আক্রান্তের শরীরে গেঁথে যায় সজোরে!
যদি লাগাতে পারি, মুগারু কিছুটা অন্তত জখম হবে!
প্রাণীটা আকাশে চক্কর কাটছে। ঝাঁপাচ্ছে না আর। তাক খুঁজছে মনে হয়। আমি লাফিয়ে উঠে সটান ছুটে যাই শেরুয়াইট যেদিকে আছে বলে দেখাচ্ছিল প্রোস্ক্যানার, সেইদিকে। আকাশে চোখ রেখেই যাই… যা ভেবেছিলাম! ওটা আবার ঘুরপাক খেয়ে নেমে আসছে…
আরেকটু নামাতে হবে। আরেকটু। নাগালের মধ্যে এলে তবেই…
উত্তেজনায় বুকের মধ্যে দামামা বাজছে।
আয়, আয়, আর একটুখানি, আয়…
সজোরে বোতামে চাপ দিই। আমার হাতের পাশের খাপ থেকে বিদ্যুদ্গতিতে ছুটে যায় মৃত্যুবাণ…
কিন্তু মুগারু যেন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। কী করে ওই অতিসূক্ষ্ম অস্ত্রকেও সে দেখে ফেলল, জানি না—উড়ানের মাঝপথে ঝট করে অভিমুখ পালটে ডাইভ মেরে জেট ফাইটারের মতোই সরে গেল সে দূরে। অনেকটাই দূরে।
মুখটা তেতো হয়ে গেল। এক-একটা তির জোগাড় করা কী হ্যাপা! গেল একটা অমন দামি জিনিস গচ্চা!
দূর থেকেই আমরা পরস্পরের দিকে নজর রাখি। ফিরে আঘাত করেছি বলে ও আর মুহুর্মুহু ঝাঁপিয়ে পড়ছে না, বরং দূর থেকে চক্কর কেটে বুঝে নিচ্ছে, এই লিলিপুট সাইজ়ের জীব আর কী কী করতে পারে।
আচ্ছা, একটা স্ফটিকখণ্ডের উপর এই অতিকায় ফড়িংমার্কা জীবের এমন দখলদারিই-বা কেন বাপু! কী হবে ওটা না থাকলে?
এককালে এসব গল্পকথা ছিল, কোনো পুরোহিত প্রাণ দিয়ে মন্দিরের দেবতাকে পাহারা দিত; কোনো যাযাবর দল প্রজন্মের পর প্রজন্ম উপত্যকার পশুদের রক্ষা করত… অবাক হয়ে টের পেলাম, মুগারুকে নিয়ে ভয়ানক সব গল্প শুনলেও, আর শেরুয়াইটের অসীম ক্ষমতা আর সৌন্দর্যের রাশি রাশি বর্ণনা পেলেও… গল্পের এই ফাঁকটা আগে কখনও চোখে পড়েনি আমার। মুগারুকে কে ভার দিয়েছিল শেরুয়াইট রক্ষা করার? কেনই-বা?
এসব ভাবতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। মস্ত বড়ো ভুল ছিল সেটা। এমন একটা ধাক্কা লাগল আচমকা, মাথা টলমল করে উঠল। নিজেকে সামলাতে না সামলাতেই প্রোস্ক্যানারে লাল আলো দপদপ করতে লাগল, সেই সঙ্গে ট্যাঁ ট্যাঁ করে অ্যালার্ম বাজা শুরু হল কানের পাশে।
বিপদ! মারাত্মক বিপদ।
আবারও টলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি, কিছুতে আমায় পিছন থেকে ঠেলা দিচ্ছে। আবার নতুন কী এল—ভেবে ঘাড় ঘুরিয়ে হতভম্ব হয়ে যাই। তবে থেমে থাকি না, আবারও মাটিতে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে গড়িয়ে সরে যাই।
ডানা ঝাপটানোর সাঁইসাঁই শব্দটা নির্ভুল শুনতে পাই এবার। কিন্তু…
কোথায় সে?
আমি তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না! খোলা, ফাঁকা জমি!
অথচ আমি টের পাচ্ছি, বিশাল প্রাণীটা খুব কাছেই নিশ্বাস ফেলছে। তার চারখানা আগ্রাসী ডানা বাতাস কাটছে, দুলে উঠছে ল্যাজ… রাগে গনগন করছে তার চোখ…
ওই তো! নিকষকালো অঙ্গারের মতো চোখ দুটো দেখতে পেয়েছি এবার!
বাকিটা… ওই যে। ওই ডানা নড়ল।
অবিশ্বাস্য!
এত গল্পকথার কোথাও বলা নেই, মুগারু বহুরূপীর মতো গায়ের রং পালটে ফেলে অবিকল মিশে যেতে পারে জমির সঙ্গে!
আয় তবে, সম্মুখসমরই হোক!
বেশি ভাবার সময় পাওয়া যায় না। ফায়ারবল লোড করে নিই মুহূর্তে।
বিশাল ডানা ছড়িয়ে অজানা জীবটা আমার দিকে তৃতীয়বার ছোঁ মারে। আগের দুবারের মতো ডানার ঝাপট এবার আমায় ছুঁতে পারেনি… সরে গেছি দ্রুত, আর সঙ্গে সঙ্গে ছুড়ে দিয়েছি তীব্র নীল রঙের ঝলক! ইয়েস! লেগেছে এটা! সাপের মতো ছোবল মেরেছে গিয়ে গলার কাছাকাছি।
প্রাণীটা ভয় পেয়েছে!
তাড়াহুড়ো করে উড়ান দেয় মুগারু। আর উঠে যাওয়ার মুহূর্তে তার দীর্ঘ কাঁটাওয়ালা ল্যাজ ছুঁয়ে যায় আমার হেলমেটে।
আতঙ্কিত চোখে আমি দেখি, আমার চোখের ঠিক সামনে হাজারো বিপদে অপ্রতিরোধ্য অক্ষয় প্লেক্সিগ্লাস কাচের গায়ে সূক্ষ্ম একটা চিড়ের দাগ ফুটে উঠেছে। ঝট করে হেল্থ চেক করে বুঝি চিড়টা বাইরের স্তরে, ভিতর অবধি না, তাই আপাতত প্রাণের ঝুঁকি নেই। কিন্তু আবার যদি এমন আঘাত লাগে তাহলে আর দেখতে হবে না!
এর ফাঁকে ফাঁকেই মুগারুর গতিবিধির দিকেও নজর রাখতে হয়। আবার যদি অমন বহুরূপীগিরি করে অলক্ষে কাছে চলে আসে…
কিন্তু না, সত্যিই ভয় পেয়েছে ওটা, মনে হচ্ছে। অনেক উপরে উড়ছে গোল হয়ে। নামার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
এগোব এই ফাঁকে? স্ফটিকটার কাছে গেলে নিশ্চয় আবার আক্রমণ করবে মুগারু। একটা ফায়ারবল, যতই জুতসই জায়গায় লেগে থাকুক-না কেন—বড়ো জখম করতে পারবে বলে মনে হয় না ওকে। বেশ, আসুক। তখন আবার লড়ব।
আরেকবার হেলমেটটা চেক করে নিয়ে প্রোস্ক্যানারের নির্দেশিত দিকে এগিয়ে যাই।
***
দশ হাতের মধ্যে চলে এসেছি। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, মাটির উপর একটা খোঁদলে আলগা শোয়ানো আছে স্ফটিকটা।
আহাহা… কী রূপ গো!
এত রঙের আলোও হয় ভুবনে? রঙের খেলায় সব ভাবনাচিন্তা ধুয়ে ভেসে যাচ্ছে আমার। এমন অসহ্য সুন্দর কিছু কখনও দেখিনি আগে।
আমি, যে কিনা সারা ব্রহ্মাণ্ড ঘুরে ঘুরে মহাকাশের যত মহার্ঘ দ্রব্য তুলে আনি—সেই আমার মনে হচ্ছে, সৃষ্টির সারাৎসার যেন এই স্ফটিকখণ্ডের মধ্যে ধরা আছে! এ যেন সৌন্দর্যের আদি ও অন্ত!
দুর শালা! এরপর তো কবিতা লিখতে শুরু করব!
কিন্তু মাইরি কী অপূর্ব একটা জিনিস! সাধে কি আর মক্কেল এমন জলের মতো টাকা খরচ করছে!
এই সময়ে মুগারু আবার আমায় আক্রমণ করল। তবে আচমকা না। এত রোমান্টিক ভাবনাচিন্তার মধ্যেও আমার স্নায়ু টানটান হয়ে ছিল এই আক্রমণটার অপেক্ষাতেই। সরে গিয়ে কাটালাম, বলতে গেলে অনায়াসেই। কিন্তু আমার কপাল এতই খারাপ, যে এত কাছ থেকেও তিরটা লাগাতে পারলাম না গায়ে।
যেন বা ডানার হাওয়াতেই সেটা পাশের দিকে ছিটকে পড়ে গেল।
খুঁজে কুড়িয়ে এনে আবার লোড করার অবস্থা ছিল না, বলা বাহুল্য। প্রতি সেকেন্ডে মুগারুর ঠোঁট, ডানা, নখ আমায় তাক করে ধেয়ে আসছিল, আমি বারবার কোনোমতে কাটাচ্ছিলাম। পরপর লেজ়ার ছুড়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু মুগারু সেসব টের পেল বলেও মনে হল না।
এমনভাবে স্ফটিকটার সামনে আড়াল করে রেখেছিল প্রাণীটা, যে আমি এক-পা-ও কাছে যেতে পারছিলাম না। কতক্ষণ কেটে গেল, এভাবে কে জানে! ভেবেছিলাম, এত ধুমসো একটা দানব নিশ্চয় খুব একটা বুদ্ধিমান হবে না। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, তা নয়। মুগারু ইচ্ছা করে আমায় খেলাচ্ছে, নিজে সামান্য হেলেদুলে আমায় বারবার ছোটাচ্ছে। বিড়াল যেমন ইঁদুর নিয়ে খ্যালে।
আমার হাঁপ ধরছিল। পায়ের নড়াচড়া আর আগের মতো ক্ষিপ্র হচ্ছিল না। শ্বাস পড়ছিল ঘনঘন। বুঝতে পারছিলাম, মুগারুও তীক্ষ্ণ চোখে আমায় দেখছে। সম্ভবত এবার সে সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণ করবে…
আর সে দাপুটে আঘাত ঠেকানোর মতো জোর আর আমার নেই।
মরিয়া মানুষ শেষ চেষ্টা হিসাবে যা হোক কিছু আঁকড়ে ধরে, জানেন তো? আমিও কেমন খ্যাপার মতো হাত চালালাম তালুর ডায়াল প্যাডে। যদি ল্যাসোর টানাটানিতে আমি নিজেই ঘায়েল হই, বা ছিঁড়ে যায় আমার শেষ অস্ত্রটাও… তবু তো জানব, না লড়ে জমি ছাড়িনি!
চোয়াল শক্ত করে বোতামে চাপ দিলাম।
এ কী! কই? কিছুই হল না কেন?
তবে কি খারাপ হয়ে গেল সুট? জ্যাম? এই তবে আমার শেষ? ‘মানবজাতির ইতিহাস’ ক্লাসে পড়া বহু যুগ আগের মহাকাব্য মনে পড়ে গেল, কার যেন রথের চাকা মাটিতে বসে গিয়েছিল মৃত্যুর সামনে এসে…
পাথরের মতো ভার বুকে নিয়ে চোখ তুলে তাকালাম সাক্ষাৎ মৃত্যুদূতের দিকে। ভয়? নাহ্! মরি তো চোখে চোখ রেখেই মরব।
ডানা আফসাচ্ছে মুগারু। ঝাঁপিয়ে পড়বে? স্টিলের মতো ঝকঝক করছে ঠোঁট। কতখানি লাগবে ওই ধারালো বাঁকা ঠোঁট বুকে ঢুকে গেলে?
মুগারুর পায়ের দিকে চোখ চলে গেল নিজের অনিচ্ছাতেও। বাঁকা, বিশাল নখ চারটে করে। তার উপরের অংশে কাঁটা-কাঁটা চামড়া।
এতক্ষণ লাগছে কেন?
অবাক হয়ে দেখলাম, যাকে আমি আক্রমণের প্রস্তুতি ভাবছিলাম, তা আসলে যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ। প্রাণীটা কোনো অজানা কারণে ছটফট করছে, পায়ে পায়ে সরে যাচ্ছে ডানদিকে।
কী হল এটা?
ইতস্তত করে কয়েক পা এগিয়ে গেলাম ওর দিকে।
আরও ঝটপট করে উঠে সরে গেল মুগারু, তারপর আমায় একদমই হতচকিত করে ডানা মেলে উড়ে গেল আকাশে।
যাক্কলা!
নিজের সুটের দিকে চোখ ফেরাতে, এতক্ষণে দপদপ-করা সবুজ আলোটা চোখে পড়ল। বাতাসের সবুজাভার সঙ্গে সেটা প্রায় মিশেই যাচ্ছে।
খুঁটিয়ে দেখতেই গণ্ডগোলটা ধরতে পারলাম। উত্তেজনায়, ভয়ে বা তাড়াহুড়োয় সিকোয়েন্স ভুল দিয়েছি কিপ্যাডে। ল্যাসোর বদলে এয়ার সিগনাল জ্যামার চালু হয়ে গেছে। এটা চালালে আমার চারদিকের কয়েক মিটার বলয় জুড়ে একটা বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গ পাঠাতে থাকে আমার স্পেসসুট-বর্ম। স্পেস চেকিং স্টেশনগুলোর আশপাশ দিয়ে যেতে হলে এটা চালাই, আমার অস্তিত্ব ওরা টের না পায় যাতে।
আর এই ফ্রিকোয়েন্সিই সহ্য হচ্ছে না মুগারুর!
মার দিয়া কেল্লা!!!
আকাশে মুগারুকে আর দেখতে পাচ্ছি না। পালিয়েছে শেষমেশ! শেরুয়াইটটা বগলদাবা করে এবার কেটে পড়ি!
কাছে যাই নির্বিঘ্নে। সুন্দর! সুন্দর! উফ, বলে বোঝাতে পারব না কী সুন্দর!
নীচু হয়ে তুলে নেব বলে হাত বাড়াই।
আমার চোখের সামনে স্ফটিকটা কেঁপে ওঠে থরথর করে। চমকে হাত সরিয়ে নিই।
এত আলোর মধ্যেও ঠাহর করে দেখি, স্ফটিকের কেন্দ্রে ইয়াব্বড়ো লাল চুনির মতো কিছু একটা দানা বেঁধে রয়েছে।
এটা কোনো বোমা-টোমা নয় তো আবার?
স্পর্শ না করেই ঝুঁকে চারদিক থেকে দেখতে থাকি। স্ফটিকের আলো বিচ্ছুরণকারী আবরণের মধ্যে তরল কিছু নড়ছে, মনে হয়। মধ্যের লাল চুনির মতো জিনিসটা তাতে সাঁতার কাটছে যেন। খুব ধীরে, কিন্তু নির্ভুল নড়ছে সেটা অল্প অল্প।
কোথায় দেখেছি আমি এরকম সান্দ্র তরলের মধ্যে ভেসে-বেড়ানো কিছু? এরকম থিরিথিরি কাঁপুনির সাঁতার কাটা?
মাথার মধ্যে টিপটিপ করতে থাকে। গলা শুকিয়ে খুব জোর জলতেষ্টা পায়। উবু হয়ে বসে পড়ি নিজেকে সামলাতে।
তখনই ওকে আবার টের পাই আমি। দূরত্ব রেখেই, বহুরূপীর মতো রং মিলিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে মুগারু।
ও কি বুঝতে পারছে যে, আমি এতক্ষণে বুঝেছি, কেন শেরুয়াইট রক্ষা করতে মুগারু প্রাণও দিতে রাজি?
চোখের মধ্যে জ্বালা করছে। ঘাড়ে সিমেন্ট করে দিয়েছে যেন কেউ। ইউএসজি-তে বেবিটা এইভাবে ভেসে বেড়াত। রোবোটিক প্রোব ঘুরত আমার পেটের উপর, আর সামনের স্ক্রিনে আমি ওকে দেখতাম।
এক উজ্জ্বল আলোর দলা।
অনেক টাকার দরকার ছিল তখন। ঝুঁকি নিয়ে ভুলভাল কাজ নেওয়া, নিয়ে বিপদে পড়া, আর ভুল পার্টনার যে রক্ষীদের স্পেস রেসার তেড়ে আসছে দেখে আমায় ফেলে নিজেকে বাঁচিয়ে কপ্টার নিয়ে পালিয়েছিল… এইসব কারণে সে আলো নিবে গিয়েছিল। যখন আবার বৃহস্পতির দাতব্য চিকিৎসালয়ে ফিরে যেতে পারলাম, তখন আর কোনো হৃৎস্পন্দন নেই আমার পেটে।
মুগারু এখনও কাঁপছে। কষ্ট হচ্ছে ওর, দৃশ্যতই। তবু সেভাবেই এগিয়ে আসে সে, আমার দিক থেকে একবারও চোখ না সরিয়ে শেরুয়াইটের একদম পাশে এসে দাঁড়ায়। কুঁজো হয়ে, আমার এত কাছে আসতে গিয়ে ওর সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে।
তালুর উপর হাত চালিয়ে জ্যামার বন্ধ করি। মুগারুর কাঁপুনি থামে, আস্তে আস্তে সোজা হয়ে দাঁড়ায় আবার।
দুজনে দুজনের দিকে চেয়ে থাকি। অনন্তকাল, মনে হয়। তারপর চারটে অপরূপ সুন্দর ডানা নেমে এসে স্ফটিকের মতো উজ্জ্বল গোলকটাকে জড়িয়ে ধরে। শেরুয়াইটের আলোয় এখন ডানাগুলোর রং ফিকে গোলাপি।
আমি আস্তে আস্তে পিছিয়ে আসি। ফেরার রাস্তা ধরি। আর ফিরে তাকাই না।
সুটের সেফটিমিটার এখনও সবুজ, এই রক্ষা। কিন্তু দ্রুত ফিরে যেতে হবে ক্যাপসুলে। চিড়টা যত সূক্ষ্মই হোক, ক্ষতি করছে। নামা অবশ্য অনেক কম সময়ে হল, ফিক্সাররোপার দিয়ে এক-একবারে অনেকটা করে নেমে আসতে পারছিলাম দড়ি বেয়ে। নীচে নেমে দৌড় দিলাম সিধে। সবুজ রং আস্তে আস্তে কমলার দিকে যাচ্ছে এবার। সময় কম।
ক্যাপসুলটা যখন আর কয়েক গজ দূরে কমলা থেকে লাল হয়ে গেল সেফটিমিটার। শেষটুকু প্রায় উড়ে গেলাম সর্বশক্তি দিয়ে। ভিতরে ঢুকে, হ্যাচ বন্ধ করে হেলমেট খুলতে পারলাম যখন, তখন শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেছে আমার।
ক্যাপসুলে একটাই বসার চেয়ার। নিজেকে ছুড়ে দিলাম তার উপর। নেতিয়ে পড়লাম, বলা যায়। বড়ো বড়ো শ্বাস নিতে নিতেই মনে হচ্ছিল, মুগারুর হাতেও আর সময় নেই বেশি।
আমার ফিরে যাওয়ার পর অবধারিত আর কেউ আসবে। অন্য কোনো স্পেস-আর্ট তস্কর। অন্যসব লাইনের মতো এতেও কম্পিটিশন যথেষ্ট বেশি আজকাল। চিনিও তাদের অনেককেই। আমায় টেক্কা না দিতে পারলেও, তাদের কেউ কেউ যথেষ্ট দক্ষ।
আর, তাদের তো আর শূন্য থেকে শুরু করতেও হবে না!
অক্ষম রাগ হয় একটা ভিতরে। নিজের বুকের দিকে তাকাই একবার। চিপটা ওখানেই বসানো। পরিষ্কার দৃশ্য, স্পষ্ট আওয়াজ। আমার এ গ্রহে নামার পর থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওটা সব রেকর্ড করে যাচ্ছে।
ওই চিপটা হাতে নেওয়ার পর শেরুয়াইট ঠিক কোথায় আছে থেকে মুগারু কোন অস্ত্রে ঘায়েল হয়—সবই মুহূর্তে জেনে যাবে আমার মক্কেল। পরের এজেন্টের জন্য দেওয়া নোটে থাকবে সেসব ইনস্ট্রাকশন।
নিজেকে নিয়ে ভাবতে ইচ্ছা হয় না। শুধু তো অগ্রিম টাকা সব ফেরত দিতে হবে, তা-ই না, হাতে পেয়েও কাজ শেষ না-করার জন্য যে বদনামটা হবে, তা অকল্পনীয়। এ মক্কেলের যা খুঁটির জোর, আমার জেল হয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়।
ভুল করলাম কি?
আরেকবার কিছু ছেঁড়া-ছেঁড়া ছবি মুখের সামনে ফুটে ওঠে। অপারেশন থিয়েটার। সাদা বিছানা। নীল নিথর দেওয়াল। অসহ্য গোঙানির কান্না। তীব্র, আকুলিবিকুলি কান্না।
এই কান্নাটা সেবার আমার গলা থেকেই আসছিল।
ফেরার সিকোয়েন্স ইনিশিয়েট করি।
দশ মিনিট।
মনে মনে হিসাব করি, ঠিক কতক্ষণ পর আমার বদলি আর কেউ এই গ্রহে এসে নামতে পারে।
ডিমটা কি তার আগে ফেটে যাবে? মুগারু কি ছানাকে নিয়ে নিরাপদ আর কোনো জায়গায় সরে যেতে পারবে?
খুবই কম সম্ভাবনা।
টিক টিক করে সময় কমছে। সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে লিমাঙের কথা মাথায় ভেসে এল।
কিপ্যাডের দিকে হাত বাড়িয়েও থমকাই। করব?
আমি কি জানি না, করলে কী কী হতে পারে?
লিমাং আমার লাইনেরই লোক, তবে ওর কাজ শিল্পবস্তু নিয়ে না, প্রযুক্তি নিয়ে। অনেকরকম হ্যাক ওর আয়ত্তে আছে। শরীর থেকে চিপ রিলিজ় করারও। তবে সেগুলো সাধারণ বাকাসা চিপ, সরকার থেকে যা লাগিয়ে দেয় ট্র্যাকিং-এর জন্য। আমি টেকনোলজির ওস্তাদ নই, কিন্তু আমার বুকে যেটা বসানো আছে, তা যে অনেক উন্নতমানের লেটেস্ট কিছু, তা বুঝি। যতদূর জানি, যতবার ভুল পাসওয়ার্ড দেওয়া হয়, সারা শরীরে ভয়াবহ যন্ত্রণা ছড়িয়ে দেয় এই চিপগুলো।
কতটা ব্যথা টের পাব, সেরকম হলে?
অপারেশন টেবিলে আমার শরীর থেকে যখন ছিঁড়েখুঁড়ে বার করে নেওয়া হচ্ছিল মরা বাচ্চাটাকে, তখন কিছু টের পাইনি। পেয়েছিলাম অ্যানেস্থেশিয়ার ঘোর কেটে যাওয়ার পর, সারা পেট, তলপেট জুড়ে তরল আগুনের মতো যন্ত্রণা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিচ্ছিল। টানা সাত দিন যন্ত্রণায় কাতরেছিলাম।
আলতো হাত দিয়ে একবার তলপেট ছুঁই। তারপর অভ্যস্ত হাতে সেট-করা কোর্স পালটাতে শুরু করি। লিমাঙের আস্তানা ডেপাডেলি ৫, খুব দূর নয় এখান থেকে।
অর্ডার ওভাররাইট করে ফেলতে বেশিক্ষণ লাগে না। এবার পালাতে হবে। এই কোর্স পালটানোটা ওরা টের পাওয়ার আগেই বেরিয়ে যেতে হবে নাগালের বাইরে।
যাত্রা শুরুর নির্দেশ দিই। ক্যাপসুলটা থরথর করে কেঁপে ওঠে। পরক্ষণেই ছিটকে যায় ডেপাডেলি ৫-এর উদ্দেশে।
নিরাপদ দূরত্ব পার হওয়ার পর গা এলিয়ে বসি কনট্রোল চেয়ারে। যে কথাটা এতক্ষণ ইচ্ছে করে, জোর করে ভুলে ছিলাম, সেটাকে মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করি এবার। পাঁচবার ভুল পাসওয়ার্ড দেওয়া হলে এই চিপটা সেল্ফ-ডেস্ট্রাক্ট করবে… সঙ্গে টুকরো-টুকরো করে দেবে, যার গায়ে লেগে আছে তার হৃৎপিণ্ড।
হাসি পায়। যেন এখনই কত আস্ত আছে!
যতক্ষণে ওরা বুঝবে, আমি ইচ্ছা করে পালিয়েছি, ততক্ষণে আমি হয় মুক্ত, নয় মৃত।
তারপরও নতুন এজেন্ট কেউ আসবে বই-কি। এত সহজে কি আর বড়োলোকেরা ছেড়ে দেয়! কিন্তু তারা অন্তত জানবে না, কী কৌশলে মুগারুকে হারিয়ে দেওয়া যায়। লড়াইটা হবে সমানে সমানে। এত বছর লোককথায় অজর অমর হয়ে বেঁচে আছে যে জীব, সে এই লড়াইটাও সামলে নিতে পারবে, আশা করি।
ওর দুর্বলতা চিরতরে লুকিয়ে রাখা—এই সাহায্যটুকুই আমি ওকে দিতে পারলাম। এইটুকু তো একজন হতে-না-পারা মা আরেক হতে-চলা মায়ের জন্য করতেই পারে!
Tags: অনুষ্টুপ শেঠ, একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা
