এ মার্শিয়ান ওডিসি
লেখক: স্ট্যানলি জি. ওয়েনবাম, অনুবাদ: রাকেশকুমার দাস
শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব
জারভিস যতটা পারল, হাত-পা ছড়িয়ে বেশ আরাম করে গা-টা এলিয়ে দিল। এরিস মহাকাশযানের একটি ঘুপচি বসার ঘর এটি, খুব বেশি জায়গা নেই আরাম করার।
“এখানে বেশ নিশ্বাস নেওয়া যাচ্ছে,” বেশ খুশি মনে হল তাকে, “বাইরে বাতাস এত পাতলা! সেই তুলনায় ভেতরের বাতাস মনে হচ্ছে এক বাটি ঘন সুপ!” পোর্টহোলের কাচের ওপারে থাকা মঙ্গল গ্রহের সমতলভূমির দিকে মাথা নাড়িয়ে ইঙ্গিত করল জারভিস। কাছের উপগ্রহটি থেকে আসা মলিন আলোয় বিষণ্ণ ও নিষ্প্রাণ দেখাচ্ছে মঙ্গল গ্রহের মাটি।
বাকি তিনজন বেশ করুণার দৃষ্টি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। প্রথমজন পুট্জ, এই যানটির ইঞ্জিনিয়ার। দ্বিতীয়জন হল লেরয়, একজন জীববিজ্ঞানী। তৃতীয় ব্যক্তি হল জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও এই অভিযানের ক্যাপটেন হ্যারিসন। জারভিস এই বিখ্যাত অভিযাত্রীদের দলে রসায়নবিদ হিসেবে রয়েছে। এরাই প্রথম মানুষ, যারা পৃথিবীর রহস্যময় পড়শি গ্রহ মঙ্গলে প্রথম পা রেখেছে। তবে এও ঠিক, বছর কুড়ি আগে আমেরিকার উন্মাদবিজ্ঞানী ডোহেনি যদি নিজের প্রাণের বিনিময়ে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর নিখুঁত পদ্ধতিটা না বের করে যেত, আর সেই সঙ্গে সমান উন্মাদ কার্ডোজা যদি না দশ বছর আগে সেই পদ্ধতি ব্যবহার করে চাঁদে পাড়ি না দিয়ে ফেলত তাহলে আজ হয়তো এইদিন দেখতে হত না। আধ ডজন চন্দ্রাভিযান আর সম্মোহিনী শুক্রের দিকে ধাবিত হওয়া মন্দভাগ্য ডে-ল্যান্সির অভিযান বাদ দিলে এরিসের এই চারজনকেই মহাকাশযাত্রার প্রকৃত অগ্রদূত হিসাবে ধরা যেতে পারে। এরাই পৃথিবী ব্যতীত অন্য কোনো গ্রহের অভিকর্ষ বল অনুভব করার সৌভাগ্য অর্জন করে। পৃথিবী ও চাঁদের সংসার থেকে বেরিয়ে-আসতে-পারা প্রথম অভিযাত্রীও এরাই। যাবতীয় বাধাবিপত্তি আর কৃচ্ছ্রসাধনের কথা বিচার করলে, এই খ্যাতি ও সাফল্যের সম্পূর্ণ হকদার তারা। বেয়াড়া পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য মাসের পর মাস ‘জলবায়ু অভ্যাস’ কক্ষে সময় কাটানো, মঙ্গলের মতো ক্ষীণ বাতাসে নিশ্বাস নেওয়া অভ্যাস করা, একবিংশ শতকের বদমেজাজি রিঅ্যাকশন মোটরচালিত রকেট নিয়ে মহাশূন্য অতিক্রম করার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া—এসব তো ছিলই, আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল একেবারেই অজ্ঞাত একটি জগতে পা রাখার সাহস জুগিয়ে ওঠা।
জারভিস ফ্রস্টবাইট-হয়ে-যাওয়া নাকের ডগাটা আঙুল দিয়ে ঘষে নিল। আবার হাত-পা ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বড়ো করে একটা তৃপ্তির নিশ্বাসও ফেলল।
“কই, এবার শুনি কী ব্যাপার তোমার,” হ্যারিসন হঠাৎ খেপে উঠল, “সেই তো ল্যাংবোট রকেট নিয়ে উধাও হলে, দশ দিন কোনো দেখা নেই। শেষে পুট্জ তোমাকে আর তোমার কিম্ভূত উটপাখি বন্ধুকে পিঁপড়ের ঢিপি থেকে টেনে বের করল বলে এখন তুমি এখানে আরাম করতে পারছ। ঝেড়ে কাশো দেখি, বাপু।”
“ঝেড়ে কাশো?” লেরয় হতবুদ্ধি হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কেন? কাশবে কেন হঠাৎ?”
পুট্জ শান্তস্বরে বলল, “ঝেড়ে কাশো, মানে পুরো ঘটনাটা খুলে বলো।”
হ্যারিসনের কৌতুক-মাখা চোখের দিকে তাকিয়ে জারভিস বলে উঠল, “ঠিক বলেছ কার্ল, তাহলে শুরু করা যাক!”
“যেমন হুকুম দিয়েছিলে, কার্লকে উত্তরের দিকে যেতে দেখে আমিও ওই ল্যাংবোট রকেটের গুমোট বাক্সে ঢুকে পড়লাম আর উড়ে গেলাম দক্ষিণের দিকে।” জারভিস বলতে শুরু করল, “তোমার নিশ্চয়ই মনে থাকবে ক্যাপটেন, আমাদের নামার অনুমতি ছিল না। আগে থেকে নির্দিষ্ট-করে-রাখা জায়গাগুলোতে উপর থেকেই অনুসন্ধান চালিয়ে ফিরে আসার কথা। আমি তো ক্যামেরা চালু করে প্রায় দু-হাজার ফিট উপরে উড়ছিলাম। এত উপরে ওড়ার কারণ হল, ক্যামেরাতে অনেকটা বিস্তীর্ণ জায়গার ছবি আসবে, পাশাপাশি নীচে নামলে প্রচুর ধুলো উড়বে। নামেই বায়ুমণ্ডল, বায়ু বলে তো কিস্সু নেই, প্রায় বায়ুশূন্য বললেই চলে, এত পাতলা।”
“এসব পুট্জই আমাদের বলেছে।” হ্যারিসন যেন একটু মেজাজ হারাল, “তার চেয়ে ফিল্মগুলো বাঁচানোর চেষ্টা করলে ভালো করতে, ও থেকেই আমার অভিযানের পুরো খরচ উঠে আসত। মনে আছে, চাঁদের প্রথম ছবি নিয়ে কীরকম কাড়াকাড়ি পড়ে গিয়েছিল?”
“ফিল্ম অক্ষত আছে। কোনো চিন্তা নেই।” পালটা ঝাঁজ দেখাল জারভিস, তারপর আবার কাহিনিতে ফেরত গেল, “১০০ মাইলের কম স্পিডে গেলে এই পাতলা বাতাসে ডানায় বল পাওয়া যায় না, তাই নীচের জেটগুলো চালাতেই হল। এই জেট, উচ্চতা আর গতিবেগের কারণে নীচের কিছুই প্রায় দেখা যাচ্ছিল না, তাও গত এক সপ্তাহ ধরে আমরা যা দেখে আসছি, তার চেয়ে আলাদা কিছু ছিল না, সেটা হলফ করে বলতে পারি। সেই থকথকে ঝোপের মতো সব গজিয়ে রয়েছে, আর কাতারে কাতারে হামাগুড়ি-দিয়ে-যাওয়া গাছের মতো দেখতে পোকার দল, যেগুলোকে লেরয় বায়োপড নাম দিয়েছে। আমি তো আমার রাস্তায় চলতে লাগলাম। প্রতি ঘণ্টায় আমার অবস্থান পাঠিয়ে যাচ্ছিলাম, তবে তোমরা সেগুলো পাচ্ছিলে কি না জানি না।”
“হ্যাঁ, তা পেয়েছি।” হ্যারিসন মেনে নিল, তবে মাথা এখনও ঠান্ডা হয়নি, বোঝা গেল গলার স্বরে।
জারভিস নির্বিকারভাবে বলতে লাগল, “দক্ষিণে আরও দেড়শো মাইলটাক যাওয়ার পর নীচের চেহারা বদলে গেল। জায়গাটা একটা নীচু মালভূমিমতো, কমলা রঙের বালিভরা মরুভূমি ছাড়া আর কিছু নেই সেখানে। বুঝতে পারলাম, আমাদের অনুমান ঠিকই ছিল। আমরা যেখানে অবতরণ করেছিলাম, সেটা সত্যিই মেয়ার সিমেরিয়াম অঞ্চলই ছিল, আর এই মরুভূমি অঞ্চলটি হল জ্যানথাস। আমার হিসেব ঠিক থাকলে আরও দুশো মাইল গেলেই মেয়ার ক্রোনিয়াম নামের ধূসর সমতলভূমি পাব। তারপর আবার কমলাবালির মরুভূমি আসবে, থাইল ১ কিংবা থাইল ২। আমি সেইমতো চললাম।”
ক্যাপটেন গজগজ করে বলে উঠল, “আরে, পুট্জ দেড় সপ্তাহ আগেই আমাদের অবস্থান যাচাই করে ফেলেছে। মোদ্দা কথায়, এসো তাড়াতাড়ি।”
“আসছি আসছি, সেখানেই তো আসছি।” জারভিস বলতে লাগল, “থাইলের ভিতর কুড়ি মাইল যেতে-না যেতেই, বিশ্বাস করবে না, একটা খাল পেরোলাম।”
“এরকম খালের ছবি পুট্জ একশোটা তুলেছে। নতুন কিছু শোনাও।”
“পুট্জ কি শহরের ছবিও দেখিয়েছে?”
“নিদেনপক্ষে কুড়িটা তো হবেই, অবশ্য তুমি যদি বালির স্তূপকে শহর বলতে চাও।”
“বেশ,” কিছুক্ষণ হ্যারিসনের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে জারভিস বলল, “তাহলে এখন থেকে আমি সেগুলোই বলব, যেগুলো পুট্জের দেখতে পাওয়ার কথা নয়।”
নাকটা সুড়সুড় করছিল বলে একবার নাকটা ঘষে নিল জারভিস। তারপর বলল, “আমি জানতাম, এই ঋতুতে ১৬ ঘণ্টার মতো দিনের আলো পাব, তাই আটশো মাইল আট ঘণ্টায় অতিক্রম করে ফিরে আসার মনস্থির করলাম সেখান থেকে। তখনও থাইলের উপরেই আছি, থাইল পেরোতে হয়তো আর পঁচিশ মাইলমতো হবে, তখনই পুট্জের আদরের মোটরখানি বিগড়ে গেল।”
“বিগড়ে গেল? তার মানে?” পুট্জকে কিছুটা উদ্বিগ্ন মনে হল।
“অ্যাটমিক ব্লাস্টের জোরটা কমে এসেছিল। দ্রুত বেগে নীচের দিকে পড়তে লাগলাম। তারপরই ধড়াম! একেবারে থাইলের মাঝখানে! জানলার কাচে আমার নাকটাও পিষে গেল।” মুখটা ব্যাজার করে আবার নাক ঘষে নিল জারভিস।
“সালফিউরিক অ্যাসিড দিয়ে চেম্বারটা পরিষ্কার করে নিতে পারতে তো, মাঝে মাঝে সিসার থেকে একটা আলাদা রেডিয়েশন আসে—”
“না, করে নিতে পারতাম না! দশবার করার পর এগারোবারের বার করতে আমার খুবই কষ্ট হত! তার উপর আছড়ে পড়ার ফলে ল্যান্ডিং গিয়ারের দফারফা হয়ে যায়, আর জেটগুলো সব চুরমার হয়ে যায়। আর ইঞ্জিন চালু হলেই বা কী লাভ হত। ব্লাস্ট করিয়ে দশ মাইল উঠতে-না উঠতেই নিজের মেঝে তাপে গলে যেত। নেহাত এক পাউন্ড এখানে সাত আউন্সের মতো ওজন হয়, না হলে আমি তো ওখানেই আলুভর্তা হয়ে যেতাম।”
“আমি থাকলে ঠিক সারিয়ে ফেলতাম, তেমন কঠিন কিছু ছিল না।”
“তা ছিল না বটে, কিছু সেটিকে আর ওড়ানো গেল না।” জারভিস বিদ্রুপের সঙ্গে মেনে নিল পুট্জের কথা: “তেমন কিছু সমস্যা হয়নি বটে, তবে কেউ আমাকে তুলে না নিয়ে এলে আটশো মাইল হেঁটে ফেরা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না। মঙ্গল ছাড়তে হয়তো কুড়ি দিনের মতো বাকি, তার মানে দিনে চল্লিশ মাইল তো হাঁটতেই হবে। তেমন কী আর সমস্যা?”
নাকে হাত বোলাতে বোলাতে জারভিস একটু থেমে বলল, “যা-ই হোক, আমি হাঁটা শুরু করলাম। তোমরা দেখতে পেলে তুলে নেবে, তার কিছুটা আশা তো ছিলই, নয়তো বসে থাকার মতো ইচ্ছে আমার ছিল না।”
হ্যারিসন বলল, “হ্যাঁ, আমরা নিশ্চয়ই খুঁজে বের করে নিতাম তোমাকে।”
“হ্যাঁ, পেতে নিশ্চয়ই। যা-ই হোক, আমি সিটবেল্ট দিয়ে জলের ট্যাংকটা পিঠে বেঁধে নিলাম। পিস্তল আর কার্তুজ নিয়ে, আর সামান্য কিছু শুকনো খাবার নিয়ে হাঁটা লাগালাম।”
“জলের ট্যাংক?” ছোটোখাটো চেহারার জীববিজ্ঞানী লেরয় যেন আঁতকে উঠল, “সে তো সিকি টন হবে ওজনে!”
“আরে পুরো ভরতি ছিল না। পৃথিবীর হিসেবে আড়াইশো পাউন্ড, এখানে সেটা পঁচাশি। এদিকে আমার নিজের দুশো দশ পাউন্ড মঙ্গলে স্রেফ সত্তর। সব মিলিয়ে তো একশো পঞ্চান্ন হচ্ছে, যা আমার পৃথিবীর ওজনের থেকেই ঢের কম।
“আমি বেশ দ্রুতই এগোচ্ছিলাম লাফিয়ে লাফিয়ে। আট ঘণ্টা দিনের আলো মানে কুড়ি মাইল বা তার বেশি পথ পার হতে হবে। নরম বালির মরুভূমির উপর দিয়ে একা হাঁটাটা বড়ো একঘেয়ে—দেখার মতো কিচ্ছু নেই, এমনকি লেরয়ের ওই বায়োপডগুলোও নেই কোথাও। তবে ঘণ্টাখানেক পর একটা খালের দেখা পেলাম। চারশো ফুট চওড়া শুকনো নালামতো, রেলওয়ের ম্যাপের লাইনের মতো একেবারে সোজা।
“তবে মনে হল, এই খালে কোনো সময়ে জল ছিল। নালাটি মনে হল সবুজ ঘাসে ঢাকা। কিন্তু যেই আমি এগোলাম, ঘাসজমিটা দূরে সরে গেল।”
“অ্যাঁ? সে কী?” লেরয় চমকে উঠল।
“আজ্ঞে হ্যাঁ, এগুলো তোমারই বায়োপডদের জ্ঞাতিভাই। আমি একটাকে ধরেও ফেললাম, আঙুলের মতো লম্বা ফালি ঘাসের মতো চেহারা, তার নীচে সরু টিংটিঙে দুটো পা!”
“সেটি কোথায় গো?” লেরয় মনে হল খুব উৎসুক দেখার জন্য।
“সেটি আমি ছেড়ে দিয়েছি গো! ওটা নিয়ে আমার দাঁড়িয়ে থাকার জো ছিল না গো! আমি সেই চলমান সবুজ ঘাসের কার্পেটের মধ্যে দিয়েই হেঁটে চললাম। আমার সামনে কার্পেটটা ফাঁক হয়ে হাঁটার জায়গা করে দিচ্ছিল, আর এগিয়ে গেলেই পেছনে সেটা আবার জুড়ে যাচ্ছিল। এইভাবে হেঁটে কিছুক্ষণ পর থাইলের কমলা মরুভূমির মধ্যে এসে পড়লাম।
“বালির উপর দিয়ে হাঁটাহাটিতে কিছুক্ষণেই ক্লান্ত হয়ে পড়লাম আর কার্লের ওই লজ্ঝড়ে মোটরের মুণ্ডপাত করছিলাম। সূর্যাস্তের ঠিক আগে আমি থাইলের শেষ প্রান্তে পৌঁছোলাম, আর নীচে ধূসর মেয়ার ক্রোনিয়ামকে দেখতে পেলাম। জানতাম, এর উপর দিয়ে আরও পঁচাত্তর মাইল হাঁটতে হবে, তারপর জ্যানথাস মরুভূমির আরও দুশো মাইল, আর সবশেষে মেয়ার সিমেরিয়াম। আমার মনের অবস্থা কেমন ছিল, বলো তো? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছ। আমাকে উদ্ধার করতে আসছ না দেখে তোমাদেরই গালমন্দ করছিলাম মনে মনে!”
“আরে, আমরা তো চেষ্টা করছিলাম, হাঁদারাম!” হ্যারিসন বলল।
“তাতে কিছুই যে লাভ হয়নি, সে তো বোঝাই যাচ্ছে। যা-ই হোক, ভাবলাম, দিনের আলো থাকতে থাকতে থাইলের খাড়া পাহাড়টা থেকে নীচে নেমে পড়ি। একটা সুবিধেমতো ঢালু জায়গা পেয়ে নীচে নেমে এলাম। এই ‘মেয়ার ক্রোনিয়াম’ জায়গাটা ঠিক এই জায়গার মতোই—উদ্ভট সব পাতাহীন গাছ আর কিছু পোকাজাতীয় প্রাণী। ওদিকে একবার চোখ বুলিয়েই আমি আমার স্লিপিং ব্যাগটা বের করে ফেললাম। সত্যি বলতে কী, ততক্ষণ পর্যন্ত এই মরা গ্রহে ঘাবড়ে যাওয়ার মতো তেমন কিছু দেখিনি—মানে, বিপজ্জনক আর কী।”
“তারপর কিছু দেখেছিলে নাকি?” হ্যারিসন উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“দেখেছিলে নাকি মানে? দেখলাম না আবার! সময় হলেই সব শুনতে পাবে। তো, সবে ঘুমোনোর তোড়জোড় করছি, এমন সময় হঠাৎ কানে এল এক বিকট হট্টগোল!”
“কীসের হট্টগোল?” পুট্জ জানতে চাইল।
“আমি থোড়াই জানতাম কীসের আওয়াজ! পা টিপে টিপে গিয়ে দেখি, একঝাঁক কাক মিলে কয়েকটা ক্যানারি পাখিকে ছিঁড়ে খাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে যা ক্যাঁচর ম্যাচর, কা কা, কুঁ কুঁ শব্দ জুড়েছে, তার আর কহতব্য নয়। কয়েকটা গাছের ডালপালা সরিয়ে সামনে যেতেই দেখি টুইল!”
“টুইল?” হ্যারিসন অবাক।
লেরয় আর পুট্জও সমস্বরে বলে উঠল, “টুইল? টুইল কী আবার?”
“ওই তো, কিম্ভূত উটপাখি,” জারভিস খোলসা করে বলতে শুরু করল, “মুখ দিয়ে থুতু না ছিটকিয়ে যেটুকু বলা যায়, তা হল টুইল। না হলে আসলে বলা উচিত ‘ট্রররররুইরররল্ল্ল’—এরকম কিছু একটা।”
“তা কী করছিল সে?” ক্যাপটেন জিজ্ঞাসা করল।
“কী আর করবে, নিজেকে খাদ্যে পরিণত করছিল আর চ্যাঁচাচ্ছিল। সেটাই স্বাভাবিক, আমি এতে কোনো অন্যায় দেখি না।”
“খাদ্যে পরিণত করছিল? কে খাচ্ছিল এই টুইলকে?”
“সেটা পরে খেয়াল করলাম। দেখলাম, একগুচ্ছ কালো দড়ির মতো শুঁড় পুট্জের বর্ণণা অনুযায়ী একটা উটপাখি গোছের প্রাণীকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। প্রথমে ঠিক করেছিলাম, ওদের ব্যাপারে আমি নাক গলাব না; যদি দুটোই বিপজ্জনক জানোয়ার হয়, তবে একটা মরলে আমারই অর্ধেক চিন্তা দূর হবে।
“কিন্তু ওই উটপাখিজাতীয় প্রাণীটা বেশ লড়াই করে যাচ্ছিল। ওই চিৎকারের ফাঁকে ফাঁকেই নিজের আঠারো ইঞ্চির লম্বা চঞ্চু দিয়ে মোক্ষম সব ঘা মারছিল কালো শুঁড়গুলোতে। আর সেই শুঁড়গুলোর উপর মূল জন্তুটাকে যা দেখলাম,” বলতে বলতে জারভিস একবার শিউরে উঠল, “তবে আমার টনক নড়ল, যখন দেখলাম, ওই উটপাখিটার গলায় একটা ছোটো কালো থলে বা বাক্সোমতো কিছু একটা ঝুলছে! তার মানে ব্যাটা বুদ্ধিমান প্রাণী! হয়তো পোষা, বা নিজেই যথেষ্ট বুদ্ধি ধরে। ওই ব্যাগটা দেখেই আমি ঠিক করে ফেললাম, কী করতে হবে। অটোমেটিক রিভলভারটা বের করে ওই শুঁড়ওয়ালা জন্তুটার যেটুকু যা দেখা যায়, তা-ই লক্ষ করে গুলি চালালাম।
“একঝাঁক শুঁড় ছটফট করে উঠল, কালো পচা রক্তের মতো কী একটা ছিটকে বেরোল, আর তারপর একটা বিতিকিচ্ছিরি চুকচুক শব্দ করে জানোয়ারটা তার শুঁড়গুলো নিয়ে মাটিতে একটা গর্তের ভেতর সেঁধিয়ে গেল। আরেকজন খটখট শব্দ করে গল্ফ স্টিকের মতো সরু ঠ্যাং দুটোর উপর টলমল করে দাঁড়াল এবং হঠাৎ ঘুরে আমার মুখোমুখি হল। আমি বন্দুকটা তৈরিই রেখেছিলাম। আমরা দুজনে একে অন্যের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম।
“মঙ্গল গ্রহের প্রাণীকে কী বলা যায়, মাঙ্গলিক বলা যায় কি? এই মাঙ্গলিকটি ঠিক পাখি নয়। প্রথম দেখায় একটু পাখির মতো মনে হলেও বাস্তবে তা নয়। ঠোঁট একটা আছে বই-কি, আর পালকের মতো কিছু উপাঙ্গও বর্তমান, কিন্তু সেই ঠোঁটটা ঠিক শক্ত ঠোঁট নয়। ওটা অনেকটা নমনীয়, দেখলাম, আগাটা আস্তে আস্তে এদিক-ওদিক দুলছে—ঠিক যেন ঠোঁট আর হাতির শুঁড়ের মাঝামাঝি কিছু একটা অঙ্গ। পা-গুলোয় চারটে করে আঙুল আর হাতে চারটে করে আঙুল—মানে যদি সেগুলিকে হাত বলো তোমরা। গোলগাল একটা শরীর আর লম্বা সরু ঘাড়ের মাথায় ছোট্ট একটা মাথা—আর সেই অদ্ভুত ঠোঁট। উচ্চতায় ওটা আমার চেয়ে ইঞ্চিখানেক লম্বা ছিল। পুট্জ তো জানে, ও তো দেখেছে!”
ইঞ্জিনিয়ার মাথা নেড়ে জানাল যে, সে দেখেছে।
জারভিস বলে চলল, “তো, আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। শেষমেশ প্রাণীটা হরেকরকম কিচিরমিচির আর খটরমটর শব্দ করে তার খালি হাত দুটো আমার দিকে বাড়িয়ে ধরল। আমি ওটাকে বন্ধুত্বের ইঙ্গিত বলেই ধরে নিলাম।”
“হয়তো ও তোমার ওই নাকটা দেখে ভেবেছে তুমি ওর হারিয়ে-যাওয়া ভাই!” হ্যারিসন ফোড়ন কাটল।
“হুঃ! তুমি কথা না বললেও আমাদের হাসি পায় তোমাকে দেখে! তোমাকে আর ফুট কাটতে হবে না। যা-ই হোক, আমি বন্দুকটা খাপে পুরে বললাম, ‘আরে, ওসব ধন্যবাদের কোনো প্রয়োজন নেই’ কিংবা ওই জাতীয় কিছু একটা কথা বলেছিলাম। ওটা অমনি কাছে এগিয়ে এল আর আমাদের মধ্যে দোস্তি হয়ে গেল।
“ততক্ষণে সূর্য অনেকটাই পাটে বসেছে। বুঝলাম, হয় আগুন জ্বালতে হবে, নয়তো এই ‘থার্মো স্কিন’ স্লিপিং ব্যাগে ঢুকতে হবে। অনেক ভেবে শেষমেশ আগুন জ্বালানোই স্থির করলাম। থাইলের পাহাড়ের পাদদেশে একটা জায়গা বেছে নিলাম, যাতে পাথর থেকে তাপটা ঠিকঠাক প্রতিফলিত হয়ে আমার পিঠে এসে পড়ে। আগুনের জন্য শুকনো ঝোপঝাড়ের ডালপালা ভাঙতে শুরু করলাম। আমার সঙ্গীটি চট করে ব্যাপারটা ধরে ফেলল এবং কোলভরে ডালপালা নিয়ে এল। আমি দেশলাই বের করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু মাঙ্গলিকটা তার থলে থেকে জ্বলন্ত কয়লার মতো একটা কিছু বের করল; ওটা ছোঁয়াতেই দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল; আর তোমরা তো জানোই, মঙ্গলের এই হালকা বাতাসে আগুন জ্বালানো কতটা কঠিন কাজ!
“আর ওর ওই ব্যাগটা!” জারভিস আবার বলতে শুরু করল, “ওটা যে প্রাকৃতিক কিছু নয়, হাতে বা কারখানায় তৈরি জিনিস—তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। একপাশে চাপ দিলে ফট করে খুলে যায়, আবার মাঝখানে চাপ দিলে এমন সুন্দরভাবে এঁটে যায় যে, বোঝাই যায় না, কোথাও কোনো জোড় আছে। আমাদের জ়িপারের চেয়ে ঢের ভালো।
“আগুন পোহাতে পোহাতে ভাবলাম, ওর সঙ্গে একটু কথা বলার চেষ্টা করি। নিজের দিকে আঙুল নির্দেশ করে বললাম ‘ডিক’; ও সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপারটা ধরে ফেলল এবং তার হাড়সর্বস্ব হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল ‘টিক’। তারপর ওর দিকে আঙুল দেখাতেই ও সেই ডাকটা দিল, যেটাকে আমি ‘টুইল’ বলছি—ওর ওই উচ্চারণ নকল করা আমার কম্ম নয়। কাজটা বেশ সহজেই হচ্ছিল; নামগুলো মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আমি আবার বললাম ‘ডিক’, আর ওর দিকে আঙুল দেখিয়ে বললাম ‘টুইল’।
“ব্যাস! গোলমালটা ওখানেই পাকাল। ও খটখট করে একটা শব্দ করল, যেটা শুনে মনে হল, ওটা অসম্মতি জানাচ্ছে, আর তারপর বলল ‘প-প-প-প্রুট’। আর সেটা ছিল মাত্র শুরু। ও আমাকে সব সময় ‘টিক’ বলেই ডাকছিল, কিন্তু ওর নিজের বেলায়—কখনও ও ‘টুইল’, কখনও ‘প-প-প-প্রুট’, আবার কখনও ও আরও ষোলো রকমের আজব সব শব্দ করতে লাগল!
“আমরা কোনোমতেই মতৈক্যে আসতে পারছিলাম না। আমি পাথর, তারা, গাছ, আগুন—আরও কত কী বোঝানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু এর উত্তরে অপরদিক থেকে আমি কোনো একক শব্দ পেলাম না! প্রতি দু-মিনিট অন্তর ওর শব্দগুলো বদলে যাচ্ছিল। যদি এটাকে ভাষা বলতে হয়, তবে আমি রসায়নবিদ নই, অ্যালকেমিস্ট! শেষমেশ আমি হাল ছেড়ে দিয়ে ওকে ‘টুইল’ বলেই ডাকতে শুরু করলাম, আর ওটাতেই কাজ হল।
“তবে টুইল আমার কয়েকটা কথা ধরে ফেলেছিল। কয়েকটা শব্দ ও মনে রাখতে পেরেছিল, যা ওরকম একটা ভাষার ক্ষেত্রে এক মস্ত বড়ো কৃতিত্ব বলে ধরতে হবে—যেখানে হয়তো প্রতিমুহূর্তে নতুন নতুন শব্দ তৈরি করে নিতে হয়। কিন্তু ওর কথাবার্তার ধরন আমি কিছুতেই ধরতে পারছিলাম না; হয়তো আমি ওর কথার গূঢ় অর্থগুলো বুঝতে পারছিলাম না, অথবা আমাদের চিন্তাধারাটাই সম্পূর্ণ আলাদা—আর আমার মনে হয় পরেরটাই ঠিক।
“আমার এই ধারণার পেছনে আরও কারণ আছে। ভাষা নিয়ে এভাবে গলদ্ঘর্ম হওয়ার পর আমি হাল ছেড়ে দিলাম, আর অঙ্ক নিয়ে বসলাম। মাটিতে আঙুল দিয়ে লিখলাম দুই আর দুইয়ে চার হয়, তারপর কয়েকটা নুড়িপাথর দিয়ে সেটা বুঝিয়ে দিলাম। এবারও টুইল চট করে ব্যাপারটা ধরে ফেলল, আর আমাকে জানাল যে, তিন আর তিনে ছয় হয়। মনে হল, এতক্ষণে বোধহয় আমরা একটা ঠিকঠাক জায়গায় পৌঁছোতে পেরেছি।
“কাজেই, টুইলের অন্তত একটা প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষা আছে ধরে নিয়ে আমি সূর্যের একটা গোল ছবি আঁকলাম। প্রথমে সূর্যের দিকে আঙুল দেখালাম, তারপর দেখালাম দিগন্তের শেষ রক্তিম আভাটা। এরপর পর্যায়ক্রমে বুধ, শুক্র, আমাদের ধরিত্রী মাতা পৃথিবী আর মঙ্গল গ্রহের ছবি আঁকলাম। সবশেষে মঙ্গলের দিকে আঙুল দেখিয়ে হাতটা এমনভাবে চারদিকে ঘোরালাম, যাতে ও বোঝে যে, আমরা এখন মঙ্গলের বুকেই দাঁড়িয়ে আছি। আমার উদ্দেশ্য ছিল ওকে এটা বোঝানো যে আমার আসল বাড়ি পৃথিবীতে।
“টুইল আমার আঁকা ছবিটা বেশ ভালোই বুঝল। ওর সেই অদ্ভুত ঠোঁটটা দিয়ে ও ম্যাপের উপর খোঁচা মারল, আর অনেকক্ষণ ধরে কিচিরমিচির আর খটখট শব্দ করে মঙ্গলের পাশে ডিমোস আর ফোবসের ছবি এঁকে দিল। শুধু তা-ই নয়, ও পৃথিবীর চাঁদটাকেও এঁকে দেখাল!
“তাহলে বুঝতে পারছ তো, এর মানে কী হতে পারে? এর থেকে প্রমাণ হয় যে, টুইলদের জাতি টেলিস্কোপ ব্যবহার করতে জানে—তার মানে ওরা সভ্য!”
“মোটেই না!” হ্যারিসন আবার তেড়ে উঠল, “এখান থেকে চাঁদকে পঞ্চম শ্রেণির উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো পরিষ্কার দেখা যায়। খালি চোখেই ওটার পরিক্রমণ বোঝা যায়।”
“চাঁদের কথা বাদ দিলাম!” জারভিস বলে উঠল, “কিন্তু আসল জায়গাটা তুমি মিস করে গেছ। বুধ গ্রহ এখান থেকে দেখা যায় না! আর টুইল বুধের কথা জানত, কারণ ও চাঁদকে এঁকেছিল তৃতীয় গ্রহের পাশে, দ্বিতীয় গ্রহের পাশে নয়। ও যদি বুধের কথা না জানত, তবে পৃথিবীকে দ্বিতীয় আর মঙ্গলকে তৃতীয় গ্রহ হিসেবে দেখাত, চতুর্থ গ্রহ হিসেবে নয়! এবার মাথায় ঢুকেছে?”
“হুম!” হ্যারিসনের আর কিছু বলার ছিল না।
জারভিস বলতে থাকল, “যা-ই হোক, আমি ক্লাস চালিয়ে গেলাম। সব কিছু বেশ মসৃণভাবে চলছিল, মনে হচ্ছিল, আমার বক্তব্য ওকে বুঝিয়ে দিতে পেরেছি। আমি আমার ছবির পৃথিবীর উপর আঙুল রাখলাম, তারপর নিজের দিকে দেখালাম। সবশেষে ব্যাপারটা পুরোপুরি নিশ্চিত করার জন্য নিজের দিকে আর আকাশের ঠিক মাঝখানে উজ্জ্বল সবুজ রঙের পৃথিবীর দিকে আঙুল দেখালাম।
“টুইল এত উত্তেজিত হয়ে খটখট শব্দ শুরু করল যে, আমি নিশ্চিত হলাম, ও ব্যাপারটা বুঝেছে। ও আনন্দে লাফালাফি শুরু করল, আর হঠাৎ করে নিজের দিকে আর আকাশের দিকে বারবার আঙুল দেখাতে লাগল। ও নিজের পেটের দিকে একবার দেখায়, তারপরেই আর্কটারাস নক্ষত্রের দিকে দেখায়। তারপর নিজের মাথার দিকে দেখিয়ে স্পাইকা নক্ষত্রকে দেখায়, শেষে পায়ের দিকে দেখিয়ে আরও গোটা ছয়েক নক্ষত্র দেখাল—আমি হাঁ করে ওর এইসব কাণ্ড দেখতে লাগলাম। তারপর আচমকা ও এক বিশাল লাফ মারল। সে কী লাফ রে ভাই! সোজা আকাশের নক্ষত্রলোকের দিকে অন্তত পঁচাত্তর ফুট উঁচুতে উঠে গেল ওটা! আকাশের গায়ে ওর ছায়ামূর্তিটা স্পষ্ট দেখলাম; দেখলাম, ও শূন্যে শরীরটা ঘুরিয়ে বল্লমের মতো মাথা নীচু করে আমার দিকে নেমে আসছে! তারপর সোজা নিজের ঠোঁটের উপর ভর করে মাটিতে গোঁত করে ল্যান্ড করল—ঠিক আমার আঁকা সৌরজগতের একদম মাঝখানে সূর্যের উপর এসে গেঁথে গেল তার চঞ্চু! বল্লমের মতো একেবারে অব্যর্থ নিশানায় বিঁধে রইল জন্তুটা—বুল’স আই যাকে বলে!”
“পাগল!” ক্যাপটেন মন্তব্য করল, “একেবারে বদ্ধপাগল!”
“আমারও প্রথমে সেটাই মনে হয়েছিল! ও বালি থেকে মাথাটা তুলে দাঁড়ানো পর্যন্ত আমি মুখ হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ভাবলাম, ও বোধহয় আমার কথাটা ঠিক বুঝতে পারেনি, তাই পুরো মহাভারতটা আবার শোনালাম ওকে। ফল হল সেই একই—টুইল আবার লাফিয়ে এসে তার চঞ্চুর ডগায় ভর করে আমার আঁকা সৌরজগতের মাঝখানে বিঁধে রইল!”
“হয়তো কোনো ধর্মীয় আচার।” হ্যারিসন টিপ্পনী কাটলেন।
জারভিস দ্বিধার সুরে বলল, “হতেও পারে। আমরা একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত একে অপরের ভাবনা বুঝতে পারছিলাম, আর তার পরেই সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। মনে হতে লাগল আমাদের চিন্তাভাবনার মধ্যে কোনো মিল নেই, কোনো যোগসূত্র নেই। আমি ওকে যতটা পাগল ভাবছিলাম, টুইলও যে আমাকে ঠিক ততটাই পাগল ভাবছিল, সে নিয়ে আমার কোনো সন্দেহই নেই। আমাদের দুজনের মগজ জগৎসংসারকে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, আর হয়তো ওর দৃষ্টিভঙ্গিটা আমাদের চেয়ে কম সত্যি নয়। আমরা একে অপরের সঙ্গে কিছুতেই তাল মেলাতে পারছিলাম না। তবে এত অসুবিধে সত্ত্বেও টুইলকে আমার বেশ ভালো লেগেছিল, আর আমার ধারণা, ও-ও আমাকে বেশ পছন্দ করেছিল।”
“যতসব পাগল জুটেছে!” ক্যাপটেন আবার বললেন, “পুরো ছিটিয়াল!”
“তা-ই নাকি? দাঁড়াও দাঁড়াও, আগে শুনে নাও। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার আমার মনে হল যে, হয়তো আমরা—” জারভিস থামল, তারপর আবার গল্প শুরু করল, “যা-ই হোক, শেষমেশ হাল ছেড়ে দিয়ে ঘুমোনোর জন্য আমি আমার থার্মো-স্কিন ব্যাগের ভেতরে ঢুকলাম। আগুনটা আমাকে খুব একটা আরাম দিতে না পারলেও স্লিপিং ব্যাগটা কিন্তু জম্পেশ কাজ দিচ্ছিল। জ়িপার বন্ধ করার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ভেতরে দমবন্ধ-করা গরম হয়ে উঠল। একটু ফাঁক করতেই—ব্যাস! হাড়কাঁপানো মাইনাস ৮০ ডিগ্রি তাপমাত্রার বাতাস নাকে এসে লাগল। রকেট ক্র্যাশের সময় যে চোট পেয়েছিলাম, তার সঙ্গে এই ফ্রস্টবাইটটা উপরি পাওনা হিসেবে জুটে গেল।
“আমি যখন ঘুমোচ্ছিলাম, টুইল কী করেছিল, জানি না। ও পাশেই বসে ছিল, কিন্তু যখন আমার ঘুম ভাঙল, তখন দেখি ও হাওয়া। ব্যাগ থেকে বের হওয়ার পরপরই সেই চিরপরিচিত কিচিরমিচির শব্দ শুনলাম, আর দেখলাম, থাইলের সেই তিনতলা সমান উঁচু পাহাড় থেকে ও বল্লমের মতো শূন্যে ভেসে নীচে নেমে এল এবং আমার পাশেই ল্যান্ড করল। আমি নিজের দিকে আর উত্তরদিকে আঙুল দেখালাম, ও নিজের দিকে আর দক্ষিণদিকে আঙুল দেখাল। কিন্তু আমি যখন ব্যাগপত্র গুছিয়ে রওনা দিলাম, ও আমার পিছু নিল।
“উফ, কীভাবেই-না পথ চলে ব্যাটা! একলাফে অন্তত দেড়শো ফুট পাড়ি দেয়, শরীরটাকে বল্লমের মতো টানটান করে শূন্যে ভেসে যায় আর ঠোঁটের উপর ভর দিয়ে মাটিতে নামে। আমার ধীর গতির হাঁটা দেখে ও বোধহয় একটু অবাকই হচ্ছিল, তবে কিছুক্ষণ পর ও আমার পাশেই চলতে শুরু করল। অবশ্য প্রতি কয়েক মিনিট অন্তর ও এক-একটা বিশাল লাফ দিচ্ছিল আর আমার থেকে অনেকটা দূরে বালিতে ঠোঁট বা নাক, যা-ই বলো, গুঁজে দিচ্ছিল। তারপর আবার তিরের মতো আমার দিকে ফিরে আসত। ওর ওই বর্শার মতো ঠোঁটটা তিরবেগে আমার দিকে আসতে দেখে প্রথমে একটু ঘাবড়েই গিয়েছিলাম, কিন্তু ও সব সময় আমার পাশেই বালিতে ল্যান্ড করত।
“এভাবেই আমরা দুজনে মেয়ার ক্রোনিয়াম পার হচ্ছিলাম। এই জায়গাও একদম আগের মতো—একই রকম বেয়াড়া টাইপের গাছপালায় ভরা আর সেই সবুজ খুদে বায়োপডগুলো এখানেই বালির উপর দিয়ে কিলবিল করে পথ ছেড়ে দিচ্ছিল। আমরা গল্প করতে করতে এগোচ্ছিলাম—তাতে একে অপরের কথা কিছু বুঝছিলাম না ঠিকই, তবে ওর সাহচর্যটা পাচ্ছিলাম। আমি গান গাইছিলাম, আর আমার মনে হয়, টুইলও গাইছিল; অন্তত ওর ওই কিচিরমিচির আর শিস দেওয়ার শব্দগুলোর মধ্যে একটা সূক্ষ্ম ছন্দ ছিল।
“একঘেয়েমি কাটাতে টুইল মাঝেমধ্যে তার ভাঙা-ভাঙা ইংরেজি শব্দের ভাণ্ডার ঝালিয়ে নিচ্ছিল। কোনো পাথরের দিকে আঙুল দেখিয়ে ও বলছিল ‘রক’, আবার ছোটো একটা নুড়ি দেখিয়েও তা-ই বলছিল। আমার হাতে হাত দিয়ে বলছিল ‘টিক’। একই শব্দ দুবার ব্যবহার করলে বা একই শব্দ দুটো আলাদা জিনিসের ক্ষেত্রে খাটে দেখলে ও কী যে মজা পাচ্ছিল! আমি ভাবছিলাম, ওর ভাষাটা বোধহয় পৃথিবীর কোনো আদিম জাতির ভাষার মতো—ওই নেগ্রিটোদের মতো, যাদের কোনো সাধারণ বা জেনেরিক শব্দ নেই। খাবার, জল বা মানুষের জন্য আলাদা কোনো শব্দ নেই—বরং ভালো খাবার, খারাপ খাবার, বৃষ্টির জল, সমুদ্রের জল, শক্তিশালী মানুষ বা দুর্বল মানুষের জন্য আলাদা শব্দ আছে। বৃষ্টির জল আর সমুদ্রের জল যে আসলে একই জিনিসের দুটো রূপ, এটা বোঝার মতো উন্নত বোধহয় ওদের সভ্যতা নয়। কিন্তু টুইলের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমন ছিল না; বরং মনে হচ্ছিল আমরা রহস্যময়ভাবে একজন আরেকজনের চেয়ে আলাদা—আমাদের মগজ একে অপরের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। আর তা সত্ত্বেও—আমরা একে অপরকে পছন্দ করতাম!”
“দুটোই আস্ত পাগল,” হ্যারিসনের বক্তব্য, “এইজন্যেই তোমাদের দুজনের মধ্যে এত ভাব!”
“তা আমি তো তোমাকেও খুউব, খুউব ভালোবাসি, হ্যারিসন!” জারভিস একটু দুষ্টুমি করেই হ্যারিসনকে পালটা জবাব দিয়ে দিল, “যাক গে, তবে টুইলের মানসিক স্থিতি নিয়ে কোনো সন্দেহ রেখো না মনে। আমাদের মানুষের মতো এই তথাকথিত উচ্চমার্গীয় বুদ্ধিবৃত্তির প্রাণীদেরও দু-একটা প্যাঁচপয়জার শিখিয়ে দেওয়ার মতো জ্ঞান যে একেবারেই ছিল না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। হ্যাঁ, ও হয়তো অতিমানবিক মগজ নিয়ে জন্মায়নি, কিন্তু এটা ভুললে চলবে না যে, আমার চিন্তাভাবনা কীভাবে কাজ করছে, তার একটা হদিস ও পেয়েছিল, কিন্তু আমি ওর চিন্তাভাবনার কূলকিনারা খুঁজে পাইনি!”
ক্যাপটেন গম্ভীরভাবে মন্তব্য করল, “কারণ, ওটার মগজ বলে আদতে কিছু ছিল না।” এটা শুনেই পুট্জ আর লেরয় তার কথায় মনোযোগ দেওয়ার ভান করে চোখ পিটপিট করা শুরু করে দিল।
“আহা, আমার গল্প শেষ হলে না হয় এসব বিচার করবে। যা-ই হোক, সেইদিন আর তার পরের দিন মেয়ার ক্রোনিয়াম পেরোতেই চলে গেল। মেয়ার ক্রোনিয়াম—সে যেন সময়ের সমুদ্র! শিয়াপারেলি যে কেন এই নাম রেখেছিলেন, ওই পথটুকু হাঁটার পর তা হাড়েহাড়ে টের পেলাম। চারদিকে শুধু ওই ধূসর, অন্তহীন আজব গাছপালার প্রান্তর, প্রাণের কোনো চিহ্ন নেই। এতটাই বোর হচ্ছিলাম যে, দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যার দিকে জ্যানথাস মরুভূমিটাকে দেখতে পেয়েও বেশ আনন্দ হল।
“আমি তখন ক্লান্তিতে একেবারে অবসন্ন পড়েছি, কিন্তু টুইলকে দেখে মনে হচ্ছিল, ও যেন এই সবেই যাত্রা শুরু করেছে, এক্কেবারে ফ্রেশ। অথচ আমি ওকে কখনও কিছু খেতে বা জল পান করতে দেখিনি। ওই গোঁত-মারা পেল্লায় লাফ দিয়ে দিয়ে চাইলে ও ঘণ্টা দুয়েকেই মেয়ার ক্রোনিয়াম পার করে দিতে পারত, কিন্তু ও আমার পাশ ছেড়ে গেল না। আমি দু-একবার ওকে জল খেতে দিয়েছিলাম; ও আমার হাত থেকে কাপটা নিয়ে সেই জলটুকু ঠোঁট দিয়ে শুষে নিল, তারপর যত্ন করে সবটুকু আবার কাপের ভেতর উগরে দিয়ে গম্ভীর মুখে ওটা আমাকে ফিরিয়ে দিল।
“জ্যানথাস মরুভূমি বা তার সীমানার খাড়া পাহাড়গুলো আমাদের নজরে আসতে-না আসতেই কোথা থেকে একটা নোংরা ধুলোর মেঘ ধেয়ে এল। আমাদের এখানকার মতো অতটা মারাত্মক না হলেও পথ চলায় বেশ বাগড়া দিচ্ছিল ওটা। আমি আমার থার্মো-স্কিন ব্যাগের স্বচ্ছ পর্দাটা মুখের সামনে টেনে নিয়ে কোনোমতে সামাল দিলাম। দেখলাম, টুইল তার ঠোঁটের গোড়ায় থাকা পালকের মতো কতকগুলো উপাঙ্গ—যেগুলো অনেকটা গোঁফের মতো দেখতে—সেগুলো দিয়ে নাক ঢেকে ফেলল, আর ওই একই উপায়ে চোখ দুটোও আড়াল করে নিল।”
“তার মানে এটা মরুর জীব!” জীববিজ্ঞানী লেরয় দুম করে বলে বসল।
“তা-ই? এ কথা কেন বলছ?”
“এই যে, জল খায় না—তার উপর বালিঝড় সামাল দেওয়ার জন্য তার শরীর তৈরি—”
“তাতে কিছুই প্রমাণ হয় না! মঙ্গলের মতো এই শুকনো বড়ির মতো গ্রহে জল এতই কম যে তা নষ্ট করার বিলাসিতা কারোই নেই। পৃথিবীতে হলে আমরা এই পুরো গ্রহটাকেই মরুভূমি বলতাম।” জারভিস একটু থামল। “যা-ই হোক, বালির ঝড়টা থেমে যাওয়ার পর একটা হালকা হাওয়া আমাদের মুখ ছুঁয়ে বয়ে যাচ্ছিল—বালি ওড়ানোর মতো অত জোর ছিল না তাতে। কিন্তু হঠাৎ দেখলাম, জ্যানথাসের পাহাড় থেকে গোল গোল স্বচ্ছ কিছু জিনিস ভেসে আসছে—একেবারে অবিকল কাচের টেনিস বলের মতো! কিন্তু ওগুলো এতটাই হালকা যে এই পাতলা বাতাসেও ভেসে থাকতে পারে। ভেতরে কিছু ছিল না; আমি দু-একটা ভেঙেও দেখলাম, বিচ্ছিরি একটা গন্ধ ছাড়া আর কিছুই বেরোল না ওখান থেকে। টুইলকে ওগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় ও শুধু বলল, ‘নো—নো—নো’। আমি ধরে নিলাম, ও ওগুলোর সম্পর্কে কিছুই জানে না। তো, ওগুলো সাবানের বুদ্বুদের মতো বা আগাছা লতার মতো হাওয়ায় লাফাতে লাফাতে পাশ দিয়ে চলে গেল, আর আমরা জ্যানথাসের দিকে পা বাড়ালাম। টুইল একবার একটা কাচের বলের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল ‘রক’ (পাথর), কিন্তু ওর সঙ্গে তর্ক করার মতো শক্তি আমার তখন ছিল না। পরে অবশ্য বুঝেছিলাম, ও কী বোঝাতে চেয়েছিল।
“দিনের আলো যখন প্রায় শেষ হয়ে আসছে, তখন আমরা জ্যানথাস পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছোলাম। আমি ঠিক করলাম, যদি সম্ভব হয়, মালভূমির উপরেই রাতটা কাটাব। ভাবলাম, বিপজ্জনক কিছু যদি থেকে থাকে, তবে তার জ্যানথাসের বালির চেয়ে মেয়ার ক্রোনিয়ামের ঝোপঝাড়ের আড়ালেই ওঁত পেতে থাকার সম্ভাবনা বেশি। যদিও আমি এই ক-দিনে আশঙ্কা করার মতো কিছুই দেখিনি, শুধু টুইলকে আক্রমণ করা সেই দড়ির মতো শুঁড়ওয়ালা কালো জানোয়ারটা ছাড়া। আর ওটা তো শিকারের খোঁজে ঘোরে না, বরং শিকারকে তার নাগালে টেনে নেয়। আমি যখন ঘুমিয়ে থাকব, তখন ও আমাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিশ্চয়ই এতদূর আসবে না, বিশেষ করে টুইল যেখানে একদমই ঘুমোত না, সারারাত ধৈর্য ধরে পাশে বসে থাকত। ওই কালান্তক জানোয়ারটা টুইলকে কীভাবে ফাঁদে ফেলল, সেটাই ভাবছিলাম, কিন্তু ওকে জিজ্ঞেস করার তো কোনো উপায় নেই। সে রহস্যও অবশ্য পরে উদ্ধার হয়েছিল; ওহ্, কী শয়তানি বুদ্ধি ওই জানোয়ারটার!
“যা-ই হোক, আমরা জ্যানথাসের ওই খাড়া পাহাড়ের গায়ে ওঠার সহজ কোনো রাস্তা খুঁজছিলাম। অন্তত আমি খুঁজছিলাম। টুইল চাইলে অনায়াসেই ওটা লাফিয়ে পার হতে পারত, কারণ পাহাড়গুলো থাইলের চেয়েও নীচু ছিল—হয়তো ফুট ষাটেক উঁচু। একটা জায়গা পেয়ে আমি উপরে উঠতে শুরু করলাম; পিঠে বাঁধা সেই জলের ট্যাংকটাকে মনে মনে শাপশাপান্ত করছিলাম—এমনি বইতে কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু পাহাড়ে চড়ার সময়েই যত ঝক্কি বাড়ায়। ঠিক তখনই হঠাৎ একটা শব্দ শুনলাম, যেটা চেনা-চেনা মনে হল!
“এই পাতলা বাতাসে শব্দগুলো আমাদের কানে কেমন অদ্ভুত শোনায়, জানো নিশ্চয়ই? গুলির শব্দ অনেকটা কর্ক খোলার শব্দের মতো শোনায়। কিন্তু এই শব্দটা রকেটের ইঞ্জিনের আওয়াজের মতো শোনাচ্ছিল! আর সত্যিই তা-ই, তাকিয়ে দেখলাম, আমাদের দ্বিতীয় অক্সিলারি রকেটটা পশ্চিমদিকে প্রায় দশ মাইল দূর দিয়ে আমার আর সূর্যাস্তের মাঝখান দিয়ে উড়ে যাচ্ছে!”
“ওটা আমি ছিলাম!” পুট্জ বলে উঠল, “আমি তো তোমাকেই খুঁজতে বেরিয়েছিলাম।”
“হ্যাঁ, আমি তা বুঝতে পেরেছিলাম, কিন্তু বুঝে আমার কী লাভ হল? পাহাড়ের গায়ে ঝুলতে ঝুলতেই আমি কত চিৎকার করলাম আর এক হাত নেড়ে ইশারা করলাম। টুইলও রকেটটা দেখতে পেয়ে, ফড়ফড় করে আর ক্যাচর ম্যাচর শব্দে, উত্তেজনায় পাহাড়ের চূড়ায় উঠে কত লাফালাফি করল, তারপর সেখান থেকেও শূন্যে লাফ দিল। কিন্তু আমার চোখের সামনেই তোমাদের উড়ুক্কু যন্ত্রটা গর্জন করতে করতে দক্ষিণের অন্ধকারের দিকে মিলিয়ে গেল।
“আমি হড়বড় করে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে এলাম। টুইল তখনও উত্তেজিতভাবে আকাশের দিকে আঙুল দেখিয়ে ক্যাচর ম্যাচর করছে, শূন্যে লাফিয়ে উঠছে আর উলটো হয়ে বালিতে নিজের চঞ্চু বিঁধিয়ে গোঁত খেয়ে ল্যান্ড করছে। আমি দক্ষিণদিকে আর নিজের দিকে আঙুল দেখালাম। ও বলল, ‘ইয়েস—ইয়েস—ইয়েস’। কিন্তু আমার কেমন যেন মনে হল, ও ভাবছে, ওই উড়ুক্কু যন্ত্রটা আমারই কোনো আত্মীয়, হয়তো আমার বাবা বা মা। হয়তো আমি ওর বুদ্ধিকে একটু খাটো করেই দেখছিলাম; এখন মনে হয়, আমার ধারণাটা ভুল ছিল।
“কারও নজর কাড়তে না-পারায় মনটা ভীষণ দমে গেল। রাতের কনকনে ঠান্ডা ততক্ষণে শুরু হয়ে গিয়েছে, তাই আমি থার্মো-স্কিন ব্যাগটা বের করে তার ভেতর সেঁধিয়ে গেলাম। টুইল তার ঠোঁটটা বালিতে গুঁজে পা আর হাতগুলো কুঁকড়ে গুটিয়ে নিল—দেখতে হুবহু বাইরের ওই পাতাহীন ঝোপগুলোর মতো লাগছিল ওকে। মনে হয়, ও সারারাত ওভাবেই কাটিয়েছিল।”
“আরে! এ তো প্রোটেক্টিভ মিমিক্রি! আত্মরক্ষার জন্য প্রকৃতিকে অনুকরণ করা,” লেরয় আবার উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠল, “এ ব্যাটা মরুর জীব না হয়ে যায় না!”
“পরের দিন কী হল, শোনো!” জারভিস গল্পে ফিরে এল, “পরের দিন সকালে আবার হাঁটা লাগালাম। শ-খানেক গজ হাঁটতেই চোখে পড়ল এক অদ্ভুত দৃশ্য! আমি বাজি রেখে বলতে পারি, পুট্জের ক্যামেরা সে ছবি তুলতে পারেনি!
“আমি দেখলাম ছোটো ছোটো পিরামিডের একটা লম্বা সারি—একেবারে পুঁচকে সব পিরামিড, ছ-ইঞ্চির বেশি উঁচু হবে না। জ্যানথাস মরুভূমির বুক চিরে বহু দূর অবধি চলে গিয়েছে সেই সারি, যতদূর দৃষ্টি চলে, ততদূর। ছোটো ছোটো ইট দিয়ে তৈরি সেগুলি, ভেতরটা ফাঁপা আর মাথাগুলো ভাঙা। আমি টুইলকে ওগুলো দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এগুলো কী?’ টুইল মাথা-টাথা নেড়ে এমন না-বাচক কিচমিচ শব্দ করল, যার অর্থ দাঁড়ায়—ও জানে না। অগত্যা আমরা ওই সারির পাশ দিয়েই হাঁটতে লাগলাম, কারণ সারিটাও উত্তরের দিকে বিস্তৃত, আর আমরাও যাচ্ছিলাম উত্তরে।
“ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা ওই সারি ধরে হাঁটলাম। কিছুক্ষণ পর আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলাম, পিরামিডগুলো ধীরে ধীরে আকারে বড়ো হচ্ছে! প্রতিটা পিরামিডে ইটের সংখ্যা একই, কিন্তু ইটগুলোর আকার ক্রমশ বড়ো হয়ে চলেছে।”
“দুপুরের দিকে ওগুলো আমাদের কাঁধের সমান উঁচু হয়ে গেল। কয়েকটার ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখলাম—সবই এক, মাথা ভাঙা আর ভেতরটা খালি। আমি দু-একটা ইট পরীক্ষা করে দেখলাম; ওগুলো সিলিকা দিয়ে তৈরি, আর মনে হয় সৃষ্টির আদিম সময়ের ইট!”
লেরয় জিজ্ঞেস করল, “কী করে বুঝলে সেটা?”
“আরে ভাই, ইটগুলোর কোনাগুলো সব ক্ষয় হয়ে গোল হয়ে গিয়েছে। পৃথিবীতেই সিলিকা সহজে ক্ষয় হয় না, আর মঙ্গলের এই জলবায়ুতে—!”
“তোমার কী মনে হয়, কত পুরোনো হবে তাও?”
“পঞ্চাশ হাজার হতে পারে—কিংবা এক লাখ বছর। আমি অতশত জানি না। সকালে যে ছোটো পিরামিডগুলো দেখেছিলাম, সেগুলো বোধহয় এগুলোর চেয়েও দশগুণ পুরোনো। প্রায় গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। সেগুলোর বয়স কত হবে তবে? পাঁচ লাখ বছর? কে জানে? বলা খুব মুশকিল।” জারভিস একটু থামল। “যা-ই হোক, আমরা পিরামিডের সারি অনুসরণ করেই চললাম। টুইল দু-একবার ওগুলোকে ‘রক’ বলে ডাকল, যা ও আগেও অনেকবার করেছে। আর এক্ষেত্রে ও খুব একটা ভুল বলেনি।”
“আমি ওকে একটু বাজিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। একটা পিরামিডের দিকে আঙুল দেখিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করলাম, ‘লোকজন?’ টুইল নেতিবাচক একটা শব্দ করে বলে উঠল, ‘নো, নো, নো। নো ওয়ান-ওয়ান-টু। নো টু-টু-ফোর’। বলতে বলতে ও নিজের পেটে ঘষতে লাগল। আমি হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম, আর ও আবার একই কাণ্ড করল, ‘নো ওয়ান-ওয়ান-টু। নো টু-টু-ফোর’।”
“তাহলেই বোঝো! এখন তো প্রমাণই হয়ে গেল ওটা আস্ত পাগল একটা!” হ্যারিসন মন্তব্য করলেন।
জারভিস বাঁকা হেসে বলল, “তোমার সেটাই মনে হল বুঝি? আমি কিন্তু এর অন্য মানে বের করেছি। ‘নো ওয়ান-ওয়ান-টু’!—এর মানে তোমাদের মাথায় নিশ্চয়ই কিছু আসছে না?”
“না, আর তোমার মাথাতেও কিছু আসেনি!”
“আমার মনে হয়, আমি এর মানে বের করতে পেরেছি! টুইল তার জানা সামান্য ক-টা ইংরেজি শব্দ দিয়ে একটা গভীর দর্শন বোঝাতে চাইছিল। আচ্ছা এটা বলো যে, গণিতের কথা শুনলে তোমাদের মাথায় প্রথমেই কী আসে?”
“কেন—জ্যোতির্বিজ্ঞান! বা ধরো লজিক!”
“ঠিক! ‘নো ওয়ান-ওয়ান-টু’ বলে টুইল আসলে বোঝাতে চেয়েছিল যে ওই পিরামিড নির্মাতারা কোনো মানুষ নয়—অথবা ওরা অন্তত আমাদের মতো একে-একে-দুই-করা বা দুইয়ে-দুইয়ে-চার-করা যুক্তিধারী প্রাণী নয়! বুঝেছ?”
“কী বলছ ভাই!”
“হ্যাঁ, ঠিক তা-ই।”
লেরয় এবার প্রশ্ন করল, “কিন্তু ও পেটে হাত বুলোচ্ছিল কেন?”
“কেন? আরে জীববিজ্ঞানী মহাশয়, ওইখানেই তো ওর ঘিলু! ওইটুকু মাথায় নয়, ওর বুদ্ধিশুদ্ধি সব ওর শরীরের মধ্যভাগে!”
“অসম্ভব!”
“মঙ্গলের বুকে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়, লেরয়! এখানকার গাছপালা বা প্রাণী কোনো কিছুই পৃথিবীর মতো নয়; তোমার ওই বায়োপডগুলোই তো তার প্রমাণ!” জারভিস হেসে আবার গল্প শুরু করল, “যা-ই হোক, আমরা জ্যানথাস পার হচ্ছিলাম। বিকেলের দিকে আবার এক অবাক কাণ্ড হল। পিরামিডের সারিটা হঠাৎ দুম করে শেষ হয়ে গেল।”
“শেষ হয়ে গেল? মানে?”
“হ্যাঁ, আর মজার ব্যাপার হল শেষ পিরামিডটা—যা ফুট দশেকের মতো উঁচু—সেটার মাথাটা কিন্তু ভাঙা ছিল না, ওটা ইয়ে, আস্তই ছিল! তার মানে যে বা যারা ওটা বানিয়েছিল, তারা তখনও ভেতরেই আছে। আমরা যেন পিরামিডবাসীদের পাঁচ লাখ বছরের বিবর্তন দেখে একেবারে বর্তমান মুহূর্তে এসে থমকে দাঁড়িয়েছি।
“আমি আর টুইল দুজনেই ব্যাপারটা খেয়াল করলাম। আমি আমার অটোমেটিক রিভলভারটা বের করলাম, আর টুইলও পলক ফেলার আগে তার থলে থেকে কাচের তৈরি একটা আজব রিভলভার বের করে ফেলল। ওটা আমাদের অস্ত্রের মতোই দেখতে, শুধু ওর চার আঙুলের হাতের পাঞ্জায় আঁটানোর জন্য হাতলটা একটু বড়ো। আমার রিভলভারে আবার বোল্যান্ডের বিস্ফোরক বুলেট ভরা ছিল। আমরা তৈরি হয়ে পা টিপে টিপে সেই ঢাকা-দেওয়া পিরামিডটার দিকে এগোলাম।
“টুইলই প্রথম নড়াচড়াটা দেখতে পেল। উপরের তলার ইটগুলো থরথর করে কাঁপছে, আর হঠাৎ একটা হালকা শব্দ করে সেগুলো গড়িয়ে পড়তে লাগল। আর তার ভেতর থেকে—কী একটা জিনিস যেন বেরিয়ে আসছিল!
“একটা লম্বাটে, রুপালি-ধূসর রঙের হাত বেরিয়ে এল, আর তার পথ ধরেই এল একটা বর্ম-ঢাকা শরীর। বর্ম মানে চকচকে রুপালি আঁশওয়ালা ম্যাটমেটে চামড়ার বর্ম। সেই হাতটার জোরে শরীরটা গর্ত থেকে বেরিয়ে এল এবং বেরিয়েই জানোয়ারটা বালির উপর ধপাস করে পড়ে গেল।
“আমি বর্ণনা দিয়ে বোঝাতে পারব না, সে এক কিম্ভূত প্রাণী—দেখতে একটা বড়োসড়ো ধূসর পিপের মতো। তার একপ্রান্তে একটি হাত আর মুখের মতো একটা ফুটো, অন্য প্রান্তে একটা শক্ত সুচালো ল্যাজ—ব্যাস, এটুকুই। আর কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নেই, না আছে চোখ, না কান বা নাক—কিচ্ছু নেই! জানোয়ারটা নিজেকে কয়েক গজ টেনে নিয়ে গেল, তারপর তার সুচালো ল্যাজটা বালির মধ্যে পুঁতে শরীরটাকে খাড়া করে বসিয়ে দিল। ওখানেই ঠায় বসে রইল।
“টুইল আর আমি ওর দিকে তাকিয়েই দাঁড়িয়ে ছিলাম। মিনিট দশেক পর ওটা নড়েচড়ে বসল। খসখস একটা শব্দ হল—অনেকটা শক্ত কাগজ দুমড়ানোর মতো শব্দ। তারপর ওর সেই হাতটা ওর মুখের গর্তে ঢুকল আর বের করে আনল একটা ইট! হাতটা সাবধানে ইটটা মাটিতে রাখল এবং জানোয়ারটা আবার স্থির হয়ে গেল।
“আবার দশ মিনিট কাটল—আবার একটা ইট বেরোল। প্রকৃতির নিজস্ব এক রাজমিস্ত্রি! আমি যখন ওখান থেকে সটকে পড়ার কথা ভাবছি, টুইল ওটাকে দেখিয়ে বলল ‘রক’! আমি আকাশ থেকে পড়লাম। টুইল আবার বলল ‘রক’। তারপর আবার একটু ফরফর করে ‘নো—নো’ বলার চেষ্টা করল, শেষে দু-তিনটে শিস দেওয়ার মতো শব্দ করে নিশ্বাস নিল।
“অবাক কাণ্ড, আমি তক্ষুনি ওর ফরফরানির মানে বুঝে ফেললাম! আমি বললাম, ‘নিশ্বাস নেয় না?’ সঙ্গে শ্বাস নেওয়ার মতো অভিনয় করে দেখালাম, ‘নো ব্রিদ?’ টুইল তো আহ্লাদে আটখানা! ও বলল, ‘ইয়েস, ইয়েস, ইয়েস! নো, নো, নো ব্রিট!’ তারপর একলাফে ও গিয়ে গোঁত মেরে চঞ্চুতে ল্যান্ড করল ঠিক ওই দানবটার এক কদম সামনে!
“আমি তো ভয়ে কাঠ! বুঝতেই পারছ আমার অবস্থা। হাতটা ইট নেওয়ার জন্য উঠছিল। আমি ভাবলাম, এই বুঝি টুইলকে ধরে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলবে। কিন্তু কিচ্ছু হল না! টুইল জানোয়ারটার পিঠের উপর দুমদুম করে কিল মারল, আর ওদিকে ওই হাতটা মুখ থেকে ইট বের করে আগের ইটটার পাশে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখল। টুইল ওর শরীরে টোকা দিয়ে আবার বলল ‘রক’। তখন সাহস করে আমিও একটু কাছে গিয়ে দেখলাম।
“টুইল একদম ঠিক বলেছিল। জানোয়ারটা আদতে পাথর দিয়ে তৈরি, আর নিশ্বাসও নেয় না!”
“নিশ্বাস নেয় না, বুঝলে কী করে?” লেরয় উৎসাহভরা কালো চোখে জারভিসের দিকে তাকাল।
“কারণ আমি কেমিস্ট্রির লোক, ভাই। ওই জানোয়ারটা আগাগোড়া সিলিকা দিয়ে তৈরি! মঙ্গলের এই বালিতে নিশ্চয়ই খাঁটি সিলিকন আছে, আর ওটা খেয়েই ও বেঁচে থাকে। বুঝলে? আমরা, টুইল, এই আজব গাছপালা—এমনকি লেরয়ের ওই বায়োপডগুলোও হল কার্বননির্ভর প্রাণী; কিন্তু এই জিনিসটা চলে সম্পূর্ণ আলাদা এক রাসায়নিক বিক্রিয়ায়। ওটা হল এক ‘সিলিকননির্ভর প্রাণী’!”
“সিলিকা-বেসড লাইফফর্ম!” লেরয় প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, “আমার মনে একটা খটকা ছিলই, আজ তার প্রমাণ পেলাম! আমাকে ওটা দেখতেই হবে! আই মাস্ট…”
“আরে শান্ত হও খোকা, শান্ত হও!” জারভিস তাঁকে থামিয়ে বলল, “দেখতে তো যাবেই। তবে ভেবে দ্যাখো একবার—জিনিসটা বেঁচে আছে অথচ জীবন্ত নয়। প্রতি দশ মিনিটে একবার নড়ে ওঠে শুধু একটা করে ইট বের করার জন্য। ওই ইটগুলো আসলে ওর শরীরের বর্জ্যপদার্থ। বুঝলে লেরয়? আমাদের শরীর কার্বনের, তাই আমাদের বর্জ্য হল কার্বন ডাইঅক্সাইড। আর এই ব্যাটার শরীরটা হল সিলিকনের, তাই এর বর্জ্য হল সিলিকন ডাইঅক্সাইড—মানে সিলিকা। কিন্তু সিলিকা তো আর গ্যাস নয়, ওটা শক্ত পাথর; তাই ওগুলো ইটের মতো বের হয়। প্রাণীটা নিজের চারপাশেই দেওয়াল তুলতে থাকে, আর যখন তার চারপাশ পুরোটা ঢেকে যায়, তখন একটু সরে গিয়ে আবার নতুন করে শুরু করে। ওটার শরীর থেকে খসখসে শব্দ হবে না তো কার হবে? পাঁচ লাখ বছরের পুরোনো এক জীবন্ত পাথর!”
লেরয় প্রায় পাগলের মতো জিজ্ঞেস করল, “বয়স অত বেশি বুঝলে কী করে?”
“আমরা ওর তৈরি পিরামিডের সারি ধরে শুরু থেকে আসছি না? ও যদি আসল কারিগর না হত, তবে আমরা ওকে খুঁজে পাওয়ার আগেই তো সারিটা কোথাও শেষ হয়ে যেত, তা-ই না?—শেষ হয়ে আবার ছোটো পিরামিড দিয়ে শুরু হত। সহজ অঙ্ক!
“তবে ও বংশবিস্তার করারও চেষ্টা করে। ওর মুখ থেকে তৃতীয় ইটটা বের হওয়ার ঠিক আগে একটা খসখস শব্দ হল আর একঝাঁক ছোটো ছোটো কাচের বল বেরিয়ে এল। ওগুলো ওর রেণু বা বীজ—যা খুশি বলতে পারো। ওগুলোই লাফাতে লাফাতে জ্যানথাস মরুভূমি পার হয়ে যাচ্ছিল, ঠিক যেমনটা আমরা মেয়ার ক্রোনিয়ামে দেখেছিলাম। লেরয়, তোমাকে বললে তুমি বুঝবে, আমার ধারণা, ওই কাচের খোলসটা হল স্রেফ একটা বর্ম—ডিমের খোসার মতো। আসল খেল দেখায় ভেতরের ওই গন্ধটা। ওটা এক ধরনের গ্যাস, যা সিলিকনকে আক্রমণ করে; আর যেখানে সিলিকন আছে, সেখানে ওই খোলসটা ভেঙে গেলেই রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়, যা থেকে শেষমেশ ওই পিরামিড-দানব জন্ম নেয়।”
“আরে, একটা ভেঙে দেখতে পারতে তো!” লেরয় উত্তেজিত হয়ে বলল, “আমাদের একটা বল ভেঙে দেখা দরকার!”
“তা-ই নাকি? তা আমি তো ইতিমধ্যেই ভেঙে দেখেছি। দুটো বল বালির উপর আছড়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছি। তা তুমি কি হাজার দশেক বছর পর আবার এখানে এসে দেখতে চাও যে, আমি কোনো পিরামিড-দানবের জন্ম দিয়ে গিয়েছিলাম কি না? ততদিনে আশা করছি, তুমি নিশ্চয়ই নির্ভুল বলতে পারবে!”
জারভিস একটু থামল, তারপর দীর্ঘ একটা শ্বাস নিয়ে বলল, “সে যে কী অদ্ভুত একটা প্রাণী, ভগবানই জানে! তুমি ভাবতে পারছ? চোখ নেই, কান নেই, স্নায়ু নেই, ঘিলু নেই—স্রেফ একটা যন্ত্রের মতো, অথচ চিন্তা করে দ্যাখো, এ ব্যাটা অমর! যতক্ষণ অক্সিজেন আর সিলিকনের জোগান পেয়ে থাকবে, ততক্ষণ ও ইট বানিয়েই যাবে, একটার পর একটা পিরামিড গড়তেই থাকবে। জোগান ফুরিয়ে গেলে হয়তো থেমে যাবে, কিন্তু তবুও মরবে না। লক্ষ বছর পর যদি দৈবক্রমে ও আবার খাবার পায়, তবে সে আবার চলতে শুরু করবে—ততদিনে হয়তো আমাদের এই গর্বের মস্তিষ্ক আর সভ্যতা সব অতীত হয়ে গিয়েছে। কিম্ভূত একটা জন্তু—যদিও এর চেয়েও বড়ো আজব জিনিসের সঙ্গে আমার মোলাকাত হয়েছিল!”
“হলে সেটা তোমার স্বপ্নেই হয়েছিল!” হ্যারিসন গজরে উঠে জবাব দিল।
“ঠিক বলেছ!” জারভিস গম্ভীর হয়ে বলল, “একদিক থেকে ঠিকই বলেছ বটে। ‘স্বপ্ন-দানব’! হ্যাঁ, এটাই ওর সব চেয়ে মানানসই নাম হতে পারে—মানুষের কল্পনায় এর চেয়ে পৈশাচিক আর ভয়ংকর কোনো জীব আসতে পারে না! সিংহের চেয়েও খতরনাক, সাপের চেয়েও খল!”
“সেটা কীরকম? একটু বলো!” লেরয়ের কণ্ঠে অনুনয় ঝরে পড়ছে যেন, “এটা আমাকে দেখতে যেতেই হবে!”
“খবরদার! ওই শয়তানটির কাছে যাওয়ার কথা চিন্তাও করবে না!” বলে জারভিস আবার থামল।
“যা-ই হোক,” সে আবার বলতে শুরু করল, “টুইল আর আমি পিরামিড-দানবটাকে ছাড়িয়ে গিয়ে জ্যানথাসের বালির সাগর ঠেলে এগোতে লাগলাম। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছিল, তার উপর পুট্জ আমাকে উদ্ধার করতে না-পারায় মনটাও দমে গিয়েছিল। টুইলের ক্যাচর ম্যাচর আর ওই বারবার গোঁত মেরে লাফিয়ে পড়াটা দেখে আমার মাথা রীতিমতো গরম হয়ে উঠছিল। তাই কথা না বাড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওই একঘেয়ে মরুভূমির উপর দিয়ে চুপচাপ হাঁটতে লাগলাম।
“তখন মাঝ-বিকেল, দিগন্তে একটা কালো রেখা দেখতে পেলাম। আমি জানতাম ওটা কী। ওটা একটা খাল; রকেটে করে আসার সময় আমি ওটা পার হয়েছিলাম। তার মানে এতক্ষণে আমরা জ্যানথাস মরুভূমির মাত্র এক-তৃতীয়াংশ পার হতে পেরেছি! আরও দুই-তৃতীয়াংশ বাকি! দারুণ ব্যাপার, তা-ই না? তাও দ্যাখো, আমি সময়সূচি মেনেই চলছিলাম।
“আমরা খালের দিকে ধীরপায়ে এগোতে লাগলাম; মনে পড়ল, এই খালের পাড় জুড়ে বেশ ঘন জঙ্গল আছে আর ওই ‘কাদার ঢিপি শহর’টাও ওখানেই। আমি তখন এমনিতেই খুব ক্লান্ত ছিলাম, বারবার গরম গরম খাবারের চিন্তা মাথায় আসছিল। সেখান থেকে চিন্তাটা ঘুরে গেল বোর্নিয়ো দ্বীপের দিকে—ভাবছিলাম, এই খ্যাপাটে গ্রহের পর নিজের গ্রহে ফিরে বোর্নিয়োর মতো জায়গাও না জানি কত সুন্দর আর আপন লাগবে। সেখান থেকে মাথায় এল পুরোনো নিউ ইয়র্কের কথা, আর তারপর মনে পড়ল ফ্যান্সি লং-এর কথা। আমার পরিচিত একটি মেয়ে। তোমরা কেউ চেনো নাকি?”
হ্যারিসন বলল, “ভিশন চালালেই তো দেখি তাকে। ভিশনে অনুষ্ঠান করে তো? খাসা মেয়ে, ব্লন্ড, ‘এক কাপ চা’য়ের প্রোগ্রামে দিব্যি নাচ-গান করে।”
জারভিস বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ। ওর কথাই বলছিলাম। ওর সঙ্গে আমার বেশ জানাশোনা আছে—মানে স্রেফ বন্ধুত্ব, ভুলভাল অর্থ বের করবে না একদম। রকেট ছাড়ার সময় ও আমাকে বিদায় জানাতে এসেছিল। তো, ওর কথাই ভাবছিলাম আর নিজেকে খুব একা লাগছিল। ওদিকে আমরাও রাবারের মতো সেই অদ্ভুত গাছপালার রেখাটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।
“আর ঠিক তখনই, কী কাণ্ড! আমার মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট চিৎকার বেরিয়ে এল! আমি হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। দেখি ফ্যান্সি লং! ওই বিটকেল গাছগুলোর তলায় দাঁড়িয়ে আছে, একেবারে দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট! একদম আগের মতোই হাসছে আর হাত নাড়ছে, যেমনটা ওকে শেষবার দেখেছিলাম!”
“এবার দেখছি, তুমিও পাগল হয়ে গেছ!” ক্যাপটেন অনেক ভেবে এই মন্তব্য করল।
“ভাই, আমারও তখন প্রায় তা-ই মনে হয়েছিল! আমি চোখ কচলালাম, নিজেকে চিমটি কাটলাম, চোখ বন্ধ করে আবার তাকালাম—কিন্তু প্রতিবারই দেখলাম, ফ্যান্সি লং হাসছে আর হাত নাড়ছে! টুইলও বোধহয় কিছু একটা দেখতে পেয়েছিল; ও সমানে ফরফর করে দূরে দূরে পালাচ্ছিল। কিন্তু সেসব আওয়াজ থোড়াই আমার কানে ঢুকছিল? আমি এতটাই বিস্মিত ছিলাম যে, কোনো কিছু না ভেবেই বালির উপর দিয়ে ফ্যান্সি লং-এর দিকে দৌড় দিলাম।
“লং-এর থেকে আর বড়োজোর বিশ ফুট দূরে আছি, এমন সময় টুইল এক বিশাল লাফ দিয়ে এসে আমাকে জাপটে ধরল। আমার হাত চেপে ধরে ওর সেই খ্যানখেনে গলায় চিৎকার করতে লাগল, ‘নো—নো—নো’! আমি ওকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করলাম—ওজনে ও একটা বাঁশের কঞ্চির মতোই হালকা—কিন্তু ও নখ দিয়ে আমাকে আঁকড়ে ধরে চিলচিৎকার জুড়ে দিল। শেষমেশ আমি কিছুটা প্রকৃতিস্থ হলে ফ্যান্সির থেকে ফুট দশেকের দূরত্বে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ফ্যান্সি ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিল—একেবারে রক্তমাংসের মানুষের মতোই নিরেট, যেমন ধরো এই পুট্জের মাথা!”
“অ্যাঁ?” ইঞ্জিনিয়ার পুট্জ অবাক হয়ে বলল।
“ফ্যান্সি হাসছিল আর হাত নাড়ছিল, সমানে হাত নাড়ছিল আর হাসছিল। আর আমি লেরয়ের মতো বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, ওদিকে টুইল সমানে ক্যাটক্যাট করে কী সব বলে যাচ্ছিল। আমি জানতাম, এটা বাস্তব হতে পারে না, অথচ ফ্যান্সি ঠিক ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিল! একেবারে আসল!
“শেষমেশ আমি ডাকলাম, ‘ফ্যান্সি! ফ্যান্সি লং!’ ও শুধু হেসেই যাচ্ছিল আর হাত নাড়ছিল। কিন্তু ওকে দেখে মনেই হচ্ছিল না যে, আমি ওকে সাঁইত্রিশ মিলিয়ন মাইল দূরে ফেলে এসেছি।
“টুইল দেখি, ততক্ষণে তার কাচের রিভলভারটা বের করে ওর দিকে তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ওর হাতটা ধরে আটকাতে গেলাম, কিন্তু ও আমাকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। ও ফ্যান্সির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘নো ব্রিট! নো ব্রিট’! আমি বুঝলাম, ও বলতে চাইছে, ফ্যান্সি লং নামের ওই জিনিসটা জীবিত কোনো বস্তু নয়। ভাই, আমার মাথা তখন বনবন করে ঘুরছে!
“তাও ওকে বন্দুকের নিশানা করতে দেখে আমার বুকটা ধক করে উঠল। জানি না, কেন আমি হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখলাম, ও লক্ষ্যস্থির করছে, আমি কোনো বাধাই দিতে পারলাম না। তারপর ও রিভলভারের হাতলে হালকা চাপ দিল; ফক করে একটু বাষ্প নির্গত হল আর ফ্যান্সি লং বেমালুম গায়েব! ওর জায়গায় পড়ে রইল ছটফট-করতে-থাকা একটা কুচকুচে কালো, দড়ির মতো শুঁড়ওয়ালা বীভৎস শয়তান—ঠিক যেরকম জন্তুর হাত থেকে আমি টুইলকে বাঁচিয়েছিলাম!
“স্বপ্ন-দানব! সেই ঘোর-লাগা অবস্থাতেই জন্তুটাকে চোখের সামনে মরতে দেখলাম। টুইল সমানে শিস দিয়ে আর কিচিরমিচির করে আনন্দ করতে লাগল। শেষমেশ ও আমার হাত ছুঁয়ে ওই ছটফট-করা জন্তুটার দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘ইউ ওয়ান-ওয়ান-টু, হি ওয়ান-ওয়ান-টু’। ও আট-দশবার এটা বলার পর আমি মানেটা ধরতে পারলাম। তোমরা কেউ মানেটা ধরতে পারলে?”
“ইয়েস ইয়েস! আই গেস, আই ক্যান!” লেরয় তীক্ষ্ণ গলায় চিৎকার করে উঠল। “আই থিংক, ও বলতে চাইছে—তুমি মনে মনে কিছু একটা যেই ভাবছ, আর ওই জানোয়ারটা তক্ষুনি সেটা টের পেয়ে যাচ্ছে! ফলে তুমি সেটাই দেখতে পাচ্ছ! একটা ক্ষুধার্ত কুকুর থাকলে সে নিশ্চয়ই সেখানে একখানা মাংসের হাড় দেখতে পেত! তা-ই না?”
“একদম ঠিক!” জারভিস বলল, “এই স্বপ্ন-দানব তার শিকারের গোপন বাসনা আর আকাঙ্ক্ষাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে। বাসা বাঁধার সময় কোনো পাখি হয়তো তার সঙ্গিনীকে দেখবে, আবার কোনো শিকারি শিয়াল হয়তো দেখবে একটা অসহায় খরগোশকে!”
লেরয় অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ওরা এটা করে কীভাবে?”
“সেটা আমি কীভাবে জানব? পৃথিবীতে সাপ কীভাবে একটা পাখিকে সম্মোহিত করে তার মুখের ভেতর টেনে নেয়? আর সমুদ্রের গভীরে কি এমন মাছ নেই, যারা শিকারকে প্রলুব্ধ করে নিজেদের পেটে ঢোকায়? ওহ্!” জারভিস শিউরে উঠল, “বুঝতে পারলে এই জানোয়ারটা কতটা কুটিল? আমরা এখন সতর্ক হয়ে গেছি বটে, কিন্তু এরপর থেকে আমরা নিজেদের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারব না। হয়তো তুমি আমাকে দেখবে কিংবা আমি তোমাদের কাউকে দেখব, অথচ তার আড়ালে হয়তো ওঁত পেতে আছে ওই কালো রঙের বিভীষিকা!”
“তোমার ওই বন্ধু জানল কী করে?” ক্যাপটেন হঠাৎ করে প্রশ্ন করল।
“টুইল? আমিও তা-ই ভাবছি!” জারভিস বলল, “হয়তো ও এমন কিছু ভাবছিল, যাতে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, আর আমি যখন হঠাৎ দৌড়োতে শুরু করলাম, তখন ও বুঝল যে, আমি অন্য কিছু দেখছি। তখনই ও সতর্ক হয়ে গিয়েছিল। অথবা এমনও হতে পারে যে, ওই স্বপ্ন-দানব একবারে কেবল একটা মায়াই তৈরি করতে পারে—হয়তো টুইলও সেটাই দেখছিল, যা আমি দেখছিলাম, অথবা কিছুই দেখেনি। আমি আর ওকে জিজ্ঞেস করতে পারিনি। তবে এটুকু পরিষ্কার যে ওর বুদ্ধি আমাদের সমান, বা আমাদের চেয়েও বেশি।”
“আমার কথা শোনো, ওটা একটা আস্ত পাগল!” হ্যারিসন আবারও বলে উঠল, “তোমার কেন মনে হল ওর বুদ্ধি মানুষের স্তরের?”
“অনেক কারণ আছে! প্রথমত, সেই পিরামিড-দানব। টুইল ওটা আগে কখনও দেখেনি, ও নিজেই সেটা জানিয়েছিল। তবুও ও প্রথম দেখাতেই বুঝে ফেলল যে ওটা সিলিকন দিয়ে তৈরি একটা জীবন্মৃত স্বয়ংক্রিয় যান্ত্রিক জীব।”
“ও ওটার কথা লোকমুখে শুনেও থাকতে পারে,” হ্যারিসন মানতে নারাজ, “তা ছাড়া ও তো এই তল্লাটেই থাকে।”
“বেশ, তাহলে ভাষার ব্যাপারে কী বলবে? আমি ওর একটা চিন্তার হদিসও পেলাম না, অথচ ও আমার ছ-সাতটা শব্দ চট করে শিখে ফেলল। আর খেয়াল করেছ, ওই ক-টা শব্দ দিয়েই ও কত জটিল সব ধারণা বুঝিয়ে দিল? পিরামিড-দানব আর স্বপ্ন-দানব! স্রেফ একটা বাক্যে ও আমাকে জানিয়ে দিল যে, একটা হল নিরীহ যন্ত্রজীব আর অন্যটা মারাত্মক সম্মোহনকারী একটা প্রাণী। এর বেলা তুমি কী বলবে?”
“হুঁহ্!” ক্যাপটেন শুধু একটা শব্দ করল।
“হুঁহ্ বলে উড়িয়ে দিয়ো না! বাংলা বা ইংরেজি ভাষার মাত্র ছ-টা শব্দ জেনে তুমি এটা করতে পারতে? এমনকি টুইল আরও এক ধাপ এগিয়ে আমাকে বুঝিয়ে দিল যে, অন্য এক ধরনের প্রাণীর বুদ্ধিবৃত্তি আমাদের চেয়ে এতটাই আলাদা যে তাদের ব্যাপারস্যাপার বোঝা প্রায় অসম্ভব—টুইল আর আমার মধ্যে যতটা ফারাক, তার চেয়েও ঢের বেশি!”
“অ্যাঁ? সেটা আবার কখন হল?”
“সেটা পরে বলছি। এখন আমি যেটা বলতে চাইছি, তা হল—টুইল আর ওর জাতি আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্বের জন্য উপযুক্ত। মঙ্গলের কোথাও না কোথাও এমন এক সভ্যতা আর সংস্কৃতি আছে, যা আমাদের সমান, হয়তো-বা আমাদের চেয়েও উন্নত। আর তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ সম্ভব, টুইলই তার প্রমাণ। হয়তো বছরের পর বছর ধৈর্য ধরে চেষ্টা করতে হবে, কারণ ওদের মগজ আমাদের চেয়ে আলাদা; তবে এর পরে আমরা যাদের পাল্লায় পড়েছিলাম, তাদের তুলনায় টুইল আমাদের অনেক কাছের।”
“এর পরে? এর পরে আবার কাদের দেখলে?”
“খালের ধারের ওই কাদার ঢিপি শহরের বাসিন্দাদের।” জারভিস কপালে ভাঁজ ফেলে আবার গল্প শুরু করল, “আমি ভেবেছিলাম, স্বপ্ন-দানব আর সিলিকন-দানবই বোধহয় জগতের সব চেয়ে অদ্ভুত জীব, কিন্তু তা নয়। এই কাদা-শহরের বাসিন্দারা আরও বেশি অচেনা, আরও বেশি অবোধ্য। টুইলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যায়, ধৈর্য ধরলে ভাববিনিময়ও করা যায়—কিন্তু এদের বেলায় তা অসম্ভব।
“যা-ই হোক,” সে বলে চলল, “আমরা ওই স্বপ্ন-দানবটাকে গর্তের ভেতর আধমরা অবস্থায় ছটফট করতে দেখে খালের দিকে এগিয়ে গেলাম। পায়ের নীচে সেই আজব ঘাসের গালিচা আমাদের পথ করে দিচ্ছিল। খালের পাড়ে পৌঁছে দেখি, হলদেটে রঙের জলের একটা ক্ষীণ ধারা বয়ে চলেছে। রকেট থেকে যে ঢিপি শহরটা দেখেছিলাম, সেটা ডানদিকে মাইলখানেক দূরেই ছিল। কৌতূহল সামলাতে না পেরে ভাবলাম, একবার দেখে আসি।”
“আগে যখন উপর থেকে দেখেছিলাম, মনে হয়েছিল শহরটা জনমানবহীন। তবে সেখানে যদি কেউ লুকিয়েও থাকে—টুইল আর আমি দুজনেই তো সশস্ত্র। আর টুইলের ওই কাচের অস্ত্রটা ছিল ভারী চমৎকার এক যন্ত্র; ওই স্বপ্ন-দানবের ঘটনার পর আমি ওটা ভালো করে পরীক্ষা করেছিলাম। ওটা থেকে কাচের ছোটো কুচি কুচি স্প্লিন্টার বেরোয়, সম্ভবত বিষাক্ত। একবার লোড করলে অন্তত শ-খানেক শট নেওয়া যায়। আর ওটার চালিকাশক্তি হল বাষ্প—স্রেফ জলীয় বাষ্প!”
“স্টিম-গান!” পুট্জ অবাক হয়ে শুধোলেন, “তা স্টিম আসছিল কোথা থেকে?”
“জল থেকে, আবার কোথা থেকে! অস্ত্রটার স্বচ্ছ হাতলের ভেতর দিয়ে জল দেখা যাচ্ছিল, আর তার পাশেই ছিল আধ পোয়া পরিমাণ অন্য একটা ঘন হলদে তরল। টুইল যখন হাতলে চাপ দিল—ওতে কোনো ট্রিগার ছিল না—অমনি একফোঁটা জল আর একফোঁটা ওই হলদে তরল ফায়ারিং চেম্বারে গিয়ে ঢুকল আর জলটা মুহূর্তের মধ্যে বাষ্প হয়ে বেরোল—ফক! ব্যাপারটা খুব একটা কঠিন নয়; আমার মনে হয়, আমরাও একই পদ্ধতি কাজে লাগাতে পারি। গাঢ় সালফিউরিক অ্যাসিড জলকে প্রায় ফুটন্ত অবস্থায় নিয়ে যায়, কলিচুন দিয়েও সেটা সম্ভব, আবার পটাশিয়াম বা সোডিয়াম তো আছেই—
“ওর অস্ত্রের পাল্লা আমারটার মতো অত বেশি ছিল না যদিও, তাও এই পাতলা বাতাসে খুব একটা খারাপও নয়। আর-একবার লোড করলে ওয়েস্টার্ন সিনেমার কাউবয় বন্দুকের মতো সমানে গুলি চালিয়ে যাওয়া যায়। মঙ্গল গ্রহের প্রাণীদের জন্য বেশ মোক্ষম। একটা আজব গাছের দিকে তাক করে ওটা চালিয়ে দেখলাম, দেখি, গাছটা মুহূর্তের মধ্যে শুকিয়ে ঝুরঝুরে হয়ে ভেঙে পড়ল! সেইজন্যেই আমার ধারণা হল ওই কাচের কুচিগুলো বোধহয় বিষ লাগানো।”
“যা-ই হোক, আমরা সেই কাদার ঢিপি শহরের দিকে এগোতে লাগলাম আর ভাবতে লাগলাম, শহর যারা বানিয়েছে, তারাই কি এই খালগুলো খুঁড়েছে? আমি শহর আর খালটার দিকে আঙুল দেখিয়ে টুইলকে জিজ্ঞেস করায় ও বলল ‘নো—নো—নো’! আর দক্ষিণের দিকে হাত নাড়াল। আমি ধরে নিলাম, অন্য কোনো জাতি এই খালের জাল বিছিয়েছে, হয়তো টুইলদের জাতি। জানি না; হয়তো এই গ্রহে আরও একটা বুদ্ধিমান জাতি আছে, কিংবা ডজনখানেকও হতে পারে। মঙ্গল সত্যিই এক বিচিত্র জগৎ।”
“শহর থেকে শ-খানেক গজ দূরে একটা রাস্তার মতো জায়গায় পৌঁছোলাম—কাদা দিয়ে তৈরি শক্ত একচিলতে পথ। আর ঠিক তখনই, হঠাৎ করে এক ঢিপি-শহরবাসী সামনে এসে হাজির হল!”
“ভাই রে, কী বলব তার রূপের বর্ণনা! একটা পিপে যেন চারটে ঠ্যাঙের উপর ভর করে দৌড়ে আসছে, আর তার সঙ্গে আছে আরও চারটে হাত বা শুঁড়। কোনো মুণ্ডু নেই, শুধু ধড় আর চার হাত-পা, আর সারা শরীর জুড়ে গোল করে বসানো এক সারি চোখ। পিপের মতো শরীরের মাথার দিকটা একটা ঢাকের চামড়ার মতো টানটান চামড়া দিয়ে ঢাকা—ব্যাস, এটুকুই। ওটা একটা তামার ছোটো হাতগাড়ি ঠেলতে ঠেলতে আমাদের পাশ দিয়ে তিরের বেগে বেরিয়ে গেল। আমাদের দিকে ফিরেও তাকাল না, যদিও আমার মনে হল, যাওয়ার সময় ওর চোখের সারিটা আমার দিকে সামান্য একটু ঘুরেছিল।”
“একটু পরেই আরও একজন এল, ওর হাতেও একটা খালি গাড়ি। একই ব্যাপার—আমাদের পাশ কাটিয়ে শোঁ-ও-ও করে বেরিয়ে গেল। ভাবলাম, একদল পিপে রেলগাড়ি-রেলগাড়ি খেলবে আর আমাকে পাত্তাই দেবে না, তা তো হতে পারে না! তাই তৃতীয়জন যখন এগিয়ে এল, আমি ওর রাস্তার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালাম—অবশ্য ও না থামলে একলাফে সরে যাওয়ার জন্য তৈরি ছিলাম।”
“কিন্তু ব্যাটা থামল। থামার পর ওর মাথার উপরকার সেই ঢাকের চামড়ায় এক ধরনের খটখট শব্দ শুরু হল। আমি দু-হাত বাড়িয়ে বললাম, ‘আমরা বন্ধু!’ আর আন্দাজ করে বলো তো, প্রাণীটা তখন কী করল?”
“বলেছিল, ‘আপনার সঙ্গে আলাপ করিয়া বড়োই প্রীত হইলাম’! কী, তা-ই না? বাজি রেখে বলতে পারি, নির্ঘাত এরকমই কিছু একটা বলেছিল।” হ্যারিসন টিপ্পনী কেটে বলল।
“আরে সেটা বললেও বোধহয় আমি এতটা অবাক হতাম না!” জারভিস বলল, “প্রাণীটা তার মাথার উপরকার পর্দায় একনাগাড়ে খটখট শব্দ করল, আর তারপর হঠাৎ গমগমে গলায় বলে উঠল, ‘আমরা ভো-ও-ও-ওন্দু!’ আর বলেই তার ঠ্যালাগাড়ি দিয়ে আমাকে একখানা মোক্ষম গুঁতো মারল! আমি একলাফে সরে দাঁড়ালাম, আর ওটা তিরের বেগে বেরিয়ে গেল। আমি স্রেফ হাঁ করে ওর যাওয়ার দিকে বোকার মতো তাকিয়ে রইলাম।”
“এক মিনিট পরেই আরেকটা হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এল। ওটা আর থামল না, শুধু যাওয়ার সময় খটখট করে শুনিয়ে গেল, ‘আমরা ভো-ও-ও-ওন্দু!!’ আর নিমেষের মধ্যে চোখের আড়ালে চলে গেল। এ ব্যাটা এই কথা শিখল কোত্থেকে? এই সব ক-টা প্রাণী কি নিজেদের মধ্যে কোনোভাবে যোগাযোগ রাখছে? নাকি এরা সবাই কোনো একটা কেন্দ্রীয় মস্তিষ্কের অংশ? আমি জানি না, তবে আমার মনে হয়, টুইল হয়তো জানে।
“যা-ই হোক, একের পর এক ওই আজব পিপেগুলো আমাদের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যেতে লাগল, আর প্রতিবারই একই বুলি আওড়াতে লাগল। ব্যাপারটা একসময় বেশ মজার হয়ে দাঁড়াল। এই পাণ্ডববর্জিত গোলকের উপর যে আমার এত বন্ধু আছে, তা কে জানত! শেষমেশ আমার হতবুদ্ধি অবস্থাটা টুইলকে ইশারা-ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করলাম; আর মনে হল, ও ব্যাপারটা বুঝতেও পেরেছে, কারণ ও বলে উঠল, ‘ওয়ান-ওয়ান-টু—ইয়েস!—টু-টু-ফোর—নো’! কিছু বুঝতে পারলে?”
“আলবাত পারছি,” হ্যারিসন বলল, “নিশ্চয়ই মঙ্গলের কোনো নার্সারি রাইম-টাইম হবে।”
“তা হতে পারে! তবে আমি টুইলের এই সাংকেতিক ভাষার কিছুটা রপ্ত করেছিলাম, তাই আমি মানেটা এভাবে বের করলাম। ‘ওয়ান-ওয়ান-টু—ইয়েস’! মানে এই জানোয়ারগুলোর বুদ্ধি আছে। ‘টু-টু-ফোর—নো’! মানে ওদের বুদ্ধি আমাদের ধাঁচের নয়, ওটা অন্য কিছু—যা দুই আর দুইয়ে চার হওয়ার যুক্তিও মানে না। হয়তো আমি ওর মানে ভুল বুঝেছিলাম। হয়তো ও বোঝাতে চেয়েছিল যে ওদের বুদ্ধি খুব নীচু দরের, শুধু সাধারণ জিনিসগুলো বোঝে, ‘ওয়ান-ওয়ান-টু—ইয়েস’!—কিন্তু একটু কঠিন কিছু হলেই আর পারে না, ‘টু-টু-ফোর—নো’! কিন্তু পরে আমরা যা দেখলাম, তাতে আমার মনে হয় প্রথম মানেটাই ঠিক।”
“কিছুক্ষণ পর জানোয়ারগুলো সব ফিরে আসতে শুরু করল—একে একে। ওদের ঠ্যালাগাড়িগুলো তখন পাথর, বালি আর ওই রাবারের মতো গাছের টুকরোয় ঠাসা। ওরা সেই বন্ধুত্বের বাণী আওড়াতে আওড়াতে পাশ দিয়ে বেরিয়ে যেতে লাগল, যদিও সেই গমগমে আওয়াজটা খুব একটা বন্ধুত্বপূর্ণ শোনাচ্ছিল না। তৃতীয় যে পিপেটা আসছিল, আমি ধরে নিলাম ওটাই আমার সেই প্রথম চেনা প্রাণীটি। ভাবলাম, ওর সঙ্গেই আবার একটু বাতচিত করি। আমি আবার ওর রাস্তার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালাম।”
“প্রাণীটা কাছে এল, তার সেই চেনা ‘আমরা ভো-ও-ও-ওন্দু’! শুনিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমি ওর দিকে তাকালাম; পিপের মতো দেহে গোল করে বসানো চোখগুলোর চার-পাঁচটা আমার দিকেই চেয়ে ছিল। ও আবার তার পাসওয়ার্ড আওড়াল আর ঠ্যালাগাড়িটাকে একখানা মোক্ষম ধাক্কা দিল, কিন্তু আমি পাথরের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। আর অমনি সেই—সেই পাজি জানোয়ারটা তার একটা হাত বাড়িয়ে সাঁড়াশির মতো দুটো আঙুল দিয়ে আমার নাকে একখানা জোর চিমটি কাটল!”
“হো-হো-হো!” হ্যারিসন অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল, “হয়তো ওদের সৌন্দর্যের বোধ খুবই টনটনে!”
“হেসে নাও, হেসে নাও,” জারভিস গজগজ করে উঠল, “এমনিতেই ওই নাকে রকেট ক্র্যাশের চোট আর ফ্রস্টবাইটের জ্বালায় আমি অতিষ্ঠ হয়ে ছিলাম। আমি ‘আঁইক!’ বলে এক চিৎকার দিয়ে পিছিয়ে গেলাম, আর জানোয়ারটা তিরের বেগে বেরিয়ে গেল। কিন্তু তার পর থেকে ওদের সবার বুলি বদলে গেল। এখন থেকে ওরা বলতে শুরু করল, ‘আমরা ভো-ও-ও-ওন্দু! আঁইক’! যতসব সৃষ্টিছাড়া জন্তু!”
“টুইল আর আমি সেই রাস্তা ধরে সোজা কাছের ঢিপিটার দিকে এগোলাম। পিপে-জীবগুলো সমানে যাতায়াত করছিল, আমাদের দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপও করছিল না। কেবল যত রাজ্যের আবর্জনা বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ওরা। রাস্তাটা সোজা একটা সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল—ঠিক কোনো পুরোনো কয়লাখনির মতো ঢালু হয়ে নীচে নেমে গিয়েছে ওটা। আর তার ভেতরেই শোঁ শোঁ করে সেই পিপে-মানুষগুলো যাতায়াত করছিল আর আমাদের অভিবাদন জানাচ্ছিল তাদের সেই এক বুলি দিয়ে।”
“ভেতরে তাকাতেই নীচে কোথাও একটা আলো দেখতে পেলাম। আলোটা দেখে কোনো আগুনের শিখা বা মশালের আলো মনে হল না, বরং মনে হচ্ছিল কোনো সভ্য জগতের আলো। আমার কৌতূহলও বেড়ে গেল। ভাবলাম, এই পিপে-মানবরা কতটা উন্নত, তার একটা হদিস এখানে মিললেও মিলতে পারে। অগত্যা আমি ভেতরে ঢুকে পড়লাম, আর টুইলও কয়েকবার ফরফর করে আর শিস দিয়ে অমত জানিয়ে শেষমেশ আমার পিছু নিল।”
“আলোটা ছিল ভারী অদ্ভুত; পুরোনো দিনের আর্কলাইটের মতো ওটা দপদপ করছিল আর মাঝে মাঝে আগুনের ফুলকি ছিটকে বেরোচ্ছিল, আর আলোটা আসছিল করিডরের দেওয়ালে বসানো একটা কালো দণ্ড থেকে। ওটা যে বৈদ্যুতিক আলো, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার মানে এরা বেশ সভ্যই বলতে হবে।”
“তারপর অন্য আরেকটা আলো দেখলাম, ঝকঝকে কোনো কিছুর উপর পড়ে ঠিকরে আসছে। এগিয়ে গিয়ে দেখলাম ওটা স্রেফ একগাদা চকচকে বালি। বেরিয়ে আসার জন্য যেই-না উলটোদিকে ঘুরলাম—মাইরি বলছি—দেখি প্রবেশপথটা উধাও! কী করে যে কী হল, বুঝতে পারলাম না।”
“আমার ধারণা, সুড়ঙ্গটা কোনো জায়গায় বেঁকে গিয়েছিল, অথবা আমি ভুল করে কোনো গলিতে ঢুকে পড়েছিলাম। যা-ই হোক, যেদিক থেকে এসেছি বলে মনে হল, সেদিকেই হাঁটতে শুরু করলাম, কিন্তু সামনে দেখি আবছা আলোয় ভরা আরও একগাদা সুড়ঙ্গ! জায়গাটা তো দেখছি পুরো গোলকধাঁধা! চারদিকে শুধু প্যাঁচানো সব সুড়ঙ্গ, মাঝে মাঝে একেকটায় আলো জ্বলে উঠছে, আর এক-একটা পিপে-মানব পাশ দিয়ে শোঁ শোঁ করে বেরিয়ে যাচ্ছে—কখনও ঠ্যালাগাড়ি নিয়ে আসছে, কখনও খালি হাতে।”
“প্রথমে আমি খুব একটা ঘাবড়াইনি। টুইল আর আমি তো প্রবেশপথ থেকে মাত্র কয়েক পা এগিয়েছিলাম। কিন্তু যত কদম এগোচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল, ততই যেন আরও গভীরে তলিয়ে যাচ্ছি। শেষমেশ একটা খালি ঠ্যালাগাড়িওয়ালা পিপের পিছু নিলাম; ভাবলাম, ও নিশ্চয়ই আবর্জনা আনতে বাইরেই যাচ্ছে। কিন্তু ওটা কোনো দিশা ছাড়াই এদিক-ওদিক ঘুরতে লাগল—কখনও এক রাস্তায় ঢুকছে তো কখনও অন্যটা দিয়ে বেরোচ্ছে। যখন দেখলাম, ওটা একটা থামের চারদিকে চরকিপাকের মতো বাঁইবাঁই করে ঘুরছে, তখন আমি হাল ছেড়ে দিয়ে, পিঠের জলের ট্যাংকটা মেঝের উপর নামিয়ে ধপাস করে বসে পড়লাম।”
“টুইলও আমার মতোই পথ হারিয়েছে। আমি উপরের দিকে আঙুল দেখাতেই ও এক অসহায় স্বরে শিস দিয়ে জানাল, ‘নো—নো—নো’! আর এখানকার স্থানীয় অধিবাসীদের কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাওয়ার আশাই তো বৃথা। ওরা আমাদের দিকে পাত্তাই দিচ্ছিল না, শুধু আমাদের নিশ্চিত করছিল যে ওরা আমাদের বন্ধু—না না, ভোন্দু। আঁইক!”
“কত ঘণ্টা বা কতদিন যে আমরা ওখানে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরেছি, তা ভগবান জানে! ক্লান্তির চোটে আমি এরই মধ্যে দুবার ঘুমিয়ে নিলাম। টুইলের মনে হয় ঘুমের কোনো দরকারই নেই। আমরা শুধু উপরের দিকে উঠে-যাওয়া সুড়ঙ্গগুলো দিয়ে হাঁটার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু দেখা যাচ্ছিল, সেগুলো কিছুটা উপরে উঠে আবার নীচের দিকে নেমে আসছে। এই অলুক্ষুনে ঢিপির ভেতরের তাপমাত্রা ছিল একদম স্থির; দিন না রাত বোঝার কোনো জো নেই। প্রথমবার ঘুমোনোর পর আমি নিজেই জানতাম না যে, এক ঘণ্টা ঘুমিয়েছি না তেরো ঘণ্টা। ফলে ঘড়ি দেখেও বোঝার উপায় ছিল না ওটা মাঝরাত না দুপুর।”
“আমরা ওখানে অনেক অদ্ভুত জিনিস দেখলাম। কোনো কোনো সুড়ঙ্গে দেখলাম, কতকগুলো যন্ত্রপাতি চলছে, কিন্তু সেগুলো কোনো কাজের কাজ করছে বলে মনে হল না—স্রেফ চাকাগুলো ঘুরে চলেছে। আর কয়েকবার দেখলাম, দুটো পিপে-মানবের মাঝখানে একটা ছানা পিপে-মানব গজিয়ে উঠেছে, যা দুজনের সঙ্গেই আটকে আছে।”
“পার্থেনোজেনেসিস!” লেরয় উল্লাসে ফেটে পড়ল, “একেবারে টিউলিপ ফুলের মতো অযৌনজনন!”
জারভিস সায় দিয়ে বলল, “তুমি যদি বলো তাহলে তা-ই হবে। পিপেগুলো আমাদের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছিল না, আবার সেই বুলি, ‘আমরা ভো-ও-ও-ওন্দু! আঁইক’! বলতেও ছাড়ছে না। ওদের কোনো পারিবারিক জীবন আছে বলে মনে হল না, শুধু ওই ঠ্যালাগাড়ি করে আবর্জনা বয়ে আনাই যেন ওদের একমাত্র কাজ। আর শেষমেশ আমি বুঝতে পারলাম, ওরা ওই আবর্জনা দিয়ে কী করে।
“একটা সুড়ঙ্গে এসে মনে হল, আমাদের ভাগ্য যেন এবার বোধহয় সুপ্রসন্ন হতে শুরু করেছে, সুড়ঙ্গটা এবার অনেকটা পথ খাড়া উপরের দিকে উঠে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, আমরা বুঝি ভূপৃষ্ঠের প্রায় কাছাকাছিই পৌঁছে গিয়েছি, এমন সময় হঠাৎ সুড়ঙ্গটা একটা গম্বুজাকৃতি হলঘরের ভেতর গিয়ে শেষ হয়ে গেল—ওরকম ঘর আমরা একটাই দেখেছিলাম। আর, ছাদের একটা ফাটল দিয়ে যখন দিনের আলো দেখতে পেলাম, তখন তো খুশিতে নাচতে ইচ্ছা করছিল!
“সেই ঘরের ভেতর একটা—একটা মেশিনের মতো কিছু ছিল; কেবল বিশাল একটা চাকা দেখা যাচ্ছে, তাও খুব ধীর গতিতে ঘুরছে। আর দেখলাম, একটা পিপে-বন্ধু তার ঠ্যালাগাড়ির সব আবর্জনা ওই চাকার নীচে ঢেলে দিচ্ছে। চাকাটা কড়মড় শব্দে সব গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল—বালি, পাথর, গাছপালা সব মিহি পাউডার হয়ে কোথায় যেন চলে যাচ্ছিল। আমরা যখন দেখছিলাম, ওই সময়েই একে একে আরও অনেকে এসে একই কাজ করতে লাগল। কোনো ছন্দপতন নেই, ওঠানামা নেই, কোনো যুক্তি নেই—এই উৎকট গ্রহের এটাই বোধহয় বৈশিষ্ট্য। আর সেখানে আরও একটা আজব ব্যাপার দেখলাম, যা বললে তোমরা কেউই বিশ্বাস করবে না।
“আবর্জনা ঢেলে দেওয়ার পর পিপেদের একজন তার গাড়িটা দড়াম করে একপাশে ঠেলে সরিয়ে দিল এবং নিজে খুব শান্তভাবে ওই চাকার তলায় গিয়ে শুয়ে পড়ল! আমার চোখের সামনে ওটা পিষে মণ্ড হয়ে গেল, আমি এতই স্তম্ভিত হয়ে গেলাম যে, মুখ দিয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারলাম না। কিছুক্ষণ পর আরেকটা পিপেও একই কাণ্ড করল! ওদের কাজকারবার ছিল একেবারে নিয়মমাফিক; যাদের হাতে গাড়ি ছিল না, তাদের একজন এসে ওই পরিত্যক্ত গাড়িটা টেনে নিয়ে চলে গেল।
“টুইল কিন্তু বিন্দুমাত্র অবাক হয়নি; আমি যখন পরের আত্মহত্যার সময় ওকে দেখার জন্য ইশারা করলাম, ও মানুষের মতো কাঁধ ঝাঁকিয়ে বুঝিয়ে দিল, ‘আমি আর কী করতে পারি?’ ও বোধহয় এদের সম্পর্কে আগে থেকেই জানত।
“তারপর দেখলাম আরেকটা জিনিস। চাকাটার ওপাশে নীচু একটা বেদির উপর কিছু একটা জ্বলজ্বল করছে। এগিয়ে গিয়ে দেখি ডিমের মতো আকারের একটা স্ফটিক বা ক্রিস্টাল, ওটা থেকে এক আশ্চর্য আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। সেই আলো আমার হাতে আর মুখে তড়িৎ-আঘাতের মতো বিঁধতে লাগল। আর তখনই খেয়াল করলাম এক অদ্ভুত কাণ্ড। মনে আছে, আমার বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলে একটা আঁচিল ছিল? এই দ্যাখো!” জারভিস হাত বাড়িয়ে দেখাল, “ওটা শুকিয়ে ঝরে পড়ে গিয়েছে—একেবারে ভোজবাজির মতো! আর আমার ওই চোট-পাওয়া নাকটা—আরে ভাই, কী বলব, যন্ত্রণাটা যেন জাদুর মতো উধাও হয়ে গেল! জিনিসটার মধ্যে হার্ড এক্সরে বা গামা-রশ্মির মতো কোনো গুণ ছিল, যা শুধু অসুস্থ কোশগুলোকে ধ্বংস করে সুস্থ কোশগুলোকে অক্ষত রাখে!
“আমি যখন ভাবছি, মা বসুমতীর জন্য এটা কত বড়ো একটা উপহার হবে, তখনই এক বিকট চিৎকারে চমক ভাঙল। চাকার ওপাশে ফিরে গিয়ে দেখলাম, একটা ঠ্যালাগাড়িও পিষে গুঁড়ো হয়ে গিয়েছে। মনে হল, কোনো এক আত্মহত্যাকারী অনবধানবশত তার গাড়িটাও চাকার নীচে ফেলে দিয়েছিল।
“আর অমনি চারপাশ থেকে সেই জন্তুগুলো গর্জন আর ঢাকের মতো শব্দ করতে শুরু করে দিল—ওদের আওয়াজ তখন রীতিমতো হুমকির মতো শোনাচ্ছিল। তাদের একদল আবার আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। যে সুড়ঙ্গ দিয়ে ঢুকেছিলাম বলে মনে হল, সেটা দিয়েই আমরা পিছিয়ে যেতে লাগলাম, আর ওগুলো আমাদের দিকে তাড়া করে আসছিল তখন। উন্মাদ বর্বরের দল! একঝাঁক গলা থেকে তখন সমস্বরে বেরোচ্ছে, ‘আমরা ভো-ও-ও-ওন্দু! আঁইক’! ওদের ওই ‘আঁইক’ শব্দটা আমার একদম ভালো ঠেকল না; ওটার মধ্যে কেমন যেন একটা অশনি ইঙ্গিত ছিল!
“টুইল তার কাচের পিস্তলটা বের করল। আমিও হাত দুটোকে মুক্ত রাখার জন্য জলের ট্যাংকটা পিঠ থেকে নামিয়ে ফেলে নিজের রিভলভারটা বাগিয়ে ধরলাম। আমরা সুড়ঙ্গ ধরে পিছিয়ে আসছি, আর ওই পিপেগুলো—সংখ্যায় জনা কুড়ি হবে—আমাদের তাড়া করে আসছে। অদ্ভুত ব্যাপার, যারা মাল-বোঝাই গাড়ি নিয়ে ভেতরে ঢুকছিল, তারা আমাদের গা ঘেঁষে বেরিয়ে যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু আমাদের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছিল না।
“টুইল কিন্তু ব্যাপারটা লক্ষ করেছিল। হঠাৎ ও তার সেই জ্বলন্ত কয়লার মতো লাইটারটা বের করে একটা গাড়ির উপরকার শুকনো ডালপালায় ছুঁইয়ে দিল। ব্যাস! ফস করে আগুন জ্বলে উঠল—আর সেই গর্দভ গাড়িওয়ালা পিপেটা তার গাড়িতে আগুন-লাগা অবস্থাতেই একই গতিতে ভেতরের দিকে দৌড়ে চলে গেল! তারপরেই আমাদের ওই তথাকথিত ‘ভোন্ধু’দের মধ্যে বেশ একটা শোরগোল পড়ে গেল। আর ঠিক তখনই দেখলাম, ধোঁয়াগুলো কুণ্ডলী পাকিয়ে আমাদের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে—আর তাতেই কেল্লা ফতে! ধোঁয়ার গতির অভিমুখ দেখেই আমি প্রবেশপথটা চিনে ফেললাম।
“আমি টুইলকে জাপটে ধরলাম আর দুজনে তিরবেগে বাইরে বেরিয়ে এলাম। পেছনে ধাওয়া করে এল সেই জনা বিশেক মূর্তিমান আপদ। এতক্ষণ পর দিনের আলো দেখে মনে হল যেন স্বর্গে পৌঁছে গেলাম। যদিও প্রথম দর্শনেই বুঝলাম, সূর্য প্রায় পাটে বসেছে। সেটা খুব একটা সুবিধার কথা নয়—কারণ মঙ্গলের হাড়কাঁপানো রাতে থার্মো-স্কিন ব্যাগ ছাড়া, বা অন্তত আগুন ছাড়া আমার বেঁচে থাকা অসম্ভব।
“আরও বিপদ ঘনিয়ে এল খুব দ্রুত। ওরা আমাদের দুটো ঢিপির মাঝখানের একটা জায়গায় কোণঠাসা করে ফেলল। আমরা ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি বা টুইল কেউই গুলি চালাইনি; ওই বর্বরগুলোকে অহেতুক খেপিয়ে লাভ নেই। ওরা একটু দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল আর সেই বন্ধুত্ব আর ‘আঁইক’-এর বাণী নিয়ে হইহট্টগোল করতে লাগল।
“তারপর পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে উঠল। একটা বর্বর একটা ঠ্যালাগাড়ি নিয়ে বেরিয়ে এল আর সবাই মিলে জড়ো হয়ে ওটার ভেতর হাত ঢুকিয়ে হাত ভরে ভরে তামার তির বা ছোটো বল্লমের মতো অস্ত্র বের করে নিল—লম্বায় সেগুলো প্রায় এক ফুট আর ফলাটাও দেখে বেশ সুচালোই মনে হল। হঠাৎ একটা তির আমার কানের পাশ দিয়ে সাঁই-ই-ই করে বেরিয়ে গেল—ওরেব্বাপ! তখন হয় মারো, না হয় মরো পরিস্থিতি একদম।
“কিছুক্ষণ আমরা বেশ পাল্লা দিয়ে লড়লাম। যারা ঠ্যালাগাড়ির কাছে ছিল, তাদের একে একে গোল্লায় পাঠিয়ে তিরবৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে আনলাম। কিন্তু হঠাৎ এক বজ্রনির্ঘোষে ‘ভোন্দু’ আর ‘আঁইক’ শব্দে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠল, আর সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল তাদের আস্ত বাহিনী!
“আমি তখনই বুঝে গেলাম যে আমাদের খেলা শেষ! কিন্তু এটাও খেয়াল করলাম, টুইল কিন্তু তখনও হাল ছাড়েনি। ও চাইলে অনায়াসেই সেই ভয়ংকর লাফ দিয়ে ঢিপিটা টপকে পালিয়ে যেতে পারত। শুধু আমার জন্যই টুইল পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করে যাচ্ছিল!
“বলতে বাধ্য হচ্ছি, তেমন অবকাশ থাকলে আমি বোধহয় ওখানেই কেঁদে ফেলতাম! টুইলকে প্রথম দেখাতেই আমার ভালো লেগেছিল। কিন্তু আমার জায়গায় টুইল থাকলে আমি কি ওর মতো কৃতজ্ঞতা দেখাতে পারতাম? আমি ওকে প্রথমবার বাঁচিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু ও-ও তো আমার জন্য কম করেনি। আমি ওর হাতটা চেপে ধরে বললাম ‘টুইল’, আর উপরের দিকে ইশারা করলাম। ও বুঝে গেল। ও বলল, ‘নো—নো—নো, টিক’! আর সমানে ওর কাচের পিস্তল চালিয়ে যেতে লাগল ফকফক করে।
“আমারই বা কী করার ছিল? সূর্য ডুবলে তো এমনিই আমার জারিজুরি শেষ, কিন্তু সেটা ওকে কে বোঝাবে? আমি বললাম, ‘ধন্যবাদ, টুইল। তুমি একজন মানুষের মতো মানুষ বটে!’ আর তখনই মনে হল, আমি ওকে ওর উপযুক্ত প্রশংসা করে উঠতে পারলাম না। মানুষ! মানুষের মধ্যে কজন আছে, যে এমন কাজ করতে পারে?
“আমি আমার বন্দুক দিয়ে গুড়ুমগাড়াম করছি আর টুইল ওর বন্দুক দিয়ে ফকফক করে ধোঁয়া ছাড়ছে। পিপেগুলো তির ছুড়ছে আর আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার তোড়জোড় করছে, আর মুখে তখনও বন্ধুত্বের বুলি হেঁকে চলেছে। আমি সমস্ত আশা ছেড়ে দিলাম। ঠিক তখনই যেন স্বর্গ থেকে এক দেবদূত হয়ে নেমে এল পুট্জ! ওর রকেটের নীচের জেট-ইঞ্জিনের আগুনে ওই পিপেগুলো সব টুকরো টুকরো হয়ে ঝলসে গেল!
“আরেব্বাস! আমি এক চিৎকার দিয়ে রকেটের দিকে দৌড় দিলাম। পুট্জ দরজা খুলে দিল আর আমি হাসতে হাসতে, কাঁদতে কাঁদতে আর চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। মিনিটখানেক পর টুইলের কথা মনে পড়ল। ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, ও ঢিপিটার উপর দিয়ে সেই বল্লমের মতো এক বিশাল লাফ দিয়ে দিগন্তের ওপারে মিলিয়ে যাচ্ছে।
“পুট্জকে বুঝিয়েসুঝিয়ে টুইলের পেছনে ধাওয়া করতে রাজি করানো যে কী কঠিন ছিল, বাপ রে বাপ! যতক্ষণে আমরা রকেট নিয়ে আকাশে উঠলাম, ততক্ষণে অন্ধকার নেমে এসেছে। এখানে অন্ধকার ঠিক আলো নেবানোর মতো হঠাৎ করে আসে। আমরা মরুভূমির উপর দিয়ে উড়ে গেলাম, দু-এক জায়গায় ল্যান্ডও করলাম। আমি ‘টুইল! টুইল!’ বলে একশোবার ডাকলাম। ওকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। ও তো বাতাসের গতিতে পথ চলে। শুধু দক্ষিণদিক থেকে একটা হালকা কিচিরমিচির আর শিসের আওয়াজ ভেসে এল—নাকি ওটা আমার শুধুই কল্পনা ছিল, জানি না। ও চলে গিয়েছিল, আর ফেরেনি। মাইরি বলছি, ও না গেলেই মনে হয়, আমার মনে ইচ্ছেপূরণ হত!”
‘এরিস’ রকেটের চারজন অভিযাত্রী একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইল। এমনকি রসিক হ্যারিসনও চুপ। শেষমেশ লেরয় সেই নীরবতা ভাঙল।
লেরয় বিড়বিড় করে বললেন, “আমি ওর সঙ্গে দেখা করতে চাই।”
“হ্যাঁ, আমিও।” হ্যারিসনও সায় দিল, “আর ওই আঁচিল সারানোর দাওয়াইটাও আমার চাই। ওটা হাতছাড়া করা তোমার একদম উচিত হয়নি, জারভিস; ওটাই হয়তো সেই ক্যানসারের ওষুধ হতে পারত, যা দেড়শো বছর ধরে মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছে।”
“ওহ্, ওটার কথা বলছ তুমি!” জারভিস বিষণ্ণ মনেই বিড়বিড় করে বলল, “ওটার জন্যেই তো লড়াইটা শুরু হয়েছিল!” বলতে বলতে সে তার পকেট থেকে একটা চকচকে বস্তু বের করল।
“আমি তুলে নিয়েছিলাম বেদি থেকে। এই তো, ওটা এখনও আমার কাছেই আছে।”
Tags: একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা, রাকেশকুমার দাস, স্ট্যানলি জি. ওয়েনবাম
